অড্রে ট্রুশকের পরিচয়ে তাকে একজন জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচয় করবার চেয়ে বরং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একজন বিদ্যায়তনিক (academic) গবেষক হিসেবে পরিচয় করানোটাই বেশি জুতসই। এবং তিনি এই পরিচয়েই বেশি পরিচিত।
তাঁর প্রথম গ্রন্থ, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘Culture of Encounters: Sanskrit at the Mughal Court’ (২০১৬) রচিত হয়েছে মুঘল দরবারে ফার্সি ও সংস্কৃত জগতের পারষ্পরিক সাহিত্যিক মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাসকে উপজীব্য করে। দ্বিতীয় গ্রন্থটি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘Aurangzeb: The Life and Legacy of India’s Most Controversial King‘ (২০১৭) ছিল মুঘল সম্রাটদের একজন প্রখ্যাত ও বিতর্কিত শাসকের ওপর একটি তাত্ত্বিক গবেষণাপত্র। প্রথম গ্রন্থটির জন্য ট্রুশকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ ‘জন এফ. রিচার্ডস পুরস্কার’ লাভ করেন।
তবে, দ্বিতীয় গ্রন্থটির প্রকাশনা বিদ্যায়তনিক মহলে সমাদৃত হলেও এটি ট্রুশকে এবং তাঁর গবেষণার বিরুদ্ধে এক তীব্র অপপ্রচারমূলক এবং ঘৃণাজীবি প্রচারণার (smear campaign) সূত্রপাত ঘটায়, যার মূলে ছিল ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। এর সুত্র ধরে- ট্রুশকে যেখানে অধ্যাপনা করেন, সেই রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের একদল হিন্দু শিক্ষার্থী ২০২১ সালে হিন্দুধর্ম সম্পর্কিত যেকোনো বিষয় পড়ানো থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ারও দাবি উঠায়। তাদের অভিযোগ ছিল, ট্রুশকে তাঁর বইতে আওরঙ্গজেবের ইতিহাসকে সুপরিকল্পিতভাবে হোয়াইটওয়াশ করেছেন। আরএসএস-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান ট্রুশকে এবং প্রগতিশীল হিন্দু গোষ্ঠীসহ আরও বেশ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে একটি মানহানির মামলাও দায়ের করে।
হিন্দুত্ববাদীদের সেই মামলাটি ব্যর্থ হয় এবং ট্রুশকে নিউ জার্সির রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যাপনা এখন অব্দি চালিয়ে যাচ্ছেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং প্রখ্যাত মার্কিন সংস্কৃতজ্ঞ শেলডন পোলকের সান্নিধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্রুশকে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উঠে আসা সংস্কৃত ও ইন্দো-পারসিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। বক্ষ্যমাণ এই সাক্ষাৎকারটি লাহোরে তাঁর নতুন গ্রন্থ India: 5000 Years of History on the Subcontinent (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২৫)-এর প্রচারণার সময় গ্রহণ করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারটি সংক্ষেপণ এবং আলোচনার স্পষ্টীকরণের স্বার্থে কিছুটা পরিমার্জিত হয়েছে।
দ্রষ্টব্যঃ সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় জবান ম্যাগাজিন বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছে। মূল সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পাকিস্তানভিত্তিক ম্যাগাজিন Dunya Digital এর রানা সাদুল্লাহ খান।
__________
রানা সাদুল্লাহ খান (আরএসকে): একজন প্রশিক্ষণরত ইতিহাসবিদ হিসেবে আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন যে আপনার কাজ এতোটা আলোচিত হবে?
অড্রে ট্রুশকে (এ. টি.): দুঃস্বপ্নেও না। চিন্তা করুন- আমার বয়স তখন ২০-এর কোঠার মাঝামাঝি বা শেষের দিকে, আমি পিএইচডি নিয়ে ব্যস্ত। আমার অধিকাংশ সময় কাটছে দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ কিংবা নিউ ইয়র্কের কোনো লাইব্রেরিতে। ৩০ বছর বয়সে আমার পিএইচডি শেষ হয়। ঐ সময় আমার যদি কোনো দুশ্চিন্তা থেকেও থাকে, সেটা ছিলো আমার কাজ শেষ পর্যন্ত কেমন সমাদর পাবে, সেটা নিয়ে আদৌ কেউ মাথা ঘামাবে কী না- এই নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের ‘বিতর্কিত বিষয়গুলো’ সম্পর্কে আমি কিছুটা সচেতন থাকলেও সেগুলোতে জড়ানোর কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। আমার অবস্থান থেকে দেখলে বলতে হয়, (বিতর্কের কাছে আমি যাইনি) বিতর্কই বরং আমার কাছে এসেছে। (এবং এটা এই নির্দিষ্ট কাজটি থেকে না, বরং) আমার কাজকে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং ব্যবহার করার বিষয়টি সেই ২০১৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত কাজগুলো থেকেই আরম্ভ হয়েছিল। আমি নিশ্চিত, এই নির্দিষ্ট বিষয়টিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হবে।
আরএসকে: সেটা তো ‘Aurangzeb’ প্রকাশেরও আগের কথা…
এ. টি.: হ্যাঁ, কিছুটা আগে। আমার প্রথম বই, ‘কালচার অফ এনকাউন্টারস’ প্রকাশের প্রাক্কালে আমি ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম। তখন আমি এটা ভেবে পুলকিত ছিলাম যে কেউ অন্তত আমার সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে চাইছে এবং আমি আমার লেখার প্রতি মানুষের কিছুটা আগ্রহ তৈরি করার প্রয়াস পেয়েছিলাম। আমি সম্রাট আকবর সম্পর্কে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে কিছু সাহসী বক্তব্য দিয়েছিলাম এই ভেবে যে, দেখি কেউ এতে প্রতিক্রিয়া জানায় কি না।
সেই মন্তব্যগুলো নিয়ে কেউ কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, কিন্তু একই সাক্ষাৎকারে আমি আওরঙ্গজেব সম্পর্কে দুটি সংক্ষিপ্ত এবং অনাপত্তিযোগ্য (unobjectionable) কথা বলেছিলাম, আর এরপরই মনে হলো পুরো পৃথিবী যেন আমার ওপর ভেঙ্গে পড়ল। আমি বলেছিলাম যে আওরঙ্গজেবকে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়: তিনি ছিলেন একজন প্রাক-আধুনিক রাজা (pre-modern king)। এই কথায় কোনো ইতিহাসবিদই আপত্তি করবেন না, এটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্পষ্ট একটি বিষয়। ঐ প্রতিক্রিয়া আমাকে এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করল যে, বিদ্যায়তনিক মহলে (Academia) যা অত্যন্ত স্পষ্ট, বাইরের জগতে সবসময় তেমনটা নয়। আমি প্রথমবারের মতো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত একাডেমিক কাজ (public-facing scholarship) করার সুযোগ দেখতে পেলাম এবং পরবর্তীতে ‘Aurangzeb’ লিখলাম।
আরএসকে: ‘Aurangzeb’ প্রকাশের পর ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আপনাকে ভয়-ভীতি দেখানো বা হুমকি দেওয়ার মাত্রা কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল? এটা কি তাৎক্ষণিক ছিল?
এ. টি.: না, তাৎক্ষণিক ছিলো না। যখন আমি বইটি লিখি, তখন এটি ভারতে প্রকাশ করব কি না- সেটা নিয়েই আমাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়েছিল আসলে। এবং এই বিষয়ে আমি আমার সহকর্মীদের সাথেও পরামর্শ করেছিলাম। সেই সময়ে তাদের মতামত ছিল আধা-আধি। যারা মনে করেছিলেন ‘ভারতে এটি প্রকাশ করা উচিত হবে না’, তারা আসলে এর তীব্র প্রতিক্রিয়ার (backlash) কথা অনুমান করতে পেরেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভেবেছিলাম এই প্রতিক্রিয়া হয়তো মাস আঠারো স্থায়ী হবে, তারপর থিতিয়ে যাবে। শুরুতে তেমনটাই ঘটেছিল- প্রায় বছর দেড়েক এই বইটি নিয়ে বেশ উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো, তারপর আস্তে আস্তে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছিল।
২০১৯ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজেপির বিজয়ের সাথে আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এখানকার বৃহত্তর বিষয়গুলোর মধ্যে থাকা অতি ক্ষুদ্র একটি শিকার ছিলাম মাত্র। আমি বিশ্বাস করি আমার ওপর আক্রমণ সরাসরি আমার গবেষণার ফলাফল নয়; ততদিনে আমি গবেষণায় এক নির্দিষ্ট উচ্চতায় এবং পরিচিতিতে পৌঁছে গিয়েছি। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা যখন নিজেদের বিশেষ ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করে, তখন তারা বিদ্যায়তনিক লক্ষ্যবস্তু (academic targets) খুঁজতে থাকে। আমি তখন কেবল সেই টার্গেটের শীর্ষে থাকা একজন ছিলাম।

আরএসকে: মার্কিন বিদ্যায়তনিক জগৎ (academic world) থেকে আসা কারো পক্ষে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের এমন একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নিয়ে এতোটা আগ্রহ তৈরি হওয়া কীভাবে সম্ভব হলো?
এ. টি.: ধর্মের প্রতি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ দীর্ঘদিনের। আমি কলেজে গিয়েছিলাম ধর্মতত্ত্ব পড়ার জন্য, আর সেখানেই হিন্দুধর্মের ওপর একটা কোর্স নিই। তখন হিন্দুধর্ম সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমেরিকার মিড-ওয়েস্টে আমার বাড়ি। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে আমার পারিবারিক কোনো যোগসূত্রও নেই। তাই বলতে পারেন আমি একদম না জেনেই এই পথে পা বাড়িয়েছিলাম। হিন্দুধর্ম (পড়তে গিয়ে) স্বভাবতই এটা আমার কাছে কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছিল, কিন্তু একইসাথে এটা আনন্দদায়ক এবং রোমাঞ্চকরও ছিলো। এর আগে কখনো এই মিথ বা গল্পগুলো আমি পড়িনি বা সেগুলোর মুখোমুখিও হইনি। তাই কৌতুহল আমার আরও বাড়তে লাগলো। অবশেষে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমি সংস্কৃত শেখা শুরু করি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্র হওয়ার কারণে সেখানে এই বিষয়টা নিয়ে আনন্দের সাথে লেগে থাকাটা বেশ সহজ ছিল।
আমি বলেছিলাম যে আওরঙ্গজেবকে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়: তিনি ছিলেন একজন প্রাক-আধুনিক রাজা। এই কথায় কোনো ইতিহাসবিদই আপত্তি করবেন না, এটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্পষ্ট একটি বিষয়। ঐ প্রতিক্রিয়া আমাকে এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করল যে, বিদ্যায়তনিক মহলে যা অত্যন্ত স্পষ্ট, বাইরের জগতে সবসময় তেমনটা নয়।
আরএসকে: তাহলে আপনি বলছেন- দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় বেশ ভালো একটা জায়গা, না?
এ. টি.: অবশ্যই! তবে, সেখানে আমার যাওয়ার কারণ কেবল এটা ছিলো না। শুরুতে আমার পরিকল্পনা ছিল ‘কোইনে গ্রিক’ (Koine Greek- যে গ্রিক ভাষায় বাইবেল রচিত) শেখার। কিন্তু সংস্কৃতের সংস্পর্শে আসার পর আমি উপলব্ধি করলাম যে, বিদ্যায়তনিক মহলে ইতিমধ্যে অনেকেই কোইনে গ্রিক পড়েন, তাই আমি সংস্কৃতই বেছে নিলাম। এভাবেই স্নাতক পর্যায়ে আমি হিন্দুধর্মের ওপর মনোনিবেশ করি। এক সময় সবকিছু এতোটাই প্রাচীন মনে হতে লাগল যে আমি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। আমি যে মহাকাব্যগুলো নিয়ে কাজ করছিলাম সেগুলো প্রায় ২০০০ বছরের পুরনো। তাই ফার্সি ভাষা শেখার মাধ্যমে আমি নিজেকে কিছুটা ‘আধুনিক’ (modernise) করতে চেয়েছিলাম। আর এটা আমাকে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের দোরগোড়ায় নিয়ে আসে।
সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা শেখা এবং হিন্দুধর্ম নিয়ে স্নাতক শেষ করাটা আমার প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের জন্য খুব একটা কাজে দেয়নি। খুব ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাইনি আমি! আমি জানি এটা শুনে সবাই অবাক হবেন। কিন্তু এটাই হয়েছে আসলে। আমি এক বছর চাকরি করার পর বুঝলাম যে বাইরের জগতটা আমার জন্য নয়। তাই আবারও একাডেমিয়াতেই ফিরে এলাম। পিএইচডি গবেষণায় আমি আসলে কী করব, তা ভাবতে গিয়েই সংস্কৃত এবং ফার্সি সাহিত্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ধারণাটি মাথায় আসে।
আরএসকে: ‘কালচার অফ এনকাউন্টারস’ গ্রন্থে আপনি মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা করেছেন। আপনি বলেছেন মুঘলরা একটা বৈশ্বিক সাম্রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যায়তনিক মহলে পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি, বিশেষ করে অটোমান বা এই ধরনের অন্যান্য বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের তুলনায় সেই আগ্রহ একেবারেই নগণ্য। এমনটা হয়েছে বলে আপনার কেন মনে হয়?
এ. টি.: দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস এখনো যথেষ্ট কম পঠিত হয় এবং কম পাঠদান করা হয়। এটা স্রেফ একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি ও গোঁড়ামির ফল। এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। অধিকাংশ মানুষই দক্ষিণ এশিয়াকে পড়াশোনা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঞ্চল মনে করেন না। এই কারণেই দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিতদের প্রতিনিধিত্বের বেহাল দশা।
আমি নিউ জার্সির রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়াই। আমেরিকার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অঙ্গরাজ্য সম্ভবত নিউ জার্সি। এতদসত্ত্বেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি ইতিহাস বিভাগের মতোই; অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি অধ্যাপক কেবল আমেরিকার ইতিহাস নিয়েই কাজ করেন। আমেরিকার মাত্র আড়াইশো বছরের ইতিহাসের প্রতিটি বিষয়কে নির্দিষ্ট করে পড়ানোর জন্য প্রতিটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।
বাকি বিশ্বের জন্য আমরা কেবল ‘নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব’ (token representation) হিসেবে থাকি। ইউরোপ নিয়ে কাজ করার জন্য সব সময়ই একদল গবেষক নিযুক্ত রয়েছেন; কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রতিটি অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র একজন। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকা বিষয়ে পড়ানোর জন্য আমাদের একজন আফ্রিকানিস্ট (Africanist) আছেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে পড়ানোর জন্য আমিই একমাত্র দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ। আমার কাছ থেকে আশা করা হয় যে আমি দুই সেমিস্টারে সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র ইতিহাস পড়াব! আমি ইতিহাস উপভোগ করলেও ইতিহাস পড়ানোর এই পদ্ধতিটি একেবারেই পাগলাটে (insane)। আমার একজনের কাছ থেকে আশা করা হচ্ছে যে আমি বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যার ৫০০০ বছরের ইতিহাস পড়াব। আর মাত্র ২৫০ বছরের মার্কিন ইতিহাস পড়ানোর জন্য আছে আমার ২০ জন সহকর্মী। এই বৈষম্য হাস্যকর পর্যায়ের। তবে দুঃখজনকভাবে আমেরিকার প্রায় প্রতিটি ইতিহাস বিভাগেই এই একই অবস্থা। ইউরোপীয় দেশগুলো এই বিষয়ে ভারসাম্যের দিক থেকে কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও মানুষ যতটা ভাবে ঠিক ততটাও নয় আসলে।
আরএসকে: আপনি যে টেক্সটগুলো নিয়ে কাজ করেন, সেগুলোর মধ্যে কোন গল্পগুলো আপনার কাছে বিশ্ব সাহিত্যের সংকলনে (world literature canon) অবহেলিত বা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি বলে মনে হয়?
এ. টি.: আমি মনে করি সংস্কৃত মহাকাব্য দুটির একটি বা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করার কিছু প্রচেষ্টা হয়েছে। রামায়ণ তো মোটামুটি পড়ানো হয়, কিন্তু মহাভারতের ক্ষেত্রে চরিত্রের আধিক্য এবং এর ব্যাপকতার কারণে মানুষ সহজেই খেই হারিয়ে ফেলে। রামায়ণের গল্পটি বেশ স্পষ্ট। আপনি যদি ছয়টি নাম মনে রাখতে পারেন, তবে সহজেই এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন।
এই টেক্সটগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টার পরেও তা কঠিন ছিল। কারণ যে কোনো মহাকাব্যকে মূল্যায়ন করতে হলে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সাংস্কৃতিক বোধ বা বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন। সাহিত্যকে যেন তার নিজস্ব তাতপর্য ঠিক রেখে আমরা পাঠ করতে পারি তার জন্য ‘গ্রেট বুকস’ (Great Books) পদ্ধতিতে বিশ্ব সাহিত্যের একটি বৈশ্বিক সংকলন তৈরির ধারণা আছে। দক্ষিণ এশীয় কিছু সাহিত্য এই ধারার সাথে মানানসই; যেমন ‘থেরিগাথা’ (Therigatha)। এই সাহিত্যটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় থেকে ২য় শতাব্দীর বৌদ্ধ নারী কবিদের কবিতার সংকলন; মূলত পালিতে রচিত এবং ইংরেজিতে পাওয়া যায়; পড়তেও সুখকর। এর অনেক পরের আছে ‘বাবরনামা’; যদিও এটি থেরিগাথা থেকে ভিন্ন ধারার সাহিত্য, তুর্কিতে রচিত এবং ফার্সিতে অনূদিত হয়েছিল। এটিও বেশ প্রাঞ্জল এবং সুখপাঠ্য। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়, মহাকাব্যগুলো (রামায়ণ ও মহাভারত) অনুবাদ করা কিছুটা কঠিন।
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস এখনো যথেষ্ট কম পঠিত হয় এবং কম পাঠদান করা হয়। এটা স্রেফ একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি ও গোঁড়ামির ফল। এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। অধিকাংশ মানুষই দক্ষিণ এশিয়াকে পড়াশোনা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঞ্চল মনে করেন না। এই কারণেই দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিতদের প্রতিনিধিত্বের বেহাল দশা।
সাহিত্যের এই সংকলনকে বৈচিত্র্যময় করার ক্ষেত্রে একটি টানাপোড়েন কাজ করে। গ্রন্থ সংকলনে বৈচিত্র আনতে আমরা কোন বিষয়কে প্রাধান্য দিবো; বইটি পড়তে কতটুকু সহজবোধ্য নাকি বইয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য। যদি দ্বিতীয়টি বেছে নেন, তবে আপনাকে সংস্কৃত মহাকাব্য এবং তামিল সঙ্গম সাহিত্যের দিকে তাকাতে হবে। যেভাবেই হোক, বিষয়টি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং সুপরিকল্পিত হওয়া প্রয়োজন। এগুলো না করে আমরা একটি ভারতীয় সাহিত্য নিই, একটি চৈনিক সাহিত্য নিই। এরকম দায়সারা উপায়েই আমরা বৈচিত্র আনতে চেষ্টা করি। কিন্তু, এভাবে কাজ হয় না।
আরএসকে: বিশ্ব সাহিত্যকে যখন একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট থেকে অন্য প্রেক্ষাপটে ভ্রমণরত পাঠ্য হিসেবে দেখি, তখন আপনার কাজের মাধ্যমে মুঘল দরবারের অনুবাদ প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানাটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। যেমন, রামায়ণের ফার্সি অনুবাদে সংস্কৃত শব্দগুলো যেভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে, তাতে মনে হয় তারা পারসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতকে একীভূত করতে চেয়েছিল। একে কি এক ধরণের ‘সংস্কৃতায়িত ফার্সি’ (Sanskritised Persian) তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়?
এ. টি.: আমি মনে করি হ্যাঁ, তবে এটি ‘ভারতীয় ইংলিশ’ থেকে ভিন্ন। ভারতীয় ইংলিশ প্রাকৃতিকভাবে বিকশিত হয়েছে। এবং এটি বর্তমানে ইংরেজি ভাষার তিনটি প্রধান ধারার একটি। কিন্তু ফার্সিতে হাজার হাজার সংস্কৃত শব্দ প্রবর্তন প্রাকৃতিকভাবে ঘটেনি, দৈনন্দিন কথোপকথন থেকে এগুলো উঠে আসেনি, বা এটি কোনো তৃণমূল পর্যায়ের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া (imposition from up high) একটি রাজকীয় বা দরবারী প্রকল্প। আমার কাছে এটিও স্পষ্ট নয় যে এর লক্ষ্য ঠিক কতদূর ছিল; আমাদের কাছে এমন কোনো প্রমাণও নেই যার মাধ্যমে আমরা বলতে পারবো যে এই অনুবাদগুলো ইন্দো-পারসিক (Indo-Persian) ভাষাকে পুরোপুরি বদলে দিতে চেয়েছিল।
তারপরেও এই ‘সংস্কৃতায়িত ফার্সি’ আমাদেরকে এতটুকু স্পষ্ট করে দেয় যে তারা অনুবাদের মাধ্যমে ঠিক কী অর্জন করতে চেয়েছিলেন; আর তাদের সেই লক্ষ্য অবশ্যই বর্তমান সময়ের অনুবাদকদের লক্ষ্যের চেয়ে একেবারেই আলাদা ছিলো। অনুবাদকগণ সাধারণত চান তাদের পাঠককে একটি সহজপাঠ্য টেক্সট উপহার দিতে। এমনকি আমরা যদি দীপা ভাস্তির কাজের দিকেও তাকাই, সেখানে দেখতে পাই তিনি কন্নড় থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় ইংরেজির এমন একটি রূপ বেছে নেন যা পাঠকের কাছে পরিচিত। নতুন কোনো ‘ইন্ডিয়ান ইংলিশ’ তিনি উদ্ভাবন করছেন না। সেই অনুবাদে নির্দিষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক সংকেত থাকলেও, সেটি কিন্তু আগে থেকেই প্রচলিত। অধিকাংশ অনুবাদকই চান পাঠক যেন আয়েশ করে পড়তে পারেন এবং যা বলা হচ্ছে তা সহজেই বুঝতে পারেন। অথচ মুঘল আমলের সেই আদি ফার্সি-পাঠকদের কথা ভাবতে গেলে আমার মনে হয় যারা প্রথমবার রামায়ণ বা মহাভারতের অনুবাদ পড়তেন- তারা নিশ্চিতভাবেই একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যেতেন।
এই বিষয়টি আমি স্নাতকে পড়ার সময়েই বুঝতে পারি। আমার এক পারসিক শিক্ষক ‘সংস্কৃত থেকে ফার্সিতে অন্য একটি অনুবাদ নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি একটি শব্দ দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘অদ্রে, এই ‘জাচ’ (juch) কী?’ আমি বলেছিলাম, ‘ওহ, ওটা তো যক্ষ (yaksha)’। সংস্কৃতের ‘য’ ফার্সিতে এসে ‘জ’ এবং ‘ক্ষ’-এর প্রাকৃত রূপ ‘চ’ হয়ে গেছে। মহাকাব্যগুলোর ফার্সি অনুবাদ পড়ার কারণে আমি তা জানতাম। কিন্তু, ইন্দো-পারসিক সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর পক্ষে সেই সংস্কৃত ‘যক্ষ’ শব্দটিকে চেনা সম্ভব ছিল না।
তবে, একবার খেই ধরে ফেলতে পারলে ভোকাবুলারি আয়ত্ত করাও বেশ সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু শুরুতে একটু কঠিন লাগবে। অনুবাদটি করা হয়েছিল পাঠ্যটিকে ফার্সিতে বোধগম্য করার জন্য; এর ব্যাকরণ সম্পূর্ণ পারসিক এবং এর ভাষাও অত্যন্ত সরল- বিশেষ করে মহাভারতের ক্ষেত্রে। কিন্তু তার মাঝেই এই সব সংস্কৃত শব্দগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। হতে পারে এর কারণ ছিল পার্থক্য দেখানো, অথবা হতে পারে ফার্সি সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই ভিনদেশিভাবকে (foreignness) বজায় রাখা যাতে কেউ একে ভুল করে মূল ফার্সি গ্রন্থ ভেবে না বসে। অথবা তারা হয়তো কেবল এটি দেখাতে চেয়েছিলেন যে এটি একটি সংস্কৃত টেক্সট, এবং পাঠককে প্রতিটি পাতায় সেই সত্যের মুখোমুখি করাটাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। এটি এমন এক শৈলী যা আধুনিক অনুবাদ চর্চায় এখন দেখা যায় না বললেই চলে।
আরএসকে: আমি এখন ভাবি, হামিদা বানুর রামায়ণ অনুবাদের উদ্দেশ্য আসলে কী ছিল? তিনি কি তাঁর ভাইপো-ভাগ্নেদের সাথে, অর্থাৎ ভারতের ভবিষ্যৎ শাসকদের কাছে এটা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন?
এ. টি.: এই বিষয়টা জানতে আমিও আগ্রহী। আমার একান্ত মনোবাঞ্ছা, সেই মহীয়সী নারী যদি আমাদের জন্য তার এই কাজের উদ্দেশ্য-সম্বলিত একটি চিরকুট রেখে যেতেন!
যাইহোক! আমি আগেও বলেছি এবং আমি আমার সেই কথায় এখনও অনড় যে, রামায়ণের ফার্সি অনুবাদের পনের বছরের মধ্যে এর অধিকাংশই কেন্দ্রীয় রাজদরবারে জায়গা পেয়েছিলো।
এর পাঠকশ্রেণী ছিল প্রধানত মুঘল রাজপরিবার। আমি বলছি না যে তারা ছাড়া আর কেউ এটা পড়তো না। আমি যেটা বুঝাতে চাচ্ছি, এটি ছিলো রাজপরিবারের অভ্যন্তরীন ব্যবহারের টেক্সট; অর্থাৎ এটা খুবই অভিজাত (Elite) শ্রেণীর একটা সাহিত্য। তবে, আবুল ফজল ফার্সি রামায়ণের মুখবন্ধে বলেন ভিন্ন কথা; সেখানে তিনি বলেছিলেন যে রামায়ণ অনুবাদের উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দুরা যাতে তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ নিজেরা পড়তে পারে। যেহেতু সংস্কৃত খুবই সীমিত মানুষের এবং সংরক্ষিত একটি ভাষা, আর তখন অনেক হিন্দুও ফার্সি শিখছিলো, সেই প্রেক্ষিতে অনেকেই আবুল ফজলের যুক্তিটি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এমনটি হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, অন্তত তখন তো নয়ই। হিন্দুরা পরবর্তীতে এই অনুবাদগুলো ব্যাপকভাবে পড়তে শুরু করে, তবে সেটা আওরঙ্গজেবের আমলেরও অনেক পরে। হামিদা বানুর সংগ্রহে থাকা এই রামায়ণটিই প্রমাণ করে যে আবুল ফজলের দাবিটি ছিল অতিরঞ্জিত। এবং এর মাধ্যমে পাণ্ডুলিপিগুলোর আসল সংরক্ষণস্থলও আমরা চিনতে পারি।
জৈনদের এই আর্কাইভগুলো বাহ্যিকভাবে অনেক বেশি সমৃদ্ধ; একজন ইতিহাসবিদের কৌতুহল আর প্রশ্নের খোরাক সেখানে সহজেই মেলে। তবে আমাদের দুটো বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে: এই বিবরণগুলো কতটা নির্ভুল, আর আদতে তারা কেন এই কাহিনীগুলো লিপিবদ্ধ করছিলেন? আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ বিষয়ই তো আর বই আকারে ছাপা হয় না। তাহলে জৈনরা কেন এই বিষয়ে লিখতে গিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি শেষ পর্যন্ত এই উত্তরই পেয়েছি যে, তারা আসলে এগুলো লিখেছিলেন তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ পাঠের জন্য। আর এই লেখাগুলোর মাধ্যমে জৈনরা হয়তো নিজেদের আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।
আরএসকে: হামিদা বানুর রামায়নের কপিটি এখন দোহায়। এর সাথে কি দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের প্রতি আরবদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কোনো সম্পর্ক আছে?
এ. টি.: আমি সেরকম মনে করি না। সেই পাণ্ডুলিপিটির উৎস বা প্রাপ্তিস্থান (provenance) নিয়ে প্রশ্ন আছে; অর্থাৎ, খুব সম্ভবত ৭০-এর দশকের পুরাকীর্তি আইনের (Antiquities Act) পর এটি ভারত থেকে পাচার করা হয়েছিল। হামিদা বানুর কপিটি দোহায় থাকার এটি একটি বড় কারণ হতে পারে। পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো যে সবসময় পাণ্ডুলিপির উৎসের বৈধতা যাচাই করেছে তা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা চুরি করা পাণ্ডুলিপি না কেনার ব্যাপারে বেশ কড়াকড়ি করছে। অন্যদিকে, কাতার এই সমস্ত বিধিনিষেধের খুব একটা তোয়াক্কা করে না।
কয়েক বছর আগে, সেই পাণ্ডুলিপিটি পরীক্ষা করতে এবং সেটির ওপর একটি প্রকাশনার কাজ করতে দোহার ‘মিউজিয়াম অফ ইসলামিক আর্ট’ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো। সেখানে গিয়ে আমি অবাক হলাম যে, পাণ্ডুলিপিটিতে এত চমৎকার অলঙ্করণ থাকা সত্ত্বেও তারা এর একটি পাতাও প্রদর্শনীতে রাখেনি। কারণ খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারলাম যে, হিন্দু দেবদেবীর ছবি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ আসার পর তারা সেটি সরিয়ে নিয়েছে।
মাত্র দুয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে তারা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই এটি নামিয়ে ফেললো- আমার কাছে বিষয়টা বিষ্ময়করই লাগলো। সে সময় মিউজিয়ামটির অধিকাংশ কিউরেটর ছিলেন ইউরোপীয়- খুব কম সংখ্যক কাতারি সেখানে কাজ করতেন। আমি তাদের বলেছিলাম, “দেখুন, এর মাধ্যমে আপনারা মূলত সেন্সরশিপকেই মেনে নিলেন। আপনারা একটি অমূল্য জিনিস প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে নিলেন কেবল এই কারণে যে কিছু মানুষ অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায় না। আপনারা কি এটাকে শিক্ষামূলক কোনো পদক্ষেপে পরিণত করার কথা ভাবেননি? যদি এই সত্যটা আপনারা মেনে নিতে না পারেন যে পৃথিবীতে বহু-ঈশ্বরবাদী হিন্দুরাও আছেন, তবে আমরা সবাই মিলে একসাথে থাকব কী করে? এটি তো বড় কোনো সমস্যাও নয়- দোহার মাটিতেই তো অসংখ্য হিন্দু বাস করেন, কাজ করেন।” কিন্তু আমি যে কিউরেটরদের সাথে কথা বলছিলাম, তারা এটা নিয়ে আর কথা আগাননি। তারা হয়তো ভাবছিলেন যে, দোহার মিউজিয়ামে কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং এসব দুর্লভ পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করার জন্য এ ধরণের আপস করাই যায়। এরপর আমি আর কখনো দোহায় যাইনি।

আরএসকে: আপনার কাজগুলো থেকে এটাও জানা যায় যে, মুঘল দরবারে সংস্কৃত সাহিত্যের একটি বড় অংশ জৈনরা লিখেছিল। এটা কি আপনি আর্কাইভ বা নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন, নাকি একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে জৈনদের প্রতি আপনার আলাদা কোনো আগ্রহ আগে থেকেই ছিল?
এ. টি.: আর্কাইভের কারণেই। আমি মূলত এমন কিছু খুঁজছিলাম যেখানে সংস্কৃত এবং ফারসি- এই দুই ভাষা অথবা এই দুই ভাষার পণ্ডিতদের মধ্যে এক ধরণের মিথস্ক্রিয়া বা আদান-প্রদান ঘটেছে। এই সূত্রেই আমি প্রথমে সংস্কৃত গ্রন্থগুলোর ফারসি অনুবাদগুলো খুঁজে পাই; এরপর আমি জৈনদের লেখা একগুচ্ছ সংস্কৃত টেক্সটের সন্ধান পাই। তখন আমি আমার গ্র্যাজুয়েশনের মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিলাম; দক্ষিণ এশিয়ার ধর্ম ও ইতিহাস সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য হয়তো তখন আমি জানতাম, কিন্তু জৈন ধর্ম নিয়ে আমার গভীর কোনো পড়াশোনা ছিল না। ফলে আমাকে এই ধর্ম এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে বেশ ভালোমতো পড়াশোনা করতে হয়েছিল। বিশেষ করে সংস্কৃত টেক্সট ব্যবহারের ক্ষেত্রে জৈনদের যে নিজস্ব রীতি এবং পদ্ধতি রয়েছে তা শিখতে হয়েছিল; কারণ সংস্কৃত লেখার ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদী ট্র্যাডিশনের তুলনায় জৈনদের ধরন কিছুটা আলাদা হয়। শেষ পর্যন্ত আমি দেখলাম, মুঘল দরবারের সাথে তাদের মোলাকাত বা অভিজ্ঞতার কথা তারা এমনভাবে লিখে গেছেন যা আর কেউ করেনি। যদিও সেই সময়ে মুঘল দরবারে ব্রাহ্মণদের উপস্থিতি ছিল সংখ্যায় অনেক বেশি এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের অনেক কিছু বলার থাকতে পারত। কিন্তু তারা সেভাবে কিছুই বলেননি। অন্তত সংস্কৃত ভাষায় তো নয়ই। ফলে সেই সংক্রান্ত কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড বা নথিপত্রও গড়ে ওঠেনি।
আরএসকে: আপনার প্রথম বইয়েতো ব্রাহ্মণ বুদ্ধিজীবীদের মুসলিম নারীদের প্রেমে পড়ার কিছু আলোচনা আছে, তাই না?
এ. টি.: আছে। তবে সেই লেখাগুলোর গুঢ় অর্থ আমাদের বুঝতে হবে (read between the lines)। আমাদের কাছে এমন একজন সংস্কৃত পণ্ডিতের হদিস আছে যিনি একজন মুসলিম নারীর প্রেমে পড়েছিলেন এবং তাকে ‘যবনী’ (yavanni) বলে সম্বোধন করতেন। প্রাচীন সংস্কৃতে ‘যবন’ (yavanna) বলতে ফর্সা চামড়ার কাউকে বা গ্রিকদের বোঝাত, কিন্তু পরবর্তীতে এটি ‘মুসলিম’ অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তো, তিনি এক যবনী নারীর প্রেমে পড়েন এবং তাঁকে নিয়ে চমৎকার সব কবিতা রচনা করেন। এই কবিতাগুলো সংস্কৃতে লেখা হলেও অদ্ভুতভাবে তার সুর ছিল অনেকটা ফারসি কবিতার মতো। আবার অন্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা এই সম্পর্কের কথা লিখে গেছেন সাংকেতিক ভাষায়; সেখানে সরাসরি কিছু না বলে কিছুটা প্রচ্ছন্ন অপমানের (shaded insults) সুরে এই সম্পর্ককে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আসলে ঠিক কী ঘটেছিল তার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা তারা দেননি।
অন্যদিকে জৈনরা যখন লিখতে বসতেন, তাদের বর্ণনাগুলো হতো অনেকটা এরকম: ‘অমুক ব্যক্তি এই বছরে মুঘল দরবারে গিয়েছিলেন এবং আকবরের সাথে দেখা করেছিলেন, তাদের মধ্যে এই এই কথা হয়েছিল’- এভাবেই তারা লিখে ফেলতেন শ’খানেক শ্লোক!
জৈনদের এই আর্কাইভগুলো বাহ্যিকভাবে অনেক বেশি সমৃদ্ধ; একজন ইতিহাসবিদের কৌতুহল আর প্রশ্নের খোরাক সেখানে সহজেই মেলে। তবে আমাদের দুটো বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে: এই বিবরণগুলো কতটা নির্ভুল, আর আদতে তারা কেন এই কাহিনীগুলো লিপিবদ্ধ করেছিলেন? আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ বিষয়ই তো আর বই আকারে ছাপা হয় না। তাহলে জৈনরা কেন এই বিষয়ে লিখতে গিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি শেষ পর্যন্ত এই উত্তরই পেয়েছি যে, তারা আসলে এগুলো লিখেছিলেন তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ পাঠের জন্য। আর এই লেখাগুলোর মাধ্যমে জৈনরা হয়তো নিজেদের আত্মপরিচয় (identity) নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। হতে পারে ব্রাহ্মণরা সেভাবে নিজেদের আত্মপরিচয় নতুন করে গড়তে চাননি। অথবা ফারসিভাষী মুঘলদের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলাটা হয়তো তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না- কারণ, ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে আন্তঃসাংস্কৃতিক মেলামেশার (cross-cultural engagements) বিরুদ্ধে তাদের তাত্ত্বিক বিধি-নিষেধ ছিল। বাস্তবে হয়তো তারা সবসময় সেই নিয়ম মানতেন না, কিন্তু যখন সংস্কৃত ভাষায় লেখার প্রশ্ন আসত- তখন হয়তো তারা সেই নিয়মগুলো কঠোরভাবে পালন করতেন।
আমার কাছে ১৯৪৭ সালের আগের পুরো ইতিহাস ভারত এবং পাকিস্তান- উভয় দেশের মানুষেরই এক ও অভিন্ন ইতিহাস। আমার মনে হয়, এই ইতিহাসকে নিজেদের বলে দাবি করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের আরও সাহসী হওয়া উচিত। গুপ্ত সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি, কিংবা চোলরা এখান থেকে হাজার মাইল দূরে ছিল- তাতে আসলে কী যায় আসে? এই ইতিহাস ভারতীয়দের যতটা, আপনাদেরও ঠিক ততটাই। আমি আসলে এটাই দেখতে চাই যে, পাকিস্তানে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ইতিহাসকে আরও বড় মন নিয়ে আপন করে নেওয়া হচ্ছে।
আরএসকে: আর্কাইভের কথা যখন উঠলই (তখন এই বিষয়ে আরেকটা প্রশ্ন করি), পাকিস্তানে আর্কাইভ বা নথিপত্র নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা কেমন আপনার?
এ. টি.: গবেষণা করতে এসে আমি পাকিস্তানের চেয়ে ভারতীয় আর্কাইভে বেশি সময় কাটিয়েছি। তবে এই দুই দেশের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি পেয়েছি। যেমন, এই দুই দেশের কোনো দেশেই মহাফেজখানাগুলো (Archive) কেন্দ্রীভূত (centralised) নয়। আমার সহকর্মীরা গবেষণার কাজে তুরস্কে গেলে সেখানে তাঁরা নির্দিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় মহাফেজখানায় বসলেই হয়। কিন্তু, দক্ষিণ এশিয়ার মহাফেজখানাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে এখানে আসলে আমাদেরকে এক মহাফেজখানা থেকে আরেক মহাফেজখানায় ঘুরতে হয় এবং এর জন্য প্রচুর ভ্রমণের প্রয়োজন হয়। আবার প্রতিটি মহাফেজখানার নিজস্ব নিয়মকানুন রয়েছে। সেগুলোর সাথে খাপ খাওয়াতে এক ধরণের সমঝোতা বা নেগোশিয়েশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব মহাফেজখানার মধ্যে কোনোটি রাজ্য মহাফেজখানা, কোনোটি জাতীয়; আবার কোনোটি ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন।
ভারত এবং পাকিস্তান- উভয় দেশেই ছবি তোলার বিষয়টি এখনো একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। পাণ্ডুলিপির ছবি তোলার অনুমতি না থাকলে তার ওপর কাজ করা খুবই দুরূহ ব্যাপার; কারণ সেক্ষেত্রে আপনাকে আর্কাইভে বসে বসে পুরো টেক্সটটি পড়তে হবে। গ্র্যাজুয়েশনের একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটা ঠিক আছে, কারণ তার হাতে যথেষ্ট সময় থাকে। কিন্তু, একজন পূর্ণকালীন প্রফেসর হিসেবে আমার জন্য এটা করা সম্ভব নয়। কারণ, গবেষণা ছাড়াও আমার পারিবারিক ব্যস্ততাও আছে। তাই, ছবি বা ফটোকপি আমার জন্য খুবই জরুরি। যদি আপনি সময় বের করে তুলনামূলক ছোট কোনো টেক্সট পড়ে শেষও করেন, তবুও সমস্যা থেকে যায়। দুই-তিন বছর গবেষণা করে সেটি প্রকাশ করতে গেলে দ্বিতীয়বার মিলিয়ে (double-check) দেখার সুযোগ থাকে না। যদি আপনি কোনো একটি অক্ষর ভুলভাবে টুকে থাকেন, কী হবে তখন?
এছাড়া ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের দশা খুবই খারাপ। অনেকে এর জন্য ‘সাংস্কৃতিক প্রবণতাকে’ (cultural proclivities) দায়ী করেন, কিন্তু আমি মনে করি এর মূল কারণ অর্থনৈতিক। যেখানে দুই দেশকেই তাদের নিজেদের আরও অনেক জরুরি সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে, সেখানে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য ব্যয়বহুল ‘ক্লাইমেট-কন্ট্রোলড’ (তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত) কক্ষ তৈরি করা আসলেই কঠিন। দক্ষিণ এশিয়ায় আমি এ পর্যন্ত কেবল কলকাতাতেই এই ধরণের একটি কক্ষ দেখেছি।
আরএসকে: বিতর্কের প্রসঙ্গে ফিরে আসি; আমি খেয়াল করেছি যে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে একটি ধারা তৈরি হয়েছে যা মুঘল সাম্রাজ্য এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম সাংস্কৃতিক প্রভাবকে ‘উপনিবেশবাদী’ (coloniser) হিসেবে ফ্রেমবন্দি করতে চায়। তারা ইতিহাস চর্চায় এক ধরণের অতি-বিদ্যায়তনিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক (post-colonial) ভাষা ব্যবহার করে। আমি এমনও দেখেছি যে, ‘কথক’ নাচকেও ‘সাম্রাজ্যবাদী’দের নাচ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভারতীয় অ্যাকাডেমিয়া বা বিদ্যায়তনিক জগতে কি এই ধরণের চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়?
এ. টি.: ভারতীয় বিদ্যায়তনিক মহলে সেই অর্থে এমনটা আছে বলে আমার মনে হয় না। বরং আমরা ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে অ্যাকাডেমিক ভান (cosplaying) করা বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি। স্রেফ ‘ডিকলোনাইজেশন’ বা উপনিবেশবাদ-মুক্তির জার্গন বা ভাষা ব্যবহার করলেই কেউ অ্যাকাডেমিক হয়ে যান না। আপনি যদি অ্যাকাডেমিয়ার নিয়ম মেনে না চলেন, তাহলে আপনি সেই জগতের অংশ নন। হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের লক্ষ্যগুলো সমর্থনের উদ্দেশ্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাষা ব্যবহারের উল্লম্ফন দেখেছি আমরা। কিন্তু আমার মতে এটি সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে (in bad faith) করা হচ্ছে। এই উপনিবেশবাদ মুক্তির বুদ্ধিজীবীতা চর্চা ‘ডিকলোনাইজেশন’ বা উপনিবেশবাদ-মুক্তির ধারণার এক অদ্ভুত রূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কারণ হিন্দুত্ববাদীদের এই উপনিবেশবাদ মুক্তি এক অর্থে আসলে পুনঃউপনিবেশায়নের (recolonisation)-ই কথা বলছে। মজার বিষয় হলো, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদীরাই আসলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারী।
তবে এই ভাষার ব্যবহার বাড়ার চেয়ে বড় আশঙ্কের বিষয় হলো এই ভাষা এবং এই ধারণাগুলোর পেছনে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করছে, তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ গত ১০০ বছর ধরে একই কথা বলে আসছে। আগে (যখন) তারা বি-উপনিবেশায়নের ভাষা ব্যবহার করত না, (তখনও) তারা মুঘল, দিল্লি সালতানাত এবং ভারতের ইতিহাসের মুসলিম শাসকদেরকে অপমান করার উদ্দেশ্যে অন্য পরিভাষা ব্যবহার করত। তবে, লক্ষ্য তাদের সবসময় একই ছিল- অতীতের মুসলিমদের দানব হিসেবে উপস্থাপন করা, যাতে বর্তমানের মুসলিমদের খুব সহজেই কোণঠাসা করা যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া যায়। ১৯৬০ এর দশকে যখন তাদের হাতে ক্ষমতা ছিলো না, কিংবা RSS যখন সংখ্যায় কম ছিলো এবং মানুষ গান্ধি-নেহরুর আদর্শে বিশ্বাসী ছিলো তখন এই ধরণের কথা বলা এক বিষয় ছিলো। কিন্তু ২০২০ এ এসে- যখন বিজেপি ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারতের প্রধান রাজনৈতিক আদর্শ তখন এই ধরণের কথা বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সুতরাং, এই চিন্তাগুলোর পেছনে এখন যে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাজ করছে, সেটাই সবাইকে কোণঠাসা করে ফেলছে। এখন আর একে আপনার কোনো ‘পাগলা চাচার উদ্ভট কথা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই; কারণ সেই ‘পাগলা চাচা’ই এখন দেশ চালাচ্ছেন।
সংস্কৃত হলো দক্ষিণ এশীয় সাহিতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য; এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো ভাষার তুলনায় সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক বেশি।
আরএসকে: কংগ্রেস সরকারের কথা যদি বলি, তাহলে ‘স্বাধীন ভারতের নান্দনিক রূপ কেমন হবে’ তা নির্ধারণে তাদের শুরুর দিকের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আলী উসমান কাসমির কাজ আমাকে সচেতন করেছে; তৎকালীন কংগ্রেস পার্টি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতের চিত্রকল্পে বৌদ্ধ ও হিন্দু মোটিফগুলো অন্তর্ভুক্ত করলেও সেখানে মুসলিমদের দৃশ্যমান অভিব্যক্তি (visual expression) জায়গা পায়নি।
এ. টি.: এটা সত্য, তবে আমি ঠিক জানি না যে সেখানে খুব বেশি সুনির্দিষ্ট ‘হিন্দু’ প্রতীক দেখা গিয়েছিল কি না। তারা অশোক চক্র বেছে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমি কোথাও ‘গরুড়’ (Garuda- গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতীক) দেখিনি। আমার মনে হয়, কংগ্রেস পার্টির মৌর্য সাম্রাজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ ছিলো ১৯৪৭ সালে ভারতে বৌদ্ধদের অনুপস্থিতি। বর্তমানে ভারতে ৮০ লক্ষের বেশি বৌদ্ধ রয়েছেন। কিন্তু, তাঁদের প্রায় সবাই আম্বেদকরপন্থী ধর্মান্তরিত বৌদ্ধ, আর সেই প্রক্রিয়াটিও শুরু হয়েছিলো আরও কিছুটা পরে। কোনো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা আপনার নিজের মাটিতে ঘটলে সেটাকে পুনরায় বর্ণনা করা সহজ। আর যদি সেই ইতিহাসের কোনো সরাসরি উত্তরাধিকার বর্তমান না থাকে, তাহলে সেটাকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করা কিংবা আকৃতি দেয়া আরও বেশি সহজ। কারণ, তখন সেই বিকৃত ইতিহাসে ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো কেউ নেই। আমি এই বিষয়টিকে সরাসরি ‘মুসলিম-বিদ্বেষ’ হিসেবে দেখার বদলে বরং মুসলিম এবং হিন্দু- উভয় পরিচয়কে এড়িয়ে যাওয়ার একটি উপায় হিসেবে দেখি। কারণ, ভারতের স্বাধীনতার মুহূর্তে এই দুটি ধর্মীয় পরিচয়ই অত্যন্ত কঠোর রাজনৈতিক প্রভাবক (political implicator) হিসেবে কাজ করেছিলো।
তবে প্রশ্নটি যদি এমন হয় যে- কংগ্রেসের মধ্যে কি কখনো ‘নরম হিন্দুত্ববাদ’ (soft Hindutva) ছিল? এর উত্তর হলো- হ্যাঁ, অবশ্যই ছিল। আমি যদি বলতে পারতাম যে ভারতীয় সমাজে হিন্দু জাতীয়তাবাদের দায় কেবল বিজেপি আর আরএসএস-এর—তবে ভালো হতো; কিন্তু বাস্তবতা তা নয়।
আরএসকে: পাকিস্তানে কি এমন কোনো ডানপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা আছে যা আপনাকে বিচলিত করে?
এ. টি.: শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আমি জানি না একে আমি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’ বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলব কি না, এটি সম্ভবত সংজ্ঞায়ন বা শ্রেণির পার্থক্য হতে পারে। তবে হ্যাঁ, বিচলিত হওয়ার মতো পাকিস্তানে অনেক বিষয় রয়েছে: এক ধরণের কড়া রক্ষণশীলতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর তার প্রভাব এই সমাজে বেশ বিপর্যয়কর। ইতিহাসের কথা যদি বলি, তবে এখানেও ‘পাকিস্তানি’ ইতিহাসকে আলাদা করে দেখার একটা প্রবণতা আছে, যা আদতে কাজ করে না। জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের ইতিহাস ১৯৪৭ সালে শুরু হয়েছে; আর যদি এর শিকড় আরও পেছনে নিয়ে যেতে চান, তবে তা বড়জোর ১৯৩০ সাল পর্যন্ত যায়। এর বেশি নয়। সবাই তো একটি সুপ্রাচীন ইতিহাস চায়, পাকিস্তানও যদি তার শেকড় ইতিহাসের আরও প্রাচীনে খুঁজতে যায়, তবে জাতীয় প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি এবং ভারতীয়দের সেই ইতিহাস আসলে অভিন্ন- উভয় একই ইতিহাসের অংশীদার। বিশেষ করে পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে বলেন: আমি কেবল ইতিহাসের মুসলিম অংশটুকুই জানতে চাই। আবার অনেকে একে ভৌগোলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ (geographically demarcএ. টি.e) করতে চান- অর্থাৎ কেবল এই ভূখণ্ডে যা ঘটেছে তা ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত করতে চান। উইকেন্ডে ঘুরতে যাবার জন্য ইতিহাসের এই হালকা জ্ঞান হয়তো ঠিক আছে; কিন্তু ইতিহাসকে গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আপনি ৪০০০ বছরের ইতিহাসের ওপর আধুনিক ও কৃত্রিম সীমানা (artificial boundaries) চাপিয়ে দিয়ে বলতে পারেন না যে, আমরা কেবল এখানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়েই ভাবব। বিষয়টি এইভাবে কাজ করবে না আসলে ।
আরএসকে: আমার বাবা-মা’দের কারিকুলামের তুলনায় আমাদের কারিকুলামে ‘গান্ধার সভ্যতা’ অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গান্ধার সভ্যতার ভৌগলিক অবস্থান এর কারণ কী না—এটা আমি ভাবি। ভৌগোলিকভাবে গান্ধার সভ্যতার অবস্থান ছিল পাকিস্তানের অতীতের সেই অংশে যা মধ্য এশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাথে যুক্ত। আর সেই কারণেই কি একে মৌলিকভাবে ‘ভারতীয়’ ইতিহাস হিসেবে গণ্য করা হয় না?
এ. টি.: সম্ভবত অন্য সব সংস্কৃতির প্রভাব মেশানো আছে বলেই এটিকে (ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা) সহজ হয়েছে। এছাড়া এটি বৌদ্ধধর্মের সাথে যুক্ত- যদিও আমার মনে হয় না যে এই ধর্মের খুঁটিনাটি দিকগুলো নিয়ে আপনাদের এখানে খুব গভীরে গিয়ে পড়ানো হয়। তবে আপনি মানচিত্রকে যেভাবেই ভাগ করেন না কেন, বর্তমান পাকিস্তানের এই মাটিতেই প্রচুর ‘হিন্দু’ ইতিহাস মিশে আছে। আপনি হয়তো বলতে পারেন যে ‘চোল’ রাজবংশ পাকিস্তান থেকে অনেক দূরে ছিল। তাহলে ‘হিন্দু শাহী’ রাজবংশের কথা কী বলবেন? হিন্দু শাহীদের শাসনের মূল কেন্দ্রই তো ছিল আজকের পাকিস্তান। এখানে এখনো তাদের অজস্র স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপত্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, আমি যখন ভারতে বসে ‘ভারতীয় ইতিহাস’ নিয়ে কথা বলি, তখন সিন্ধু সভ্যতার প্রধান নিদর্শনগুলো বর্তমান পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু সেই অস্বস্তি কখনোই সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না- সিন্ধু সভ্যতাকে এখনো ভারতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং প্রধান সূচনা হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমি পাকিস্তানেও ঠিক একই মানসিকতা দেখতে চাই। আমার কাছে ১৯৪৭ সালের আগের পুরো ইতিহাস ভারত এবং পাকিস্তান—উভয় দেশের মানুষেরই এক ও অভিন্ন ইতিহাস। আমার মনে হয়, এই ইতিহাসকে নিজেদের বলে দাবি করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের আরও সাহসী হওয়া উচিত। গুপ্ত সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি, কিংবা চোলরা এখান থেকে হাজার মাইল দূরে ছিল- তাতে আসলে কী যায় আসে? এই ইতিহাস ভারতীয়দের যতটা, আপনাদেরও ঠিক ততটাই। আমি আসলে এটাই দেখতে চাই যে, পাকিস্তানে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ইতিহাসকে আরও বড় মন নিয়ে আপন করে নেওয়া হচ্ছে।
আরএসকে: এমন কোনো বিশেষ গ্রন্থ বা টেক্সট আছে কি যা আপনি পাকিস্তানের কারিকুলামে আরও বেশি করে দেখতে চান?
এ. টি.: সম্ভবত সংস্কৃত টেক্সটগুলো। সংস্কৃত হলো দক্ষিণ এশীয় সাহিতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য; এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো ভাষার তুলনায় সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক বেশি। এমনকি ফারসি ভাষার চেয়েও সংস্কৃতে টেক্সট বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে- তার একটি বড় কারণ হলো, আমরা বর্তমানে যে ফারসি দেখি (যাকে ‘নিউ পার্সিয়ান’ বলা হয়) তার উদ্ভব হয়েছে দশম শতাব্দীর শেষের দিকে, আর সংস্কৃতের ইতিহাস ৩০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। আমার ধারণা, পাকিস্তানের অনেক মানুষই মনে করেন যে সংস্কৃতে লেখা সবকিছুই বুঝি ‘হিন্দু’ ধর্মীয় বিষয়। এটি একেবারেই সত্য নয়। সংস্কৃতে জগতের যাবতীয় বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে: রান্না করা থেকে শুরু করে ঘোড়া পালন, এমনকি স্থাপত্যবিদ্যা- সবই সংস্কৃতে লেখা হয়েছে। এমনকি ফারসি থেকে সংস্কৃতে অনুবাদ করা অনেক টেক্সটও আছে, যদিও তা সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনুবাদের তুলনায় কিছুটা কম। উদাহরণ হিসেবে ‘কথা-কথুকা’র কথা বলা যায়। এটি মূলত কবি জামী-র ‘ইউসুফ-ও-জুলাইখা’-র অনুবাদ। জামীর ওই কাব্যটি ফারসি বিশ্বে তৎকালীন সময়েই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল (instant bestseller); এমনকি প্রাক-আধুনিক যুগেই এটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়- যার মধ্যে কাশ্মীরে হওয়া এই সংস্কৃত অনুবাদটিও ছিল।