মানব জীবনের সফলতা শুধু বাহ্যিক সাফল্যে নয়; আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ, কর্মদক্ষতা, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে জীবন যাপনের ওপরও নির্ভর করে। কোরআনসহ পৃথিবীর সবগুলো ধর্মগ্রন্থই এই বিষয়ে মানুষকে নসিহত করে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়। নবী রসূল সাধু ঋষিরা এই নসিহতগুলো দেয়ার জন্যই আমৃত্যু সংগ্রাম করে থাকে। নিচে সেই নসিহত ও এর পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করবো। এই নসিহতগুলো ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র সমাজ রাষ্ট্র এমনকি বিশ্বব্যবস্থা — সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
১. প্রতিদিন নিজের হিসাব নিন
প্রতিদিন কিছু সময় নিজের কথা, কাজ ও নিয়ত পর্যালোচনা করুন: আজ কারও হক নষ্ট করেছি কি, কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি, ফরজ ইবাদতে অবহেলা হয়েছে কি? আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।” —সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৮।
ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করুন, ক্ষমা চান, সাহায্য চান এবং নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও দিনে বহুবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তাওবা দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং হৃদয়ের জীবন্ত থাকার প্রমাণ।
২. নিজেকে নিফাকমুক্ত মনে করবেন না
নিফাক শুধু প্রকাশ্য মুনাফিকির নাম নয়; কথা দিয়ে কথা না রাখা, আমানতের খিয়ানত করা এবং বিরোধে সীমালঙ্ঘন করাও মুনাফিকির লক্ষণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মুনাফিকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে।” —সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
তাই নিজের ঈমান ও চরিত্র নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্ট হওয়া বিপজ্জনক। বরং নিয়মিত দোয়া করা উচিত: “হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর স্থির রাখুন।” আত্মসমালোচনা মানুষকে ভণ্ডামি থেকে দূরে রাখে এবং সংশোধনের পথ খুলে দেয়।
৩. অন্যের দোষ নয়, আগে নিজের দোষ দেখুন
অন্যের ভুল চোখে পড়ে দ্রুত, নিজের ভুল দেখতে কষ্ট হয়। কিন্তু একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব নিজের নফসকে সংশোধন করা। আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না; কে মুত্তাকি, তিনি তা ভালো জানেন।” —সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩২।
অন্যের ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ততা গীবত, হিংসা এবং অহংকার বাড়াতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশোধনের জন্য নরমভাবে পরামর্শ দিন; কিন্তু আগে নিজের চরিত্র, আমল, আচরণ ও দায়িত্ব পালনের ঘাটতি দেখুন।
৪. মানুষের হক জানুন ও রক্ষা করুন
ইসলাম শুধু নামাজ-রোজার শিক্ষা নয়; মানুষের অধিকার রক্ষারও দ্বীন। মানুষের পাশাপাশি প্রাণ প্রকৃতি সকল কিছুর অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করা রাসূল সা. এর সুন্নাহ। যেহেতু তিনি রহমাতুল্লিল আলামীন বা জগত সমূহের জন্য রহমত ফলে তাঁর উম্মত হিসেবে জগতের জন্য রহমত হয়ে উঠাও সুন্নাহ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মুসলিমের ওপর মুসলিমের পাঁচটি হক আছে”—সালামের জবাব দেওয়া, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, জানাজায় অংশ নেওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা ও হাঁচির জবাব দেওয়া।” —সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
পরিবার, কর্মী, সহকর্মী, প্রতিবেশী, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সমাজের দুর্বল মানুষেরও হক আছে। কোন হক আগে এবং কীভাবে আদায় করতে হবে—এ বিষয়ে কোরআন ও কোরআন গবেষকের দিকনির্দেশনা নিন। কারণ হক নষ্ট হলে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, আল্লাহর কাছে জবাবদিহিও কঠিন হয়।
৫. বড় সিদ্ধান্তে শূরা, ইস্তিখারা ও দোয়া করুন
বড় সিদ্ধান্ত একা আবেগের ওপর নির্ভর করে নেওয়া ঠিক নয়। আল্লাহ মুমিনদের প্রশংসা করে বলেছেন, “তাদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।” —সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩৮। পরিবার, ব্যবসা, বিনিয়োগ, চাকরি, রাজনীতি, সমরনীতি, সমাজনীতি বা বিয়ের মতো বিষয়ে জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে ইস্তিখারা ও দোয়া যুক্ত করুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের ইস্তিখারা এমন গুরুত্ব দিয়ে শেখাতেন, যেমন কুরআনের সূরা শেখাতেন। তবে ইস্তিখারা মানে শুধু স্বপ্নের অপেক্ষা নয়; তথ্য সংগ্রহ, শরিয়তসম্মত পদ্ধতি, পরামর্শ, পরিকল্পনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া।
৬. দোষ চাপানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন
ব্যর্থতার পর অজুহাত খোঁজা, সহকর্মীকে দোষ দেওয়া বা পরিস্থিতিকে দায়ী করা মানুষের চরিত্র দুর্বল করে। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজের ভুলের মালিকানা নেন, শিক্ষা নেন এবং সংশোধনের পদক্ষেপ নেন।
আদম আ. এর সাথে ইবলিশের চিন্তাগত ফারাকটা এই জায়গাতেই হয়। আদম আ. ভুল করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের নিকটবর্তী হওয়ার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলে হে আল্লাহ আমি নিজের ওপর নিজে জুলুম করলাম। অর্থাৎ কর্মের দায়ভার আদম আ. নিজ কাঁধে নেয়। কিন্তু ইবলিশ আল্লাহর আদেশ অমান্য করে আল্লাহকে বলে, হে আল্লাহ তুমি আমাকে পথভ্রষ্ট করলা! এখানে ইবলিশ নিজ কর্মের দায় নিজে নেয় না অন্যের ওপর দেয়!
আল্লাহ বলেন, “তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের কারণেই।” —সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩০।
সফলতা এলে দল, সহকর্মী ও সহায়তাকারীদের কৃতিত্ব দিন; আর ব্যর্থতা এলে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করুন। এই নীতি নেতৃত্বে বিশ্বাস তৈরি করে। “যদি এমন হতো” বা “কিন্তু” বলে আফসোসে ডুবে না গিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করাই উত্তম।
৭. অগ্রাধিকার বুঝে কাজ করুন
সব কাজ জরুরি নয়, আর সব জরুরি কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রথমে ফরজ দায়িত্ব, মানুষের হক, পরিবার, আমানত, ঋণ এবং জীবিকার বৈধ দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সময়মতো সালাত।” —সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
অগ্রাধিকার নির্ধারণে ধর্ম গবেষক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে ছোট কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা অনেক সময় নফসের ধোঁকা। দ্বীনি দায়িত্ব ও দুনিয়াবি দায়িত্ব—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখে পরিকল্পিতভাবে চলাই বিচক্ষণতা।
৮. নেক আমলে শুকরিয়া, গুনাহে তাওবা, বিপদে সবর
কোনো ভালো কাজ করার সুযোগ পাওয়া নিজের কৃতিত্ব নয়; এটি আল্লাহর তাওফিক। তাই নেক আমলের পর অহংকার নয়, শুকরিয়া ও কবুলিয়তের দোয়া করা উচিত। আল্লাহ বলেন, “তোমরা শুকরিয়া আদায় করলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।” —সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭।
গুনাহ হলে দেরি না করে তাওবা করুন, আর বিপদে ধৈর্য ধরুন। মুমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক—কল্যাণ পেলে সে শুকরিয়া করে, আর কষ্ট পেলে ধৈর্য ধরে; উভয়টিই তার জন্য কল্যাণকর। —সহিহ মুসলিম।
শোকর, তাওবা ও সবর- এই তিনটি গুণ হৃদয়কে স্থির রাখে।
৯. ভোগ নয়, অবদানেই মূল্য
মানুষের মূল্য কেবল সে কত আয় করল, কত খরচ করল বা কত সুবিধা ভোগ করল—এতে নির্ধারিত হয় না। তার প্রকৃত মূল্য হলো সে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ, পৃথিবী ও উম্মাহর জন্য কী উপকার রেখে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মানুষের মধ্যে সেই উত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” —আল-মু‘জামুল আওসাত, তাবারানি।
তাই প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন: আজ আমি শুধু নিয়েছি, নাকি কিছু দিয়েছিও? জ্ঞান, শ্রম, সততা, ন্যায়বিচার, সদাচরণ বা মানুষের সমস্যা সমাধান—সবই মূল্যবান অবদান। ভোগ কমিয়ে উপকার বাড়ানোই অর্থবহ জীবনের পথ।
১০. মানুষের মত নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি মুখ্য
মানুষের প্রশংসা ও সমালোচনা পরিবর্তনশীল। আজ যে প্রশংসা করে, কাল সে সমালোচনা করতে পারে। তাই সিদ্ধান্তের মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত: এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন কি না? আল্লাহ বলেন, “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন।” —সূরা আত-তালাক, ৬৫:২।
তবে “মানুষ কী ভাববে” একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়—কারণ ভালো সুনাম, আমানতদারিতা ও মানুষের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষের মন জেতা কখনো সাফল্য নয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকুন, যদিও তা কখনো কঠিন হয়।
১১. শক্ত হন, উৎকর্ষ অর্জন করুন
মুমিন দুর্বল, অগোছালো বা দায়িত্ব এড়িয়ে চলা ব্যক্তি হওয়ার কথা নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও অধিক প্রিয়; তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ আছে।” —সহিহ মুসলিম।
কাজ শিখুন, দক্ষতা বাড়ান, কঠোর পরিশ্রম করুন এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করুন। চেষ্টা ও দোয়া একে অন্যের বিকল্প নয়—দুটিই প্রয়োজন। ব্যর্থ হলে বারবার চেষ্টা করুন; তারপরও ফল অনুকূলে না এলে “যদি এমন করতাম” বলে হতাশ না হয়ে বলুন: “আল্লাহ তাকদির করেছেন, তিনি যা চান তাই করেন।” —সহিহ মুসলিম।
সম্মৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য চাই উন্নত চিন্তা। গনতান্ত্রিক দেশ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শুধু তথ্যযুদ্ধ এবং ইস্যু দিয়ে ইস্যু চাপা দেয়া নয়, দরকার মননশীল সাংবাদিকতা। একতরফা ভাবনা বা মতের প্রতিফলনের বাইরে সত্য ও প্রজ্ঞার সন্নিবেশ ঘটাতে বিশ্লেষণী সাংবাদিকতার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এই উদ্যোগ আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। ডোনেট করুন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাতিগঠনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশীদার হোন।
মোবাইল ব্যাংকিংঃ Bkash & Nagad (personal): 01677014094
https://paypal.me/jobanmedia