Jobanসামগ্রিক অর্থনীতির হালচাল: প্রবৃদ্ধির জন্য কতটা প্রস্তুত?

সামগ্রিক অর্থনীতির হালচাল: প্রবৃদ্ধির জন্য কতটা প্রস্তুত?

বাংলাদেশের অর্থনীতি তীব্র অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে একটি ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বেড়েছে এবং ডলারের বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়েছে। এসব অগ্রগতি অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমিয়েছে। তবে এটিকে এখনই শক্তিশালী বা বিস্তৃত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের চড়া সুদ, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এখনো অর্থনীতির বড় বাধা। এসব সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদন, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। তাই বর্তমান স্থিতিশীলতাকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং সংস্কার এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের চড়া সুদ, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এখনো অর্থনীতির বড় বাধা। এসব সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদন, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।

 

১. স্থিতিশীলতা এসেছে, প্রবৃদ্ধির গতি ফেরেনি

২০২৫২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী গতি এখনো ফিরে আসেনি। প্রাথমিক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে এই উন্নতি মূলত কৃষি ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল; শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল। বিশেষ করে ২০২৫ সালের অক্টোবরডিসেম্বর প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.০৩ শতাংশ। ফলে শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এখনো উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতির গড় হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে স্বস্তি ফেরেনি। মে ২০২৬-এ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এপ্রিলের ৯.০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ১০.১৩ শতাংশ থেকে কমে ৮.৬৩ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ পণ্যের দাম কমেনি; বরং আগের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে বাড়ছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৮.১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

তাই খাদ্য, ডিম, মাছ ও মাংস কেনার ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী দাম এবং অর্থের বিনিময়ে ভালো মান এখন ভোক্তার প্রধান বিবেচনা।

বৈদেশিক বাণিজ্যেও চাপ পুরোপুরি কাটেনি। ২০২৫২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত রপ্তানি আয় ১.৬৭ শতাংশ কমে ৪৪.২০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি ব্যয় ৫.৯২ শতাংশ বেড়ে ৬১.৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে আয় কমলেও কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং ব্যবসার কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে এগোলেও শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে আরও গতি আনা প্রয়োজন।

এর অর্থ পণ্যের দাম কমেনি; বরং আগের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে বাড়ছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৮.১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

 

২. বৈদেশিক খাতে দৃশ্যমান উন্নতি

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। ২০২৫২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স ১৯.১৪ শতাংশ বেড়ে ৩২.৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে এবং আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে সহায়তা করেছে। ফলে আগের তুলনায় ডলারবাজারে অস্থিরতা কিছুটা কমেছে।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত BPM6 পদ্ধতিতে রিজার্ভ জুন ২০২৫-এর ২৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে জুন ২০২৬-এ প্রায় ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। জুলাই ২০২৬-এ এটি কিছুটা কমে ৩১.৬০ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় অবস্থান অনেক শক্তিশালী। একই সঙ্গে মে ২০২৬-এ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় ও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার পরিকল্পনা করা কিছুটা সহজ হয়েছে।

তবে এই উন্নতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বৈদেশিক খাতের বর্তমান স্বস্তি প্রধানত রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ফল; শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বা নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের ফল নয়। রপ্তানি আয় দুর্বল থাকায় দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে খাদ্য ও ফিডের কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও পরিবহন ব্যয়ের ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই বর্তমান স্বস্তিকে টেকসই করতে রপ্তানি বাড়ানো, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানিনির্ভর উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো জরুরি।

বৈদেশিক খাতের বর্তমান স্বস্তি প্রধানত রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ফল; শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বা নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের ফল নয়। রপ্তানি আয় দুর্বল থাকায় দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

 

৩. বেসরকারি বিনিয়োগে গভীর স্থবিরতা

দেশের বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো গভীর স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক দুর্বলতা। মার্চ ২০২৬-এ এই প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিক নিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমে আসে; এপ্রিলে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ এবং মে মাসে সামান্য বেড়ে ৪.৯৮ শতাংশ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জুনের জন্য প্রায় ৫.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অনুমান করলেও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। এই পরিস্থিতি দেখায় যে ব্যবসায়ীরা নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছেন না এবং ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

অন্যদিকে একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ দ্রুত বেড়েছে। মে পর্যন্ত সরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২০.৮ শতাংশ এবং জুনের জন্য তা ২৫.৯ শতাংশ হওয়ার অনুমান করা হয়েছে। সরকারের রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় বাজেট ব্যয় ও অন্যান্য দায় মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যবসায় ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমছে এবং নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

ফলে ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যবসায় ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমছে এবং নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

 

উচ্চ সুদহারও বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি জরুরি ঋণসুবিধার হার ১১ শতাংশ থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বাজারচাহিদা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়। ফলে ব্যাংকে অর্থ বা তারল্য থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগের আস্থা তৈরি হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু সুদহার কমানো যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, স্থিতিশীল নীতি, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ বাজারচাহিদার বিষয়ে আস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

 

৪. ব্যাংকিং খাত: স্বচ্ছতা বেড়েছে, ঝুঁকি কমেনি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হিসাবে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর ৩৫.৭৩ শতাংশ থেকে মার্চ ২০২৬-এ ৩২.২৬ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু এখনো ব্যাংকঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি, যা ব্যাংকের মূলধন, তারল্য, মুনাফা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, খেলাপি ঋণ কমার বড় অংশ ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিশোধের সময় বা শর্ত পরিবর্তন করায় সেগুলোর কিছু অংশ আপাতত খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ঋণগ্রহীতার ব্যবসা, নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সক্ষমতা সব ক্ষেত্রে উন্নত হয়েছেএমনটি নিশ্চিত নয়। তাই ঘোষিত হার কমলেও ব্যাংকের সম্পদের মান সত্যিকার অর্থে পুনরুদ্ধার হয়েছে বলা যাবে না।

তাই ঘোষিত হার কমলেও ব্যাংকের সম্পদের মান সত্যিকার অর্থে পুনরুদ্ধার হয়েছে বলা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে এই স্বচ্ছতা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদন ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারে।

 

কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ, সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের ফলে আগে আড়ালে থাকা ক্ষতি এখন সামনে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে এই স্বচ্ছতা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদন, ঋণপত্র খোলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারে। ফলে দুর্বল আর্থিক অবস্থা, অপর্যাপ্ত জামানত বা অনিশ্চিত নগদ প্রবাহ রয়েছেএমন ব্যবসার জন্য অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হবে।

ব্যাংক পুনর্গঠন সফল করতে সাধারণ আমানতকারীর অর্থ ও আস্থা রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ, স্বাধীন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। জালিয়াতি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না।

 

৫. জ্বালানি ও লজিস্টিকস: প্রবৃদ্ধির প্রধান সরবরাহগত বাধা

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনীয় গ্যাস ও জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্র পুরো ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। শিল্পকারখানায় অনিয়মিত বিদ্যুৎ, গ্যাসের নিম্নচাপ এবং ঘন ঘন সরবরাহ বিঘ্ন উৎপাদনের সময়, ব্যয় ও পণ্যের মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমদানিনির্ভর এলএনজি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, দুর্বল সঞ্চালনব্যবস্থা এবং জ্বালানির অদক্ষ ব্যবহার এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

জ্বালানির অনিশ্চয়তা এখন শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বাড়তি খরচের বিষয় নয়; এটি ব্যবসার ধারাবাহিকতার বড় ঝুঁকি। উৎপাদন বন্ধ থাকা, জেনারেটরের জ্বালানি ব্যয়, কাঁচামাল ও পণ্য নষ্ট হওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ করতে না পারার কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফিডমিল, হ্যাচারি, পরিবেশ-নিয়ন্ত্রিত খামার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হিমাগার ও শীতল সরবরাহব্যবস্থার জন্য এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুতর।

সরকার মহেশখালীতে শিল্পকারখানার জন্য একটি স্বতন্ত্র ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে টার্মিনাল নির্মাণ, সঞ্চালনব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ এবং এলএনজি সংগ্রহ নিশ্চিত করতে প্রায় দুই বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। তাই বর্তমান উৎপাদন বা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতের এই সম্ভাব্য গ্যাস সরবরাহকে নিশ্চিত সুবিধা হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। প্রকল্প মূল্যায়নে বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা, জ্বালানির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন বন্ধ থাকার আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যদিকে বন্দর, কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবা ২৪ ঘণ্টা চালু এবং কাস্টমস কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা গেলে পণ্য খালাসের সময়, বন্দরের অতিরিক্ত ভাড়া ও মজুত ব্যয় কমতে পারে। তবে শুধু বন্দর বা কাস্টমস খোলা রাখলেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। ব্যাংক, উদ্ভিদ ও প্রাণিসঙ্গনিরোধ কর্তৃপক্ষ, পরীক্ষাগার, পরিবহন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেও একই সময়ে কার্যকর থাকতে হবে। সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা, নির্ধারিত সেবার সময়সীমা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই ২৪ ঘণ্টার সেবা ব্যবসার জন্য বাস্তব সুফল আনবে।

জ্বালানির অনিশ্চয়তা এখন শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বাড়তি খরচের বিষয় নয়; এটি ব্যবসার ধারাবাহিকতার বড় ঝুঁকি। উৎপাদন বন্ধ থাকা, জেনারেটরের জ্বালানি ব্যয়, কাঁচামাল ও পণ্য নষ্ট হওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ করতে না পারার কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারে।

 

৬. ব্যবসা ও প্রশাসনিক সংস্কার: ইতিবাচক দিকনির্দেশনা, অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন

সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের আলোচনায় উত্থাপিত ২৮টি বিষয়ের মধ্যে ২১টিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অথবা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমোদন সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে শুধু সময়সীমা ঘোষণা করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্যে ঋণপত্র বা এলসির ওপর নির্ভরতা কমাতে ওপেন অ্যাকাউন্ট, ডকুমেন্টারি কালেকশন এবং সরবরাহব্যবস্থাভিত্তিক অর্থায়নের মতো বিকল্প পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এগুলো কার্যকর হলে আমদানিকারকের ব্যাংক খরচ, জামানতের চাপ ও কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন কমতে পারে। পাশাপাশি বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর থেকে পাঁচ বছর করা, বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আমদানি পণ্যের ঘোষিত মূল্য ও কাস্টমস মূল্যায়নের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ রপ্তানিমুখী শিল্পের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও রপ্তানি সম্প্রসারণেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সৌর প্যানেল আমদানির শুল্ক প্রায় ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদিও ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বহাল থাকবে। করনীতি প্রণয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং করনীতি নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পৃথক করার উদ্যোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং আন্তর্জাতিক মান পরিপালন অপরিহার্য।

সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের আলোচনায় উত্থাপিত ২৮টি বিষয়ের মধ্যে ২১টিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অথবা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ব্যবায়িক লাইসেন্স ও অনুমোদন সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নীতিগত ঘোষণা এবং ব্যবসায় বাস্তব সুবিধা পাওয়ার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে। কোনো উদ্যোগকে কার্যকর ধরে নেওয়ার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র, যোগ্যতার শর্ত, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং আর্থিক সুবিধা—প্রতিটি ধাপ যাচাই করা প্রয়োজন।

 

তবে নীতিগত ঘোষণা এবং ব্যবসায় বাস্তব সুবিধা পাওয়ার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে। কোনো উদ্যোগকে কার্যকর ধরে নেওয়ার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র, যোগ্যতার শর্ত, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং আর্থিক সুবিধাপ্রতিটি ধাপ যাচাই করা প্রয়োজন। ২০২৫২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয় ১০.০২ শতাংশ বাড়লেও ওই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১.৫৮ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে কর আদায়, নিরীক্ষা ও নথিপত্র যাচাই আরও কঠোর হতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তাই সম্ভাব্য প্রণোদনার পাশাপাশি কর পরিপালন ও নীতিগত ঝুঁকির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

৭. কৃষি, কৃষক কার্ড ও গ্রামীণ অর্থনীতি

কৃষকদের সরকারি সহায়তা আরও সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে কৃষিঋণ, সার বিতরণ, শস্যবিমা, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের মতো কর্মসূচি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি কৃষিসহায়ক কার্যক্রমে অপচয় ও অনিয়ম কমাতে পারে।

কৃষক কার্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে শুধু নাম তালিকাভুক্ত করা যথেষ্ট নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির তথ্য, পেশা, খামারের অবস্থান ও প্রকৃত উৎপাদন কার্যক্রম যাচাই করতে হবে। একই ব্যক্তি যেন একাধিক কর্মসূচিতে অবৈধভাবে সুবিধা না নেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় পক্ষপাতের মাধ্যমে ভুয়া সুবিধাভোগী অন্তর্ভুক্ত না হন, সে ব্যবস্থাও প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদন, জমি, খামারের আকার ও আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন বিবেচনায় তথ্যভান্ডার নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য ভুল তথ্য সংশোধন, অভিযোগ ও আপিলের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। পাশাপাশি স্বাধীন নিরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের মাধ্যমে দেখতে হবে প্রকৃত কৃষক সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন কি না। কৃষক কার্ডকে শুধু ফসল উৎপাদনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাণিসম্পদ, পোলট্রি, দুগ্ধ ও মৎস্যচাষিদেরও নিবন্ধন ও বিমা কাঠামোর আওতায় আনা উচিত। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে শুধু নাম তালিকাভুক্ত করা যথেষ্ট নয়। একটি নির্ভরযোগ্য কৃষক তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে কৃষিঋণ, বিমা, টিকাদান, কারিগরি পরামর্শ, ডিজিটাল অর্থপ্রদান, উৎপাদিত পণ্যের অনুসরণযোগ্যতা এবং সরাসরি বাজারসংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। তবে শুধু কৃষক কার্ড থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে সক্রিয় উৎপাদক বা ঋণযোগ্য গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

 

একটি নির্ভরযোগ্য কৃষক তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে কৃষিঋণ, বিমা, টিকাদান, কারিগরি পরামর্শ, ডিজিটাল অর্থপ্রদান, উৎপাদিত পণ্যের অনুসরণযোগ্যতা এবং সরাসরি বাজারসংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। তবে শুধু কৃষক কার্ড থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে সক্রিয় উৎপাদক বা ঋণযোগ্য গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। ঋণ বা ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার আগে তার প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা, লেনদেনের ইতিহাস ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

 

সরকারের করণীয়

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত ছয় মাসে তীব্র অস্থিতিশীলতা থেকে ধীরে ধীরে একটি ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার পর্যায়ে এসেছে। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে এই উন্নতি এখনো শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত স্বস্তি আনতে পারেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির মধ্যকার ব্যবধান সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা হলো বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, উচ্চ সুদ, ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ, জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি। রপ্তানি কমলেও আমদানি ব্যয় বেড়েছে, আর সরকারের ব্যাংকঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত করছে। তাই বর্তমান স্থিতিশীলতাকে পুনরুদ্ধার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; বরং এটি প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমালে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বাধা কমাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, ফিডের কাঁচামাল ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করেও উৎপাদনশীল খাত সচল রাখা যায়।

সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমালে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি সরবরাহ, সঞ্চালনব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্প, কৃষি ও জরুরি সেবায় জ্বালানি বরাদ্দের একটি স্বচ্ছ অগ্রাধিকারনীতি থাকা উচিত। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগের জন্য কর-সুবিধা এবং স্বল্পসুদের অর্থায়ন দিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রকল্পের ঘোষণার পাশাপাশি বর্তমান সরবরাহ-সংকট মোকাবিলায় সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা জরুরি।

ব্যাংকিং সংস্কারে আমানতকারীদের সুরক্ষা দিয়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, স্বাধীন সম্পদমান পর্যালোচনা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করে পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারের ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমিয়ে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বর্তমান স্থিতিশীলতাকে পুনরুদ্ধার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; বরং এটি প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নীতির ধারাবাহিকতা, মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি এবং সরকার–ব্যবসা–কৃষকের নিয়মিত সংলাপ নিশ্চিত হলেই বর্তমান ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা টেকসই ও কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে।

 

সবশেষে, সরকারি ঘোষণাকে দ্রুত বাস্তব সুবিধায় রূপ দিতে প্রতিটি সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও অগ্রগতি প্রকাশ করা উচিত। লাইসেন্স ও অনুমোদন ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়া, ২৪ ঘণ্টা বন্দরকাস্টমসব্যাংক সেবা, বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন এবং কাস্টমস স্বয়ংক্রিয়করণ বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। কৃষক কার্ডের তথ্য নিয়মিত যাচাই করে পোলট্রি, প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও মৎস্যচাষিদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নীতির ধারাবাহিকতা, মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি এবং সরকারব্যবসাকৃষকের নিয়মিত সংলাপ নিশ্চিত হলেই বর্তমান ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা টেকসই ও কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে।

 

Institutional References