সরকার একটা ব্যতিক্রমী কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা, রাজস্বচাপ, প্রশাসনিক শিথিলতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো এবং জ্বালানিনির্ভর শিল্পের সংকট—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে ছিল কঠিন এক উত্তরাধিকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বিপর্যয়। ফলে ছয় মাসে কাঠামোগত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু ছয় মাস এতটাও কম সময় নয় যে শুধু উদ্যোগের ফিরিস্তি দিয়ে ফলাফলের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে। রেমিট্যান্স, রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তির লক্ষণ স্পষ্ট হলেও এক দশকের সর্বনিম্ন শিল্প প্রবৃদ্ধি, বাড়তে থাকা দারিদ্র্য এবং জ্বালানি সরবরাহের কাঠামোগত ঘাটতি বলছে, পুনরুদ্ধার এখনো ভঙ্গুর ও অসম। তাই সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে ঘোষণার পাশাপাশি দেখতে হবে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে।
প্রেক্ষাপট: কঠিন উত্তরাধিকার, উঁচু প্রত্যাশা
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনে গঠিত সরকার দায়িত্ব নেয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। গত ১৭ আগস্ট ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের প্রধান অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা, প্রায় শতাধিক অধ্যাদেশকে সংসদীয় আইনে রূপান্তর, আর্থিক খাত সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতাকে।
মূল্যায়নে বসার আগে দুটি বাস্তবতা মেনে নেওয়া দরকার। সরকার একটি কঠিন সময়ে চেয়ারে বসেছে—দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা, রাজস্বচাপ, প্রশাসনিক শিথিলতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো এবং জ্বালানিনির্ভর শিল্পের সংকট। এসব খুব অল্প সময়ে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ নয়। আবার কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে ছয় মাস আসলেই কম সময়। তবে এতটাও কম নয় যে শুধু উদ্যোগের ফিরিস্তি দিয়ে ফলাফলের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে।
সরকারের দাবির শক্তি ও সীমা
সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর বেশ কয়েকটি নিঃসন্দেহে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণসহায়তা; বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের পরিকল্পনা; সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন; দ্রুত বিচার ও নারী-শিশু নির্যাতন মামলার নিষ্পত্তি; এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারকে প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা—এর প্রতিটিই যৌক্তিক অগ্রাধিকার এবং কোনোটিই ফেলনা নয়।
সমস্যাটা অগ্রাধিকার নির্বাচনে নয়, উপস্থাপনায়। সংবাদ সম্মেলনে তোলা অধিকাংশ দাবির ভাষা ছিল ‘প্রক্রিয়াধীন’, ‘উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’, ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ কিংবা ‘করা হবে’—এ ধরনের। এসব শব্দ প্রশাসনিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় বটে, কিন্তু নাগরিকের হাতে-নাতে প্রাপ্তি বোঝায় না। কতটি কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে, কতজন প্রকৃতপক্ষে সুবিধা পেয়েছেন, কত টাকা ছাড় ও ব্যয় হয়েছে এবং সেই ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ আছে কি না—এই চার প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ছয় মাসের কোনো মূল্যায়নই সম্পূর্ণ হতে পারে না। ঘোষণাকে যাচাইযোগ্য ফলে রূপান্তর করাই এখন সরকারের প্রধান কাজ।
ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ একটা অসঙ্গতিও থেকে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে ইশতেহারের ৩১ দফা বাস্তবায়নের কথা, অথচ ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচটি অধ্যায়ের অধীনে ছিল ৫১টি অগ্রাধিকার, আর ৩১ দফা ছিল রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের পৃথক ও আগের একটি রূপরেখা। দুটি দলিলের আলাদা বাস্তবায়ন তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি দফা বাস্তবায়িত হচ্ছে—এই দাবি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে থেকে যেতে পারে, যাচাইযোগ্য সরকারি সাফল্য হিসেবে নয়।
সংবাদ সম্মেলনে তোলা অধিকাংশ দাবির ভাষা ছিল ‘প্রক্রিয়াধীন, উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে কিংবা করা হবে’ ইত্যাদী ধরণের। এসব শব্দ প্রশাসনিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় বটে, কিন্তু নাগরিকের হাতে-নাতে প্রাপ্তি বোঝায় না। কতটি কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে, কতজন প্রকৃতপক্ষে সুবিধা পেয়েছেন, কত টাকা ছাড় ও ব্যয় হয়েছে এবং সেই ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ আছে কি না, এই চার প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ছয় মাসের কোনো মূল্যায়নই সম্পূর্ণ হতে পারে না।
যেখানে অগ্রগতি বাস্তব ও দৃশ্যমান
সমালোচনায় যাওয়ার আগে অর্জনের কথাও বলা দরকার, কারণ কয়েকটি সূচকে উন্নতি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। পরিবর্তনটা সবচেয়ে চোখে পড়ে বাহ্যিক খাতে। চলতি আগস্টের ১ থেকে ১৬ তারিখে রেমিট্যান্স আগের বছরের একই সময়ের ১২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মোট রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৭১১ কোটি ডলার, আইএমএফের বিপিএম৬ (BPM6) পদ্ধতিতে যা ৩ হাজার ২৩১ কোটি। কয়েক বছরের রিজার্ভ সংকটের পর এটা বাস্তব একটা স্বস্তি। মূল্যস্ফীতির প্রবণতাও ইতিবাচক দিকে। জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, যদিও এই মাত্রাও এখনো উদ্বেগজনক রকমের উঁচু।
আর্থিক খাতেও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে। গত ২৪ জুন বিশ্বব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে ৪৫ কোটি ডলারের Financial Sector Support Project II প্রকল্পে, যার লক্ষ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, জরুরি তারল্য সহায়তার কাঠামো তৈরি, আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের চার গুণেরও বেশি। ফলে এই সংস্কার এমনিতেই জরুরি হয়ে উঠেছিল।
প্রশাসনিক ব্যয়েও কিছুটা সংযমের ছাপ দেখা গেছে। টিআইবির ১০০ দিনের পর্যালোচনায় সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল এবং ভিভিআইপি প্রটোকল কমানোকে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ফেব্রুয়ারির ভোটকে প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে অভিহিত করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেছে।
আর্থিক খাতেও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে। গত ২৪ জুন বিশ্বব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে ৪৫ কোটি ডলারের Financial Sector Support Project II প্রকল্পে, যার লক্ষ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, জরুরি তারল্য সহায়তার কাঠামো তৈরি, আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের চার গুণেরও বেশি, ফলে এই সংস্কার এমনিতেই জরুরি হয়ে উঠেছিল।
অর্থনীতি: সামষ্টিক স্বস্তি, উৎপাদনে দুর্বলতা
সামষ্টিক উন্নতির নিচে উৎপাদন অর্থনীতির চিত্রটা কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক। বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, আগের বছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। কিন্তু জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ২২ শতাংশে, আগের বছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। টানা তৃতীয় প্রান্তিকে এই মন্থরতা। পুরো অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে, যা এক দশকের সর্বনিম্ন। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ, ছয় বছরের মধ্যে যা প্রথম। অর্থাৎ সামগ্রিক জিডিপি কিছুটা বাড়লেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতটিই আসলে দুর্বল হয়েছে।
অর্থপ্রবাহের হিসাবও একই দিকে ইঙ্গিত করে। মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, জুনে তা নেমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে—কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। উল্টো দিকে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ গত অর্থবছর শেষের ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৩ জুনে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকায়, প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থাৎ ব্যাংকব্যবস্থার তহবিল যাচ্ছে উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের বদলে সরকারি ঋণে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শব্দটা ব্যবহারের আগে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি ঋণপ্রবাহে দৃশ্যমান ফল দেখা দরকার।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে উন্নতি হয়েছে, কিন্তু এক দশকের সর্বনিম্ন শিল্প প্রবৃদ্ধি, কয়েক দশকের সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণপ্রবাহ এবং বাড়তে থাকা দারিদ্র্য বলছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল এখনো অসম ও ভঙ্গুর।
এই ফলাফল নাগরিকের জীবনেও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের ৮ এপ্রিলের Bangladesh Development Update প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পিছিয়ে পড়েছে এবং জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে ঠিকই, তবে এই মাইলফলককে পড়তে হবে এক দশকের সর্বনিম্ন শিল্প প্রবৃদ্ধি ও বাড়তে থাকা দারিদ্র্যের পাশাপাশি রেখেই। মূল্যস্ফীতির সামান্য মাসিক পতনকে জীবনযাত্রার সংকটের অবসান বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল: ঘোষণা যেমন বড়, ঝুঁকিও তেমন বড়
বন্ধ ও দুর্বল কারখানা ফের চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচির উদ্দেশ্যটা ইতিবাচক। গত ২৩ মে ঘোষিত এই কর্মসূচিতে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়ন থেকে, আর সরকারি গ্যারান্টিতে ১৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল থেকে। কিন্তু ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সংখ্যায় বড় গরমিল রয়ে গেছে। রয়টার্স বলেছে সংখ্যাটা প্রায় আড়াই লাখ, অথচ বাসস, ইউএনবি ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ দেশীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে ২৫ লাখের কথা। একই কর্মসূচির ফল-প্রক্ষেপণে দশ গুণ ব্যবধান কোনো ছোটখাটো ভুল নয়; এটা প্রকল্পটির প্রাথমিক হিসাব-নিকাশের মান নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কোন কারখানা সাময়িক সংকটে বন্ধ হয়েছে আর কোনটা অদক্ষতা, ঋণখেলাপি, জালিয়াতি বা বাজার হারানোর কারণে একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পার্থক্য না করে রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে সস্তা ঋণ দিলে পুরোনো খেলাপি ঋণের সঙ্গে যোগ হবে নতুন খেলাপি ঋণ। ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ নিয়ে চলা একটা ব্যাংকব্যবস্থার পক্ষে যে ঝুঁকি নেওয়া মোটেও সহজ নয়।
তাই প্রতিটি অর্থায়নের আগে অন্তত পাঁচটি বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়া দরকার—মালিকের নিজস্ব মূলধন, বাজার ও প্রকৃত ক্রয়াদেশের অবস্থা, নগদ প্রবাহ, আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং প্রতি এক কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে কতটা টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে তা। এর পাশাপাশি ছয় মাস অন্তর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি—ঋণ বিতরণ, উৎপাদন, রপ্তানি, নতুন সৃষ্ট চাকরি এবং ঋণ পরিশোধের হালনাগাদ অবস্থা। স্বচ্ছতার এই ন্যূনতম কাঠামো না থাকলে তহবিলটা শিল্প পুনরুজ্জীবনের কর্মসূচি না হয়ে রাজনৈতিক ঋণের কর্মসূচিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যাবে।
৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্প পুনরুজ্জীবন তহবিল বন্ধ কারখানা ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, মালিকের নিজস্ব বিনিয়োগ এবং ঋণ ব্যবহারের স্বচ্ছ নজরদারি না থাকলে এই উদ্যোগ নতুন শিল্পায়নের বদলে পুরোনো খেলাপি ঋণের ওপর নতুন বোঝা চাপাতে পারে।
নতুন পে-স্কেল: ন্যায্যতা প্রয়োজন, কিন্তু অর্থ কোথা থেকে?
দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমেছে, তাই যৌক্তিক একটা বেতন সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। নবম জাতীয় পে কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং তা বাস্তবায়ন হচ্ছে ধাপে ধাপে। তবে মনে রাখা দরকার, এটা এক বছরের সিদ্ধান্ত নয়; বেতন, ভাতা ও পেনশনের ওপর এটা তৈরি করবে একটা স্থায়ী দায়।
সমস্যা হলো, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, এশিয়ার সর্বনিম্নদের একটা, সুদান ও ইয়েমেনের সামান্য ওপরে। অথচ ২০২৬-২৭ বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, বাজেট বক্তৃতার হিসাবে যা জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন কর-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশে নেওয়ার কথা। বাস্তব আদায় আর লক্ষ্যমাত্রার এই ব্যবধান পূরণ না হলে স্থায়ী এই ব্যয়ের ভার বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
রাজস্ব সংস্কার ছাড়া বড় পে-স্কেল কার্যকর করলে সরকারকে হয় বাড়তি ঋণ নিতে হবে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে, অথবা নতুন কর বসাতে হবে। তিনটির যেকোনোটাই মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। আরেকটা বিবেচনার বিষয়ও আছে, বেসরকারি খাতের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় না বাড়লে শুধু সরকারি বেতন বৃদ্ধি বাজারে চাহিদাজনিত চাপ তৈরি করতে পারে। তাই একবারে সর্বজনীন বড় বৃদ্ধির বদলে নিম্ন গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়া, উচ্চ গ্রেডে ধাপে ধাপে সমন্বয় করা এবং কিছু সুবিধা কর্মদক্ষতা ও সেবার মানের সঙ্গে যুক্ত করাই বেশি বাস্তবসম্মত হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পূর্ণ ব্যয়-রাজস্ব প্রভাবের হিসাবটাও প্রকাশ করা উচিত।
রাজস্ব সংস্কার ছাড়া বড় পে-স্কেল কার্যকর করলে সরকারকে হয় বাড়তি ঋণ নিতে হবে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে, অথবা নতুন কর বসাতে হবে, তিনটির যেকোনোটাই মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। আরেকটা বিবেচনার বিষয়ও আছে, বেসরকারি খাতের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় না বাড়লে শুধু সরকারি বেতন বৃদ্ধি বাজারে চাহিদাজনিত চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি: বৈশ্বিক ধাক্কা বাস্তব, অভ্যন্তরীণ ঘাটতিও বাস্তব
জ্বালানি সংকটের বৈশ্বিক অংশটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, মার্চের প্রথম সপ্তাহেই পেট্রোবাংলার তিন দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী—কাতার এনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং ও এক্সেলারেট এনার্জি—ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করে। স্পট এলএনজির দাম জানুয়ারির প্রায় ১০ ডলার থেকে মার্চে উঠে যায় সর্বোচ্চ ২৮ দশমিক ২৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউতে। এর মধ্যে ২২ জুলাই মহেশখালীতে এক্সেলারেটের ভাসমান টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যায় দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ, যা জাতীয় সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ।
কিন্তু বৈশ্বিক ঘটনাটা ছিল একটা ধাক্কা মাত্র, মূল কারণ নয়। জাতীয় চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, আর স্বাভাবিক সরবরাহ ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০। অর্থাৎ এই ঘাটতি দুর্ঘটনার আগেও কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান ছিল। মূল দুর্বলতাগুলো দেশের ভেতরেই—একটিমাত্র অবকাঠামো বিকল হলেই সরবরাহের ছয় ভাগের এক ভাগ হারিয়ে যাওয়ার মতো অতিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ধীরগতি, স্পট বাজারের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা, শিল্প-বিদ্যুৎ-সার-গৃহস্থালির মধ্যে আগে থেকে ঘোষিত রেশনিং নীতির অভাব এবং সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জনসাধারণ ও শিল্পকে সময়মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য না দেওয়া।
প্রভাব পড়েছে বহুমুখীভাবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি থেকে নেমে প্রায় ৭০০-এ ঠেকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ থেকে নেমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে। এক সন্ধ্যায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৬৪ মেগাওয়াট, আর উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। শিল্পে চিত্রটা আরও কঠিন। প্লাস্টিক কারখানাগুলো চলছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় আর প্রায় ৩০০টি একেবারেই বন্ধ, সিরামিক খাত চলছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায়। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং ও সার শিল্পেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে আর রপ্তানি আদেশ ধরে রাখার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
এখানেই ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের সীমাবদ্ধতাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতির স্থিতিশীলতা না থাকলে শুধু ঋণ দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। কর্মসংস্থানের প্রথম শর্ত নতুন তহবিল নয়, বরং বিদ্যমান উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষা করা।
হরমুজ প্রণালির সংকট ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের শিকড় আরও গভীরে। দেশীয় অনুসন্ধানের ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতা ও অতিকেন্দ্রীভূত অবকাঠামো সংকটকে এমন পর্যায়ে নিয়েছে, যেখানে জ্বালানির ঘাটতি সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত করছে।
এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও খাদ্য খাতেও, নানাভাবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি সার উৎপাদন, সেচ, কোল্ডচেইন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পশুখাদ্য শিল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যার শেষ প্রতিফলন পড়ে খাদ্যমূল্য, প্রাণিজ প্রোটিনের দাম আর গ্রামীণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতায়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৬ আগস্ট বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে অন্তত দুই বছর লাগবে। প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখার এই সরলতা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সময়সীমা ঘোষণা করা আর রোডম্যাপ প্রকাশ করা এক জিনিস নয়। প্রশ্ন থেকেই যায়, কোন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল, ব্যাকআপ পরিকল্পনা কেন কাজ করেনি, রেশনিংয়ের অগ্রাধিকার নীতি আসলে কী এবং দুই বছরের প্রতিটি ধাপে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য কী থাকবে।
হরমুজ প্রণালির সংকট ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের শিকড় আরও গভীরে। দেশীয় অনুসন্ধানের ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতা ও অতিকেন্দ্রীভূত অবকাঠামো সংকটকে এমন পর্যায়ে নিয়েছে, যেখানে জ্বালানির ঘাটতি সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত করছে।
আইনশৃঙ্খলা: দ্রুত বিচার বনাম সামগ্রিক সূচক
রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ১৯ মে-র ঘটনার রায় এসেছে ৭ জুন, অর্থাৎ মাত্র ১৯ দিনে, যা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতার একটা বাস্তব দৃষ্টান্ত। মেহেরপুরে একটা শিশু ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯ কার্যদিবসে। ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে এই গতি অবশ্যই অর্থবহ, আর গুরুতর অপরাধে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া থাকাটাও জরুরি। তবে রামিসার মামলায় ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে মাত্র একদিনেই। প্রমাণ যাচাই, আসামির কার্যকর আইনি প্রতিরক্ষা, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও আপিলের সুযোগ অক্ষুণ্ন না থাকলে পরে এই দ্রুত রায়ও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তার চেয়েও বড় কথা, দুই-তিনটা আলোচিত মামলার রায় সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার বিকল্প সূচক হতে পারে না।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২৬১টি, যাতে নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন আর আহত ২৫৬ জন। আগের বছরের একই সময়ে ঘটনা ছিল ১৪১টি আর নিহত ছিলেন ৬৭ জন। অর্থাৎ ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। টিআইবির ১০০ দিনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্যও। স্থানীয় পর্যায়ে দখলদারি ও চাঁদাবাজির চক্র পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার প্রতিফলন শেষমেশ পড়ে বাজারদরেই। তাই মূল্যায়ন হওয়া উচিত অপরাধের হার, মামলা গ্রহণের প্রবণতা, তদন্তের সময়, অভিযোগপত্রের মান, সাক্ষী সুরক্ষা, দণ্ডের হার এবং চাঁদাবাজি-দখলদারির প্রবণতার ভিত্তিতে, শুধু কয়েকটা রায়ের ভিত্তিতে নয়।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২৬১টি, যাতে নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন আর আহত ২৫৬ জন। আগের বছরের একই সময়ে ঘটনা ছিল ১৪১টি আর নিহত ছিলেন ৬৭ জন, অর্থাৎ ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। টিআইবির ১০০ দিনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্যও। স্থানীয় পর্যায়ে দখলদারি ও চাঁদাবাজির চক্র পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার প্রতিফলন শেষমেশ পড়ে বাজারদরেই।
সংস্কার: সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সততার
নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদ পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, হ্যাঁ ভোট প্রকাশিত হয়েছে ৬৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হিসেবে, যদিও বাতিল ব্যালট গণনার একটা পদ্ধতিতে ৬২ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারও উদ্ধৃত হয়েছে। গণভোট নিজে থেকে সংবিধান বদলে দেয় না, নির্বাচিত সংসদকেই সেই ম্যান্ডেটকে আইন ও সাংবিধানিক সংশোধনে রূপ দিতে হবে। ১০৫ সদস্যের উচ্চকক্ষ সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত হলেও আগস্ট পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি, আর ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংস্কার পরিষদের আইনি ভিত্তি নিয়ে মতপার্থক্যও থেকে গেছে।
এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় নৈতিক ঝুঁকি—বিরোধী দলে থাকার সময় যে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের দাবি তোলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে তা শিথিল হয়ে পড়া। টিআইবি ২১ জুলাই অভিযোগ করেছে, যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই সংসদে পাস হয়েছে Invest Bangladesh Act, আর জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রায় ২৬ শতাংশ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি। বিচার বিভাগ, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সুরক্ষাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ স্থগিত রাখা নিয়েও সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা, সংসদীয় কমিটির কর্তৃত্ব আর বিরোধী দলের অধিকার—এসব প্রশ্নে সরকারের অবস্থানই আসলে প্রমাণ করবে সংস্কারটা রাষ্ট্রের জন্য ছিল, নাকি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার একটা কৌশল।
পরবর্তী ছয় মাসের জন্য করণীয়
সবচেয়ে জরুরি কাজ একটা পূর্ণাঙ্গ ফলাফলপত্র প্রকাশ করা। ৩১ দফা ও ৫১ অগ্রাধিকারের পৃথক তালিকা ধরে প্রতিটা অঙ্গীকারের ভিত্তিরেখা, লক্ষ্য, সময়সীমা, বরাদ্দ, প্রকৃত ব্যয় এবং পরিমাপযোগ্য ফল জানানো দরকার। এর সঙ্গে অনুমোদন, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও ফলাফল—এই চারটা ধাপ আলাদা করে দেখানো দরকার, যাতে ঘোষণা আর অর্জনকে এক করে ফেলা না হয়। মূল্যায়নটা সরকারের একার হাতে না রেখে বিবিএস, সিএজি, সংসদীয় কমিটি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ছয় মাস অন্তর করা উচিত।
জ্বালানিতে দরকার তিন স্তরের পরিকল্পনা—৩০ দিনের জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা, এক বছরের এলএনজি ক্রয় কৌশল এবং পাঁচ বছরের দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্রিড আধুনিকায়নের রোডম্যাপ। দৈনিক চাহিদা, সরবরাহ, উৎপাদন ঘাটতি ও এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের তথ্য থাকা দরকার একটা উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ডে। শিল্পের ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী ও কর্মসংস্থাননিবিড় খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের একটা স্বচ্ছ অগ্রাধিকার কাঠামো ঘোষণা করা উচিত। কে কতটুকু পাবে তা আগে থেকেই জানা থাকলে কারখানা নিজের মতো করে পরিকল্পনা করতে পারবে।
দ্রব্যমূল্যে স্থায়ী স্বস্তি আসবে সরবরাহব্যবস্থার সংস্কারে, বাজারে অভিযান চালিয়ে নয়।
কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পরিবহন, সংরক্ষণ, পাইকারি মোকাম, আমদানি নীতি ও প্রতিযোগিতা ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ টেকসই হবে না। কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষাকেও যুক্ত করতে হবে ডিজিটাল জবাবদিহির সঙ্গে। উপকারভোগী নির্বাচনের তথ্যভিত্তিক ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ পদ্ধতি, একই পরিবারের একাধিক সুবিধা যাচাই, প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষির অন্তর্ভুক্তি এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ছাড়া শুধু কার্ড দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।
আইনশৃঙ্খলায় প্রয়োজন একটা মাসিক ড্যাশবোর্ড, যেখানে থাকবে অপরাধ, গ্রেপ্তার, তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার, দণ্ড, গণপিটুনি ও চাঁদাবাজির জেলাভিত্তিক তথ্য। সেই সঙ্গে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে চাঁদাবাজি ও দখলদারিতে দৃশ্যমান শূন্য সহনশীলতার নীতিও থাকা দরকার।
সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের একটা সময়বদ্ধ রোডম্যাপ, যেখানে ঐকমত্যের বিষয়, মতভেদের বিষয় এবং প্রতিটা সংশোধনের সময়সীমা আলাদাভাবে উল্লেখ থাকবে। সবশেষে দরকার ভুল স্বীকারের একটা সংস্কৃতি। সংবাদ সম্মেলন যেন শুধু অর্জনের প্রদর্শনী না হয়ে ওঠে, বরং কী করা যায়নি, কেন যায়নি আর কবে হবে—এই তিন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জায়গা হয়ে ওঠে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের একটা সময়বদ্ধ রোডম্যাপ, যেখানে ঐকমত্যের বিষয়, মতভেদের বিষয় এবং প্রতিটা সংশোধনের সময়সীমা আলাদাভাবে উল্লেখ থাকবে। সবশেষে দরকার ভুল স্বীকারের একটা সংস্কৃতি, সংবাদ সম্মেলন যেন শুধু অর্জনের প্রদর্শনী না হয়ে ওঠে, বরং কী করা যায়নি, কেন যায়নি আর কবে হবে, এই তিন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জায়গা হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
সরকার একটা ব্যতিক্রমী কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, এটা বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বিপর্যয়, ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ, এশিয়ার সর্বনিম্ন রাজস্ব সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়—এসব ছয় মাসে সারিয়ে তোলা যায় না। রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতির প্রবণতা দেখাচ্ছে, সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় সরকার কিছুটা জায়গা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু আগের সরকারের ব্যর্থতা নতুন সরকারের জন্য সীমাহীন দায়মুক্তি হয়ে উঠতে পারে না।
সরকারের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বক্তব্যটা বোধহয় এটাই হতে পারে—সব সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি, কিন্তু সমস্যাগুলো অস্বীকার করা হচ্ছে না, আর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মাপা যায় এমন সমাধানই দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ১৮০ দিনে উদ্যোগ নেওয়া যায়, পরের ১৮০ দিনে ফল দেখাতে হয়। মূল্যায়নের মানদণ্ডটাও তাই বদলাতে হবে। কতটা সভা হয়েছে বা কতটা কার্ড ঘোষণা হয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং কারখানায় গ্যাস আছে কি না, উৎপাদন ফিরেছে কি না, বাজারে স্বস্তি এসেছে কি না, রাস্তায় নিরাপত্তা আছে কি না এবং ক্ষমতার ওপর কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা দিয়ে।
সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে আত্মপ্রশংসা নয়, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করার সাহস। আর সবচেয়ে বড় সংস্কার হবে এমন একটা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সরকারের দাবি যাচাই হবে সরকারের নিজের বক্তব্য দিয়ে নয়, বরং স্বাধীন তথ্য আর নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে।
প্রথম ১৮০ দিনে একটি সরকার উদ্যোগ নিতে পারে, সংস্কারের কাঠামো দাঁড় করাতে পারে এবং নানা কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু পরের ১৮০ দিনে তার আসল পরীক্ষা হবে ফলাফলে: কারখানায় গ্যাস ফিরেছে কি না, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বেড়েছে কি না, মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি এসেছে কি না এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে কি না।
তথ্যসূত্র:
বিবিএস; বাংলাদেশ ব্যাংক; জাতীয় বাজেট বক্তৃতা ২০২৬-২৭; বিশ্বব্যাংক (Bangladesh Development Update, ৮ এপ্রিল ২০২৬; Financial Sector Support Project II, ২৪ জুন ২০২৬); সিপিডি; টিআইবি; এইচআরএসএস; ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন; দ্য ডেইলি স্টার; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড; দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস; নিউ এজ; বাসস; ইউএনবি; রয়টার্স। সরকারি অবস্থান ১৭ আগস্ট ২০২৬ এর ১৮০ দিন পূর্তির সংবাদ সম্মেলন থেকে গৃহীত। যেখানে সূত্রে অসঙ্গতি রয়েছে, তহবিলের কর্মসংস্থান প্রক্ষেপণ এবং গণভোটে হ্যাঁ ভোটের হার, সেখানে উভয় সংখ্যাই উল্লেখ করা হয়েছে।