আগস্ট ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিং প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়। অথচ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, এর বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৮ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। তারপরও ১১ ও ১২ আগস্ট সরবরাহ নেমে আসে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে, যেখানে চাহিদা ছিল ১৮,০৪৩ মেগাওয়াট।
এর তাৎক্ষণিক কারণগুলোর একটি ছিল গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা। বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির প্রায় পুরোটা গ্রিডে আসে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এক্সিলারেট ও সামিটের এফএসআরইউ) দিয়ে। ২১ জুলাই এক্সিলারেটের এফএসআরইউতে জাহাজ-থেকে-জাহাজে গ্যাস স্থানান্তরের সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে আগুন লাগে। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০–৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা জাতীয় সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ। এরপর ১৪ আগস্ট বৈরী আবহাওয়া ও নোঙর-ক্ষতির কারণে সামিটের এফএসআরইউও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে মার্চ ২০২৬ থেকে কাতার এনার্জির ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা যুক্ত হয়, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রায় ৩৫ শতাংশ কার্গো সরবরাহ ব্যাহত ছিল।
তবে কেবল এই ঘটনাগুলো দিয়ে এত বড় সঙ্কটকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলো এমন একটি ব্যবস্থায় আঘাত করেছে, যেখানে সঙ্কট আগে থেকেই বিদ্যমান ছিলো; আগেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছিল, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছিল এবং বিদ্যুৎ খাতে জমছিল বৃহদাকারের অর্থনৈতিক বোঝা। ফলে কয়েকটি আকস্মিক ধাক্কা একটি বৃহত্তর ভঙ্গুরতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে কেবল।
সেই ভঙ্গুরতার পেছনে রয়েছে বিশ বছরের গ্যাস-অনুসন্ধান ব্যর্থতা, আমদানি-নির্ভরতার একরৈখিক স্থাপত্য, ২০১০ সালের একটি বিশেষ আইনের অধীনে প্রতিযোগিতাবিহীনভাবে সই করা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং সেখান থেকে তৈরি হওয়া বিশাল ও ক্রমবর্ধমান ক্যাপাসিটি-পেমেন্টের বোঝা।
তাই, প্রশ্নটা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভাব নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যে জ্বালানি-ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, সেটি বাস্তবে কতটা ব্যবহারযোগ্য, কতটা জ্বালানি-নিরাপদ এবং কতটা আর্থিকভাবে টেকসই। বহু বছর ধরেই এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না। এই লেখায় সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
সঙ্কটটি আসলে কতটা গভীর
জাতীয় গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd)। এর বিপরীতে স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ থাকে ২,১০০ থেকে ২,৬৫০ mmcfd-এর মধ্যে। অর্থাৎ চলমান সঙ্কট শুরু হওয়ার আগেই ঘাটতিটা বিদ্যমান ছিল। আগস্টে সঙ্কটকালীন মুহূর্তে সরবরাহ নেমে আসে ১.৯ থেকে ২.১ বিলিয়ন ঘনফুটে। যে ব্যবস্থা স্বাভাবিক সময়েই চাহিদার তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম গ্যাস জোগাড় করতে হিমশিম খায়, সেখানে আরও সতেরো শতাংশ সরবরাহ হারালে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, তা তো সহজেই অনুমেয়।
বিদ্যুতের হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ইনস্টলড ক্যাপাসিটি প্রায় ২৮,৫০০ থেকে ২৯,০০০ মেগাওয়াট, আর পিক ডিমান্ড ১৮,০০০ থেকে সাড়ে আঠারো হাজার মেগাওয়াট। নামমাত্র রিজার্ভ মার্জিন পঞ্চান্ন থেকে ষাট শতাংশ, বৈশ্বিক মানে যা বিশাল উদ্বৃত্ত। কিন্তু এই ইনস্টলড ক্যাপাসিটির একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর, প্রায় ১২,১০০ থেকে ১২,৪৭০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য এই সংখ্যাটিই যথেষ্ট। পিডিবির নিজস্ব সামার প্ল্যান, যা এপ্রিল ২০২৬-এ সঙ্কট শুরুর অনেক আগে তৈরি হয়েছিল, সেখানে ধরে নেওয়া হয়েছিল এই গ্যাসভিত্তিক ক্যাপাসিটির মাত্র প্রায় ৪৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৫,২০০ মেগাওয়াট, বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য থাকবে। এটি সঙ্কট-পরবর্তী ব্যাখ্যা নয়; সরকারি সংস্থার নিজস্ব আগাম প্রক্ষেপণ। অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক ক্যাপাসিটি অব্যবহৃত থাকবে, এই বাস্তবতা বাংলাদেশ প্রশাসনের কাছে সঙ্কট শুরুর মাসখানেক আগেই জানা ছিল।
প্রকৃত সঙ্কট আঘাত হানার পর আগস্টে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন নেমে আসে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াটে, যা আগের সেই সংকুচিত প্রক্ষেপণের চেয়েও কম। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও সমস্যায় পড়ে। পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ার ও মাতারবাড়ি কেন্দ্র বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থতা এবং সরবরাহ-বিঘ্নের কারণে আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ১১ ও ১২ আগস্ট লোডশেডিং পৌঁছায় ৩,৫০০ থেকে প্রায় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে। চাহিদা ছিল ১৮,০৪৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৫,০৩৬ মেগাওয়াট। আর এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আশিটিরও বেশি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনা ঘটে, পুলিশপ্রধানের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন জমা পড়ে। তবে এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া সঙ্কটের কারণ নয়, ফলাফল।
প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের চাহিদা; তবু লোডশেডিং ৩,৫০০ মেগাওয়াট—সমস্যাটি তাই সক্ষমতার নয়, ব্যবস্থার।
এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণ আসলে ক্যাপাসিটি-ঘাটতি নয়। এটি মূলত জ্বালানি-প্রাপ্যতা, ব্যবস্থাপনা-নকশা এবং অর্থনৈতিক চাপগত সমস্যা। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো গ্যাস নেই, কয়লা কেনার মতো অর্থ নেই, আর বিকল্প সরবরাহের মতো কাঠামোগত বৈচিত্র্যও নেই।
গ্যাসের ঘাটতি: সঙ্কটের মূল কারণ
বিদ্যুতের সঙ্কট বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে গ্যাসের অবস্থা। কারণ বিদ্যুৎ-সঙ্কটের প্রায় পুরোটাই একটি জ্বালানি-সঙ্কট, যা বিদ্যুতের ঘাটতি হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১,৬৩০ থেকে ১,৮০০ mmcfd-এর মধ্যে। উৎসভেদে সংখ্যাটি সামান্য ভিন্ন: সংসদে দেওয়া হিসাবে ১,৬৩০, অন্য প্রতিবেদনে প্রায় ১,৮০০। নির্দিষ্ট সংখ্যা যা-ই হোক, প্রবণতাটি স্পষ্ট। নয় বছরে দেশীয় উৎপাদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
উৎপাদনে কেন এই পতন?
২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে মাত্র বাইশ থেকে ছাব্বিশটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। একটি গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির জন্য পঁচিশ বছরে এই সংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের কম। ২০২৪ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানিই দরপত্র জমা দেয়নি; সাড়ার পরিমাণ ছিলো শূন্য। এর আগেও দুটি বড় প্রস্থানের নজির রয়েছে। প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট বা পিএসসির মূল্য-কাঠামো নিয়ে বিরোধের মধ্যে কোনোকোফিলিপস ২০১৫ সালে এবং পসকো-দাইয়ু ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে সরে যায়। দেখা যাচ্ছে, এই যে আজকের এলএনজি-নির্ভরতা, এটা হঠাৎ তৈরি হয়নি। দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ধারাবাহিক পতনের সঙ্গে সমান্তরালভাবেই আমদানি-নির্ভরতা বেড়েছে। একটির ব্যর্থতা অন্যটির প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।
এই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও ক্যাপাসিটি কমেনি, বরং বেড়েছে। দেশীয় জ্বালানি-উৎস যখন সঙ্কুচিত হচ্ছিল, তখনও সেই জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত ছিল। ২০১০-১৫ সাল নাগাদ গ্যাসের সরবরাহ কমে আসার সংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারপরও গ্যাসভিত্তিক ক্যাপাসিটি সম্প্রসারণ থামেনি। এটি একটি কাঠামোগত অসংগতি। জ্বালানির সরবরাহরেখা এবং উৎপাদন-সক্ষমতার সম্প্রসারণরেখা বিপরীত দিকে এগিয়েছে, অথচ পরিকল্পনায় দুটিকে যথেষ্ট সমন্বয় করা হয়নি।
বিদ্যুতের সঙ্কট বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে গ্যাসের অবস্থা। কারণ বিদ্যুৎ-সঙ্কটের প্রায় পুরোটাই একটি জ্বালানি-সঙ্কট, যা বিদ্যুতের ঘাটতি হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১,৬৩০ থেকে ১,৮০০ mmcfd-এর মধ্যে। উৎসভেদে সংখ্যাটি সামান্য ভিন্ন: সংসদে দেওয়া হিসাবে ১,৬৩০, অন্য প্রতিবেদনে প্রায় ১,৮০০। নির্দিষ্ট সংখ্যা যা-ই হোক, প্রবণতাটি স্পষ্ট। নয় বছরে দেশীয় উৎপাদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
এলএনজি-নির্ভরতার ফাঁদ
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু করে। কিন্তু এই আমদানি-ব্যবস্থা যেভাবে গড়ে উঠেছে, তাতে ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি নতুন একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। পুরো আমদানি-ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর। ২০১৮ থেকে সক্রিয় এক্সিলারেটের এফএসআরইউর দৈনিক ক্ষমতা প্রায় ৬০০ mmcfd, আর ২০১৯ থেকে সক্রিয় সামিটের এফএসআরইউর ক্ষমতা প্রায় ৫০০ mmcfd। এই দুটি টার্মিনালের যৌথ ক্ষমতা প্রায় ১,০০০ থেকে ১,১০০ mmcfd।
এই কাঠামোর দুর্বলতা তো সরাসরিই বোধগম্য। দুটি টার্মিনালের যেকোনো একটি বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় সরবরাহের একটি বড় অংশ মুহূর্তেই ব্যাহত হবে এটাই স্বাভাবিক। প্রকৌশলের ভাষায় একে “সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিওর” বলা হয়, অর্থাৎ এমন একটি বিন্দু যার ব্যর্থতা পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি-ব্যবস্থায় এমন নির্ভরতা দুটি টার্মিনালের দুটিতেই রয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, দুটি এফএসআরইউই একই ভৌগোলিক এলাকায়- মহেশখালীতে। কোনো আঞ্চলিক দুর্যোগ, বৈরী আবহাওয়া বা নৌ-দুর্ঘটনা একসঙ্গে দুটি টার্মিনালকেই ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে, যা ২০২৬ সালের আগস্টে ঘটেছেও। এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন কমানোর জন্য একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল পরিকল্পিত হয়েছিল। ভাসমান জাহাজের তুলনায় এটি অনেক বেশি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা। সেই সমাধান হিসেবে পরিকল্পিত হয় মাতারবাড়ি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল, যার পরিকল্পনা ২০১৪ সাল থেকেই কাগজে-কলমে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সাল পর্যন্ত এটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু করে। কিন্তু এই আমদানি-ব্যবস্থা যেভাবে গড়ে উঠেছে, তাতে ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি নতুন একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। পুরো আমদানি-ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর।
এই বিলম্বের কারণ হিসেবে মূলত প্রক্রিয়াগত ক্রম-বিভ্রাটের কথা উঠে আসে। আগে স্পনসর নির্বাচন করা হয়েছে, পরে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে যৌক্তিক ক্রম হওয়ার কথা ছিল উল্টো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি-জটিলতা এবং ২০২৪ সালে প্রকল্পটি নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত। নাম-প্রকাশ না করা একটি সূত্র দাবি করেছে, বেসরকারি এফএসআরইউ-ইন্ট্রেস্টের একটি লবি এই বিলম্বের পেছনে সক্রিয় ছিল। যদিও এই দাবি প্রমাণিত নয়। যা প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত, তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধীরগতি ও পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ার ত্রুটি। এই কারণগুলো একাই মাতারবাড়ির বারো বছর দেরি হওয়ার ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট।
এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে, আট বছর আগে সাময়িক সমাধান হিসেবে নির্মিত সেই দুই-টার্মিনাল ব্যবস্থার ওপরই ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কাতার ও ওমানের সাথে করা এসব চুক্তি মূলত ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ২০২৬ সালে কাতার এনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ (Force Majeure) ঘোষণা করলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ধস নামে। গোপনীয়তার মোড়কে থাকা এসব চুক্তিতে ‘টেক-অর-পে’ (Take-or-pay) বা ন্যূনতম অর্থ পরিশোধের মতো কঠোর শর্তও যুক্ত রয়েছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থা এমন এক রূপ নিয়েছে যেখানে ভৌগোলিক, সরবরাহকারী কিংবা মূল্য—কোনো ক্ষেত্রেই কোনো বৈচিত্র্য বা বিকল্প নেই। মূলত এই ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর কারণেই ২০২৬ সালের ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে।
আট বছর আগে সাময়িক সমাধান হিসেবে নির্মিত সেই দুই-টার্মিনাল ব্যবস্থার ওপরই ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আছে, সেগুলো কেন চলছে না
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (ইনস্টলড ক্যাপাসিটি) প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেলেও, সে অনুপাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি। ফলস্বরূপ, বিপুল পরিমাণ অলস ক্যাপাসিটি সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতে, বর্তমানে দেশে ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এত উদ্বৃত্ত থাকার পরও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে, যা এই সঙ্কটের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। মূল সমস্যা ক্যাপাসিটি ঘাটতি নয়, বরং কেন্দ্রগুলোর সাথে জ্বালানি সরবরাহের চরম সমন্বয়হীনতা।
উদাহরণস্বরূপ, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২,১০০-১২,৪৭০ মেগাওয়াট হলেও, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার করা গেছে মাত্র ৫,২০০ মেগাওয়াট। প্রায় ৫৭ শতাংশের এই বিশাল পার্থক্য প্রমাণ করে যে, শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এই অসামঞ্জস্যের পেছনে প্রধান দায়ী ত্রুটিপূর্ণ চাহিদা-পূর্বাভাস। ২০১০, ২০১৬ এবং ২০২৩ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনাগুলোতে অবাস্তব ও অতিরিক্ত চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, যা বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই ভুল পূর্বাভাসের ভিত্তিতেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও সরকারকে ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বা ধারণক্ষমতা-মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই ‘অব্যবহৃত থাকলেও পরিশোধ’ নীতিই বর্তমান বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতে, বর্তমানে দেশে ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এত উদ্বৃত্ত থাকার পরও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে, যা এই সঙ্কটের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। মূল সমস্যা ক্যাপাসিটি ঘাটতি নয়, বরং কেন্দ্রগুলোর সাথে জ্বালানি সরবরাহের চরম সমন্বয়হীনতা।
২০১০-এর পর বদলে যাওয়া বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা
দেশে জরুরি বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে ২০১০ সালে দুই বছরের জন্য ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ প্রণয়ন করা হয়। ২০০৬ সালের সরকারি ক্রয় আইনকে পাশ কাটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দ্রুত চুক্তি সম্পাদন করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে, এই আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত করা হয়েছিল।
নথিপত্র অনুযায়ী, যে জরুরি পরিস্থিতির অজুহাতে আইনটি করা হয়েছিল তা ২০১২-১৩ সালের মধ্যেই প্রশমিত হয়। তা সত্ত্বেও আইনটি বাতিল না করে তিন দফায় নবায়ন করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত (টানা ১৬ বছর) বহাল রাখা হয়। একটি সাময়িক আইনি ব্যবস্থা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসে পরিণত হলো, তার পর্যাপ্ত আইনসভীয় ব্যাখ্যা মেলেনি। এই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে এক দরপত্রহীন ক্রয়-স্থাপত্য, যেখানে প্রতিযোগিতা ছাড়াই মাত্র ৩ থেকে ৬ মাসে একতরফা মূল্যে চুক্তি চূড়ান্ত হতো। এই প্রক্রিয়াতেই আদানি, সামিটের এফএসআরইউ এবং একাধিক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে ২৫ বছরের মতো দীর্ঘমেয়াদী ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন চুক্তি সই হয়।
পাশাপাশি, ২০২২ সালের সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির (BERC) ক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং ২০১৪-১৭ মেয়াদে তোলা মহাহিসাব নিরীক্ষকের (CAG) অডিট আপত্তিগুলোও উপেক্ষা করা হয়। এই দুর্বল তদারকি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান কাঠামোগত ভঙ্গুরতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
২০১০ সালের জরুরি আইন দুই বছরের জন্য তৈরি হলেও তিন দফা নবায়নে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টিকে থাকে—একটি সাময়িক ব্যবস্থা পরিণত হয় দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-স্থাপত্যে।
ক্যাপাসিটি পেমেন্টের অর্থনীতি
বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা—যেখানে কেন্দ্র চালু না থাকলেও সচল রাখার প্রস্তুত ফি হিসেবে সরকারকে টাকা দিতে হয়। কাজেই মূল সমস্যা এই মডেলে নয়, সমস্যা বাংলাদেশে এর ভুল ব্যবহারে।
গত ২০ বছরে দেশে বিদ্যুতের সামগ্রিক খরচ ১১ গুণ বাড়লেও ক্যাপাসিটি চার্জ একলাফে বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ! এর সহজ অর্থ হলো, বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়ে অলস বসিয়ে রাখার পেছনে খরচ বাড়ছে বহুগুণে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির তথ্যমতে, কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বছরে গুনতে হচ্ছে ৯০ থেকে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেবল ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদই খরচ হয়েছে প্রায় ৪২,০০০ কোটি টাকা।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি এই বিশাল খরচের দায় মূলত দুটি ভুলের ফসল—অতিরঞ্জিত চাহিদা-পূর্বাভাস দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর পথ খোলা এবং দরপত্র ছাড়া অপ্রতিযোগিতামূলকভাবে দর নির্ধারণ করা। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কেন্দ্র মালিকদের পকেট ভারী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)।
২০২২ সালের সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির (BERC) ক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং ২০১৪-১৭ মেয়াদে তোলা মহাহিসাব নিরীক্ষকের (CAG) অডিট আপত্তিগুলোও উপেক্ষা করা হয়। এই দুর্বল তদারকি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান কাঠামোগত ভঙ্গুরতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
৭. এস আলম/বাঁশখালী: সঙ্কটের ভেতরের চিত্র
বিদ্যুৎ খাতের এই সামগ্রিক কাঠামোগত দুর্বলতার এক বাস্তব উদাহরণ বাঁশখালীতে নির্মিত এস আলম গ্রুপের ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেন্দ্রটি তার মোট সক্ষমতার ২১ শতাংশেরও কম ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ এই সময়কালে কেন্দ্রটি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পেয়েছে প্রায় ৩,২৮৭ কোটি টাকা, যা অন্যান্য সমপর্যায়ের কেন্দ্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে এর ইউনিট-প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২০.৫৩ টাকা, যা নথিভুক্ত সকল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। কোনো কেন্দ্র যত কম পরিচালিত হয়, নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি চার্জ তত কম উৎপাদিত ইউনিটের ওপর বিভাজিত হয়, যার ফলে প্রতি ইউনিটের আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি পায়। বাঁশখালীর এই ঘটনা প্রমাণ করে, বর্তমান কাঠামোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কত সহজে বিপুল অর্থ তুলে নেওয়া যায়।
আদানি চুক্তির ফরেনসিক অ্যানাটমি
ভারত-সংযুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও নথিবদ্ধ চুক্তিটি হলো আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড লিমিটেডের সাথে সম্পাদিত চুক্তি। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর বিপিডিবি এবং আদানি পাওয়ারের মধ্যে ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি (PPA) স্বাক্ষরিত হয়। ২০১০ সালের বিশেষ বিধান আইনের আওতায় কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই জিটুজি (G2G) পদ্ধতিতে এটি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ২.৬০ রুপি ক্যাপাসিটি চার্জ, পৃথক ট্রান্সমিশন চার্জ এবং কয়লার সম্পূর্ণ মূল্য ‘পাস-থ্রু’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এই চুক্তির কয়লার মূল্য নির্ধারণ ও কর কাঠামোতে স্পষ্ট অসংগতি রয়েছে। কয়লার দাম ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মিশ্র সূচকের সাথে যুক্ত হওয়ায় তা কাঠামোগতভাবেই উচ্চমূল্যের। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লার বেঞ্চমার্ক মূল্য যেখানে টনপ্রতি ২৪৫-২৫০ ডলার, সেখানে আদানির হিসাব অনুযায়ী তাদের দর প্রায় ৪০০ ডলার। এছাড়া, চুক্তি স্বাক্ষরের চার মাস আগেই ভারতে জিএসটি কার্যকর হলেও চুক্তিতে জিএসটি-পূর্ববর্তী কর কাঠামো বহাল রাখা হয়। পরবর্তীতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) সুবিধা থেকে আদানি যে কর-ছাড় পেয়েছে, তার সুফল বাংলাদেশের বিদ্যুতের দামে প্রতিফলিত হয়েছে কি না- সে বিষয়েও সুস্পষ্টতার অভাব রয়েছে।
২০১০ সালের বিশেষ বিধান আইনের আওতায় কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই জিটুজি (G2G) পদ্ধতিতে এটি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ২.৬০ রুপি ক্যাপাসিটি চার্জ, পৃথক ট্রান্সমিশন চার্জ এবং কয়লার সম্পূর্ণ মূল্য ‘পাস-থ্রু’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
ঝুঁকি-বণ্টনের বিচারেও আদানি চুক্তিটি অত্যন্ত একচেটিয়া। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৫ বছর মেয়াদি এই ক্যাপাসিটি-বাধ্যবাধকতা সংশোধনের সুযোগ ন্যূনতম। বাস্তবে কেন্দ্রটির পরিচালন সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ; এর উৎপাদন হার একাধিকবার ৪২ শতাংশের নিচে নেমে যায় (যেমন: ২০২৪ সালের নভেম্বরে ছিল ৪১.৮২ শতাংশ)। পরবর্তীতে বকেয়া পাওনা ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেলে সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে এবং বিষয়টি সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশি কেন্দ্রে (SIAC) গড়ায়, যার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের আগস্টে।
ঝুঁকি-বণ্টনের বিচারেও আদানি চুক্তিটি অত্যন্ত একচেটিয়া। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৫ বছর মেয়াদি এই ক্যাপাসিটি-বাধ্যবাধকতা সংশোধনের সুযোগ ন্যূনতম। বাস্তবে কেন্দ্রটির পরিচালন সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ; এর উৎপাদন হার একাধিকবার ৪২ শতাংশের নিচে নেমে যায়
অন্যদিকে ট্যারিফ নিয়ে দুই ধরনের বিপরীতমুখী তথ্য রয়েছে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতে, গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৩৯.৭ শতাংশ বেশি। বিপরীতে আদানির দাবি, বিপিডিবির ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের ইউনিট-প্রতি খরচ ১৪.০২ টাকা—যা রামপাল (১৪.১২ টাকা) ও পায়রা (১৬.০২ টাকা) কেন্দ্র অপেক্ষা কম। বিপিডিবির একই নথির বরাতে এই সাংঘর্ষিক দাবিগুলো প্রকাশ করে যে, ট্যারিফ গণনার পদ্ধতি ও সময়সীমা নিয়ে এখনো গভীর অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্ট। ২০২৩ সালে সাময়িক কিছু ছাড় মিললেও ২০২৪ সালে ব্যয় পুনর্নবীকরণ এবং আইনি লড়াইয়ে জড়ানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে, চুক্তির কাঠামোগত কারণে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা শুরু থেকেই সীমিত ছিল।
আদানির বাইরে কী আছে
আদানি চুক্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার কারণে ভারত-সংশ্লিষ্ট পুরো বিদ্যুৎ খাতকে একই কাঠগড়ায় তোলার প্রবণতা দেখা যায়, যা আদতে সঠিক নয়। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভারত-সংশ্লিষ্ট প্রধান দুটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাঠামোগত ঝুঁকি-প্রোফাইল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রথমটি আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড—যা সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন, দরপত্রহীন এবং একতরফা রপ্তানি-ভিত্তিক একটি চুক্তি। দ্বিতীয়টি হলো ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি ভারত-বাংলাদেশ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (BIFPCL) মাধ্যমে বিপিডিবি ও ভারতের এনটিপিসির (NTPC) ৫০-৫০ অংশীদারিত্বে বাংলাদেশের মাটিতে নির্মিত। এই যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের নিজস্ব ইকুইটি ও পর্ষদ প্রতিনিধিত্ব থাকায় ঝুঁকি ভাগাভাগির সুযোগ রয়েছে, যা আদানির ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এছাড়া ২০১২ সালে ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়ার সাথে স্বাক্ষরিত প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (PSC) দরপত্রের মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়েছিল।
ফলে “ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে জিম্মি করেছে”—এই ঢালাও দাবি নথিপত্র সমর্থিত নয়। কেবল আদানি চুক্তির ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্টভাবে চুক্তিগত লক-ইন ও দর-কষাকষির দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা ও ভঙ্গুরতা তৈরি হয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের স্থবিরতা এবং অপরিকল্পিত এলএনজি আমদানির কাঠামোগত ভুলের কারণে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের কোম্পানির জন্য নয়।
হাসিনা আমলে কীভাবে এই ভঙ্গুরতা তৈরি হলো
এর সূচনা ঘটেছিল পলিসি ডিজাইনের মাধ্যমে—২০১০ সালের বিশেষ বিধান আইন উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে চুক্তি সম্পাদনের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এর ওপর ভর করে মাত্র ৩ থেকে ৬ মাসে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য-যাচাই ছাড়াই একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় আদানি (২০১৭), পায়রা (২০১৬), রামপাল (২০১২) এবং সামিট এফএসআরইউ (২০১৭)-এর মতো চুক্তিগুলো সম্পাদিত হয়, যার প্রতিটিতে ২৫ বছর মেয়াদি ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বিপুল আর্থিক দায়বদ্ধতা যুক্ত ছিল। একই সাথে বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব করা এবং সিএজির নিরীক্ষা আপত্তি উপেক্ষা করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক তদারকি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় রাখা হয়। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে অবহেলা করে চাহিদার তুলনায় বহু গুণ অতিরিক্ত সক্ষমতা বাড়ানো হয়।
পলিসি থেকে প্রক্রিয়া, প্রক্রিয়া থেকে চুক্তি এবং চুক্তি থেকে আর্থিক বোঝা- প্রতিটি ধাপই পরের সংকটের ভিত্তি স্থাপন করেছে। যদিও ২০১০ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্য সংক্রান্ত আইনসভায় বিতর্কের নথি পাওয়া যায়নি, তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি অর্থাৎ টেন্ডার-মুক্ত ও ক্যাপাসিটি-পেমেন্ট-নির্ভর ভঙ্গুর বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব চিত্র সুস্পষ্ট ও নথিবদ্ধ।
সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্যাটার্ন চোখে পড়ে। এটি কোনো আকস্মিক বা একক ভুল সিদ্ধান্তের ফসল নয়; বরং শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা একটা প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়।
কারা লাভবান হয়েছে, এবং কীভাবে
বিদ্যুৎ খাতের ক্রয়-প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী হিসেবে সামিট, এস আলম, বেক্সিমকো, ওরিয়ন, আরামিট, জেমকন এবং বসুন্ধরা—এই সাতটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নাম নথিপত্রে বারবার উঠে এসেছে।
কেবল রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুর্নীতির নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো পদ্ধতিগতভাবে সঠিক না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক সংযোগ এবং সুবিধা প্রাপ্তির স্বতন্ত্র প্রমাণ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে।
এবং দুটি ক্ষেত্রে সরাসরি বলপ্রয়োগ ও অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণও নথিভুক্ত রয়েছে। প্রথমটি হলো এস আলমের ব্যাংক দখলের ঘটনা, যেখানে ডিজিএফআই-এর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিবরণ রয়েছে। দ্বিতীয়টি আরামিট গোষ্ঠীর ঘটনা, যেখানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথিতে একজন মন্ত্রীর সরাসরি ব্যাংকের ওপর চাপ প্রয়োগের প্রমাণ রয়েছে। এই দুই ঘটনায় সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ থাকলেও, অবশিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্ক ও আর্থিক সুবিধার মধ্যকার সমান্তরাল অবস্থানই দৃশ্যমান—যা এখনো সরাসরি কার্যকারণ হিসেবে প্রমাণিত নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায় কোথায়
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে সময়ের হিসাবটি পরিষ্কার করা জরুরি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই খাতের নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে; মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এই পুরো সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয় ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ। ফলে ২০২৬ সালের লোডশেডিং, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বা গ্যাস-সংকটের পুরো দায় নতুন সরকারের ওপর চাপানো যেমন ভুল, তেমনি আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত নেওয়া সিদ্ধান্তকে শুধু “হাসিনা সরকারের উত্তরাধিকার” বলে এড়িয়ে যাওয়াও ভুল।
অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিল অতিরিক্ত সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা-ভাতা, অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতাহীন বিদ্যুৎচুক্তি, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের পতন, এলএনজি-নির্ভরতা এবং বিপিডিবির দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সংকট। কিন্তু উত্তরাধিকার পাওয়া সংকট আর তা পরিচালনার দায় এক বিষয় নয়। ২০১০ সালের বিশেষ বিধান আইন স্থগিত ও পরে বাতিল, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে ফেরার উদ্যোগ এবং বিইআরসির স্বাধীনভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। সমস্যা হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পুরোনো ব্যবস্থা ভাঙা দ্রুত সম্ভব হলেও তার বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করতে সময় লাগে। ফলে কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কারের মধ্যবর্তী সময়ের ঝুঁকি যথেষ্টভাবে সামলানো হয়নি।
সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সৌরবিদ্যুৎ। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া অনুমোদিত ৩৪–৩৭টি প্রকল্প, মোট ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা, বাতিল করা হয়। সিদ্ধান্তটির নীতিগত ভিত্তি ছিল শক্তিশালী; পরবর্তী সময়ে ১২টি প্রকল্পকে পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৯৯৮ মেগাওয়াট সক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় আগের প্রস্তাবের তুলনায় ২–৩ সেন্ট কম দামও পাওয়া যায়। কিন্তু বাকি প্রায় ২,৩০০ মেগাওয়াট দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকে এবং দ্রুত বিকল্প সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে পুরোনো প্রকল্প বাতিল, নতুন দরপত্র, দীর্ঘ বাস্তবায়ন এবং সম্ভাব্য সক্ষমতা সময়মতো গ্রিডে না আসার মধ্যকার ব্যবধান ২০২৬ সালের সরবরাহ-সংকট প্রশমনে কোনো সহায়তা করেনি। প্রশ্নটি তাই শুধু প্রকল্প বাতিল করা ঠিক ছিল কি না, তা নয়; বরং প্রকল্প বাতিলের সঙ্গে সমান্তরালে বিকল্প সক্ষমতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা কতটা কার্যকর ছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া অনুমোদিত ৩৪–৩৭টি প্রকল্প, মোট ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা, বাতিল করা হয়। সিদ্ধান্তটির নীতিগত ভিত্তি ছিল শক্তিশালী; পরবর্তী সময়ে ১২টি প্রকল্পকে পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৯৯৮ মেগাওয়াট সক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় আগের প্রস্তাবের তুলনায় ২–৩ সেন্ট কম দামও পাওয়া যায়। কিন্তু বাকি প্রায় ২,৩০০ মেগাওয়াট দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকে এবং দ্রুত বিকল্প সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
একই দ্বন্দ্ব দেখা যায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে। ২০২৪ সালে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি এবং ২০২৫–২৮ সময়ে মোট ১০০টি কূপ খননের লক্ষ্য নেওয়া হলেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে এসজিএফএলের ১৬টির মধ্যে ৯টি, বিজিএফসিএলের ১৪টির মধ্যে ৩টি এবং বাপেক্সের ২০টির মধ্যে ৮টি কূপের কাজ এগোয়; অফশোর অনুসন্ধানও কার্যত স্থবির ছিল। ফলে দেশীয় উৎপাদন প্রত্যাশামতো বাড়েনি এবং ঘাটতি মেটাতে এলএনজি-নির্ভরতা বজায় থেকেছে। উন্মুক্ত দরপত্র দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা বাড়ালেও অনুসন্ধানের গতি কমে যাওয়ার মধ্যবর্তী ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাস বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল, কিন্তু উৎপাদন দ্রুত বাড়েনি; ফলে ঘাটতি রয়ে গেছে এবং এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেনি।
এলএনজি অবকাঠামোয় এই ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকি আরও স্পষ্ট। সামিটের দ্বিতীয় এফএসআরইউ ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাতিল করা হয়; ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিদ্ধান্তটি পুনর্ব্যক্ত হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলএনজি সরবরাহ চুক্তিও পরে বাতিল হয়। চুক্তিতে সমস্যা থাকলে বাতিলের যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু আমদানিনির্ভর ব্যবস্থায় টার্মিনালের ধারণক্ষমতা নিজেই কৌশলগত সম্পদ। ফাওজুলের মেয়াদ শেষে কার্যকর এফএসআরইউ ছিল আগের দুটিই। তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া থেকে পরে সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতে যাওয়া হলেও নতুন গ্যাসে রূপান্তর সক্ষমতা তাঁর মেয়াদে যুক্ত হয়নি। ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন না বাড়লেও এলএনজির প্রয়োজন বাড়ছিল, অথচ তা গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি। এটি ছিল সরবরাহ-শৃঙ্খলের একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য। শুধু এলএনজি কেনার চুক্তি করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; বন্দরে পৌঁছানো এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে পাঠানোর সক্ষমতাও থাকতে হয়। তাই সামিট এফএসআরইউ বাতিলের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—চুক্তি বাতিলের আগে ও পরে বিকল্প সক্ষমতার পরিকল্পনা কী ছিল এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় গ্যাসের ঘাটতি কীভাবে সামলানো হয়েছিল।
রামপাল ও পায়রার ক্ষেত্রেও পুরোনো চুক্তির আর্থিক বোঝা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং মাতারবাড়ির নতুন ট্যারিফকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে পুনঃআলোচনা শুরু হয়। কিন্তু পুনঃআলোচনা শেষ হওয়ার আগেই ২০২৫ সালের মে থেকে সরকারি ভর্তুকি বিতরণ স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্রগুলো বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও কয়লা আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়ে; কয়লা ও অর্থপ্রদানের সংকটে ২০২৫ সালে বিভিন্ন কেন্দ্র সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি খরচ কমানোর চেষ্টা থাকলেও স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল না।
আদানি ও এস আলমের এসএস পাওয়ার চুক্তিও পর্যালোচনা ও পুনঃআলোচনার আওতায় আসে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি চুক্তির মূল্য নির্ধারণ, মানদণ্ড ও সম্ভাব্য অতিরিক্ত অর্থপ্রদান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। কিন্তু ফাওজুলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বড় কোনো চুক্তি পুনর্গঠন, বাতিল বা আর্থিক পুনরুদ্ধার সম্পন্ন হয়নি; এসএস পাওয়ারের পাওনা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি হয়। অর্থাৎ সমস্যা শনাক্ত ও তদন্ত হলেও তার আর্থিক নিষ্পত্তি হয়নি। পর্যালোচনা থেকে বাস্তব পদক্ষেপে যাওয়ার এই ব্যবধানেরও একটি সরাসরি মূল্য ছিল: রাষ্ট্র পুরোনো চুক্তির দায় বহন করেছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বেড়েছে এবং জ্বালানি কেনা ও উৎপাদন অব্যাহত রাখার সক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়েছে।
এর প্রভাব বিপিডিবির আর্থিক অবস্থাতেও দেখা যায়। সক্ষমতা-ভাতা কমিয়ে কিছু ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ২,৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবি থাকলেও ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে বকেয়া প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এর পেছনে আগের সরকারের দায়, ডলার-তারল্যের সংকট এবং পুরোনো আর্থিক বোঝা অবশ্যই ছিল; তাই পুরো বকেয়াকে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি দায় বলা যাবে না। কিন্তু বকেয়া ব্যবস্থাপনা, অর্থপ্রবাহ, চুক্তি পুনঃআলোচনা এবং সরবরাহ অব্যাহত রাখার ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। ফলে দায়ের কাঠামোটি দ্বিস্তরীয়: সংকটের কাঠামোগত ভিত্তি পুরোনো, কিন্তু সেই সংকটের মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের।
সক্ষমতা-ভাতা কমিয়ে কিছু ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ২,৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবি থাকলেও ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে বকেয়া প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
এই সময়কে শুধু হাসিনা সরকারের উত্তরাধিকার বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি ২০২৬ সালের সব সংকটকে অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্টি বলাও ভুল। বরং বলা যায়, হাসিনা আমল বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের কাঠামো তৈরি ও দুর্বলতা গভীর করেছে; অন্তর্বর্তী সরকার সেই কাঠামো ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্যবর্তী ঝুঁকি সব ক্ষেত্রে সামলাতে পারেনি; আর সেই অসম্পূর্ণ সংস্কার, অমীমাংসিত আর্থিক দায় ও অপর্যাপ্ত নতুন সক্ষমতার ফল পরবর্তী সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে।
ফাওজুলের সময়ের সবচেয়ে টেকসই অর্জন তাই প্রাতিষ্ঠানিক—বিশেষ বিধান আইনের অবসান, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে ফেরার চেষ্টা এবং বিইআরসির ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বিপরীতে সরবরাহ ও আর্থিক সূচকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রত্যাশামতো বাড়েনি, এলএনজি অবকাঠামো দ্রুত বাড়েনি, বাতিল সৌর প্রকল্পের বড় অংশ সময়মতো ফিরে আসেনি, রামপাল-পায়রার পুনঃআলোচনা ও আদানি-এসএস পাওয়ারের চুক্তিগত নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়নি এবং বিপিডিবির বকেয়া কমেনি।
এই সময়কে শুধু হাসিনা সরকারের উত্তরাধিকার বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি ২০২৬ সালের সব সংকটকে অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্টি বলাও ভুল। বরং বলা যায়, হাসিনা আমল বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের কাঠামো তৈরি ও দুর্বলতা গভীর করেছে; অন্তর্বর্তী সরকার সেই কাঠামো ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্যবর্তী ঝুঁকি সব ক্ষেত্রে সামলাতে পারেনি
বর্তমান সরকারের কোনোই দায় নেই?
তাহলে বর্তমান সরকারের দায় কি একেবারেই নেই? হাসিনা আমলে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ, ইন্টেরিম তার দেড় বছরেরও বেশি সময়ে সেটার মেরামত করতে না পারা- এগুলো সত্য। কিন্তু, দায় কি কেবল তাদের? বর্তমান সরকারকে কি আমরা ব্ল্যাংক চেক দিবো?
সঙ্কটের পেছনে বর্তমান সরকারের দায় না থাকলেও তার চলমান ব্যবস্থাপনায় তো আছে।
সরকার বকেয়া পরিশোধ, এলএনজি আমদানি ও নতুন গ্যাস-সৌর সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু বকেয়া কমেনি, ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপ বেড়েছে এবং এফএসআরইউ দুর্ঘটনার পর বিকল্প সরবরাহ ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ-সংকটের মতো বড় বাহ্যিক আঘাতও সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ফলে বর্তমান সংকটে সরকারের অংশটি সরবরাহ ও অর্থসংকটের উত্তরাধিকার সামলানোর সক্ষমতা, বিকল্প অবকাঠামোর ঘাটতি এবং সংকট মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থাপনার মধ্যে।
বর্তমান সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিপিডিবির বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে বকেয়া ছিল ৫২,৩০০ কোটি টাকার বেশি; জুনের মধ্যে তা শূন্যে নামানোর চাপও ছিল। মার্চে ৮৫টি আইপিপি ও ৯টি রেন্টাল কেন্দ্রের বকেয়া মেটাতে ২,০৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি অনুমোদন করা হলেও ১৩টি শর্ত আরোপ করা হয়। এপ্রিলের শেষেও বকেয়া প্রায় ৫৬,০০০ কোটি টাকা ছিল।
বর্তমান সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিপিডিবির বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে বকেয়া ছিল ৫২,৩০০ কোটি টাকার বেশি; জুনের মধ্যে তা শূন্যে নামানোর চাপও ছিল। মার্চে ৮৫টি আইপিপি ও ৯টি রেন্টাল কেন্দ্রের বকেয়া মেটাতে ২,০৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি অনুমোদন করা হলেও ১৩টি শর্ত আরোপ করা হয়। এপ্রিলের শেষেও বকেয়া প্রায় ৫৬,০০০ কোটি টাকা ছিল। অর্থাৎ সরকার বকেয়া কমানোর উদ্যোগ নিলেও আর্থিক সংকটের কাঠামোগত চাপ কাটেনি। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা আসে। এপ্রিলের জন্য ৯টি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা হয়, যার ৮টি স্পট বাজার থেকে; দাম গড়ে প্রায় ২২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ, যেখানে যুদ্ধের আগে ছিল ৯–১০ ডলার। এপ্রিল–জুনে ৩০টি কার্গো আনার পরিকল্পনা হলেও প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি ছিল। ফলে সরকার আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ভর্তুকির চাপ বেড়ে যায় এবং গ্যাস-সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া যায়নি। এপ্রিলের শেষ দিকে মন্ত্রী লোডশেডিং ৮০০–৯০০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনার কথা জানান, কিন্তু পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার চারটিই অন্তত ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ৮৭০ থেকে কমে ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে যায়।
সরকার এলএনজি আমদানি ও নতুন গ্যাস-সৌর সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু বকেয়া কমেনি, ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপ বেড়েছে এবং এফএসআরইউ দুর্ঘটনার পর বিকল্প সরবরাহ ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
সরকারের সরাসরি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় মহেশখালীর এফএসআরইউতে ২১ জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ডের পর। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মেরামতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনতে হয়, সময়সীমা বারবার পিছোয় এবং ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালু হয়ে মাত্র ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ শুরু করে। অর্থাৎ প্রায় ১৬ দিন বড় ধরনের সরবরাহ-ঘাটতি বহাল থাকে। এই ঘটনা দেখায়, মাত্র দুটি কার্যকর এফএসআরইউর ওপর নির্ভরশীল অবকাঠামোয় বিকল্প ব্যবস্থা ও স্থানীয় কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে এটিকে পুরোপুরি সরকারের তৈরি সংকট বলা যাবে না; বরং ঘটনার পর সংকট সামলানোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি এখানে সরকারের দায়ের জায়গা।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকার বঙ্গোপসাগরের ২৬টি গ্যাস ব্লকের জন্য ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক দরপত্র শুরু করেছে এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের কাঠামো তৈরি করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য, সৌর প্যানেল ও ব্যাটারিতে শুল্ক-সুবিধা এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এগুলো জ্বালানি-নিরাপত্তা বাড়ানোর সঠিক দিকের পদক্ষেপ হলেও বর্তমান সংকটে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে না—নতুন গ্যাস উৎপাদন শুরু হতে সময় লাগবে এবং নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও এখনো প্রমাণিত হয়নি।
শেষ কথা
সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে ২০২৬ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত পর্যায় স্পষ্ট হয়। এটি কোনো একক সরকারের সৃষ্টি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা, সংস্কারের মধ্যবর্তী ঝুঁকি এবং বর্তমান সরকারের সংকট-ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল।
শেখ হাসিনা আমলে এই সংকটের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে- অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা, প্রতিযোগিতাহীন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা এবং মাত্র দুটি এফএসআরইউ-নির্ভর এলএনজি কাঠামো তার প্রধান উপাদান। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত হয়নি।
শেখ হাসিনা আমলে এই সংকটের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে- অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা, প্রতিযোগিতাহীন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা এবং মাত্র দুটি এফএসআরইউ-নির্ভর এলএনজি কাঠামো তার প্রধান উপাদান। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার এই কাঠামো সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে- বিশেষ আইন বাতিল, উন্মুক্ত দরপত্রে ফেরার চেষ্টা এবং বিইআরসির ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা তার উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থা ভাঙার সঙ্গে বিকল্প সক্ষমতা ও অর্থপ্রবাহের সমন্বয় সব ক্ষেত্রে হয়নি। ফলে সংস্কারের মধ্যবর্তী সময়ে বকেয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থসংকট এবং নতুন সক্ষমতা তৈরির বিলম্ব অব্যাহত থাকে।
বর্তমান সরকার সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। ফলে চলমান সংকটের মূল কাঠামো তার তৈরি নয়। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর বকেয়া ব্যবস্থাপনা, এলএনজি সরবরাহ, বিকল্প অবকাঠামো এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিতে তার নিজস্ব দায় তৈরি হয়েছে। সরকার বকেয়া পরিশোধ, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু এসব পদক্ষেপের কোনোটিই এখনো সংকটের তাৎক্ষণিক ভঙ্গুরতা দূর করতে পারেনি। এফএসআরইউ দুর্ঘটনার পর বিকল্প সরবরাহ ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সেই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
ফ্যাসিবাদী হাসিনা আমল সংকটের কাঠামো তৈরি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সেটি সংস্কারের চেষ্টা করেও রূপান্তরকালীন ঝুঁকি পুরোপুরি সামলাতে পারেনি, আর বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থা পরিচালনায় নিজস্ব সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে।
অতএব, দায়কে এক সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে এই সংকটের ব্যাখ্যা করা যায় না। ফ্যাসিবাদী হাসিনা আমল সংকটের কাঠামো তৈরি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সেটি সংস্কারের চেষ্টা করেও রূপান্তরকালীন ঝুঁকি পুরোপুরি সামলাতে পারেনি, আর বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থা পরিচালনায় নিজস্ব সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর আকস্মিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ-বিঘ্ন তাই সংকটের মূল কারণ নয়; বরং বহু বছর ধরে জমে থাকা জ্বালানি-নির্ভরতা, আর্থিক চাপ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুরতা প্রকাশের মুহূর্ত।
সম্মৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য চাই উন্নত চিন্তা। গনতান্ত্রিক দেশ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শুধু তথ্যযুদ্ধ এবং ইস্যু দিয়ে ইস্যু চাপা দেয়া নয়, দরকার মননশীল সাংবাদিকতা। একতরফা ভাবনা বা মতের প্রতিফলনের বাইরে সত্য ও প্রজ্ঞার সন্নিবেশ ঘটাতে বিশ্লেষণী সাংবাদিকতার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এই উদ্যোগ আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। ডোনেট করুন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাতিগঠনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশীদার হোন।
মোবাইল ব্যাংকিংঃ Bkash & Nagad (personal): 01677014094
https://paypal.me/jobanmedia