রাস্তার ঢালের ওপরের দিকে, যেটাকে তারা পাহাড় বলে, গাড়িটা সেখানে আসার আগেই কার্লা আওয়াজ পেল। মিসেস জেমিসন ওরফে সিলভিয়া গ্রিসে ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফিরলেন মনে হয়। আস্তাবলের দরজা থেকে কিংবা আরও কিছুটা সামনে গেলেও ঠিকমতো তাকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তাই মিসেস জেমিসন যে রাস্তায় এসে উঠবেন সেদিকে তাকিয়ে থাকে সে। জেমিসনের বাড়িটা কার্লা আর ক্লার্কের বাসা ছেড়ে আরও অন্তত আধামাইল দূরে।
তাদের বাসার উদ্দেশ্যে আসা কোনো অতিথি হলে এতক্ষণে গাড়ির গতি কমে আসত। তবু কার্লা ভাবতে থাকে, এটা যেন তিনি না হন।
তিনিই এলেন। যেতে যেতে জেমিসন দ্রুত এদিকে একবার মাথা ঘুরিয়ে নিলেন। কাঁকড় আর বৃষ্টির কারণে জমে থাকা কাদার ওপর দিয়ে গাড়ির চাকার দাগ বসিয়ে নানান কৌশলে পেরিয়ে যেতে তার ব্যস্ত হাত স্টিয়ারিং থেকে একবারও ওঠেনি। তিনি কার্লার দিকে তাকাননি, হাতও নাড়েননি। কার্লাও কেবল তার তামাটে বাহু, খোলা কাঁধ আর আগের চেয়েও ফ্যাকাশে রঙের চুলগুলো এক ঝলক দেখতে পেল। আগের রুপালিমতো রঙের তুলনায় এবারে চুল বোধ হয় আরও বেশি সাদাটে করেছেন। মুখ এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় এবড়োথেবড়ো রাস্তায় গাড়ি সামলাতে গিয়ে বেশ সতর্ক তিনি। এরই মধ্যে যখন এদিকে নজর বুলিয়ে নিলেন, মনে হলো যেন কিছু জানতে চান, সেটা কার্লাকে আরও বেশি গুটিয়ে দিলো।
আসলে ব্যাপারটা এমনই হওয়ার কথা।
ক্লার্ক হয়তো এসব কিছুই টের পায়নি। সে যদি এখন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে, তাহলে রাস্তার দিকে আছে তার পিঠ।
তবে মিসেস জেমিসনকে আরেকবার বেরোতে হবে। এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফেরার পথে তিনি নিশ্চয়ই বাজার করার জন্য কোথাও থামেননি। বাসায় এসে কী কী লাগবে বুঝে নিয়ে তারপর আবার বাজারের দিকে রওনা দেবেন, সেটাই স্বাভাবিক। ক্লার্ক হয়তো তখন তাকে দেখতে পাবে। আর অন্ধকার হয়ে এলে তার বাসার বাতিগুলোও জ্বলে উঠবে। কিন্তু এখন তো জুলাই মাস, পুরোপুরি অন্ধকার হতে এখনও অনেক দেরি। তিনি আজ এত ক্লান্ত থাকবেন যে হতে পারে বাতিগুলো জ্বালানোর কথা তার মনেই পড়ল না। আজ হয়তো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েও পড়তে পারেন।
আবার এই এখনই, যে কোনো সময়ে তিনি ফোনও করে ফেলতে পারেন।
এখন গরম কাল। কেবল বৃষ্টি আর বৃষ্টি। সকালে চোখ মেলেই প্রথম কানে আসবে ভ্রাম্যমান বাসাটার ছাদের ওপরে বৃষ্টির শব্দ। পায়ে চলা পথগুলো কাদায় ঠাসা, লম্বা ঘাসগুলো ডুবে গেছে। বৃষ্টি থেমে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরেও মাথার ওপরের পাতাগুলো থেকে টুপটাপ পানি পড়তেই থাকে। কার্লা বাইরে যাবার সময়ে বরাবরই অস্ট্রেলিয়ান আদি স্টাইলের উঁচু আর বড় ঘেরওলা টুপিটা পরে নেয়। আর তার লম্বা, মোটা মোটা বেণিগুলো পেঁচিয়ে শার্টের ভেতরে দেয় ঢুকিয়ে।
ঘোড়ায় চড়তে আজও কেউ আসেনি। যদিও কার্লা আর ক্লার্ক ঘুরে ঘুরে সব ক্যাম্পে, রোস্তোরায়, টুরিস্ট অফিসে আর যত জায়গা তাদের মাথায় এসেছে, সবখানে ঘোড়ায় চড়া শিক্ষার বিজ্ঞাপন দিয়ে এসেছে। সামান্য কিছু ছাত্র নিয়মিত আসত। তারা অবশ্য স্কুলের ছুটিতে বাড়ি ফিরে আসা ছেলেপেলে নয়, গ্রীস্মের ছুটি কাটাতে বাস ভরে আসা ছাত্রের দল। পুরো গ্রীস্মটা তারা এখানে কাটিয়ে গিয়েছিল। তবে প্রায়ই এখানে ওখানে ঘোরাফেরার সুযোগ হয়ে যাওয়াতে তারা শিফট বাতিল করত। আবার এই বিশ্রি আবহাওয়ার কারণে অনেক শিফট এমনিতেই বরবাদ হয়ে যেত। অনেক সময় দেরি করে এলে ক্লার্ক সেজন্য তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে ছাড়ত। দলটির মধ্যে দু’জন এজন্য রেগে গিয়ে আসাই ছেড়ে দিলো।
যে তিনটা ঘোড়া তারা ভাড়া করেছিল, তখন তা থেকে কিছু আয় হতো। সেই তিনটা তাদের নিজেদের অন্য চারটা ঘোড়ার সাথে এখন বড় গাছের নিচে ঘাস খাচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার মুখে যে বৃষ্টি হঠাৎ করে থেমে গেল সেটা তারা খেয়ালই করেনি। মেঘগুলো সাদা হয়ে উঠছে, মেঘ গলে কিছু সূর্যের আলোও ঠিকরে আসছে, তবে কোনোমতেই দিনের আলোর মতো নয়। সেই সামান্য আলোটাও রাতের খাবারের আগেই উধাও হয়ে যায়।
কার্লা আস্তাবল পরিষ্কার করল। অনেকক্ষণ ধরে কাজ সারতে হলো। সে তার প্রতিদিনের কাজগুলোর মধ্যে একটু ছন্দ রাখার চেষ্টা করে। ফাঁকে ফাঁকে আস্তাবলের মাঝখানে যেখানে উঁচু ছাদটা একটু ভেঙে গেছে, সেখানে গিয়ে জোরে নিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসে। আবার শরীরচর্চার জায়গাটিতে ফিরে যায় সেটি কতটুকু শুকনো আছে সেটা দেখতে। বলা তো যায় না, যদি আবার পাঁচটার দিকে ছাত্রেরা হঠাৎ উদয় হয়।
এভাবে একনাগাড়ে বৃষ্টি হতে থাকলে অবশ্য খুব একটা মুষলধারে হয় না। তেমন উথালপাতাল কোনো বাতাসও দেখা যায় না। কিন্তু গত সপ্তাহে খুব বিদ্যুৎ চমকাল। বজ্রপাত হয়ে সামনের কিছু গাছের মাথা মুড়িয়ে দিয়ে গেল। আর বৃষ্টিও এলো এমন ঘন হয়ে যে সামনে-পেছনে দিগন্ত হয়ে গেল অদৃশ্য। মাত্র পনেরো মিনিটের মতো তুমুল ঝড়টা বয়ে গেল। তাতেই বাসার সামনে অনেকগুলো গাছের ডাল ভেঙে পড়ে রইল, পানির পাইপগুলো গেল বেঁকে, বৃত্তাকারে ঘোড়া ছোটানোর জায়গাটার প্লাস্টিকের ছাদটা দুমড়ে মুচড়ে গেল। ঘোড়া দৌড়ানোর পথগুলোতে পানি জমে হলো ছোট ছোট ডোবার মতো। ক্লার্ককে সেদিন সন্ধ্যার পরেও সেসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হলো। সরু লাইন করে মাটি কেটে পানি সরাবার ব্যবস্থা করল।
ছাদটা অবশ্য এখনও মেরামত করা হয়ে ওঠেনি। ক্লার্ক চারদিকে তার টেনে পাঁচিল বানিয়ে ঘোড়াগুলোকে এক জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করেছে। যাতায়াতের জন্য একটা ছোট রাস্তা বানিয়েছে কার্লা।
এখন আস্তাবলের ভেঙে পড়া ছাদটা নতুন করে বানানোর জন্য ক্লার্ক ওয়েবে বিভিন্ন ধরনের ছাদের খোঁজ করছে। পুরোনো জিনিসের বোচাকেনা করে, এমন দোকানে কিংবা কেউ নিজের ব্যবহার করা ছাদের সরঞ্জামগুলো বিক্রি করবে, এমন কারও কাছে যদি অল্প দামে পাওয়া যায়, সেই আশায়। সে অবশ্য শহরের হাই আর রবার্ট বাকিসের দোকানে যাবে না। দোকানটাকে ক্লার্ক ডাকাত (রবার্স) বলে ডাকে। ইতোমধ্যেই তাদের কাছে বাকিতে এত জিনিস নিয়েছে যে খানিকটা ঝগড়াঝাটিও হয়ে গেছে তার সাথে।
শুধু যে পাওনাদারদের সাথে ক্লার্কের ঝগড়া হয়, তা নয়। কারও সাথে তার সম্পর্ক যতই ভালো হোক না কেন, হঠাৎ করেই সেটা তেতো হয়ে যায়। যেসব জায়গায় এভাবে তার যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে সে কার্লাকে জোর করে পাঠায়। তার মধ্যে একটি হলো ওষুধের দোকান। একবার বয়স্কা একজন মহিলা লাইনে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু একটা নিতে ভুলে গেছেন বলে তিনি একটু সরে গেলেই ক্লার্ক তার জায়গা দখল করে নেয়। মহিলা সাথেসাথেই ফিরে এলে ক্লার্ক তাকে লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়াতে বলে। তারপর মহিলার সাথে তর্ক করে ক্যাশিয়ারের কাছে অভিযোগও করে। ক্যাশিয়ার তাকে ভদ্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, “মহিলার কিন্তু ফুসফুসে ভয়ানক সমস্যা আছে”, ক্লার্ক ঠোঁট উল্টে বলেছিল, “তাই নাকি? আমার নিজেরও তো পাইলস আছে।” গন্ডগোলের এক পর্যায়ে মিটমাট করার জন্য তারা দোকানের ম্যানেজারকে ডেকে আনতে বাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া বড় রাস্তার ওপরে যে কফিশপ আছে সেখানেও ক্লার্ক ঝামেলা কম করেনি। তাদের সকালের নাস্তার বিজ্ঞাপনে পরিষ্কার লেখা আছে যে বেলা এগারোটার পরে দামে আর কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এর পরেও ক্লার্ক সেটা নিয়ে তর্ক বাঁধিয়ে বসল। রাগের মাথায় সে কফি ভরা কাপ মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। অল্পের জন্য স্ট্রোলারে বসা একটা বাচ্চার গায়ে পড়েনি। ক্লার্ক যুক্তি দেখালো যে কফি যেখানে পড়েছে বাচ্চাটা সেখান থেকে তো আধামাইল দূরে। আর সে কফির কাপটা ফেলে দিয়েছে কারণ তারা গরম কাপের চারপাশে ধরার জন্য কিছু দেয়নি। তারাও বলে দিলো যে সে তো কাপ ধরার জন্য কিছু চায়নি। ক্লার্ক অবাক হয়ে বলল তাকে চাইতে হবে কেন!
“তুমি খামাখাই রেগে যাও”, কার্লা বলল।
“পুরুষ মানুষ এমনই হয়।”
জয় টাকারের সাথে ক্লার্ক যে গন্ডগোলটা করল সেটা নিয়ে অবশ্য কার্লা তাকে কিছুই বলেনি। জয় টাকার হলো লাইব্রেরিয়ান, শহরে থাকে, যে তাদেরকে তার ঘোড়া ভাড়ায় খাটাতে দিয়েছিল। ঘোড়াটা বেশ রাগি, একটু দুষ্টুও, নাম লিজি। জয় টাকার তার পিঠে চড়ে ঘোারার সময়, খোশ মেজাজে থাকলে তাকে লিজি বোর্ডেন বলে ডাকে। গতকাল সে তার ঘোড়া নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিল, মেজাজ মনে হয় একদম ভালো ছিল না। আস্তাবলের ছাদটা এখনও ঠিক করা হয়নি, লিজি যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। টাকারের থমথমে মুখ দেখে মনে হচ্ছিল সে ক্লার্কের ওপরে খুব বিরক্ত।
এমনিতে লিজির অবশ্য তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। ক্লার্ক ভাঙা ছাদের নিচে তাকে ভালোভাবে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টাও করছিল। কিন্তু তারপর জয় টাকারই বলা শুরু করল যে ঘোড়াগুলোর থাকার জায়গাটা একেবারেই স্যাঁতসেতে আর অস্বাস্থ্যকর। লিজিকে কি এর চেয়ে অনেক ভালোভাবে রাখা উচিত না? ক্লার্ক দুম করে বলল, “যেভাবে আছে সেভাবেই ওকে মানিয়ে নিতে হবে”। জয় অবশ্য এর পরেও লিজিকে নিয়ে চলে যায়নি, কার্লা যে ভয়টা পেয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে ক্লার্ক লিজির সাথে আর আগের মতো মজা করে খেলাধুলা করা বন্ধ করে দিলো। লিজি নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে। সে ইদানিং বেশ মোটাও হয়ে গেছে। নিয়মমাফিক শরীরচর্চা করার সময়ে সে তার খুড়ের মধ্যে একটু আঘাত পেয়েছিল। কদিনের মধ্যেই সেখানে ছত্রাকের সংক্রমন হয়ে গেল। সেটা যেন বাড়তে না পারে তাই কার্লা খুব নজর রেখেছিল।
কিন্তু এ কদিন কার্লা বেশি চিন্তিত ছিল যেটা নিয়ে তা হলো, ফ্লোরা হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল। ফ্লোরা হলো ছোট্ট ছাগলটা, যেটা মাঠে কিংবা আস্তাবলে ঘোড়াগুলোর সাথে মজা করে। গত দুদিন ধরে ফ্লোরার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। কার্লার সন্দেহ বন্য কুকুরের দল কিংবা নেকড়ে অথবা কোনো ভাল্লুক তাকে পেয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
কাল রাতে, এমনকী পরশু রাতেও কার্লা ফ্লোরাকে স্বপ্নে দেখেছে। প্রথম রাতে দেখল ফ্লোরা মুখে একটা লাল আপেল নিয়ে কার্লার বিছানার দিকে এগিয়ে আসছে। সেটা ভালোই ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় রাতে দেখে কার্লাকে আসতে দেখে ফ্লোরা দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন তার পায়ে ব্যথা পেয়েছে। তবু কষ্ট করে দৌড়ে যাচ্ছে। তাকে ধাওয়া করতে করতে কার্লা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো কাটাতারের পাঁচিল ঘেরা এক মাঠের সামনে উপস্থিত হলো। আর তার পরপরই ফ্লোরা কী করে যেন বেড়া গলে ভেতরে গেল ঢুকে। পায়ে আবারও খুব ব্যথা পেল। তারপর সাদা ইল মাছের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঘোড়াগুলো দেখছিল যে কার্লা তাদের ছোটার জায়গাটার পাঁচিল পেরিয়ে চলে গেল। উৎসুক হয়ে পেছন পেছন পাঁচিল পর্যন্ত এগিয়ে গেল তারা। তাদের গায়ের ওপরে নিউজিল্যান্ডের কম্বল জড়ানো থাকলেও প্রত্যেকে কাদায় মাখামাখি। ওখানেই জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকল সব, যেন ফেরার সময় কার্লার নজরে পড়তে পারে। ফিরে এসে খালি হাতে ফেরার জন্য ফিসফিস করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইল কার্লা। তাদের ঘাড়ে আর নাকে আদর করতে করতে জিজ্ঞাসা করল তারা কেউ ফ্লোরার কথা জানে কি না।
গ্রেস আর জুনিপার নামের ঘোড়াদুটো নাক ডাকার মতো শব্দ করল। পরমুহূর্তে তাদের নাক টানার শব্দটা মনে হলো দীর্ঘশ্বাস। যেন তারা কার্লার দুশ্চিন্তায় সহানুভ‚তি দেখাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ লিজি নিজের মাথা সেধিয়ে দিলো। গ্রেসের মাথার ওপর থেকে কার্লার হাতটা নিজের মাথা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তবে যেন শান্তি পেল। কার্লা হাতে এত ব্যথা ব্যথা পেল যে তারপর বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে লিজিকে বকাঝকা করল।
তিন বছর আগেও কার্লা ভ্রাম্যমান বাসার ব্যাপারে খোঁজখবর করেনি। এরকম বাসা হয়, সে আসলে জানতই না। তার বাবামায়ের মতো সেও ভেবেছিল, ভ্রাম্যমান বাসা আসলে এক ধরণের কল্পিত ব্যাপার। কিন্তু কার্লা যখন এখানে চলে আসে, ক্লার্কের সাথে নতুন জীবন শুরু করে, তখন থেকে সমস্ত কিছুকে অন্য চোখে দেখে। তখন সে ভ্রাম্যমান বাসার কথা জানল, বুঝতে পারল কী করে মানুষ সহজেই সেটা কিনে এনে নিজেরাই বানিয়ে ফেলে। কী রকম পর্দা সেখানে লাগাতে হয়, কীভাবে রঙ করতে হয়, কী করে সুন্দর একটা বারান্দা অথবা দরকার মতো আরেকটা অতিরিক্ত ঘর তার সাথে জুড়ে দেয়া যায়, সবকিছুই সে শিখতে শুরু করল। নিজের জন্য সেরকম একটা বাসা পাওয়ার জন্য কার্লার আর তর সইছিল না।
ক্লার্ক তার সাথে একমতই ছিল কিছুদিনের জন্য। কার্লার ইচ্ছে অনুযায়ী সে নতুন সিঁড়ি বানিয়েছিল আর তাতে পুরোনো ধাচের রট আয়রনের রেলিং লাগানোর জন্য বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজিও করেছিল। রান্নাঘর আর বাথরুম নতুন করে রঙ করার জন্য কিংবা পর্দার জন্য কাপড় নতুন করে কেনার ব্যাপারেও ক্লার্ক কোনো অভিযোগ করেনি। তবে তখন ঘরে রঙ করার ব্যাপারে কার্লা ছিল একেবারে অপটু। রঙ করার আগে যে ধাতব কবজাগুলো খুলে রাখতে হয় অথবা রঙ চটে যাওয়া পুরোনো পর্দা জাতীয় কিছু দিয়ে আসবাবগুলো ঢেকে রাখতে হয়, এই সাধারণ ব্যাপারটাও তার জানা ছিল না।
ক্লার্ক শুধু যেটা করতে বারণ করেছিল তা হলো, কার্পেট বদলানো। সব ঘরে একই রকমের কার্পেট পাতা ছিল, জায়গায় জায়গায় খানিকটা ছেঁড়া। কার্লার কাছে মনে হয়েছিল এই জিনিস বদলে ফেলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কার্পেটটা ছোট ছোট বাদামি রঙের চারকোণা কতকগুলো টুকরো একসাথে লাগিয়ে বানানো। প্রতিটি টুকরোতে গাঢ় আর ফ্যাকাশে বাদামি রঙের আঁকাবাঁকা লাইন আর জ্যামিতিক ছবি। বহুদিন ধরে সে মনে করত প্রতিটা বর্গক্ষেত্রে একই ধরণের বক্ররেখা আর চিত্র। কিন্তু অনেকদিন ধরে খুঁটিয়ে দেখার পরে বুঝল সেখানে আসলে চারটি করে আলাদা ধরনের ছবি মিলে একটি একইরকম বড় চতুভর্‚জ তৈরি করেছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখনও খুব সহজেই সে জোড়াগুলো পেয়ে যেত, কখনও আবার খুঁজে পেতে বহু সময় লাগত।
মাঝে মাঝে বাইরে বৃষ্টির সময়ে ক্লার্ক বাসার কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে কিংবা অন্য সব বাদ দিয়ে কম্পিউটারের মধ্যে মুখ গুজে রাখলে কার্লা কার্পেটের জোড়া খোঁজায় ব্যস্ত হতো। কিন্তু তখন যদি আস্তাবলের কোনো ফেলে রাখা কাজ মনে করে সেরে ফেলত তাহলে ভালো হতো। কার্লার মন খারাপ থাকলে ঘোড়াগুলোর দেখতে পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু ফ্লোরা কখনই বাঁধা তাকত না। সে ঠিকই তার কাছে এসে শরীর ঘষে ঘষে তার মনোযোগ পেতে চাইত। হলদেটে সবুজ রঙের চকচকে চোখগুলো মেলে এমন করে কার্লার দিকে তাকাত যেন সেটা ঠিক সহানুভ‚তি নয়, কার্লার মন এক পলকে ভালো করে ফেলার নির্দেশ।
ক্লার্ক একবার ঘোড়ার লাগামের দাম দরাদরি করার জন্য কাছের একটা ফার্মে গিয়ে ফ্লোরাকে সাথে করে নিয়ে আসে। তখন সে একেবারেই বাচ্চা। সেখানে কিছু মানুষ ছিল যারা হয়তো গ্রাম্য জীবন থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছিল। এসব জায়গায় ওরকম হলে মানুষ তাদের ঘোড়াগুলো বিক্রি করে দিয়ে চলে যায় কিন্তু ছাগলগুলো কী করবে ভেবে পায় না। ক্লার্ক কোথা থেকে যেন শুনেছিল আস্তাবলে একটা ছাগল থাকলে ঘোড়াদের বুদ্ধি খোলে আর তারা মজাও পায়। তাই সেটা বিশ্বাস করে ফ্লোরাকে এনেছিল। বড় হলে তাকে দিয়ে আরও ছাগল বাড়িয়ে ফেলার কথা ভাবা হয়েছিল শুরুতে কিন্তু সে চেষ্টা পরে আর কখনই করা হয়ে ওঠেনি।
প্রথম প্রথম সে পুরোপুরিই ছিল ক্লার্কের পোষা ছাগল। ক্লার্ক যেখানে যেত, সে অনুসরণ করত। তার মনোযোগ পাওয়ার আশায় চারদিকে ঘুরে ঘুরে নাচানাচি করত। ভীষণ ছটফটে আর দেখতে এতই সুন্দর ছিল ফ্লোরা, দেখলে মনে হতো যেন বেড়ালের ছোট্ট বাচ্চা। তার চাহনি ছিল নতুন প্রেমে পড়া নিষ্পাপ কিশোরির মতো, দেখে কার্লা আর ক্লার্ক হেসে অস্থির হতো। কিন্তু যত বড় হতে থাকল তত যেন কার্লার সাথে তার ঘনিষ্টতা বাড়তে লাগল। কার্লার কাছাকছি থাকতে থাকতে সে ধীরে ধীরে অযথা লাফালাফি আর বেড়ালছানার মতো পায়েপায়ে ঘোরা ছেড়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর প্রকৃতির হয়ে গেল। তখন তাকে মনে হতো খামাখা তাদের মনোরঞ্জনের পরিবর্তে সে যেন বেশ দায়িত্ববান হয়ে উঠেছে। ঘোড়াগুলোর সাথে কার্লার ব্যাবহার সবসময় বেশ শান্ত অথচ শক্ত, অনেকটা মায়ের মতো। কিন্তু ফ্লোরা যেন কার্লাকে কখনও মনিব বলে পাত্তাই দেয়নি।
“ফ্লোরার এখনও কোনো খবর নেই, না?” আস্তাবলে পরার জুতোজোড়া খুলতে খুলতে কার্লা জানতে চায়। ক্লার্ক ওয়েবে হারিয়ে যাওয়া ছাগলের সন্ধান পাওয়ার জন্য একটি পোস্ট দিয়েছে।
“নাহ্, এখনও তো কোনো হদিস নেই”, ক্লার্ক বলে। তার গলা শুনে মনে হয় মনোযোগ অন্যদিকে তবে কার্লার প্রশ্নটা ঠিকই শুনেছে। ক্লার্ক অবশ্য অনেকদিন ধরেই কার্লাকে বলছিল নিজে গিয়ে একটা রামছাগল পছন্দ করে আনতে।
মিসেস জেমিসনের ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। কার্লা কেতলিতে চায়ের পানি চড়াল। ক্লার্ক নিজের মনে বিড়বিড় করে কিছু বলছিল যেটা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে সে প্রায়ই করে।
কখনও মনে হয় যেন কম্পিউটারের সাথেই কথা বলছে। তার সাথে কোনো একটা চ্যালেঞ্জে হেরে গেলে রেগে গিয়ে হয়তো বলে, গু খা! কখনও আবার জোরে জোরে হাসতে থাকে। কিন্তু পরে কার্লা হাসির কারণ জানতে চাইলে কৌতুকটা কিছুতেই মনে করতে পারে না।
কার্লা বলে, “তুমি কি চা চাও?” মাথা ঘুরিয়ে অবাক হয়ে দেখে ক্লার্ক চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরে চলে এসেছে।
“তো..” বলতে থাকে ক্লার্ক, “তাহলে, কার্লা…”
“কী?”
“তিনি ফোন করেছিলেন।”
“কে?”
“মহামান্য রানি সিলভিয়া? মাত্র তো ফিরে এলেন দেখলাম।”
“কই আমি তো গাড়ির শব্দ পাইনি!”
“আমি তো জানতে চাইনি তুমি তার গাড়ির শব্দ পেয়েছ কি না।”
“তো, তিনি ফোন আসলে করেছিলেন কেন?”
“তিনি চান তুমি যেন কাল গিয়ে তার বাড়িতে একটু গোছগাছ করে দিয়ে আস। এটাই বলেছেন শুধু। কালকে যাওয়ার কথা”
“আর তুমি কী বললে?”
“আমি বললাম, নিশ্চয়ই যাবে। তবে তুমি আরেকবার ফোন করে জানিয়ে দিও যাচ্ছ কি না।”
একটু থেমে কার্লা বলে, “আমি বুঝতে পারছি না, তুমি যদি তাকে যাওয়ার কথা বলেই থাক তবে আমাকে আবার ফোন করতে হবে কেন।” কাপদুটোতে চা ঢালতে ঢালতে সে বলে, “তিনি ছুটিতে যাওয়ার আগেআগেই আমি বাসাটা পরিষ্কার করে এলাম, এখন এর মধ্যে সেখানে আর করার কী থাকতে পারে জানি না”
“কে জানে, তিনি যখন ছিলেন না তখন হয়তো কিছু খরগোশ বাসার ভেতরে ঢুকে যেতে পারে, হয়তো তারা কিছু একটা তছনছ করে রেখেছে।”
“তবু এখনই তাকে আর ফোন করতে পারব না।” কার্লা বলে, “আগে চা খাই, গোসল সারি, তারপরে দেখা যাবে।”
“যত তাড়াতাড়ি করবে ততই ভালো”।
কার্লা তার চায়ের কাপ নিয়ে বাথরুমের দিকে রওনা দেয়। সেখান থেকে গলা চড়িয়ে বলে, “লন্ড্রিতে আমাদের একবার যেতে হবে, বুঝেছ? তোয়ালেগুলো শুকনো অথচ কেমন ভেজাভেজা গন্ধ।”
“মনে রেখ কার্লা, আমরা কিন্তু এখন অন্য প্রসঙ্গে কথা বলছি না।”
কার্লা বাথরুমে ঝরনা ছেড়ে দেয়ার পরও ক্লার্ক দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকল। তার উদ্দেশে জোরে জোরে বলতে লাগল, “আমি কিন্তু তোমাকে এর থেকে মুক্তি দেব না কার্লা।”
কার্লা মনে করেছিল বাথরুমের দরজা খুলে দেখবে ক্লার্ক তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু ক্লার্ক ততক্ষণে তার কম্পিউটারের সামনে ফিরে গেছে। গোসলের পরে কার্লা এমন কাপড়চোপড় পরেছিল যেন মনে হচ্ছিল সে বুঝি শহরের দিকে যাবে। ভেবেছিল তারা যদি বাসা থেকে বেরিয়ে লন্ড্রিতে অথবা কফিশপ থেকে কিছু কিনে আনতে যায়, তবে নিজেদের মধ্যে একটু অন্যভাবে কথা বলতে পারে। সে দ্রুত বসার ঘরের দিকে যায় আর পেছন থেকে ক্লার্কের গলা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরতে না ধরতেই কী যে এক গভীর বেদনায় ডুবে যায়, এ নিশ্চয়ই বেশি গরম পানিতে আরাম করে গোসল করার ফল। তার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। সে তার ঘাড়ের উপরে উপুড় হয়ে কাঁদতে থাকে।
ক্লার্ক কি-বোর্ড থেকে হাত সরিয়ে নিলেও মুর্তির মতো ঠায় বসে থাকে।
“আমার ওপরে রাগ কর না প্লিজ”, কার্লা বলে।
“রাগ করিনি। কিন্তু তোমাকে এরকম ঘ্যানঘ্যান করতে দেখলে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।”
“আমি এমন করছি কারণ তুমি রেগে আছ।”
“আমি কেমন আছি তা আমি ভালো জানি। তুমি কিন্তু আমাকে বিরক্ত করছ। যাও রাতের খাবার বানাতে শুরু কর।”
আর কার্লা তাই করল। ততক্ষণে এটুকু বোঝা যাচ্ছিল যে পাঁচটার দিকে যাদের ঘোড়া চালানো শিখতে আসার কথা ছিল, তারা আজ আর আসছে না। কার্লা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে রাতের জন্য আলু ছেলা আরম্ভ করল। তার চোখ কান্নায় এমন করে ভরে আসছিল যে কী করছে দেখতেও পাচ্ছিল না। একটা টিস্যু দিয়ে মুখটা খুব করে মুছে, সাথে আরেকটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে চলে যায় সে। আস্তাবলের দিকে যায়নি। কারণ ফ্লোরা ছাড়া সেখানে এখন যাওয়া মানে আরও মন খারাপ হয়ে যাওয়া। বরং পেছনের দিকের জঙ্গলের ধার দিয়ে হেঁটে যেতে থাকল। ঘোড়াগুলো ছিল অন্যদিকের মাঠে। তাকে লক্ষ্য করে ছুটে তারা এদিকটায় আসে । সবাই এসেছিল, কেবল লিজি ছাড়া। লিজি কেবল দূর থেকে ঘোঁতঘোঁত শব্দ করছিল যেন সে বুঝতে পেরেছিল যে কার্লা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত।
. . .
এই ঘটনা শুরু হয়েছিল সেই যখন তারা কাগজে মিস্টার জেমিসনের মৃত্যুসংবাদটা পড়েছিল। সেটা ছিল শহরের একটা খবরের কাগজ আর বিকেলের সংস্করণের প্রথম পাতায় ছিল মিস্টার জেমিসনের মুখ। তার আগ পর্যন্ত জেমিসন পরিবারটিকে তারা কেবল ঘরকুনো প্রতিবেশি হিসেবেই জানত। মিসেস জেমিসন চল্লিশ মাইল দূরে এক কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা পড়াতেন আর দিনের অনেকটা সময় তাই রাস্তায়ই কেটে যেত তার। মিস্টার জেমিসন ছিলেন একজন কবি।
মানুষজন তাদের ব্যাপারে এটুকুই জানত। কিন্তু মিস্টার জেমিসনকে দেখলে সবসময় মনে হতো অন্যমনষ্ক। এমনিতে মিসেস জেমিসনের চেয়ে অন্তত বিশ বছরের বড় এবং একজন বয়ষ্ক কবি হলেও তিনি ছিলেন বেশ শক্তসমর্থ আর কর্মঠ। নিজের বাড়ির পানি যাওয়ার পাইপগুলো তিনি নিজেই বসিয়েছিলেন আর বাইরের পাথুরে বাগানটাও নিজেই সাফ করতেন। বাগানের চারদিকের বেড়া বানানো থেকে শুরু করে সেখানে সবজির গাছ লাগানো, পেছনের বনের ভেতর দিয়ে সরু পথ বানানো, এমনকী বাসার টুকটাক মেরামতও তিনি নিজের হাতেই করতেন।
বাসাটা অবশ্য ছিল একটা অদ্ভুত ত্রিভূজাকৃতির। একটা ভেঙে পড়া খামার বাড়ির ভিত্তির উপরে কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় এই বাসাটি তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। বন্ধুরা ছিল বেশ কমবয়সী আর খুব আধুনিক। সেই হিসেবে মিস্টার জেমিসন অনেক বুড়ো এমনকী মিসেস জেমিসনও। শোনা যেত সেসব বন্ধুবান্ধবরা নাকি পেছনের বনটাতে মারিজুয়ানার চাষ করেছিল। সেসব বিক্রি করে কাঁচের বৈয়ামে টাকা ভরে রাখত। ওই বাড়ির আশেপাশে নাকি এখনও অনেক টাকাভরা বৈয়াম পোঁতা আছে। ক্লার্ক শহরে কিছু লোকের কাছে এসব ঘটনার কথা শুনে এসেছিল। ফিরে এসে বলেছিল, যত্তসব গাঁজাখুরি গল্প।
“আর সত্য হলেও সেসব কি আর এখনও আছে নাকি? দেখ গিয়ে কবে কে মাটি খুঁড়ে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কেউ না কেউ নিশ্চয়ই সেসবের খোঁজ পেয়ে গেছে এতদিনে।”
খবরের কাগজে শোক সংবাদটা পড়ে ক্লার্ক আর কার্লা প্রথম জানতে পারে যে মিস্টার লিয়ন জেমিসন মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর আগে বিরাট একটা পুরস্কার পেয়েছিলেন। পুরষ্কারটা পেয়েছিলেন কবি হিসেবে। একথা আগে তারা কাউকে বলতে শোনেনি। মারিজুয়ানার মতো নেশার জিনিস বিক্রির টাকা মানুষ কাঁচের বৈয়ামে ভরে মাটির নিচে রেখে দিতে পারে, এটা বিশ্বাসযোগ্য। কিন্ত তাই বলে কবিতা লিখে পাওয়া পুরষ্কারের টাকা নিশ্চয়ই কেউ সেভাবে রাখবে না।
খবরটা পড়ার সামান্য পরেই ক্লার্ক বলল, “এই টাকা তার কাছ থেকে বের করতে হবে।”
কার্লা সাথেসাথেই বুঝতে পেরেছিল ক্লার্ক কী বলতে চায়। কিন্তু সে ভেবেছিল যে ক্লার্ক কেবল মজা করছে।
“অনেক দেরি হয়ে গেল যে!” কার্লা বলল। “ বেচারা একটা মৃত মানুষ তো আর তোমাকে টাকা দিতে পারবে না।”
“তা ঠিক। মিস্টার জেমিসন না পারলেও মিসেস জেমিসন পারবেন।”
“তিনি তো গ্রিসে গেছেন।”
“আরে সেখানে তো আর তিনি সারা জীবনের জন্য যাননি।”
“তিনি তো মনে হয় টাকাটার কথা জানতেনই না।” গলা নামিয়ে বলে কার্লা।
“আমি তো বলিনি যে তিনি জানতেন।”
“আমার মনে হয় এই ব্যাপারে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানা ছিল না তার।”
“সে না-হয় আমরাই তাকে জানাব।”
“না না…” কার্লা বলেই চলে। মনে মনেও।
“আমরা বলতে পারি যে টাকা আদায়ের জন্য মামলা করব। এসব ক্ষেত্রে মামলা করলেই লোকে টাকা পেয়ে যায়।”
“এটা তুমি কী বলছ? একটা মৃত মানুষের বিরুদ্ধে কী করে মামলা করবে?”
“আরে কাগজের মাধ্যমে ভয় দেখানো আর কী। এত বড় কবি, মামলার খবর শুনলে সাংবাদিকরা খুব খাবে। আমাদের যেটা করতে হবে তা হলো তাকে বিপদে ফেলা। ভয়ে কুঁকড়ে মিসেস জেমিসন যেন কারও সামনে বেরোতে না পারেন।”
“তোমার যত্তসব আবোলতাবোল কথা।” কার্লা বলে। “খামাখা মজা করছ।”
“না।” দৃঢ়ভাবে বলে ক্লার্ক, “আমি সত্যিই মজা করছি না।”
কার্লা বলে যে সে এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চায় না। ক্লার্কও মুখ বন্ধ করে।
কিন্তু তারপরের দিন এটা নিয়ে তাদের মধ্যে আবার কথা ওঠে। তার পরের দিন আবার। এমনকী তার পরের দিনও। মাঝেমাঝেই ক্লার্ক নানান ফন্দিফিকির করে। কোনোভাবে বিষয়টা সাজায়। তারপর আবার ভাবে, এটা হয়তো বেআইনি হবে কিংবা ওটার ওই আইন এখন বদলে গেছে। মাঝে মাঝে কোনো একটা পরিকল্পনা নিয়ে সে বেশ উত্তেজিত হয়ে যায়। তারপর কার্লা জানে না কেন, নিজে নিজেই আবার সেটা বাতিল করে। টানা বৃষ্টিাটা থেমে গেলে যদি সাধারণ গ্রীস্মের মতো ঝলমলে রোদ উঠত তাহলে এতদিনে তার এসব পরিকল্পনার কথা হয়তো সে ছড়িয়ে দিত। কিন্তু তেমন হয়নি। তাই গত একমাস ধরে সে তার পরিকল্পনার উপরে কাটাকাটির কাজ করেই চলছে। কী করলে বিষয়টি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য এবং শক্তভাবে দাঁড়ায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল ঠিক কত টাকার জন্য মামলাটা করা হবে। খুব কম যদি চায় তবে হয়তো মহিলা বিষয়টাকে পাত্তাই দেবেন না। ভাবতে পারেন এটা কোনো ছোটখাট জালিয়াতির চেষ্টা। আবার অনেক বেশি যে চাবে তারও উপায় নেই। হয়তো বেঁকে বসলেন। তখন টাকা আদায় করা খুব কঠিন হবে।
কার্লা এখন আর মনে করে না যে ক্লার্ক এই বিষয়টা কেবল মজা করার জন্য বলেছিল। সে বরং তাকে বোঝাতে চেয়েছিল যে এভাবে কাজ হবে না। সে বলেছিল যে মানুষ কিন্তু কবিদের একটুআধটু অমন স্বভাবের বলেই জানে। সুতরাং তার জন্য এভাবে টাকা পরিশোধ করাটা ঠিক সাজে না।
ক্লার্ক বলেছিল, জুতসই করে মামলা সাজাতে পারলে ঠিকই ফল পাওয়া যাবে। শুনে কার্লা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে ছুটে গিয়ে মিসেস জেমিসনকে সব বলে দিলো। বলার পরে ফিরে এলে ক্লার্ক এতই অবাক হলো যেন মামলা করার ধান্দার কথা সে এই প্রথম শুনছে। রাগে গরগর করতে করতে সবকিছু ফাঁস করে দেবে বলে শাঁসাল। এমন বিপাকে ফেলবে যে মিসেস জেমিসন নিজেই এসে টাকা সাধবেন তাকে।
“তোমার সাঙ্ঘাতিক অবস্থা করেছিল সে। তোমাকে যেভাবে ব্যবহার করেছিল তাতে তুমি আঘাত পেয়েছিলে। আর আমি ছোট হয়ে গিয়েছি, কষ্টও পেয়েছি, কারণ তুমি আমার স্ত্রী। এটা হলো মানসম্মানের প্রশ্ন।”
দিনের পর দিন বারবার ক্লার্ক একই কথা বোঝাতে চেয়েছে কার্লাকে। কার্লাও বারবার তাকে এসব করতে বিরত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্লার্ক ভোলেনি।
বারবার বলেছে, “রাজি হও কার্লা, রাজি হয়ে যাও।”
এসব আসলে হয়েছে কার্লার কথার জন্যই। যা বলেছে এখন আর তা অস্বীকার করতে পারে না।
কখনও কখনও সে আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকায়, বুঝেছ?
কে, ওই বুড়োটা?
মিসেস জেমিসন যখন থাকেন না তখন মাঝেমাঝে তিনি আমাকে তার ঘরে ডাকেন।
আচ্ছা-
যখন মিসেস জেমিসন বাজারে যান আর নার্সটাও বাসায় থাকে না।
কার্লা এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যে মুখ দেখলে ক্লার্ক সবসময় গলে যায়।
তখন, তখন তুমি কী কর? যাও তার কাছে?
কার্লা মনে হয় লজ্জা পেল।
কখনও কখনও যাই।
বুড়োটা তোমাকে তার ঘরে ডেকে নেয়। তারপর? তারপর কী করে, কার্লা?
যাই আমি। দেখি তার কী লাগবে।
কী লাগে তার? কী লাগে, হ্যাঁ?
প্রশ্ন এবং উত্তর সবই চলছিল ফিসফিস করে। যদিও তাদের কথা শোনার মতো সেখানে কেউই ছিল না। এমনকী যখন বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে তারা তাদের বিছানায় আত্মগোপন করত, তখনও। এটা যেন একটা ঘুমপাড়ানি গল্প হয়ে দাঁড়াল। প্রতিবার নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসত। সেসব নিত্যনতুন লজ্জা, ঢোক গেলা অথবা পরিতাপের অনুভ‚তিগুলো ছিল খুবই চমকদার। সব মিলিয়ে কেবল নষ্টামি। আর বিষয়টা এমন ছিল না যে গল্পটাতে ক্লার্কই কেবল উত্তেজিত হয়, শোনার জন্য অধীর হয়, কার্লাও ছিল তাই। সেও যেন সেসব বলে বলে কøার্ককে উত্তেজিত করতে চাইত। প্রতিবার গল্পগুলো বলার পরে একরকম তৃপ্তিই পেত হয়তো।
তার মন জানে সে যা বলছে তা সত্যি। বুড়োটার কামুক চেহারা সে অনেকবার দেখেছে। বিছানার চাদরের ওপরে, যেখানে হাত দিয়ে ইশারায় কার্লাকে বসতে বলত, সেটাও ভোলার নয়। বুড়োটা বিছানাপড়তা। কিন্তু ইশারায় কার্লাকে সব বুঝিয়ে দিতে পারত। তাকে কাছে পাওয়ার কি ছোঁয়ার ইচ্ছেটা বোঝাতে তার একটুও কষ্ট হতো না। কার্লাকে একান্তভাবে চাইত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। (কার্লার অনিচ্ছাটা ছিল সেক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেকথা বললে ক্লার্ক কেন যেন তাকে অবাক করে দিয়ে বেশ হতাশ হয়ে যেতো।)
এটা জানা ছিল যে একদিন না একদিন কার্লাকে হার মানতেই হবে। কোনো না কোনো দিন কার্লা প্রায় অসার পড়ে থাকা শরীরটার নিবুনিবু ইচ্ছের কাছে হার মানবে। কোনো না কোনো দিন ভাড়া করা ওই হাসপাতালের বিছানায় ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসা শরীরটা কার্লাকে টেনে নিয়ে যাবেই। অবশ্য মিসেস জেমিসন বা নার্স যদি ঘরের দরজাটা ভুলে খুলে রেখে চলে যায় তবেই কার্লার চোখ যায় ওদিকে। তাছাড়া নিজে থেকে কার্লা কখনও সে ঘরে যায়নি।
আসলে বলতে গেলে সে ওই বাসায় কাজ করতে যেতেই চাইত না। কিন্তু টাকার দরকার ছিল। এছাড়া মিসেস জেমিসনের জন্য তার খারাপও লাগত। একা একা ওই ভুত‚ড়ে বাড়ির মধ্যে মহিলা যেন একাকিত্বের যন্ত্রণায় কাতর। তাকে দেখলে মনে হতো তিনি যেন ঘুমের মধ্যেও বাড়িময় হেঁটে বেড়ান। মাত্র দু’একবার অবশ্য কার্লা অদ্ভুত, অর্থহীন কিছু কাজের উসিলায় সেই থমথমে বাড়িতে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিল। মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবতে গেলেই সে এমন করত যেন নবীন কোনো ঘোড়সওয়ার রাগি ঘোড়ার পিঠে প্রথমবারের মতো চড়তে গিয়ে আছাড় খেয়েছে। ক্লার্ক যতই তাকে ওই বাড়ির দিকে ঠেলে দিত, কার্লা ততই বাড়িটার অসহনীয় নিঝুম আর ক্লন্তিকর পরিবেশের কথা বলে তাকে বোঝাতে চাইত। তবে এই এক অযুহাত বেশিদিনের জন্য ধোপে টিকল না। বরং কাজ হলো মিস্টার জেমিসনের নোংরা ইচ্ছের কথা বলাতে।
পায়ে চলা পথগুলো দিয়ে চলতে গেলে কাদা না মাড়িয়ে কিংবা পানিতে ডোবা লম্বা ঘাসগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলার কোনো উপায় নেই। পথের ধারেধারে বন্য গাজরের গাছগুলোতে যে ফুল এসেছে, সেসবও পায়ের তলায় পড়বেই। কিন্তু বাতাসটা যথেষ্ট গরম থাকায় কার্লার শীতশীত করেনি। কার্লাার কাপড় ভিজে গিয়েছিল, কিছুটা ঘামে, আর কিছুটা তার চোখ থেকে অঝোর ধারার গড়িয়ে পড়া পানির সাথে দু’এক ফোটা বৃষ্টির পানি মিশে। ধীরে ধীরে তার ফুঁপিয়ে ওঠা কমে এসেছে। নাকমুখ মোছার মতো কিছুই নেই তার কাছে এখন। যে টিস্যুটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেটা সেই কখন ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। তাই খানিকটা ঝুঁকে সে কাদার উপরে নাক ঝাড়ল।
তারপর মাথাটা উঠিয়ে বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে গায়ের জোরে বাঁশিতে দিলো একটা ফু। কেঁপে কেঁপে বাজা বাঁশির শব্দটা ফ্লোরার জন্য একটা সিগনালের মতো কাজ করে। ক্লার্কও ফ্লোরাকে ডাকতে হলে এটা বাজায়। কার্লা ক্রমাগত একবার বাঁশিতে ফু দেয় আরেকবার ফ্লোরার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকে।
ফ্লোরার কোনো সাড়া নেই।
ফ্লোরার হারিয়ে যাওয়ার সমস্যাটা এসে অবশ্য এক ধরণের উপকারই করল। এই কষ্টে ডুবে থেকে অন্তত একটুক্ষণের জন্যে হলেও সে ভুলে যাবে মিসেস জেমিসনের সাথে কত ভয়াবহ নিষ্টুরতা সে করতে যাচ্ছে অথবা ভুলে যাবে ক্লার্কের সাথে তার এই-আছে এই-নেই জাতীয় নড়বড়ে সম্পর্কের কথা। একটা বিষয় তো অন্তত তাকে শান্তি দেবে যে এই ফ্লোরার হারিয়ে যাওয়ার পেছনে তার কোনো দোষ নেই।
সিলভিয়ার বিশাল বাড়িটার জানালাগুলো খুলে দেয়া ছাড়া বস্তুত কার্লার আর কোনো কাজ ছিল না। আরেকটা জিনিস ভেবে কার্লা অবাক হলো যে সিলভিয়া আসলে কার্লাকে দেখার জন্য খুব অস্থির হয়ে ছিলেন।
অসুস্থ মানুষের ব্যবহার করা জিনিসপত্রসহ বাড়িটাতে রোগশোকের যে ছায়া ছিল তার সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সিলভিয়া আর তার স্বামীর শোবার ঘরটি, যেখানে মিস্টার জেমিসনের মৃত্যু হয়েছিল, ঝেড়েমুছে এমন করে সাফ করিয়েছেন যে সেখানে কখনও কিছু ঘটেছিল বলে মনেই হবে না। মৃতের সৎকার আর সিলভিয়ার গ্রিসে যাবার মাঝখানের সময়টিতে কার্লা সেসব গুছিয়ে নিয়েছে। মিস্টার জেমিনসের ব্যবহার করা প্রতিটি কাপড়, এমনকী বোনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া কাপড়গুলো, যেগুলোর বেশিরভাগ প্যাকেটই খোলা হয়নি, সবকিছুই গাড়ির পেছনের সিটে স্তুপ করে নিয়ে পুরোনো জিনিসপত্রের দোকানে দান করে দেয়া হয়েছে। তার ওষুধপত্র, শেভ করার যাবতীয় জিনিস, নানারকম এনার্জি ড্রিঙ্কের বোতল, যেগুলো তাকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছিল, তিলের বিস্কিটের ডজন ডজন প্যাকেট, একসময় যেগুলো তিনি অনেক খেতেন, তার পিঠে মালিশ করার লোশনের কার্টন আর ভেড়ার যে চামড়াটার ওপরে তিনি শুয়ে থাকতেন, সেই সবকিছু পলিথিন ব্যাগে ভরে ময়লা ফেলার জায়গায় ফেলে দিয়ে আসা হয়েছে। কার্লা এসব নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্চ করেনি। সে একবার ভুলেও বলেনি, “ফেলে না দিয়ে কাউকে দিয়ে দিলেই তো সে ব্যবহার করতে পারত” কিংবা কার্টন খুলে দেখায়নি যে একটা ক্যানও খোলা হয়নি তখনও। আর সিলভিয়া যখন বলেছিলেন,“কাপড়গুলো গাড়িতে করে শহরের দোকানটাতে নিয়ে যেতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না, এগুলোও ময়লা পোড়ানোর মেশিনটাতে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে ফেললে হতো”, কার্লা কোনো বিস্ময়ের ভাব দেখায়নি।
তারা ওভেন পরিষ্কার করল, কাবার্ডগুলো গোছালো, বাড়ির দেয়াল আর জানালাগুলোও মুছে ফেলল। সিলভিয়া বাইরের ঘরের সোফায় বসে তার ঠিকানায় আসা অজ¯্র সাান্ত¦নার চিঠিগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। (সেখানে এমন কিছুই ছিল না যার উত্তর তাকে দিতে হবে। অথবা এমন কোনো শোকসভার খবর ছিল না যেখানে তাকে উপস্থিত হতে হবে। একজন লেখকের মৃত্যুর পরে যেসব হওয়াটা ছিল খুব স্বাভাবিক। লেখকের কোনো অর্ধসমাপ্ত কাজও ছিল না যার জন্য কেউ বিপদে পড়েছে বলে জানা গেছে। বেশ কয়েক মাস আগেই মিস্টার জেমিসন স্ত্রীকে বলেছিলেন যে তার আর কোনো কাজ বাকি নেই। আর কাজ নিয়ে তার কোনো অনুশোচনাও নেই।)
বাড়িটার দক্ষিণ দিকে ঢলে পড়া দেয়ালে বড় বড় জানালা। চিঠিগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে সিলভিয়া হঠাৎ মাথা উঠিয়ে সেদিকে তাকান। জানালার ওপরের অংশ গলে নরম সূর্যের আলো দেখে নাকি দেয়ালের ওপরের ছায়ার মধ্যে ঠেকানো মইয়ের মাথায় কার্লার খালি পা আর খোলা বাহুর নড়াচড়া দেখে তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, বোঝা যায় না। কাজে মনোযোগী কার্লার কপালের ওপরে কোকড়া চুলের রিংগুলো ঝুলছে। সামনের পাতলা চুলগুলো ফু দিলেই সরে যায় অথচ এত বড় নয় যে বেণি পর্যন্ত যাবে। দ্রুত হাতে সে জানালার কাচের ওপরে স্প্রে করছে আর আরেক হাতে মুছে ঝকঝকে করে ফেলছে। সিলভিয়ার সাথে চোখাচোখি হলে মুচকি হেসে এক মুহূর্তের জন্য থামে। তারপর আবার ঢলে যাওয়া জানালার কাচে ঝুঁকে হাত চালায়। ঠোঁটে ঁেঠাট চেপে প্রাণপণ চেষ্টার অভিনয় করে কাচের উপরে হাত ডলতে থাকে। কার্লার মুখ দেখে সিলভিয়া হেসে ফেলেন, দুজনেই হাসতে থাকে একসাথে। হাসি থামিয়ে কার্লা আবার মোছা শুরু করলে সিলভিয়াও তার চিঠি দেখায় ফিরে যান। আরও কয়েকটা দেখার পরে তার মনে হয়, এই সমস্ত ব্যথার উপরে মলম লাগানো কথা, সত্যি বা লোকদেখানো যাই হোক, হোক সম্মান অথবা শোক জানানোর ভাষা, ওই ভেড়ার চামড়া আর বিস্কিটগুলোর সাথে একই জায়গায় যেতে পারত।
তারপর যখন বারান্দার ওপরে কার্লার বুটের শব্দ পেলেন, মই সরিয়ে নিলো কার্লা, তিনি যেন হঠাৎ একটু লজ্জা পেলেন। মাথা নিচু করে একই জায়গায় বসে রইলেন তিনি। কার্লা তার পেছন দিয়ে বালতি আর মোছার কাপড় নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, বেসিনের নিচে ঢুকিয়ে রাখল। কাজের মাঝখানে কার্লা দ্রুত হাঁটে আর কোথাও থামে না। তবু যেতে যেতে সিলভিয়ার ঝুলিয়ে রাখা মাথার ওপরে একটু চুমু খেল। তারপর নিজের মনে একটা সুর ভাজতে ভাজতে চলে গেল।
সেই চুমুটা যেন সিলভিয়ার মাথায় ঘুরতে থাকে। এরকম একটা আকস্মিক আদরের হয়তো তেমন কোনো অর্থই হয় না। হতে পারে এর মানে হাসো, হতে পারে বাদ দাও তো। হতে পারে যে এই চুমুর অর্থ তারা দুজনে আসলে অনেক পুরোনো সঙ্গী, অনেক দিন ধরে একসাথে অনেক কাজ করে যাচ্ছে। অথবা এই যে সূর্যটা মেঘের আড়াল থেকে কেবল বেরিয়ে এলো, সেটা দেখেই কার্লার মনে পড়ে গেল বাড়িতে তার ঘোড়াগুলোর কাছে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। সে যাই হোক, সিলভিয়ার কাছে এ আদর কেবল উজ্জ্বল প্রষ্ফুটিত এক ফুলের মতো। রজোনিবৃত্তির পরে কখনও কখনও যেমন পলকেই শরীর তীব্রভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তেমনি যেন আচমকা উষ্ণতার মধ্যে ফুল তার ভেতরের পাপড়িগুলো একটি একটি করে মেলছে।
প্রায়ই তার উদ্ভিদবিদ্যা ক্লাসের কোনো না কোনো ব্যাচের মধ্যে একটা না একটা মেয়ে থাকেই যার মধ্যে কিনা অল্প বয়সে তিনি যেমন চালাকচতুর, নিজের অবস্থান সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন আর পড়াশোনার প্রতি সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখতেন, সেসব তিনি দেখতে পান। এইরকম মেয়ে হলে তার পেছনে পেছনে ছায়ার মতো ঘুরতে থাকে, যদি তার সাথে কিছুটা ঘনিষ্ট হওয়া যায়। হয়তো কোনো ক্ষেত্রে হয়েও যায়। কোনো সময় বেশ সহজেই কেউ তার মন জয় করে ফেলে।
কার্লা কোনো দিক দিয়েই সেই মেয়েগুলোর মতো নয়। সিলভিয়া চেনা কোনো মেয়ের সাথে যদি কার্লাকে তুলনা করতে চায় তবে কেবল হাইস্কুলে দেখা কারও সাথে হয়তো করতে পারে। হাইস্কুলের পরিচিত কতকগুলো মেয়ে কখনই খুব বুদ্ধিদীপ্ত ছিল না, তারা হয়তো খেলাধুলায় ভালো ছিল, তবে চমকে দেয়ার মতো কিছু করার ক্ষমতা হয়তো তাদের ছিল না। খুব সহজেই হেসে গড়িয়ে পড়ত আর বেশ চেঁচামেচি করত। মোটামুটি বরাবরই উৎফুল্ল থাকত তারা।
“আমি কেমন একটা জায়গায় গিয়েছিলাম, বলব? এই এতটুকু একটা গ্রামে। আমার দুই বন্ধুর সাথে ছোট্ট সেই গ্রামে ছিলাম আমি। তবে সে যাই হোক, গ্রামটা এমনই এক জায়গা যেখানে বহুক্ষণ পরে পরে আসা বাসগুলো বেড়াতে আসা মানুষদের নামানোর জন্য থামে। যখন থামে, মনে হয় যেন বাসটা বুঝি পথ হারিয়ে ফেলেছে, তারপর সফরে আসা মানুষগুলো দুরুদুরু বুকে বাস থেকে নেমে অবাক চোখে চারদিকে দেখতে থাকে। মনে হয় তারা যেন কোথায় এক অবাস্তব জায়গায় এসে পড়েছে। সেখানে জানো, কেনার মতোও কিছু পাবে না।”
সিলভিয়া তার গ্রিস সফরের গল্প বলছিলেন। কার্লা কার থেকে কয়েক ফুট দূরে বসে ছিল। লম্বা লম্বা হাতওলা, বেশ উজ্জ্বল মেয়েটি মোটামুটি অস্বস্থি নিয়ে তার সাথে সেই ঘরের মধ্যে বসে পড়েছিল শেষপর্যন্ত। তবে সে ভাবলেশহীনভাবে মাঝেমধ্যে একটু হাসছিল, বেশ দেরি করে করে একটু একটু মাথা দোলাচ্ছিল।
“আর প্রথমে বুঝলে কী হলো?”, সিলভিয়া বলে চলছিলেন, “প্রথমে আমারও সেরকম যেন ধাধা লেগে গেল। জায়গাটা ছিল ভীষণ গরম। কিন্তু আলোটা যে এত সুন্দর, কী বলব, অসাধারণ! তারপর আমি বুঝতে পারলাম সেখানে আসলে কী করার আছে। সেসব সব মিলিয়েও খুবই সামান্য তবে করতে করতে তোমার সারাদিন কেটে যাবে। একটু তেল কেনার জন্য তোমাকে আধা মাইল একদিকে যেতে হবে, তো রুটি অথবা ওয়াইন কেনার জন্য আরেক দিকে আধা মাইল। এভাবে তোমার সকালটা তো কেটেই গেল। কোনোমতে একটা গাছের নিচে বসে দুপুরের খাবারটা সেরে নিতে পারলে দেখবে চারদিকে এতই গরম যে ঘোরাফেরার প্র্শ্নই ওঠে না। তখন পর্দাটর্দা কিছু একটা টেনে বিছানায় শুয়ে থাকা অথবা কিছু একটা পড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে পড়াই ভালো। তবে পরে যখন ছায়াগুলো দীর্ঘ হতে থাকে, তোমার মনে হবে, আর শুয়ে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে বরং সাঁতার কাটতে যাওয়া ভালো।”
“ও, ভালো কথা”, নিজেই নিজেকে থামান তিনি। “দেখ তো একদম ভুলেই গিয়েছি!”
লাফিয়ে উঠে তিনি চলে যান উপহারটা আনতে, যেটা তিনি কার্লার জন্য এনেছেন। আসলে সত্যি বলতে কী উপহারটার কথা তিনি মোটেই ভোলেননি। তিনি প্রথমেই হুট করে কার্লাকে সেটা বের করে দিতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন গল্পে গল্পে স্বাভাবিকভাবে যখন উপহারটা দেয়ার উপযুক্ত একটা সময় আসবে তখন তিনি সেটা বের করে তার হাতে দেবেন। আর যখন তিনি সেখানকার গল্প বলছিলেন, আগেই ভেবে রেখেছিলেন, এরপর আসবে সমুদ্রের কথা, সাঁতার কাটার কথা। তখন তিনি ঠিকই নির্দিষ্ট এই উপহারটা বয়ে আনার কারণটা বর্ণনা করবেন। আর এবারে সেটি তিনি বললেন। “সাঁতারের কথা বলতেই আমার এটার কথা মনে পড়ল, জানো, এটা একটা ঘোড়া যেটা পানির নিচে তারা পেয়েছে। এটা তো আর আসল ঘোড়া নয়, কেবল ব্রোঞ্জ দিয়ে বানানো একটা প্রাচীন মূর্তি। সমুদ্রের নিচে তারা বারবার মাটি সরিয়ে পরিষ্কার করে, করতে করতে এটা পাওয়া গেছে। সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর জিনিস এটা।”
কার্লা যখন ওই ঘরে কোনো কাজ আছে কিনা দেখার জন্য এসেছিল, সিলভিয়া বলেছিলেন, “বাদ দাও, এখানে একটু বসো দেখি, ফিরে আসার পর থেকে কারও সাথে একটুও কথা বলিনি। আস, বসো তুমি।” কার্লা একটা চেয়ারের শেষ মাথায় বসেছিল দুদিকে পা বিছিয়ে। তার হাতদুটো দুই হাটুর মাঝখানে দুলছিল। দেখতে মনে হচ্ছিল মনমরা। এতকিছু শোনার পরে কিছুটা ভদ্রতার খাতিরেই হয়তো অন্যমনষ্কভাবে বলল, “গ্রিস কেমন লাগল?”
এবারে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ঘোড়ার মূর্তিটা টিস্যু দিয়ে মোড়ানো, পুরোপুরি খোলা হয়নি তখনও।
“এটা আসলে একটা রেসের ঘোড়ার মূর্তি”, সিলভিয়া বললেন। “বিজয় পাবার আশায় মানুষ শেষ যে চেষ্টাটা করে আর কী, দেখছ না, ঘোড়সওয়ার ছেলেটিও কেমন জয় পাওয়ার জন্য নিজেকে আর ঘোড়াটিকে সর্বোচ্চ শক্তিতে ওঠাতে চাচ্ছে।”
ঘোড়ার পিঠে বসা ছেলেটি যে তাকে কার্লার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল সেটা তিনি বলেননি। এখনও সেটা উল্লেখ করবেন না। ছেলেটিকে দেখলে মনে হয় মাত্র এগারো কি বারো বছর বয়সী হবে। হয়তো ছেলেটির শক্তিশালী বাহু আর লাগাম ধরে রাখার ভঙ্গি দেখে অথবা তার শিশুকপালে পড়া উত্তেজনার ভাঁজগুলো আর প্রচন্ড মানসিক চাপ গ্রহনের ক্ষমতা দেখে তার গত বসন্তে বহু সময় ধরে জানালা পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে কার্লার পরিশ্রমের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ছোট প্যান্ট পরা কার্লার শক্ত পা দুটো, তার চওড়া কাঁধ. জানালার কাচের ওপরে হাত বিস্তৃত করা তার বড় বড় মোছার দাগ আর যেভাবে সে সেসবের মধ্যে হাসিঠাট্টাও করতে পারে, সিলভিয়া তার কাÐকীর্তি দেখে না হেসে থাকতে পারেন না।
“হ্যাঁ, দেখে বোঝা যাচ্ছে,” কার্লা বলে। নিজের মনের ভাবটা গোপন করে ছোট্ট সবুজাভ ব্রোঞ্জের ঘোড়াটা নেড়েচেড়ে বলে, “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”
“তোমাকেও। চলো একসাথে কফি হয়ে যাক, ঠিক আছে?” এইমাত্র আমি বানালাম। গ্রিসের কফি বেশ কড়া, বুঝলে? আমি যতটা কড়া খাই তার চেয়েও বেশি। কিন্তু রুটিগুলো যে এত মজার! আর পাকা ডুমুরগুলো অতুলনীয়। আরেকটু বসো, প্লিজ। শোনো আমি বেশি কথা বলতে থাকলে, তুমি আমাকে থামিয়ে দিতে পার। আচ্ছা, এর মধ্যে এখানে সব ঠিক ছিল? কেমন ছিলে তোমরা?”
“এখানে তো বেশিরভাগ সময়ে বৃষ্টিই হচ্ছিল।”
“সেটা এসেই বুঝতে পারলাম। এখনও দেখতে পাচ্ছি,” বড় ঘরের এক মাথায় রান্নাঘরের কোণ থেকে সিলভিয়া একটু গলা চড়িয়ে কথা বলছিলেন। মগে কফি ঢালতে ঢালতে তিনি ভাবেন, কার্লার জন্য আরও যে উপহারটা আছে সেটার ব্যাপারে এখন তিনি কিছুই বলবেন না। সেটার জন্য মোটেও কোনো পয়সা খরচ হয়নি তার। (ব্রোঞ্জের ঘোড়াটা কিনতে তার কত লেগেছে সেটা তো মেয়েটা হাজার চেষ্টা করলেও আন্দাজ করতে পারবে না।) কিন্তু এই উপহারটা কেবল একটা সাদাটে গোলাপী পাথর যা কিনা তিনি রাস্তার ধার থেকে কুড়িয়ে এনেছেন।
“এটা কার্লার জন্য নিলাম,” বান্ধবী ম্যাগির সাথে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাকে বলছিলেন। “আমি জানি এটা খুবই হাস্যকর হতে পারে। তবে কেবল এই জায়গার নিজস্ব একটা অংশ তার হাতে দিতে চাচ্ছিলাম, এই আর কী।”
ততদিনে তিনি ম্যাগির কাছে কার্লার কথা বলেছেন, সেখানে তার সাথে বেড়াতে যাওয়া আরেক বান্ধবী সোরাইয়াকেও বলা হয়েছে। বলেছেন যে মেয়েটির উপস্থিতি তার জীবনে দিনদিন কতটা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কী করে তাদের দুজনের মধ্যে অপরিহার্য একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। গত বসন্তের অসহনীয় কষ্টকর মাসগুলোতে কার্লা কীভাবে তাকে স্বান্ত¦না দিয়েছিল, সেটা বলেছেন।
“সে এলে কেমন অসহ্য ভালো লাগত, জানো, মনে হতো যেন ওই মৃত বাসায় এক জীবন্ত, স্বাস্থ্যকর আলো এসে উপস্থিত হলো।”
ম্যাগি আর সোরাইয়া তার কথা শুনে হেসেছিল। মেয়েটির প্রতি তার মমতা দেখে তাদের মায়া হয় আবার হাসতে হাসতে তারা বিরক্তিও প্রকাশ করে।
স্থুল কালচে বাহুগুলো দিয়ে অলসভাবে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে সোরাইয়া বলে, “সারাক্ষণ শুধু কার্লা আর কার্লা!” আর ম্যাগি হাসতে হাসতে বলে, “মনে হয় এই বয়সে আমাদের সবারই এমন হয়, একটি অল্পবয়সের মেয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, যাকে বলে প্রেম।”
সিলভিয়া প্রেমের মতো একটা আদি আর অস্বস্থিকর শব্দ শুনে ভেতরে ভেতরে একটু রেগে গিয়েছিলেন।
“হতে পারে আমার আর লিয়নের কখনও কোনো বাচ্চা হয়নি, তাই।” তারপর বলতে থাকেন, “এই মেয়েটা হয়তো আমার ভেতরের মাতৃত্বের ভালোবাসার সেই জায়গাটা দখল করেছে।”
তার বান্ধবীরাও তা অস্বীকার করে না। তবে তার মত থেকে সামান্য সরে গিয়ে বলে, হতে পারে এটা হাস্যকর, কিন্তু এই আকর্ষণ যেমনই হোক, প্রেমই।
কিন্তু আজকের কার্লা যেন সেই মেয়েটি নয়, যার কথা সিলভিয়া গ্রিসে সবসময় মনে করতেন, বলতেন। তার সেই উচ্ছলতা, ঝলমলে তারুণ্য আর সমস্ত দুঃখকষ্টকে অগ্রাহ্য করার মানসিকতা, যা তাকে সেই সুদূর গ্রিসেও প্রতি মুহূর্তে সঙ্গ দিয়ে গেছে, তার কিছুই যেন আজ আর নেই।
সে তার উপহারটা পেয়েও তেমন কোনো উচ্ছাস দেখায়নি। ভীষণ মনমরা হয়ে সে তার কফির মগটা হাতে তুলে নিল।
“সেখানে আরেকটা জিনিস ছিল, জানো, আমার ধারণা দেখলে তোমার খুব ভালো লাগত”, হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে বলেন সিলভিয়া। “ছাগলের দল। সেগুলো পূর্ণবয়ষ্ক হয়ে গেলেও বেশ ছোট ছোট। কিছু কিছু সাদা আর কিছুর গায়ে অন্য রঙের ছোপ। আর সেগুলো সেখানকার পাথরের উপরে এমনভাবে লাফালাফি করছিল যে দেখে মনে হবে ওরাই ওই জায়গাটার প্রাণ।” সিলভিয়া নিজে নিজেই এমন করে হাসা শুরু করলেন যে থামতেই পারছিলেন না। “জানো, যদি দেখতাম খ্রিস্টমাসের দিনের মতো তাদের শিঙের মধ্যে ছোট ছোট ফুলের মালা ঝোলানো, তাহলেও দেখে অবাক হতাম না। আচ্ছা, তোমার ছাগলটার খবর কী? কী যেন নাম?”
“ফ্লোরা”, কার্লা বলে।
“ও হ্যাঁ, ফ্লোরা।”
“সে চলে গেছে।”
“চলে গেছে মানে? বিক্রি করে দিয়েছ?”
“সে হারিয়ে গেছে। জানি না কোথায়।”
“তাই বলো, এটা তো খুবই দুঃখজনক, আচ্ছা হঠাৎ করে ফিরে আসতে পারে না আবার?”
কোনো উত্তর দেয় না কার্লা। সিলভিয়া সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এমনভাবে হয়তো এ পর্যন্ত কখনই তার দিকে তাকাতে পারেননি। দেখেন তার চোখে পানি টলটল করছে, তার ঠোঁট কাঁপছে। মুখটা এমন কালো হয়ে আছে যেন কোনো একটা কষ্ট তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
কার্লা সিলভিয়ার একটানা দৃষ্টি এড়ানোর কোনো চেষ্টাই করল না। সে দাঁতের উপরে ঠোঁট চেপে ধরল আর চোখ বন্ধ করে ফেলল। মনে হলো যেন সামনে পেছনে দুলে দুলে সে নিজেকে ভয়ঙ্কর ভেঙে পড়া থেকে বাঁচাতে চায়। যেন একটা কোনো কান্না গিলে ফেলতে চায়। কিন্তু হঠাৎ করে শব্দবিহীন ফুঁপিয়ে উঠল। আর তারপর বেশ জোরেই। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বড় বড় নিশ্বাস নিল। চোখের পানি নেমে এসে তার গাল ভিজিয়ে দিলো, নাক বন্ধ হয়ে গেল। নাক মোছার জন্য ব্যস্ত হয়ে সে এদিক সেদিক কিছু খোঁজা আরম্ভ করল। সিলভিয়া ছুটে গিয়ে হাত ভরে কিছু টিস্যু এনে ধরিয়ে দিলেন তাকে।
“কেঁদো না। এই তো তুমি ঠিক আছ কার্লা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” তিনি বলেন। ভাবতে থাকেন কী আর করতে পারেন তিনি, হয়তো মেয়েটিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে পারেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করে সেটা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন, কে জানে তাতে যদি অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। মেয়েটি মনে করতে পারে যে সিলভিয়া কতটাই শিশুসুলভ যে এরকম একটা পরিস্থিতিতে তাকে এভাবে স্বান্ত¦না দিতে চেষ্টা করছে।
কার্লা যেন আবার কিছু একটা বলে। মনে হয় একই কথা আবার বলে।
“বিরক্তিকর”, সে আবার বলে “উহ্ বিরক্তিকর”।
“না না ঠিক আছে। আমাদের সবাইকেই একটা না একটা সময়ে কাঁদতে হয়। ঠিক আছে, কোনো বিরক্তিকর কিছু হয়নি।”
“না না ভীষণ লজ্জাজনক এসব।”
কার্লাকে এখন সিলভিয়া তার ঘনিষ্ট ছাত্রীদের একজন না ভেবে পারেন না। তারা কেউ কেউ যেমন কখনও এসে তার কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ হয়তো তাদের খারাপ নম্বর নিয়ে তার কাছে কান্নাকাটি করে, তবে কোনো কোনো সময়ে সেটা থাকে তার মন গলানোর একটা কায়দা। তখন তার ভালো লাগে না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণগুলো যা থাকে তা হলো, তাদের প্রেমঘটিত নানান সমস্যা, অথবা অভিভাবকের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ কিংবা হঠাৎ অন্তঃসত্তা হয়ে পড়া।
“কেবল ছাগল হারানোর জন্য এভাবে কাঁদছ না, তাই না কার্লা?”
“না। না ছাগলের জন্য না।”
“বরং এক গ্লাস পানি খাও।”
সিলভিয়া পানি নিয়ে ফিরতে বেশ সময় লাগান। ভাবতে থাকেন কার্লাকে কী বলে সান্ত¦না দেবেন। আর পানি হাতে ফিরে এসে দেখেন ততক্ষণে কার্লা শান্ত হয়ে গেছে প্রায়।
“এখন? এখন কেমন লাগছে কার্লা? ভালো, না?” পানি খাওয়া হয়ে গেলে কার্লাকে প্রশ্ন করেন সিলভিয়া।
“হ্যাঁ, ভালো লাগছে।”
“ছাগলটার জন্য কাঁদছ না তো কাঁদছ কেন তুমি?”
কার্লা বলল, “আমি এসব আর সহ্য করতে পারছি না।”
ক্লার্কই যে কার্লার ভেঙে পড়ার কারণ তা শেষ পর্যন্ত জানা গেল।
সে সবসময় কার্লার ওপর বিরক্ত হয়ে থাকে। বেশিরভাগ সময়ে এমন করে যেন সে কার্লাকে সহ্যই করতে পারে না। সে তাকে ঘৃণা করে। ক্লার্ক কার্লার কান্নাকাটিও সহ্য করতে পারে না। আর কেঁদেকেটে কার্লা ক্লার্কের কাছে তেমন কোনো সুবিধাও পায় না কারণ তাতে করে ক্লার্ক একেবারে পাগলের মতো রেগে যায়।
কার্লা তখন বুঝতে পারে না কী করবে।
“হতে পারে তুমি জানো তোমার কী করা উচিত”, বলে সিলভিয়া।
“পালিয়ে যাব? যদি পারতাম তবে তাই করতাম।” কার্লা আবার ফোঁপানো শুরু করে। “যদি আমার ক্ষমতা থাকত যেখানে খুশি যেতাম চলে। কিন্তু আমি তা কী করে করব? আমার কাছে না আছে কোনো টাকা আর আমার জন্য পৃথিবীতে যাওয়ার মতো না আছে কোনো জায়গা।”
“বুঝলাম। কিন্তু তুমি নিজেই চিন্তা করে দেখ, যা ভাবছ তা কি পুরোপুরি ঠিক?” সান্ত¦না দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন সিলভিয়া। “তোমার মা-বাবা নেই? তুমি না আমাকে বলেছিলে যে তুমি কিংস্টোনে বড় হয়েছ? তো সেখানে কি তোমার পরিবারের কেউই নেই?”
তার মা-বাবা পরে বৃটিশ কলাম্বিয়ায় চলে গিয়েছিল। তারা ক্লার্ককে ভীষণ অপছন্দ করত। তারা কখনও জানতেও চায়নি যে কার্লা ক্লার্কের সাথে বেঁচে আছে নাকি মরেই গেছে।
“আর কোনো ভাই-বোনও নেই?”
এক ভাই ছিল কার্লার চেয়ে নয় বছরের বড়। বিবাহিত। তারও কার্লার প্রতি কোনো টান ছিল না। কারণ সে-ও ক্লার্ককে পছন্দ করত না। আর তার বউটা ছিল ভারি অহঙ্কারী।
“তুমি কি কখনও মেয়েদের যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আছে সেসবের কথা ভেবেছ?”
“তারা তো এমনিতে কাউকে সেখানে নেবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বামী তাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে আহত করেছে। আর লোক জানাজানি হলে সেটা তো আমাদের ব্যবসার জন্যও খারাপ হতে পারে।”
সিলভিয়া একটু মুচকি হাসেন।
“পাগল মেয়ে, এটা কি তোমার ব্যবসার ভালোমন্দ ভাবার সময়?”
তখন কার্লা সত্যিই হেসে ফেলে। “আমি জানি এটা ভাবা হাস্যকর।” হেসে সে বলে, “আমি সত্যিই একটা পাগল।”
“শোনো মেয়ে”, সিলভিয়া বলে, “এবারে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। তোমার কাছে যদি কোথাও পালিয়ে যাবার টাকা থাকত, তবে কি তুমি যেতে? তখন তাহলে কোথায় যেতে বল তো, কার কাছে?”
“আমি টরেনটো চলে যেতাম।” কার্লা এমন করে বলে ফেলে যেন উত্তরটা তৈরিই ছিল। “তবে আমি আমার ভাইয়ের কাছেধারেও যাব না। হয়তো কোনো একটা মোটেলে থাকব, কাজ পেলে নিয়ে নেব আশেপাশের কোনো ঘোড়া চালানো শেখার স্কুলে।”
“তুমি সত্যিই মনে কর তুমি এটা করতে পারবে?”
“আমি তো একটা ঘোড়া চালানো শেখার স্কুলেই কাজ করতাম। যে গ্রীস্মে আমার সাথে ক্লার্কের দেখা হয়, তখনও। আর তখনকার চেয়ে এখন আমি অনেক বেশি কাজ শিখেছি। আমার অভিজ্ঞতাও বেড়েছে।”
“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি এসব আগেই ভেবে রেখেছ।” বেশ চিন্তিত মুখে বলেন সিলভিয়া।
“আমি এই এখনই ভাবলাম।” কার্লা বলে।
“তাহলে যেতে পারলে কখন চলে যেতে?”
“আজ, এখনই। এই মুহূর্তে।”
“তাহলে টাকাই একমাত্র কারণ যা তোমাকে এখানে আটকে রেখেছে?”
কার্লা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে। “হ্যাঁ, টাকাই তো, যা আমাকে বেঁধে রেখেছে।”
‘ঠিক আছে”, সিলভিয়া বলতে শুরু করেন, “ আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমার ধারণা তোমার কোনো মোটেলে গিয়ে ওঠা ঠিক হবে না। আমার মনে হয় তুমি একটা বাস ধরে টরেনটো চলে যাও আর আমার এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে ওঠো। মেয়েঠির নাম হলো রুথ স্টিলিস। সেথানে তার বেশ বড়সড় এক বাড়ি আছে। একাই থাকে। তাই তার সাথে কেউ গিয়ে থাকলে তার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তুমি চাকরিবাকরি কিছু একটা জোগাড় না করা পর্যন্ত অনায়াসে সেখানে থাকতে পার। আর আমি তোমাকে কিছু টাকা দিয়ে দিচ্ছি। টরেনটোর আশেপাশে ঘোড়া চালানো শেখার প্রচুর স্কুল আছে কিন্তু।”
“আমি জানি, আছে।”
“তাহলে তোমার কী মনে হয়? বাসস্ট্যান্ডে ফোন করে খবর নেব বাসগুলো কখন কখন ছাড়ে?”
কার্লা রাজি হয়। সে কাঁপছিল। সে তার হাত অযথা ওপরনিচ করছিল, একবার উরুর উপরে রাখছিল আর ঘনঘন মাথা দোলাচ্ছিল।
“বিশ্বাস করতে পারছি না যা হতে যাচ্ছে।” কার্লা বলে। “আমি অবশ্যই তোমার টাকা শোধ করে দেব। মানে আমি বলতে চাচ্ছি আমাকে এই সাহায্য করার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি নিশ্চয়ই তোমার টাকা যেদিন পারি শোধ করব। আমি আসলে বুঝতে পারছি না তোমাকে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব।”
“শশশ…চুপ কর। আমি বাসের সময়গুলো জেনে নিচ্ছি।” সিলভিয়া বলেন। তিনি ফোনে কিছু শুনছিলেন, কিছুক্ষণ ধরে আছেন। “ আমি জানি সে তুমি নিশ্চয়ই করবে। আর রুথের বাসায় গিয়ে উঠতে তোমার কোনো সমস্যা নেই তো?” তাকেও তাহলে জানিয়ে রাখা ভালো। যদিও এখানে একটা সমস্যা আছে অবশ্য।” সিলভিয়া কার্লার প্যান্ট আর টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই পোশাকে তুমি সেখানে যেতে পারবে না।”
কার্লা আৎকে উঠে বলে, “কিন্তু আমি যে বাড়িতে কাপড়চোপড় আনতে যেতে পারব না! এই কাপড়েই যেতে হবে আমাকে।”
“বাসগুলো যে এয়ার কন্ডিশন্ড, তুমি শীতে জমে যাবে। আমার অবশ্য একটা কিছু নিশ্চয়ই থাকতে পারে যা তোমার মাপমতো হয় কোনোরকম। আমরা দুজন প্রায় একইরকম লম্বা না?”
“তুমি আমার চেয়ে কত রোগা!”
“আগে তো আর এমন ছিলাম না।”
কিছু কাপড় দেখার পরে শেষ পর্যন্ত একটা বাদামী লিলেনের জ্যাকেট কার্লাকে পরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত হলো। দেখে মনে হয় না কখনও পরা হয়েছে। সিলভিয়া জানালেন যে এটা কিনেছিলেন ভুল করে। এই স্টাইলটা তাকে একেবারে মানায়নি। রঙচটা বাদামি প্যান্ট আর একটা ঘি রঙের সিল্কের শার্টও পাওয়া গেল যেগুলো কার্লা সাচ্ছন্দে পরতে পারে। তবে এসব কাপড়ের সাথে কার্লাকে তার নিজের স্নিকার্সই পরতে হবে। সিলভিয়ার পায়ের চেয়ে তার পা দুই সাইজ বড়।
কার্লা গোসল করতে চলে গেল। সকাল বেলা মানসিক অবস্থার কারণেই হয়তো গোসল করার কথা তার মনেই আসেনি। সিলভিয়া রুথকে ফোন করতে থাকেন। রুথের সেদিন বিকেলে কোনো একটা মিটিং ছিল তবে ওপর তলার ভাড়াটিয়ার কাছে সে বাসার চাবি রেখে যেতে পারবে। কার্লা গিয়ে তাদের দরজার বেল বাজালেই হয়ে যাবে।
“বাসস্ট্যান্ডে নেমে তাকে একটা ট্যাক্সি নিতে হবে। আমার মনে হয় এটুকু করতে তার অসুবিধা হওয়ার কথা না, নাকি?”
সিলভিয়া হেসে বলে, “আরে না না, সে অত গাধা না। চিন্তা কর না। সে কেবল বিপদে পড়েছে, হরহামেশা যেমন হয় আর কী।”
“তাবে তো হালোই। মানে আমি বলতে চাচ্ছি যে ভালোই হলো সে নিজেকে সেসব থেকে বের করে আনতে পারছে।”
“একেবারেই ভোদাই না সেÑ”, নতুন প্যান্ট আর জ্যাকেটটা গায়ে লাগে কি না দেখার জন্য কার্লা যেমন উৎসাহী হয়ে উঠেছিল একটু আগে, সেটা ভাবতে ভাবতে বলেন সিলভিয়া। অল্পবয়সের মেয়েরা কত সহজেই না একটা বিষাদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে! আর নতুন কাপড় পরে তাকে সুন্দরও দেখাচ্ছিল খুব।
শহরের বাসস্ট্যান্ডে বাসটা সাড়ে আটটার সময় এসে দাঁড়াবে। সিলভিয়া ভাবলেন দুপুরের খাবারের জন্য কিছু ডিমের ওমলেট করবেন। টেবিলের ওপরে গাঢ় নীল কাপড়টা বিছিয়ে ফেলা যায়। নিচে গিয়ে ক্রিস্টালের দুটো গ্লাস এনে একটা ওয়াইনের বোতল খুলে রাখা দরকার।
কার্লাকে ধার করা নতুন চকচকে কাপড় পরে আসতে দেখে সিলভিয়া বলেন, “আমার মনে হয় তোমার ক্ষিদে পেয়েছে।”
কার্লার নরম তিলে ভরা মুখ ঝরনার ধারার স্পর্শে জ্বলজ্বল করছিল। জবজবে চুলের রঙটা যেন হয়ে ছিল আরেকটু গাঢ়। বেণি খোলা, কোকড়ানো ছোট ছোট চুলগুলো মাথার সাথে সমান হয়ে লেপ্টে ছিল। বলল যে সত্যিই তার ক্ষিদে লেগেছে। কিন্তু যখন চামচে করে ওমলেট মুখে তুলতে গেল, হাতের কাঁপাকাঁপিতে কিছুতেই তা চালিয়ে যেতে পারল না।
“জানি না এভাবে কাঁপছি কেন,” কার্লা বলে। “আমি নিশ্চয়ই খুব উত্তেজিত। আমি কখনও ভাবতেই পারিনি যে পালিয়ে যাওয়া এত সহজ!”
“হ্যাঁ, খুব অবাক হওয়ার মতোই বটে,” সিলভিয়া বলেন। “ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক যে তোমার কাছে হয়তো সত্যি বলেই মনে হচ্ছে না।”
“বুঝতে পারছি। তবু আস্তে আস্তে সব সত্যি বলেই ধরে নিতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যেমন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, তা হয়তো কাটিয়ে উঠছি।”
“কেউ যখন কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, মানে সত্যি সত্যিই সিদ্ধান্তটা শক্তভাবে নিয়ে ফেলতে পারে, তখন হয়তো এমনই হয়। বা হওয়া উচিত।”
“সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে-” মাথা উঠিয়ে মুচকি হাসিতে মুখটা উজ্জ্বল করে কার্লা বলে, “সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে যদি কিনা আপনার মতো সত্যিকারের বন্ধু থাকে কারও।” হাত থেকে চামচ আর ছুরি নামিয়ে রেখে দু’হাতে অদ্ভুতভাবে ধরে ওয়াইন গ্লাস তুলে নেয় সে। কণ্ঠস্বরে অস্বস্তি নিয়ে বলে, “আমার তো এখন এক চুমুকও খাওয়া উচিত না। তবে আমি খাব।”
“আমিও খাব,” উদ্ভাসিত মুখে বলেন সিলভিয়া। তিনি ওয়াইনের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে গেছেন। তবে কেন যেন হঠাৎ করে অবান্তর কিছু বলে নেশা থেকে বেরিয়ে আসেন। “তো, তুমি কি ক্লার্ককে ফোন করবে? মানে কী বলবে তাকে? তার তো জানতে হবে। তোমার বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে তার তো অন্তত জানা উচিত মনে হয়।”
“না, ফোন করব না,” কার্লা বলে। তারপর যেন একটু ভয় পেয়ে বলে, “কী করে ফোন করি আমি? তুমি তাকে বলে দেবে কি?-”
“না না,” সিলভিয়া বলেন, “কখনই না।”
“এটা ভাবা অবশ্য গাধামি। আমার এমন কিছু বলাই উচিত হয়নি। আসলে কোনো কিছুই ঠিকমতো ভাবতে পারছি না। আমার হয়তো একটা চিঠি লিখে রেখে যাওয়া উচিত। মেইলবক্সে নোটের মতো একটা কিছু ফেলে যেতে পারি। কিন্তু আমি চাই না খবরটা সে এখনই পেয়ে যাক। এমনকী আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েও শহরের দিকে যাওয়া ঠিক না। পেছনের রাস্তা দিয়ে যাই, কেমন? যদি একটা নোট লিখে তোমার হাতে দেই, তো তুমি আমাকে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে ফেরার পথে আমাদের মেইলবক্সে ফেলে দিয়ে আসতে পার। তাই না?”
সিলভিয়া দেখলেন এর চেয়ে সহজ আর কিছু আপাতত নেই। তাই রাজি হলেন।
উঠে গিয়ে তিনি কাগজ-কলম নিয়ে এলেন। গ্লাসে আরও কিছু ওয়াইন ঢাললেন।
কার্লা বসে ভাবতে লাগল। শেষে লিখে ফেলল সামান্য কিছু শব্দ।
চলে গেলাম। ভালো (write) থাকব।
বাসস্ট্যান্ডে কার্লাকে নামিয়ে দিয়ে আসার পথে নোটটার ভাঁজ খুলে সিলভিয়া এই শব্দগুলোই দেখতে পেলেন। তিনি জানেন যে কার্লা ভালো থাকা (right) আর লেখার (write) পার্থক্য বোঝে। সিলভিয়া বোঝেন যে এই ভুল হয়েছে নোট লেখার ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে। সে আসলে ছিল মাত্রাতিরিক্ত আশঙ্কার মধ্যে। সিলভিয়া যতটা ভাবছেন সে হয়তো তার চেয়েও বেশি আশঙ্কায় ছিল। ওয়াইন পেটে পড়াতে সে কিছু কথা গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল বটে তবে কিন্তু কথাগুলো ছিল আবেগহীন। কিছুটা যান্ত্রিক। হাই স্কুল থেকে বেরিয়ে মাত্র আঠার বছর বয়সে যে ঘোড়া চালানো শেখার স্কুলে সে কাজ শুরু তরে, যেখানে ক্লার্কের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল, তার কথা বলছিল কার্লা। মা-বাবা চাইত যে সে কলেজে যাক। সে নিজেও চাইত যদি পশু চিকীৎসক বিভাগে পড়তে পারে সেই আশায়। জীবনে এটাই সে একেবারে মন দিয়ে হতে চাইত, সারা জীবন ধরে পশুপাখির সাথে জীবনটা কাটাতে আর গ্রামের দিকে থাকতে। স্কুলে থাকার সময়ে বরাবরই সে ছিল অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। তাকে নিয়ে অন্যান্য মেয়েরা অনেক আজেবাজে কৌতুক করত কিন্তু তার গায়ে লাগত না।
ক্লার্ক ছিল ঘোড়া চালানো শেখার জন্য সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। একদল মেয়েরা সবসময় তার পেছনে লেগে থাকত। তারা শুধুমাত্র ক্লার্ককে শিক্ষক হিসেবে পাওয়ার জন্যই ঘোড়া চালানো শিখতে যেত। কার্লা তাকে বিভিন্ন মেয়েদের সাথে ফস্টিনস্টি করার জন্য ক্ষ্যাপাত। প্রথম প্রথম মনে হতো ক্লার্ক কার্লার কথাবার্তা বেশ উপভোগই করছে, পরের দিকে বিরক্ত হতো। কার্লা বুঝতে পেরে বলা বন্ধ করে ক্ষমা চেয়েছিল তাকে বিরক্ত করার জন্য। সেসব ভুলিয়ে দেয়ার জন্য আগ্রহ করে তাকে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে অনুরোধ করেছিল। ক্লার্ক বলেছিল, তার স্বপ্ন হলো শহরের বাইরে কোথাও একটা আস্তাবল বানিয়ে ঘোড়া চালানো শেখার স্কুল করবে সে। একদিন কার্লা ক্লার্কের আস্তাবলের সামনে এসে দেখে সে ঘোড়ার পিঠে বসানো সিটের উপরে এমনিতেই বসে আছে। তাকে এক নজর দেখেই কেন যেন মন বলল যে সে ক্লার্কের প্রেমে পড়েছে।
এখন তার মনে হয় সেটা ছিল কেবলই শারীরিক টান। হয়তো ছিল কেবলই তীব্র যৌন আকর্ষণ।
তারপর শীতকাল চলে এলে কার্লার যখন ঘোড়ার আস্তাবলের কাজ ছেড়ে গুয়েল্ফের কলেজে ফিরে যাওয়ার কথা,
তখন গেল না সে, বলল আরেক বছর পরে যাবে।
ক্লার্ক কাজেকর্মে চালাকচতুর হলেও হাই স্কুল শেষ করার মতো ধৈর্য তার ছিল না। নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে সে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগই হারিয়ে ফেলল। সে এমনিতেও মনে করত যে পরিবার হলো গিয়ে নিজের শরীরের রক্তে একরকম বিষের মতো। সে একটা মানসিক হাসপাতালে কাজ করত একসময়, তারপর অ্যালবার্টার একটা রেডিও স্টেশনে সিডির জকি, থান্ডার বেইয়ের হাইওয়েতে রাস্তা দেখাশোনার কর্মী, সেলুনে চুলকাটার শিক্ষানবীশ, সেনাবাহিনীর দোকানের সেলসম্যান, একের পর এক। এসব কাজের গল্পই শোনাত সে কার্লাকে।
তাই কার্লা তার ডাকনাম দিয়েছিল যাযাবর। কারণ ক্লার্কের গল্পে তার মায়ের গলায় শোনা একটা পুরোনো গানের কথা মনে পড়ে যেত। তখন এমন হতো যে সেই গানটা গুনগুনিয়ে কার্লা বাসায় এ ঘর ও ঘর পায়চারি করত প্রায়ই। মা বুঝে ফেলেছিল যে কিছু একটা হয়েছে তার।
“কালরাত কেটেছিল পালকের বিছানায়
গায়ে দিয়ে কম্বল রেশমের
আজ রাতে আছে মেঝে শক্ত শীতল
বুক তার যাযাবর প্রেমিকের।”
তার মা বলেছিল, “সে কিন্তু তোমাকে খুব কষ্ট দেবে, জেনে রেখ।” তার ইঞ্জিনিয়র সৎ বাবা তো ক্লার্ককে কখনও তেমন পাত্তাই দেয়নি। তার কথা উঠলে বলত “ফালতু একটা”। বলত, “কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে কে জানে!” বলার সময়ে মুখটা এমন বিকৃত করে ফেলত যেন ক্লার্ক একটা বিশ্রী পোকা আর সে পারলে প্রাণপণে ঝেড়ে নিজের কাপড় থেকে তাকে ফেলে দেবে।
তখন কার্লা বলেছিল, “তো, একটা মানুষ কি কেবল যা-তা করে বেড়ালেই একটা খামার কেনার জন্য টাকা জমিয়ে ফেলতে পারে? কিন্তু সে তো সেটা করে ফেলেছে।” সৎ বাবা কেবল বলেছিল, “শোনো, মেয়ে আমি এটা নিয়ে তোমার সাথে তর্কে যাব না।” সে যে তার নিজের মেয়ে নয় সেটা মনে করিয়ে দিয়েছিল। আর সে কথাই ছিল সেই আলোচনার শেষ বাক্য।
তাই স্বাভাবিকভাবেই কার্লাকে ক্লার্কের সাথে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। তার বাবা-মা ক্লার্কের সাথে তার সম্পর্কের ব্যাপারে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল তাতে বলতে গেলে কার্লার জন্য অন্য কোনো পথ খোলা রাখেনি।
“ক্লার্কের সাথে বাড়ি ছাড়ার পরে তুমি কি টরেনটেতে তোমার বাবা-মায়ের সাথে একবারও যোগাযোগ করনি?”, সিলভিয়া জানতে চেয়েছিলেন।
কার্লা ভ্রু কুচকে, গাল ওপরে টেনে নিয়ে মুখ গোল করে ফেলেছিল। তারপর বলেছিল, “না তো!”
সে নিশ্চয়ই ততক্ষণে কিছুটা নেশাগ্রস্থ হয়ে গিয়েছিল।
কার্লার লেখা ছোট্ট নোটটা মেইলবক্সে ফেলে বাসায় ফিরে আসেন সিলভিয়া। টেবিলের ওপরে পড়ে থাকা ময়লা বাসনগুলো ধুয়ে মুছে রাখেন। অমলেট বানানোর তাওয়াটা ধুয়ে রাখেন, টেবিলের নীল রঙের কাভারটা ধোয়ার জন্য রেখে দিয়ে নীল ন্যাপকিনগুলো ফেলে দেন। জানালা খোলেন। কার্লার গোসলের জন্য তিনি আপেলের গন্ধওলা নতুন একটা সাবান বের করে দিয়েছিলেন। বাসায় তখনও সেই গন্ধটা ঘুরছিল। গাড়িতেও ভরে গিয়েছিল একই গন্ধ।
বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে। তিনি আর বসে থাকতে পারছিলেন না। তাই লিয়নের বানানো পায়ে চলা রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। কাদার উপরে লিয়ন যে নুড়ি পাথরগুলো বিছিয়েছিলেন সেগুলোর বেশির ভাগই পানির স্রোতে ধুয়ে গেছে। এই রাস্তা ধরে তারা শীতকালে প্রায়ই বনের ভেতরে যেতেন বন্য অর্কিড খুঁজতে। সিলভিয়া তাকে অনেক বন্য গাছের নাম শিখিয়েছিলেন, তবে কেবল ট্রিলিয়াম ছাড়া বাকি সবগুলো নামই তিনি ভুলে যেতেন। তিনি সিলভিয়াকে তার নিজস্ব ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলে ডাকতেন।
এই তো গত বসন্তে সিলভিয়া বনের ভেতরে গিয়ে তার জন্য একগাদা বেগুনি অর্কিড নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই ফুলগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিলেন যেভাবে তিনি মাঝেমধ্যে সিলভিয়ার দিকেও তাকান, ক্লান্ত আর নির্লিপ্ত চোখে।
কার্লা বাসে উঠে বসা পর্যন্ত সিলভিয়া তাকিয়ে ছিলেন। কার্লার ধন্যবাদ বলাটা ছিল মন থেকেই কিন্তু ততক্ষণে বারবার শোনা কথার মতো মনে হচ্ছিল। তার হাত নাড়ানোটাও যেন যান্ত্রিক। সিলভিয়ার সুনজর পাওয়াতে যেন ততক্ষণে কার্লা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সিলভিয়া টরেনটোতে রুথকে ফোন করলেন। কার্লা তখনও সেই বাসায় গিয়ে পৌঁছেনি নাকি- সিলভিয়া বারবারই পাচ্ছিলেন অ্যানসারিং মেশিনের শব্দ।
“রুথ-”, সিলভিয়া অ্যানসারিং মেশিনে মেসেজ রাখলেন, “তোমার কাছে যে মেয়েটিকে পাঠালাম, তার ব্যাপারে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। সে গেলে আবার তোমার কোনো অসুবিধা না হয়! আশা করি হবে না। সে আসলে ভেতরে ভেতরে এতই শান্ত আর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, তারুণ্যে ঝলমল। যাই হোক, অসুবিধা হলে আমাকে জানিও, ঠিক আছে?”
ঘুমাতে যাবার আগে সিলভিয়া আবর ফোন করলেন। কিন্তু সেই একই অ্যানসারিং মেশিনের শব্দ। তিনি আবারও মেসেজ রাখলেন, “রুথ, আবারও সিলভিয়া বলছি, সে গেছে কি না জানার জন্য-” সিলভিয়ার আর কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। ফোনটি হয়তো তিনি করেছিলেন রাত নয়টা-দশটার দিকে। তখনও খুব ঘুরঘুটি অন্ধকার হয়নি। রুথ নিশ্চয়ই এখনও বাসায় ফেরেনি আর কার্লা অপরিচিত বাসার ফোন বাজলেও ধরবে না। সিলভিয়া রুথের ওপরের তলার ভাড়াটিয়ার নাম মনে করার চেষ্টা করতে থাকেন। তারা নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েনি। কিন্তু নামটা কিছুতেই মনে আসে না। আর তাছাড়া, তাদের বাসায় হুট করে ফোন করে ফেলাটা হয়তো ঠিকও হবে না, ভাববে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মহিলা কিংবা খামাখা ঝামেলা।
সিলভিয়া বিছানায় কিছুক্ষণ ছটফট করে উঠে বসলেন। একটা পাতলা কম্বল নিয়ে বসার ঘরে এসে সোফায় শুয়ে পড়লেন। লিয়ন বেঁচে থাকার শেষ তিন মাস তিনি এই সোফার উপরেই ঘুমাতেন। তিনি অবশ্য ভাবেননি যে সেখানে গিয়ে শুলেই তার ঘুম চলে আসবে। বনের দিকের জানালায় কোনো পর্দা নেই। শুধু আকাশের রঙ দেখে তিনি বলে দিতে পারেন চাঁদ উঠেছে কি না। যদিও সেখান থেকে চাঁদ দেখতে পাওয়ার কথা নয়।
পরমুহূর্তেই কেন যেন তার মনে হচ্ছিল, তিনি একটা বাসে করে চলছেন, গ্রিসে কি?- তার সাথে বাসে আরও অনেক মানুষ আছে যাদের কাউকে তিনি চেনেন না। আর বাসের ইঞ্জিন কেন যেন একরকম অ্যালার্মের মতো শব্দ করেই চলছে। একসময় আবার মনে হচ্ছে শব্দটা ঠিক অ্যালার্ম নয়, বরং দরজা ধাক্কানোর মতো। ঘুম ভেঙে তিনি ঠিক শুনতে পেলেন যে দরজাঢয় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে।
কে হতে পারে, কার্লা?
বাসটা শহর ছাড়িয়ে যাবার আগ পর্যন্ত কার্লা তার মাথা নামিয়েই রেখেছিল। জানালার কাচে কালচে প্রলেপ লাগানো ছিল, বাইরে থেকে এমনিতেও দেখা যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু কার্লা নিজেও বাইরের তাকায়নি। ভয়ে, যদি হঠাৎ ক্লার্ককে দেখে ফেলে। ক্লার্ক তো তার চলে যাবার ব্যাপারে কিছুই জানে না। সাধারণ একটা বিকেলের মতোই হয়তো সে কোনো দোকান থেকে বেরিয়ে আসছে, কিংবা কোনো রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করছে। নাও হতে পারে। হয়তো সে ভাবছে তাদের পরিকল্পনা, আসলে সেটা ক্লার্কেরই পরিকল্পনা, সেটা কতদূর আগাল, কার্লা আজ সেটা বাস্তবায়নের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে পারল কি না।
তারপর যখন তারা গ্রামটা পেরিয়ে গেল, কার্লা মাথা তুলল। জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো, মাঠের দিকে তাকাল। ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে হালকা বেগুনি আভা ছড়ানো। মিসেস জেমিসনের উপস্থিতি তাকে এমন একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয় দিয়েছিল যে তার সাহায্যে এই যে কার্লা পালিয়ে যাচ্ছে, এটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে যৌক্তিক। কার্লার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সে-ও এমন করত। কার্লা নিজের ভেতরে অদ্ভুত এক শক্তি অনুভব করে, সে যেন একদিনেই অনেক পরিপক্ক হয়ে গেছে। নিজের জীবনের কত কত কথা মিসেস জেমিসনকে এমন অবলীলায় শোনাল যেন তার সহানুভ‚তি না পেয়েই যায় না। যদিও কথাগুলো ছিল সত্য এবং তার কষ্টেরই কথা। আর কার্লা যেন এমন করেই বেঁচে থাকতে চায় যেমন করে মিসেস জেমিসন কার্লার বাঁচা উচিত বলে মনে করেন। সে অবশ্য মিসেস জেমিসনকে হতাশ করতে পারত, তবে করতে চায়নি। কার্লার কাছে তাকে ভীষণ সহানুভ‚তিশীল আর সংবেদনশীল মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে কার্লা যা করছে তাতে কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা নয়।
যদিও তিনি তার পরের সময়টাতে কার্লার সাথে থাকবেন না।
অনেক্ষণ হলো সূর্য বেশ কড়া হয়ে ছিল। তারা যখন একসাথে দুপুরের খাবারের জন্য টেবিলে বসেছিল, তখন ওয়াইন গ্লাসগুলো রোদে ঝকমক করছিল। আজ সকাল থেকে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। কিন্তু এখন এত বাতাস যে রাস্তার ধারের ঘাসগুলোতে আলোড়ন তুলছে। আগাছায় মাথা উঁকি দেয়া ছোট ফুলগুলো ভেজা বৃন্ত থেকে এই উড়ে যায় বুঝি। গরমকালের গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ, ঠিক বৃষ্টি হবার মেঘ নয়, আকাশের এদিক থেকে ওদিকে চলে যাচ্ছে। গ্রামের দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে নিজেকে একেবারে বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে যেন জুলাইয়ের উজ্জ্বল দিনগুলোকে আপন করে নিচ্ছে। বাসটা যত এগিয়ে যাচ্ছে ততই অন্যরকম লাগছে দেখতে। এই কিছুক্ষণ আগের অতীতের কোনো চিহ্ন নেই, মাঠে কোনো বড় ডোবা নেই, কোথাও বীজ ধুয়ে নিয়ে গেছে এমনও মনে হচ্ছে না। এমনকী ভ‚ট্টার ক্ষেতে ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ে আছে, এমনও নেই।
এসব দেখতে দেখতে কার্লার মনে হলো, ক্লার্ককে বললেই হতো যে তারা আসলে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি দুর্যোগের একটা জায়গা বেছে নিয়েছে থাকার জন্য। ওদিকটায় ভীষণ বৃষ্টি আর স্যাঁতসেতে। অথচ এদিকে কত সুন্দর জায়গাগুলো পড়ে আছে যেখানে হয়তো তাদের জীবনটা অনেক সহজ হতো।
এখনও বললে চলে না?
তারপর ধীরে ধীরে তার মাথায় আসে যে সে এখন ক্লার্ককে আর কিছুই বলতে যাচ্ছে না। হয়তো আর কোনোদিনই বলবে না। ক্লার্কের এখন কী অবস্থা সেটা সে আর কখনই ভাববে না। ভাববে না গ্রেস, মাইক, জুনিপার বা ব্ল্যাকবেরি কিংবা লিজি বর্ডেনকে নিয়ে। এমনকী কোনোভাবে যদি ফ্লোরাও ফিরে আসে, সে তার দিকে ফিরেও তাকাবে না।
সবকিছু ছেড়ে কার্লা এবারে দ্বিতীয়বারের মতো চলে যাচ্ছে। প্রথমবার ছিল বিটলসের সেই পুরোনো গানের মতো। টেবিলের উপরে ছোট্ট চিঠি রেখে, সবার অগোচরে পা টিপে টিপে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে রাস্তার শেষ মাথায় চার্চের গাড়ি রাখার জায়গায় ক্লার্কের কাছে গিয়েছিল। তার সাথে দেখা হবার পরে সে সত্যি সত্যিই সেই গানটা গুনগুন করে গাইছিল সেদিন। চলেই যাচ্ছে সে, বিদায়-বিদায়। তার এখনও মনে পড়ে পেছনে সূর্য কী তীব্র হয়ে উঠেছিল। স্টিয়ারিং-এর উপরে ক্লার্কের হাতের দিকে সে কীভাবে তাকিয়ে ছিল। ক্লার্কের বলিষ্ট হাতের উপরে কালো কুচকুচে লোম এখনও সেদিনের সেই মুহূর্ত মনে করায়। ট্রাকের ভেতরের ধাতব, তেলতেলে আর ঘোড়ার আস্তাবলের মেলানো গন্ধটা চাইলেই নাকে লাগে। পড়ন্ত বেলার শীতল বাতাসে ট্রাকের ওপরের ত্রিপলটা পতপত করে উড়ছিল। সেটা ছিল এমনই অদ্ভুত এক গাড়ি যেটাতে তার পরিবারের কেউ কখনই ওঠেনি। তাদের বাড়ির এলাকায় ওরকম গাড়ির আনাগোনা হতো খুব মনে রাখার মতো ঘটনা।
সেই সকালে হাইওয়ের অতিরিক্ত গাড়ির চাপ নিয়ে ক্লার্কের অনুমাণ, রাস্তার অন্য ট্রাকগুলোর চালানোর ধরণ সম্পর্কে মন্তব্য, তার তীক্ষè চোখ, এমনকী চড়া রোদে সে চোখের সরু হয়ে যাওয়া, সবই কার্লাকে মুগ্ধ করেছিল। ক্লার্কের অতীত জীবনটা ছিল কষ্টের। একা থেকে থেকে যা হয়েছে সে কারও সাথেই স্বাভাবিক হতে পারত না। কেবল নমনীয় হতো ঘোড়াগুলোর সাথে আর কার্লার সাথে। তাই তারপরের দিনগুলোতে কার্লা নিজের জীবনের কারিগর হিসেবেই ক্লার্ককে দেখত। নিজেকে মনে করত তার হাতের খেলনা আর তার উপরে ছড়ি ঘোরানোর প্রবণতাকে কী যে মধুর লাগত!
“তুমি জানো না তুমি পেছনে কী ফেলে গেলে”, কার্লার মা লিখেছিল। চলে আসার পরে সেই একটাই চিঠি লিখেছিল কার্লার নামে, যার কোনো উত্তর সে কখনও দেয়নি। কিন্তু সেদিন বাসা থেকে কাকডাকা ভোরে বেরিয়ে পড়ার সময়ে যদিও পরিষ্কার ধারণা ছিল না যে কোথায় যাচ্ছে তবে সে জানত যে কী ফেলে যাচ্ছে। সে তার বাসার কাউকে পছন্দ করত না, চাইত না তাদের আরামদায়ক বাড়ি, উঠোন, ফোটো অ্যালবাম,তাদের সাথে কাটানো ছুটি, তাদের খাবারের রুচি, সাজার ঘর, কাপড়ের বিলাসী ক্যাবিনেট, মাঠের ঘাসে পানি ছিটানোর স্প্রিঙ্কল, কিছুই চাইত না। চলে যাবার সময়ে তার লেখা ছোট চিঠিতে সে অকৃত্রিম শব্দটি ব্যহার করেছিল। লিখেছিল, আমি সবসময় অকৃত্রিম একটা জীবন চেয়ে এসেছি। আর আমি জানি আমার সেই চাওয়াটা তোমরা কেউ বুঝবে না।
রাস্তায় পড়া প্রথম বড় শহরটাতে বাসটা থামল। যেখানে থামল সেটা একটা গ্যাস স্টেশন। এটা ঠিক সেই গ্যাস স্টেশন যেখানে কার্লা আর ক্লার্ক প্রথম প্রথম গাড়ির জন্য সস্তায় গ্যাস নিতে আসত। সেই সময়ে তারা দুজন আশেপাশের শহরগুলোতে ঘুরে বেড়াত। তাদের দেখলে মনে হতো টুরিস্ট। এখানে ওখানে ঢু মারত, নানান শহরের নানান বারগুলোতে বসে ড্রিংক করত। শুকনো মাংস, আলুর প্যানকেক আর বিয়ার সাথে নিয়ে ঘুরত। আর তারপর বাড়ি ফেরা পর্যন্ত রাস্তাঘাটে পাগলের মতো চিৎকার করে এলোমেলো গান গেয়ে যেত।
কিন্তু কিছুদিন পরে এসব বাইরে যাওয়া-টাওয়াকে মনে করা হতো সময় আর টাকার অপচয়। তারা বুঝেছিল যে মানুষ কেবল জীবনের বাস্তবতা বোঝার আগপর্যন্তই তাদের মতো ওরকম আচরণ করতে পারে।
কার্লা বাসে বসে কাঁদছিল। সে বুঝতেই পারেনি তার চোখ বারবার পানিতে ভরে যাচ্ছে। এখন তার জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপ, টরেনটোকে নিয়ে ভাববে বলে সে নিজেকে সামলে নিলো। অচেনা এক ট্যাক্সিতে উঠে অদেখা এক বাড়িতে গিয়ে সে উপস্থিত হবে। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বিছানায় একা ঘুমাবে। তারপর কাল ফোনবুক দেখে আশেপাশের আস্তাবলগুলোতে চাকরির জন্য খোঁজখবর করবে।
কিছুতেই বিষয়টা অনুধাবণ করতে পারছিল না। নিজেকে অচেনা এক রাস্তায় গাড়িতে চড়তে, কারও ঘোড়ার দেখাশোনা করতে, নতুন এক গাদা মানুষের সাথে কথা বলতে আর তাদের মাঝে থাকতে সে কিছুতেই কল্পনা করতে পারছিল না যেখানে কিনা ক্লার্ক নেই।
সে এমন একটা জীবন বা জায়গা বেছে নিতে যাচ্ছে যেখানে একটিই শর্ত, ক্লার্কবিহীন হতে হবে।
কিন্তু এ নিয়ে সে যত ভাবতে লাগল, ততই মনে হলো যে সামনের সময়গুলো তার জন্য হবে ভয়াবহ। তখন সে যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল, সে আসলে ওরকম একটা অবস্থায় বাঁচতেই পারে না। হয়তো হাঁটবে-চলবে, কথা বলবে, এটাওটা করবেও কিন্তু সেখানে আসলে সে নিজে থাকবে না। আর এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে সেরকম একটা জীবনের আশায় এই বাসে সে চেপেছে। যেমন মিসেস জেমিসন খুব তৃপ্তি নিয়ে বলেছিলেন যে এখন থেকে কার্লা তার নিজের জীবনের ভার নিজেই বহন করবে। এরপর আর কেউ তার ওপরে ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। কারও ভালো লাগা মন্দ লাগায় তার আর কিছু যাবে-আসবে না।
কিন্তু তাহলে সে কী নিয়ে ভাববে? কী করে সে বুঝবে যে সে বেঁচে আছে?
ক্লার্ককে ছেড়ে সে পালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ক্লার্ক তো তার ভেতরে জায়গা করে বসেই আছে। কিন্তু এই পালানোর রাস্তা যখন শেষ হবে, সে একটা স্থির জীবনে গিয়ে পৌঁছবে, তখন ক্লার্কের সেই জায়গাটা সে কী দিয়ে পূরণ করবে? কী জিনিস কিংবা কোন মানুষ সেই জায়গাটা নিতে পারে?
কান্না সে যদিও থামিয়েছিল কিন্তু তখন কাঁপুনি আর কিছুতেই থামাতে পারছিল না কার্লা। এরকম চলতে থাকলে তার অবস্থা বেশ খারাপের দিকে যাবে। নিজেকে সামলাতে হবে। “সামলাও, কার্লা সামলাও”, নিজেকে বলে সে। কষ্টে ভেঙে পড়ে কখনও কোনো ঘরে বসে যখন সে কাঁদতে থাকে, সাথে কান্না থামাতেও চায় ক্রমাগত, তখন ক্লার্ক যদি সে ঘরে আসে তবে কার্লাকে বলে নিজেকে সামাল দিতে। কার্লা জানে এখন ঠিক সেটাই করা উচিত।
বাসটা আরেকটা শহরে থামল। কার্লা যেখান থেকে বাসে উঠেছে তারপরে এটা তৃতীয় শহর হওয়ার কথা। তার মানে দ্বিতীয় শহরে থামার ব্যাপারটা কার্লা খেয়ালই করেনি। বাসটা নিশ্চয়ই থেমেছিল। ড্রাইভার যাদের নামার কথা তাদের নাম ধরে ডেকেছে, তারা নেমেও গেছে, অথচ সে নিজের ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে এমনভাবে ডুবে ছিল যে কিছুই বলতে পারে না। এই আরেকটু পরেই তারা হাইওয়েতে উঠে যাবে আর টরেনটোর দিকে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটবে।
আর তারপর কার্লা যাবে হারিয়ে।
সে সত্যি উধাও হয়ে যাবে। তারপর ট্যাক্সি ডেকে নতুন একটা ঠিকানা বলা, নতুন একটা জায়গায় সকালে উঠে দাঁত ব্রাশ করে আনকোরা একটা জীবনে গিয়ে ঢোকার কী মানে হয়? তাকে কেন একটা চাকরি যোগাড় করতে হবে? কেন নিজের জন্য টাকা আয় করতে হবে? কেন তাকে পাবলিক বাসে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে হবে?
কার্লার মনে হচ্ছিল তার পা দুটো যেন নিজের শরীর থেকে অনেক দূরে। অপরিচিত একটা প্যান্টের ভেতরে তার হাটুদুটো যেন লোহার মতো জমে গেছে। কাদায় পড়া একটা ঘোড়ার মতো মাটির ভেতরে ডুবে যাচ্ছে সে। যেন আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না।
যে শহরে বাসটা থেমেছিল সেখানে অপেক্ষমান যাত্রীরা তাদের ব্যাগসহ উঠে পড়েছে। এক মহিলার কোলে ফুটফুটে বাচ্চা। তারা দুজন বাইরে কাউকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিল। বাসের পাশের বিল্ডিংটা, যেটাতে বাসযাত্রীরা চা-কফি খেয়ে নিতে পারে, আস্তে আস্তে দূরে সরে গেল। এমন করে জানালা আর ইটের দেয়ালগুলো পেছনে চলে গেল যেন তরল হয়ে ঢেউয়ের মতো গলে পড়ল। জড় পদার্থের মধ্যে হঠাৎ জীবন সঞ্চারের মতো কার্লা তার জমে থাকা ভারি শরীর টেনে ওঠাল। তার লোহার মতো শক্ত হাটু সামনে টেনে উঠে দাঁড়াল। বাসের গায়ে চাপড় মেরে চিৎকার করে বলল, “আমাকে নামতে দাও।”
ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষল। বিরক্ত মুখে বলল, “আমার মনে হয় তোমার টরেনটো যাবার কথা ছিল?” অন্য যাত্রীরা তার দিকে কৌত‚হলী চোখ নিয়ে তাকাল। কেউ বুঝতে পারল না কার্লা কোন অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
“আমাকে এখানে নামতেই হবে।”
”বাসের ভেতরে পেছনের দিকে একটা টয়লেট আছে কিন্তু।”
“না। না। আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও।”
“কিন্তু বাস তো এখানে দাঁড়াতে পারবে না। বুঝতে পারছ তুমি? এখানে দাঁড়ানো যায় না। তোমার লাগেজ আছে না নিচে?”
“না। মানে হ্যাঁ। না, আমার কোনো লাগেজ নেই।”
“লাগেজ নেই তোমার?”
বাসের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে, “ক্লসট্রোফোবিয়া। হ্যাঁ, ওটাই হয়েছে এই মহিলার। গুমোট লাগছে ওর। ভাগতে চাইছে বাস থেকে।”
“তুমি কি অসুস্থ?” ড্রাইভার বলে।
“না। আমি কেবল নেমে যেতে চাই।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। নেমে যাও। আমার কী?”
“আসো, আমাকে নিয়ে যাও। আসো না, নিয়ে যাও আমাকে।”
“অবশ্যই।”
সিলভিয়া ভুলে দরজায় তালা লাগাননি। একবার মনে হলো তিনি লাগিয়েছিলেন। এখন মনে হয় লাগাতে গিয়ে খুললেন আবার। কিন্তু না, লকটা খোলাই ছিল।
সেখানে কেউ ছিল না।
একটু আগে কেউ দরজায় নক করেছিল। দরজার ওপরে শব্দ সিলভিয়া পরিষ্কার শুনেছেন।
আর এখন মনে হচ্ছে পাশের জানালা থেকে যেন একটা আঙুল দিয়ে বাজানো তালের মতো শব্দ আসছে। যেন কেউ বাজনা বাজাচ্ছে। তিনি বাতি জ্বাললেন একবার। কিছুই নেই কোথাও। আবার বাতি নেভালেন। কোনো ছোট প্রাণী হতে পারে কি? কোনো কাঠবেড়ালী? জানালার দিকে ভেতরের বারান্দায় যাবার দরজাতেও বোধ হয় তালা লাগানো হয়নি। এমনকী দরজাটাও পুরোপুরি লাগানোও হয়নি। এক ইঞ্চিমতো খোলা আছে। সেটা দিয়েই পুরো বাসায় বাতাস খেলছিল। তিনি একে একে সব দরজা জানালা লাগানো শুরু করেন। ঠিক তখনই কেউ যেন হেসে ওঠে। সে ঘরেই তার বেশ কাছে থেকেই কেউ একজন হা হা করে হাসল।
“এই যে আমি”, লোকটা বলে। “ভয় পেয়েছেন?”
দরজার কাঁচে ঠেস দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। মিসেস জেমিসনের ঠিক পাশে।
“এই যে আমি, ক্লার্ক।” সে বলে। “ওই পাহাড়ের নিচে থাকি, সেই ক্লার্ক।”
তিনি তাকে ভেতরে আসতে বলেননি। আবার তার মুখের উপরে দরজাটা লাগিয়ে দিতেও বাধছিল তার। বন্ধ করতে গেলেও ক্লার্ক নিশ্চয়ই ঠেলে ঢুকে যেতে পারবে। তিনি ঠেকাতে পারবেন না। ছুটে গিয়ে বাতিও জ্বালেননি। কেবল একটা লম্বা টি শার্ট পরে ঘুমিয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি সোফার উপর থেকে কম্বলটা টেনে গায়ে জড়িয়ে নেয়ার কথা মনে হলো তার। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।
“আপনি কি কাপড়চোপর ঠিকঠাকমতো পরতে চান? ক্লার্ক বলে। “এই দেখেন আমার হাতে কী, এটা ঠিক সেই জিনিস যা আপনার এখন লাগবে।”
ক্লার্কের হাতে একটা ব্যাগ। সে উঁচু করে দেখাল কিন্তু ঠেলে ঘরে ঢোকার কোনো চেষ্টা করল না।
“এটার মধ্যে কী?” ভাঙা ভাঙা আওয়াজে জানতে চান মিসেস জেমিসন।
“নিজেই দেখে নেন না, এটার ভেতরে বোম নেই। এই যে, দেখেন।”
তিনি ব্যাগের ভেতরে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন। ভেতরে নরম নরম একটা কিছু মনে হয়। আর ঠিক তার পরপরই তিনি জ্যাকেটের বোতামটা চিনতে পারেন। তারপর সেই সিল্কের শার্টটা, তারপর বেল্ট আর সেই প্যান্টটাও।
“ভাবছিলাম এসব যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আপনাকে ফেরত দেয়াই ভালো।” সে বলে। “এসব তো আপনারই জিনিস, তাই না?”
তিনি দুই ঠোঁট এমন করে চেপে রেখেছেন যেন মুখ থেকে কোনো শব্দ না বেরোয়। ভয়ে তার গলা-মুখ শুকিয়ে আসে।
“আমি জানি, কাপড়গুলো আপনারই”, নরম গলায় বলে ক্লার্ক।
মিসের জেমিসনের জিব যেন উলের বলের মতো অসার হয়ে যায়। তিনি যেন তাতে জোর দিয়ে কেবল একটি কথা বলতে পারেন, “কার্লা কোথায়?”
এবারে তিনি ক্লার্কের মুখ আরও স্পষ্ট দেখতে পান। তিনি বুঝতে পারেন, তাকে এভাবে অপদস্ত করতে সে কী মজাটাই না পাচ্ছে।
“আমার স্ত্রী কার্লা বাসায়। তার নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। ঠিক সেখানেই আছে যেখানে তার থাকার কথা।”
ক্লার্ক দেখতে একই সাথে হ্যান্ডসাম আর হাস্যকরও। বেশ লম্বাচওড়া, শক্তপোক্ত মানুষ অথচ কেমন যেন বোকা বোকা ভাবভঙ্গি করে। দেখলে মনে হবে নিজের ব্যাপারে বেশ সচেতন আর হিসেবিও অথচ মানুষের ক্ষতি করতে চাওয়ার একটা অদম্য ইচ্ছে নিয়ে যেন সবসময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কপালের উপরে একগুচ্ছ কালো চুল পড়ে থাকে, নাকের নিচে তারের মতো সরু একটা গোঁফ। চোখগুলো দেখলে মনে হয় যেন বেশ আশাবাদী আবার মিথ্যেবাদীও। মুখে একটা সরল হাসি লেগে থাকে অথচ সময়ে আবার বদরাগী।
মিসেস জেমিসন সবসময়েই ক্লার্ককে অপছন্দ করতেন। তাকে ভালো না লাগার কথা তিনি লিয়নকেও বলেছিলেন। লিয়ন তার সম্পর্কে বলেছিলেন, মানুষটা আসলে জানেই না সে কী রকম। সে আসলে একটু বেশিই বন্ধু হতে চায় সবার।
যাই হোক ক্লার্কের প্রতি লিয়নের সেই ধারণা ছিল বলে মিসেস জেমিসন যে এখন তার কাছ থেকে নিরাপদ, তা নয়।
“আপনার মুখটা তো একেবারে শুকিয়ে গেছে দেখি!” ক্লার্ক বলে। “যাই হোক কার্লার ছোট্ট অভিযান শেষ হয়েছে। কাপড়গুলো চিনতে পেরে আপনার মুখটা যা হয়েছে না, দেখার মতো। এত ভয় পেয়েছেন কেন? আপনি কি ভেবেছেন আমি তাকে খুন করে ফেলেছি?”
“আমি আসলে খুব অবাক হয়েছি”, কোনোরকমে বলেন সিলভিয়া।
“আমি বাজি ধরে বলতে পারি আপনি খুবই অবাক হয়েছেন। তাকে পালানোর জন্য এতকিছু করার পর তো অবাক হওয়ারই কথা।”
“হ্যাঁ, আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম-” সিলভিয়া যেন নিজের কাজের একটা যুক্তি দিতে চান, “ আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম কারণ সে ছিল খুবই অশান্তির মধ্যে।”
“অশান্তি?” ক্লার্ক বলে, “শব্দটাকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে অবশ্য বলতে হয় হ্যাঁ, অবশ্যই সে অশান্তির মধ্যে ছিল। ভীষণ অশান্তির মধ্যে ছিল বলেই তখন বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছিল। তারপর আমাকে ফোন করে বলল সেখানে গিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে। অশান্তিতে ছিল বলেই এত জোরে জোরে কাঁদছিল যে আমি বুঝতেই পারছিলাম না সে কী বলতে চাচ্ছে।”
“সে কি ফিরে আাসতে চেয়েছিল?
“নিশ্চয়ই! বিশ্বাস না হলে বাজি ধরতে পারেন। তার আসল অশান্তিটা তো তখনই বোঝা গেল যখন সে পাগলের মতো কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিল। সে এমন একটা মেয়ে যার আবেগের কাটা কেবলই ওঠানামা করে। কিন্তু সে যাই হোক, আপনি তো আর তাকে সেভাবে চেনেন না যতটা আমি চিনি।”
“তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল পালিয়ে যেতে পেরে সে খুব খুশি।”
“সত্যি নাকি? যাই হোক, আমি আপনার কথাই মেনে নিচ্ছি। আমি এখানে আপনার সাথে তর্ক করতে আসিনি।”
সিলভিয়া চুপ করে থাকেন।
“আমি আসলে আপনাকে কেবল একটা কথাই বলতে এসেছি যে আমার বউকে ভড়কিয়ে এই যে আমাদের জীবনে হঠাৎ আপনি হস্তক্ষেপ করলেন, এটা আমার কাছে একদম ভালো লাগেনি।”
“হাজার হলেও সে তো একটা মানুষ-”, সিলভিয়া বলতে থাকেন, যদিও তিনি জানেন সেই মুহূর্তে তার চুপ করেই থাকা উচিত। “মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তোমার বউয়ের বাইরে তার আরও একটা পরিচয় আছে যে সে একটা মানুষ।”
“কসম, তাই নাকি? আমার বউ একজন মানুষও? সত্যি বলছেন? এটা জানানোর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু সিলভিয়া, আমার ওপরে মাতব্বরি করতে আসবেন না।”
“না না, তোমার ওপরে মাতব্বরি করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।”
“ভালো। এটা জেনে খুশি হলাম। খামাখা খামাখা আমি রেগে যেতে চাই না। আমার কেবল আপনাকে কয়েকটা জরুরি কথা বলার ছিল। প্রথম কথা হলো আমার এবং আমার স্ত্রীর জীবনে কোথাও কোনোভাবে আপনার নাক গলানোর দরকার নেই। আর দ্বিতীয় কথা হলো আমি চাই না যে সে আর এ বাড়িতে আসুক। এমনও না যে সে খুব একটা আসতে চায় এখানে। আমি সবসময় দেখি, সে একবারেই এখানে আসার ব্যাপারে রাজি হতে চায় না। আর এই মুহূর্তে সে আপনাকে ভালো চোখে দেখছে না, এটাও সত্যি। সুতরাং এখন নিজেকেই নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখা শিখতে হবে আপনার। তো, এবারে বলেন, আমার সব কথাগুলো আপনার মাথায় ঢুকেছে?
“খুব ভালোভাবে।”
আমি সত্যিই চাই ভালোভাবে ঢুকুক। আপনি বুঝতে পেরেছেন আশা করি।”
সিলভিয়া বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই।”
“আর আমি কী ভাবছি তা জানেন?”
“কী?”
“আমার মনে হয় আপনার কাছে আমার কিছু পাওনা আছে।”
“কী?”
“আমার মনে হয় আপনার কাছে আমার পাওনা আছে একটা জিনিস। পাওনা আছে একটা ক্ষমাপ্রার্থনা।”
“ঠিক আছে। তুমি যদি তাতে খুশি হও, আমি দুঃখিত সবকিছুর জন্য।”
ক্লার্ক কিছুটা এগিয়ে আসে। তার শরীরের নড়াচড়ায় সিলভিয়া চমকে ওঠে।
ক্লার্ক শব্দ করে হাসে। দরজার ফ্রেমের উপরে হাত দিয়ে রাখে যেন সিলভিয়া বন্ধ করতে না পারেন।
“কী করছ?”
“কী আবার করব?” ক্লার্ক হাসতে হাসতে বলে। যেন সিলভিয়া বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু একটা করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেটা ঠিক করা হয়নি তাই। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে জানালার কাচে যেন একটা কিছুর ছবি দেখা যায়। ক্লার্ক এদিক ওদিকে ফিরে খোঁজে কিছু একটা।
বাড়িটার সামনে চওড়া যে একটুকরো জমি আছে তা বছরের এই সময়ে প্রায়ই হালকা কুয়াশায় ঢেকে থাকে। আবছা কুয়াশা সেদিনও ছিল। কিন্তু তখন একটা সময়ে মনে হয় যেন কিছু একটা বদলে গেল। কুয়াশা সে রাতে তখন ঘন হয়ে আসে আরও, কেমন যেন একটা অন্যরকম আকৃতি নেয়, মনে হয় ধারালো আর ধবধবে সাদা একটা কিছু। প্রথমে দেখা যায় একটা কোনো সাদা বল লাফিয়ে লাফিয়ে তাদের দিকে আসছে। তারপর আবার এদিকেওদিকে ছোটাছুটি করে। পরে মনে হয় সাদা কোনো একটা জন্তু, ধবধবে সাদা, যেন কুঁজো হয়ে আছে। হয়তোবা বিকট এক শিংওলা একটা ঘোড়া কুয়াশাসমেত তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
“হায় ঈশ্বর!” ক্লার্ক প্রার্থনার ভঙ্গিতে মিনিমিন করে বলে। তারপর দরজায় ধাক্কা দিয়ে সিলভিয়ার ঘাড়ে হাত রাখে। ক্লার্কের এই ছোঁয়ায় সিলভিয়ার একটুও ভয় লাগে না। যেন মনে হয় হয় সে হয় তাকে রক্ষা করতে না-হয় নিজেকে বাঁচাতে সিলভিয়াকে ধরেছে।
ঠিক তখনই সবকিছু একটু ফর্সা হয়ে যায়। রাস্তায় একটা গাড়ি দ্রুত পেরিয়ে যায়। হয়তো কোনো পার্ক বা হোটেলের খোঁজ করছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় কুয়াশার মধ্যে থেকে স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসে সাদা ধবধবে একটা ছাগল। ছোট ছাগলটা নাচতে নাচতে এগিয়ে আসে। ক্লার্ক সিলভিয়াকে ছেড়ে দেয়। বলে, “হায় ঈশ্বর, তুই কোত্থেকে এলি?”
“এটা তোমাদের ছাগল”, সিলভিয়া উত্তেজিত। “এটা তোমাদের সেই ছাগলটা, তাই না?”
“ফ্লোরা”, সে বলে, “হ্যাঁ, আমাদের ছাগল, ফ্লোরা।”
ফ্লোরা তাদের এক গজের মধ্যে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। মনে হয় যেন লজ্জা পেয়ে মাথাটা একটু ঝুলিয়ে রাখে নিচের দিকে।
“ফ্লোরা-” ক্লার্ক ডাকে। “তুই এখানে কোত্থেকে আসলি বল তো? একেবারে ভয় পাইয়ে দিয়েছিস আমাদের!”
হ্যাঁ, আমাদের।
ফ্লোরা ধীরে ধীরে সামনে আগায়। কিন্তু চোখ তুলে তাকায় না। ক্লার্কের পায়ের সাথে নিজের শরীর ঘষতে থাকে।
“ফাজিল কোথাকার!” ধমক দিয়ে ওঠে ক্লার্ক। “এতদিন কোথায় ছিলি বলবি তো?”
“সে তো শুনেছি হারিয়ে গিয়েছিল,” সিলভিয়া বলে।
“হ্যাঁ, হারিয়ে গিয়েছিল। আর কখনও একে দেখব, ভাবিইনি আসলে।”
ফ্লোরা এবারে ওপরের দিকে তাকায়। চাঁদের আলো তার চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
“ফাজিল হঠাৎ কোত্থেকে এখানে উদয় হয়ে আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে!” রাগরাগ গলায় বলে ক্লার্ক। “তা, গেছিলি কোথায়? কোনো বয়ফ্রেন্ডের খোঁজে? ভয় দেখালি কেন বদমাশ? আমরা ভেবেছিলাম, তুই একটা ভূত।”
“ওর কী দোষ, ভারি কুয়াশার জন্য ওরকম মনে হয়েছে।” সিলভিয়া বলেন। ততক্ষণে তিনি দরজা পেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। ভয় কেটে গেছে।
“তাই হবে।”
“আর তারপর গাড়ির হেডলাইটের জন্য ছায়াটা লম্বা লাগছিল।”
“অনেকটা ভৌতিক,” ক্লার্ক বলে। তার গলা এখন শান্ত।
“ঠিক বলেছ।”
“মনে হলো অন্য কোনো দুনিয়া থেকে যেন একটা ছাগলের আবির্ভাব হলো।” ফ্লোরাকে গায়ে হাত বুলিয়ে ক্লার্ক বলে, “তুই কী বুঝলি? তুই হলো গিয়ে একটা ছাগলের প্রেতাত্মা, ফাজিল কোথাকার।”
কিন্তু সিলভিয়া যখন তার একটা হাত বাড়ায় ফ্লোরাকে ক্লার্কের মতো করে আদর করতে, তার আরেক হাতে তখনও সেই কাপড়ের ব্যাগটা, কার্লা যে কাপড় পরে চলে গিয়েছিল। ফ্লোরা সাথে সাথে শিং উঁচিয়ে তৈরি হয়, যেন ব্যাগটাতে দারুণ একটা গুঁতো দেবে।
“ছাগলদের চালচলন আসলে বোঝা দায়,” ক্লার্ক বলে। “দেখলে মনে হয় খুব শান্তশিষ্ট কিন্তু আসলে মোটেও তা নয়। বিশেষ করে বড় হয়ে যাবার পরে।”
“ফ্লোরা কি বড় হয়ে গেছে? দেখলে তো একেবারে কচি মনে হয়।”
“বড় হয়েছে। আর লম্বা হবে বলে মনে হয় না।”
তারা দুজনেই নিচে ছাগলটার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন তার উসিলায় আরও কিছু কথাবার্তা হবে তাদের মধ্যে। কিন্তু তেমন আর কোনো কথা খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন এমন হলো যে সামনে বা পেছনে কোনো দিকেই আর যাওয়ার পথ নেই। সিলভিয়ার মনে হলো ক্লার্কের মুখে যেন একটা অনুতাপের ছায়া।
সাথে সাথে ক্লার্ক বলেও উঠল, “অনেক রাত হলো।”
“আমারও তাই মনে হয়।” সিলভিয়াও বললেন নির্লিপ্তভাবে। ব্যাপারটা এমন যেন এটা কেবল একটা সাধারণ সাক্ষাত ছিল তাদের।
“চল ফ্লোরা, আমাদের বাসায় যাওয়া দরকার।”
“আমার যদি কাজকর্মের জন্য কাউকে লাগে তো আমি যোগাড় করে নেব।” সিলভিয়া বলেন। “তবে এই মুহূর্তে লাগবে বলে মনে হয় না।” তারপর হাসতে হাসতে বলেন, “নিশ্চিন্ত থাক, আমি তোমাদের ছায়া আর মাড়াচ্ছি না।”
“বুঝলাম”, ক্লার্ক বলে। “আপনি ভেতরে যান, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
“আগেকার মানুষেরা ভাবত রাতের কুয়াশা খুব খারাপ।”
“আমি অবশ্য রাতে বাইরে আসি না।”
“ঠিক আছে, শুভ রাত্রি।” সিলভিয়া বলেন। “শুভ রাত্রি, ফ্লোরা।”
আর তখনই ফোন বেজে ওঠে।
“আমার ফোন-”
হাত উঠিয়ে ঘুরে যেতে যেতে ক্লার্ক বলে, “শুভ রাত্রি।”
ফোনের ওপারে সিলভিয়ার বান্ধবী রুথ।
“ও হো-” সিলভিয়া বলেন, “ তোমাকে বলাই হয়নি রুথ, পরিকল্পনাটা তো একটু বদলাতে হয়েছে।”
সিলভিয়া সে রাতে ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি ছাগলটার কথা ভাবছিলেন। কুয়াশার মধ্যে কেমন যাদুর মতো কোথা থেকে ভেসে উঠল, কে জানে। তার কাছে মনে হয়, লিয়ন এই দৃশ্যটা দেখলে ভালো হতো। নিজে কবি হলে নিশ্চয়ই এ নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলতেন তিনি। কিন্তু বরাবর এমন হতো যে যা নিয়ে ফরফর করে কবিতা লিখে ফেলা যায় বলে তার মনে হতো, লিয়নকে সে বিষয়টা কোনো আকর্ষণই করত না।
ক্লার্ক বাইরে যাবার সময় কার্লা টের পায়নি তবে ফিরে আসতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। ক্লার্ক জানালো সে আস্তাবলের চারদিকটা ঠিকঠাক আছে কি না দেখতে গিয়েছিল।
“একটু আগে একটা গাড়ি গেল সামনে দিয়ে। আমার মনে হলো, কেউ এলো নাকি। আর তারপর সবকিছু ঠিকঠাক আছে নাকি না দেখা পর্যন্ত তো আর ঘুম আসবে না, তাই দেখতে গেলাম।”
“তো কী, সব ঠিক আছে তো?”
“যতদূর মনে হলো, ঠিকই আছে।”
“আর তারপর মনে হলো জেগেই যখন আছিÑ” ক্লার্ক বলল, “ভাবলাম যাই পাহাড়ের ওপরটায় গিয়ে একবার ঘুরে আসি। কাপড়গুলো ফেরত দেয়ার দরকার ছিল।”
কার্লা বিছানায় উঠে বসে।
“তিনি জেগেই ছিলেন। কোনো অসুবিধা হয়নি। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে এলাম।”
“আচ্ছা।”
“সব ঠিকঠাক আছে।”
“তুমি কাপড়গুলোর কথা সেভাবে বলনি তো, নাকি?”
“না, আমি কিছুই বলিনি।”
“সবকিছু বানানো। বিশ্বাস কর, সবকিছু। তোমার আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। সব মিথ্যে।”
“ঠিক আছে।”
“বিশ্বাস কর তুমি।”
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”
“আমি সব ঘটনা সাজিয়েছি।”
“ঠিক আছে, কার্লা।”
ক্লার্ক বিছানায় আসে।
“তোমার পা এত ঠান্ডা কেন?” কার্লা জানতে চায়। “মনে হয় যেন ভিজে এলে।”
“হ্যাঁ, খুব শিশির পড়েছে। আসো আমার কাছে।” ক্লার্ক বলে। “যখন তোমার চিঠিটা পড়লাম, কার্লা, মনে হলো আমি যেন একটা অন্ধক‚পের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। সত্যি, বিশ্বাস কর। তুমি যদি কখনও আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আমার মনে হবে আমার কাছে আর কিছুই রইল না।”
তারপরের দিনগুলো ছিল রোদেলা। রাস্তায়, দোকানপাটে, পোস্ট অফিসে, সবখানে সবাই আনন্দে একজন আরেকজনকে বলছিল, যাক শেষপর্যন্ত গ্রীস্মকাল এলো। মাথা মোড়ানো ঘাস আর ফসলগুলো যেন মাথা তুলে দাঁড়াল খানিকটা। পানিভরা গর্তগুলো শুকিয়ে গেল। প্যাঁচপেচে কাদাগুলো হয়ে গেল ধুলা। হালকা উষ্ণ বাতাসে সবার মধ্যে নতুন করে কাজে ফেরার উদ্দীপনা দেখা গেল। ফোন বাজতে থাকল, ঘোড়া চালানো শেখার জন্য সময় জানতে চায় মানুষেরা। গ্রীস্মকালীন ক্যাম্প আসা কেউ কেউ তখন মিউজিয়ামে যাওয়ার দিনটা বাঁচিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কাটাতে লাগল। গাড়িতে ভরে ছোট ছোট চঞ্চল বাচ্চারা আসতে লাগল। ঘোড়াগুলোকে তাদের কম্বল থেকে মুক্ত করে দেয়া হলো। তারা পাঁচিলের ধার দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে লাগল।
আস্তাবলের ছাদের জন্য ক্লার্ক বেশ সস্তায় জিনিসপত্র কিনতে পারল। কার্লার পলায়ন দিনের (এভাবেই সেই দিনটাকে তারা উল্লেখ করে) পরের পুরো দিনটা তারা দুজন আস্তাবলের ছাদটা বানানোর কাজে ব্যয় করল।
তার পরের কিছুদিন পর্যন্ত কার্লা আর সে নিজেদের কাজগুলো করার ফাঁকে ফাঁকে হাত উঠিয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসত। যতবার কার্লা তার খুব কাছে দিয়ে চলে যায়, আর সে সময়ে যদি সেখানে কেউ না থাকে, কার্লা গরমকালের পাতলা শার্টের ওপরে তার ঘাড়ে চুমু দিয়ে যায়।
“আর কখনও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও তো আমি পিটিয়ে তোমার চামড়া তুলে দেব”, ক্লার্ক বলে। কার্লা বলে, “তাই নাকি?”
“কী?”
“পিটিয়ে আমার চামড়া তুলে দেবে?”
“একদম ঠিক তাই।” তার ভেতরে এখন ঠিক সেই উদ্দাম দেখা যায় যেটা দেখা যেতো কার্লার সাথে প্রথম যখন দেখা হয়েছিল।
চারদিকে তখন পাখপাখালি। লাল ডানাওলা কালো পাখি, রবিন আর একজোড়া ঘুঘু, দিনভর প্রহরে প্রহরে ডেকে চলছে। ঝাঁকে ঝাঁকে কাক আর গাংচিল উঠে এসেছে লেক থেকে। কী যেন আবিষ্কার করতে চায়। প্রায় আধামাইল দূরে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে মরা ওক গাছের গুঁড়িতে বসে তিতিরগুলো সমানে ডেকে যাচ্ছে। প্রথমে হয়তো কেবল তাদের ভারি পাখাগুলো শুকানোর জন্য বসে। তারপর গুঁড়ির ওপর থেকে দেয় এক লাফ। ছোট দূরত্বে একটু উড়তে চেষ্টা করে। আবার ফিরে এসে একই জায়গায় বসে রোদ পোহায়। সারাদিন এই তাদের কাজ। উঁচুতে ওড়ার চেষ্টা, বৃত্তাকারে ঘুরে মাটিতে ফিরে আসা, কখনও জঙ্গলের ভেতরে চট করে উধাও হয়ে যাওয়া, তারপর আবার চেনা গাছের গুঁড়িতে ফিরে এসে জিরিয়ে নেয়া।
লিজির মালিক, জয় টাকার আবার এলেন একদিন। রোদে পুড়ে গায়ের রঙ ময়লা করেছেন তবে হাসিখুশি মনে হলো। ছুটি কাটাতে গিয়ে রকি মাউন্টেন বেয়ে উঠতে উঠতে তিনি পড়েছিলেন প্রবল বৃষ্টির কবলে। তাই সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফিরে এসেছেন কদিন হলো মাত্র।
“এখানকার আবহাওয়া হিসেবে ঠিক সময়েই এসেছ”, ক্লার্ক বলে। তারপর জয় টাকারের সাথে এমনভাবে হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠে যেন তার সাথে কখনই কিছু হয়নি।
“লিজিকে দেখতে তো বেশ ভালো লাগছে”, বলেন তিনি। “কিন্তু ওর ছোট্ট সঙ্গীটা কোথায়? ওই যে, ছাগলটা, কী যেন নাম- ফ্লোরা??
“চলে গেছে”, ক্লার্ক বলে। “সে হয়তো তোমার ওই রকি মাউন্টেনের ওদিকেই কোথাও রওনা দিয়েছে।”
“হ্যাঁ, ওদিকে আমি অনেক বন্য ছাগল দেখেছি, মাথায় অদ্ভুত ধরনের শিং।”
“আমিও শুনেছি।”
তার পরের তিনচার দিন এতই ব্যস্ততার মধ্যে কাটল যে বাইরে গিয়ে মেইল বক্সটাও দেখা হয়নি। একদিন কার্লা যখন সেটা খুলল, দেখে টেলিফোন বিল, কিছু পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক হলে কী করে মিলিয়ন ডলার জেতা যায় তার নানান তথ্য আর মিসেস জেমিসনের লেখা একটা চিঠি।
প্রিয় কার্লা,
গত কয়েকদিনের ঘটনা নিয়ে আমি লাগাতার ভাবতে থাকি। (তোমার কাছে নাটকীয় মনে হতে পারে।) মনে হয় আমি যেন নিজের সাথে ক্রমাগত কথা বলছি। কিন্তু পরে দেখি আমি আসলে তোমার সাথে কথা বলি। হয়তো আমার প্রায়ই মনে হয় যে তোমার সাথে কথা বলা দরকার। তাই মনে হলো তোমাকে বরং একটা চিঠি লেখা যাক। তবে তুমি আবার মনে করো না যে তোমাকে এর উত্তর দিতে হবে।
মিসেস জেমিসন আরও অনেক কিছু লিখেছেন। লিখেছেন তিনি খুবই লজ্জিত যে কার্লার ব্যক্তিগত জীবনে এভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভুলে কার্লার সুখ আর স্বাধীনতাকে এক করে ফেলেছিলেন। তিনি কেবল কার্লার স্বাধীনতা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে কার্লা বিবাহিত আর নিজের সংসারেই তার সেই সুখশান্তি খুঁজে নিতে হবে। তার পক্ষে যেটা চাওয়া সম্ভব তা হলো কার্লা যেন তার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আর তার মতো আবেগী একটা মেয়েকে তার স্বামী যেন বুঝতে পারে, ভালোবাসে।
তিনি আরও লিখেছেন যে কার্লা যদি ভবিষ্যতে তাকে এড়িয়ে চলতে চায় তবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। কার্লা তার জীবনের অনেক ভয়ঙ্কর মুহূর্তে উপস্থিত ছিল, এজন্য তিনি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
তবে যাই বলো, সুতোয় গাঁথা মালার মতো একটার পর একটা ঘটনা যে ঘটে গেল, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছিল ফ্লোরার আকস্মিক আবির্ভাব। সত্যি বলতে গেলে সেটা ছিল একটা অপার্থিব ঘটনা। সে তার আগের এতটা সময় কোথায়ই বা ছিল আর হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া উদয় হবার জন্য ওই মুহূর্তটাকেই বা কেন বেছে নিলো, সে এক রহস্য। আমি জানি তুমি ক্লার্কের কাছে সব শুনেছ। আমরা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। আমার মুখ ছিল বাইরের দিকে। হঠাৎ দেখলাম সাদামতো কী যেন একটা। পর মুহূর্তেই রাতের অন্ধকার-কুয়াশা ফুঁড়ে সেটা আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। মাঠের উপরে ঘন কুয়াশার ভেতরে বিষয়টা ছিল দেখার মতো। তবে ভয়েরও ছিল বটে। আমার ইচ্ছে করছিল গলা সপ্তমে তুলে একটা চিৎকার দেই। বিশ্বাস কর, চোখের সামনে এরকম ভোজবাজি জীবনে আর কখনও দেখিনি। আমরা দুই দু’জন বয়ষ্ক মানুষ সেখানে ভয়ে বরফের মতো জমে গেছি, আর সাদা কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কিনা হারিয়ে যাওয়া ফ্লোরা।
এই ঘটনার নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। আমি জানি ফ্লোরা একটা ছোট্ট সাধারণ জন্তু। সে হয়তো নিজেকে গর্ভবতী করার চেষ্টায় কোথাও গা ঢাকা দিয়েছিল। একভাবে ভাবতে গেলে তার এই চলে যাওয়া বা ফিরে আসা আমাদের মানবিক জীবনের সাথে একেবারে যোগাযোগবিহীন। যদিও সেই মুহূর্তে সেখানে তার আকস্মিক উপস্থিতি তোমার স্বামী আর আমার উপরে অদ্ভুত এক প্রভাব ফেলেছিল। দুজন মানুষ যখন এক অন্যের উপরে বিরূপ থাকে, একই সাথে তারা দুজন দুজনের ক্ষতি করতে চায়, তখন যদি একই অবয়ব তাদের ভয়ার্ত করে তোলে, দুশ্চিন্তায় ফেলে, তারা দুজনে তখন এক হয়ে যায়। চমৎকার এক বন্ধনের সৃষ্টি হয় তখন তাদের মধ্যে। অদ্ভুত আর আশাতীত এক ঐক্য তৈরি হয়। মানবিক গুনাবলীই তাদের আবার এক করে ফেলে, এটাই এর একমাত্র ব্যাখ্যা বলে আমি মনে করি। বিদায় নেয়ার সময়ে মনে হচ্ছিল আমরা দুজন বন্ধু। তাই ফ্লোরাকে আমার মনে হয় আমার জীবনে একটা শুভশক্তি। তোমার স্বামী এবং তোমার জীবনেও হয়তো সে তাই।
তোমার জন্য আমার শুভেচ্ছাসহ, সিলভিয়া জেমিসন।
পড়ার সাথেসাথেই কার্লা চিঠিটা প্রথমে দুমড়ে মুচড়ে নেয়। তারপর বেসিনে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। হঠাৎ দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলে তাড়াতাড়ি ট্যাপ ছেড়ে দেয়। তারপর বড় বড় ছাইয়ের টুকরোগুলো তুলে নিয়ে কমোডে ফেলে। পোড়ানোর আগে এটা করলেই ল্যাঠা চুকে যেত।
সেদিন দিনের বাকি সময়টায় সে ছিল খুব ব্যস্ত। তার পরের দিনেও তাই। তার পরের দিনেও। দুটো দলকে আলাদা আলাদা করে ঘোড়া চড়াতে নিয়ে যেতে হলো। ছোট ছোট বাচ্চাদের একসাথে আবার পৃথক করেও শেখাতে হলো। সারারাত ক্লার্ক তাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। যখন তখন ব্যস্ত হয়ে গেছে, যেন সে কখনও ক্লান্ত হয় না, কখনও বিমর্ষ হয় না। কার্লার কাছে ক্লার্কের আহ্বানে সাড়া দেয়া কঠিন মনে হয়নি।
কিন্তু কার্লার কাছে এমন মনে হচ্ছিল যে তার ফুসফুসে কোথাও একটা কাটা ফুটে আছে। তাকে খুব সাবধানে শ্বাস নিতে হবে। খুব সতর্ক হয়ে নিশ্বাস ছাড়লে হয়তো সেই টনটনে ব্যথা থেকে সে রেহাই পেতে পারে। কিছু পরেপরেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে দেখছিল, হ্যাঁ, কাটাটা সেখানেই আছে এখনও।
সিলভিয়া যেখানে পড়ান সেই কলেজের কাছেই একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠে গেছেন। বাসাটা মনে হয় এখনও বিক্রির জন্য ছাড়া হয়নি। মানে সামনে এমন কোনো সাইনবোর্ড নেই। লিয়ন জেমিসন মরোনোত্তর কী যেন একটা সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন। খবরের কাগজে বেরিয়েছে। এবারে টাকা বা টাকার অঙ্কের কোনো কথা সেখানে নেই।
বছরের সবচেয়ে সুন্দর আর উদ্দীপক শুকনো সোনালি দিনগুলো আবার ফিরে এলো। কার্লা দেখল যে তার মনের ভেতরে যে তীক্ষè সন্দেহটা পুষে রেখেছে তার সাথে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে ধীরে ধীরে সেই তীক্ষèতা ভোঁতা হয়ে এসেছে। সেই ভাবনা এখন তাকে আর আগের মতো বিস্মিত করে না। সে যেন আজকাল প্রায় একরকম ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। এখন তার আর কোনো রহস্যের কুলকিনারা করতে ইচ্ছে হয় না।
সে কেবল সামনে চোখ তুলে তাকায়। একদিকেই তাকিয়ে থাকে, যেদিকে তাকে যেতে হয়। সারাদিনের সমস্ত কাজ শেষে সন্ধ্যাবেলায় সে যখন হাঁটতে বেরোয়, বনের ধানে ওই মরা শুকনো গাছের গুঁড়িটা পর্যন্ত গিয়েই ফিরে আসে। যেখানে তিতিরদের মেলা বসে।
ঘাসের ওপরে সেখানে কিছু হাড়গোড়ের টুকরো পড়ে থাকে। কখনও কোনো প্রাণীর মাথার খুলি। সাথে লাগানো কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন রক্তমাখা মাংস। একদিন চায়ের কাপ হাতে নেয়ার মতো একটা খুলি কুড়িয়ে হাতে নেয় সে। তার যেন কিছু মনে পড়ে।
না, সে যা ভাবছে তা হতে পারে না। এই খুলি তার পরিচিত নয়।
অন্য কতকিছুই তো হতে পারে। ক্লার্ক হয়তো ফ্লোরাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অথবা ট্রাকে করে তাকে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। কিংবা তাকে যেখান থেকে এনেছিল সেখানেই ফেরত দিয়ে এসেছে। কেবল আশেপাশে তাকে না দেখার জন্য।
হয়তো সে বেঁচেই আছে। স্বাধীন।
দিন যায়। কার্লা আজকাল আর শুকনো গাছের গুঁড়িটার কাছেও যায় না। ভাবনার ঘোরে রহস্যেরা ধীরে ধীরে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
অ্যালিস মুনরো নোবেলবিজয়ী ছোটগল্পকার। অনূদিত ‘রানঅ্যাওয়ে’ তাঁর রচিত বহু ছোটগল্পের মধ্যে অন্যতম। মুনরো ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এবং ২০০৯ সালে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও কানাডীয় এই কথাসাহিত্যিক তাঁর গদ্যের জন্য তিনবার কানাডার গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পেয়েছেন।