Jobanক্যাপিটালিজমই কি দুনিয়াব্যাপী চলা অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালছে? জেসন হিকেলের সাথে আলাপ

ক্যাপিটালিজমই কি দুনিয়াব্যাপী চলা অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালছে? জেসন হিকেলের সাথে আলাপ

জেসন হিকেল আমাদের সময়ের অন্যতম ক্রিটিক্যাল, আপসহীন এবং প্রভাবশালী একজন বুদ্ধিজীবী। তার কাজের পরিধি অ্যাকাডেমিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতি ও পরিবেশবাদী লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। হিকেলের নিরাপোষী চিন্তাধারার শেকড় তাঁর জন্মস্থান দক্ষিণ আফ্রিকার কোল ঘেঁষা সোয়াজিল্যান্ডের (বর্তমান এসোয়াতিনি) অভিজ্ঞতা; যেখানে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শৈশবেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও উপনিবেশবাদী শোষণের নগ্ন রূপ দেখেছেন। নিজের চোখে দেখা সেই ঔপনিবেশিক ক্ষতগুলোই পরবর্তীতে তাঁর তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষায় তিনি বেছে নেন নৃবিজ্ঞানকে, যা তাঁকে অর্থনীতির যান্ত্রিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি ও মানুষের যাপিত জীবনের জটিল সম্পর্কগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করতে শিখিয়েছে। আমেরিকার ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি করার সময় থেকেই তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়ে যায়; গ্লোবাল সাউথের ওপর গ্লোবাল নর্থের আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণের নিত্যনতুন ধরণগুলোকে উন্মোচন করা।

বর্তমানে তিনি স্পেনের ‘Autonomous University of Barcelona’-র পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে (ICTA-UAB) অধ্যাপনার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত ‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স’ (LSE)-এর ইন্টারন্যাশনাল ইনইকুয়ালিটি ইনস্টিটিউটের একজন ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো এবং এর আগে গোল্ডস্মিথস, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর এই দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান একদিকে পরিবেশবিদ্যার জটিল সমীকরণ বুঝতে এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক অসমতা নিরসনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপের বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। বিদ্যায়তনিক দুনিয়ায় হিকেলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির আধিপত্যবাদী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ যেখানে প্রচার করে যে গ্লোবাল নর্থের ‘সাহায্য’ বা খয়রাতি অনুদানে গ্লোবাল সাউথ টিকে আছে; হিকেল সেখানে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রতি বছর কাঁচামাল, সস্তা শ্রম ও সম্পদের এক বিশাল ‘ড্রেইন’ বা পাচার ঘটছে গ্লোবাল সাউথ থেকে নর্থের দিকে, যার পরিমাণ তথাকথিত সাহায্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই কাঠামোগত শোষণ ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তিনি সামনে এনেছেন ‘ইকোলজিক্যাল ডেট’ বা পরিবেশগত ঋণের ধারণা; যেখানে শিল্পোন্নত দেশগুলো বায়ুমণ্ডলকে আবর্জনার স্তূপ বানিয়ে যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার জন্য তারা জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত গ্লোবাল সাউথের কাছে ঐতিহাসিকভাবে ঋণী।

হিকেল কেবল একজন তাত্ত্বিক নন, বরং ‘ডিগ্রোথ’ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা হিসেবে তিনি বিশ্বনেতাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন যে, অবিরাম জিডিপি বৃদ্ধির পুঁজিবাদী অন্ধনেশা আসলে এক আত্মঘাতী পথ। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে তাঁর বক্তব্য তীব্র প্রভাব ফেলেছে এবং তিনি ‘গ্রিন নিউ ডিল’-এর মতো প্রগতিশীল নীতির খসড়া প্রণয়নে সরাসরি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে তাঁর ‘Less is More’ গ্রন্থটি প্রকাশের পর পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান রক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে একটি ‘উত্তর-পুঁজিবাদী’ অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। হিকেল মনে করিয়ে দেন, স্রেফ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দিয়ে জলবায়ু সংকট মোকাবেলা অসম্ভব; এর জন্য প্রয়োজন সম্পদের আমূল পুনর্বণ্টন এবং ভোগের সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর।

গুরুত্বপূর্ণ এই সাক্ষাৎকারটি মূলত আল-জাজিরার Reframe এ দেয়া হয়েছিলো। বাংলাভাষীদের জন্য অনুবাদ করেছে জবান ম্যাগাজিন।

____________

 

Varsha Gandikota: ২০২৬ শুরু হতে না হতেই আমরা দেখছি মার্কিন সরকার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে, কিউবার তেল সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে হামলার হুমকি দিচ্ছে, এমনকি গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর কথা বলছে। আর এখন তো ইরানে ভয়াবহ এক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যারা এই ঘটনাগুলো দেখছেন, তাদের কাছে পুরো ব্যাপারটা বিশৃঙ্খলা মনে হতে পারে। অনেকে হয়তো বলবেন এগুলোকে সাম্রাজ্যবাদী ভায়োলেন্সের আকষ্মিক এবং নাটকীয় বহিঃপ্রকাশও বলতে পারেন। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? আসলে কী ঘটছে এখন?

হিকেলঃ বাহির থেকে দেখলে নিছক বিশৃঙ্খলাই মনে হতে পারে। কিন্ত, এই ঘটনাগুলোকে বুঝার জন্য এই পয়েন্টটা বুঝা সবচেয়ে বেশি জরুরী যে, এগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত কিংবা হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এই ভায়োলেন্স হচ্ছে কাঠামোগত (Structural)। এটার পেছনে যে নিয়ামকগুলো (Determinants) আছে সেগুলো বুঝতে হবে আমাদের। আমার কাছে বিষয়টা অত্যন্ত পরিষ্কার; এই ভায়োলেন্স বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার চারিত্রিক বহিঃপ্রকাশ।

পুঁজিবাদের ব্যাপারটাই আসলে এমন। সে শুরু থেকেই একটা একক এবং নিয়ন্ত্রণবাদী বৈশ্বিক অর্থনীতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থায় শক্তিশালী দেশগুলো (যেগুলোকে আমরা Global North বলি) তাদের পুঁজি (Capital), প্রবৃদ্ধি (Growth), আর ভোগের (Consumption) জন্য গ্লোবাল সাউথের সস্তা কাঁচামাল, সম্পদ আর শ্রমের উপর নির্ভরশীল। এর জন্য গ্লোবাল নর্থ, গ্লোবাল সাউথ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টন কাঁচামাল, হাজার হাজার কোটি কর্মঘণ্টার শ্রম আর কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ স্রেফ লুণ্ঠন করছে। পুঁজিবাদের ৫০০ বছরের ইতিহাসের একেবারে শুরু থেকেই এই প্যাটার্নটা চলে আসছে।

 

Varsha Gandikota: কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার ভূমিকাটা আসলে কী? আমার কাছে মনে হয় ভৌগোলিকভাবে এটা বিশ্বের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত, যা ইউরোপকে এশিয়ার সাথে আর উত্তরকে দক্ষিণের সাথে যুক্ত করেছে। আপনি যেমনটা বলে থাকেন- পেরিফেরি বা প্রান্তিক দেশগুলো (Global South) কোর বা শক্তিশালী দেশগুলোর (Global North) জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়- সেই স্ট্রাকচারাল ব্যাখ্যায় এই অঞ্চলের ভূমিকা ঠিক কোথায়?

হিকেলঃ হ্যাঁ, এখানে বোঝার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইম্পেরিয়াল কোর বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে চব্বিশ ঘন্টা-ই হস্তক্ষেপ করতে হয়। কেন? যাতে এই দেশগুলো সব সময় তাদের অনুগত (Subordinated) থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে পশ্চিম এশিয়া এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? একটু আগে আপনি যেমনটা বললেন-ঠিক এটাই কারণ। পশ্চিম এশিয়া আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীর কেন্দ্র; এশিয়া, আফ্রিকা আর ইউরোপের সংযোগস্থল। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ২৫ শতাংশ যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে, আর কন্টেইনার শিপিংয়ের ২৫ শতাংশ যায় লোহিত সাগর দিয়ে। তার মানে, এটি পুরো ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা নোড (Node)।

এখন ভাবুন তো- যদি পশ্চিম এশিয়া স্বাধীন হয়ে যায়, যদি এই অঞ্চলের মানুষের হাতে তাদের নিজেদের সম্পদ আর উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে, তারা যদি মার্কিন ডলারের বাইরে নিজেদের তেল বিক্রি করতে শুরু করে, নিজেদের ট্রেড রুট নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন আর ভোগ (Produce and consume) করে- তখন কী হবে? এটা মার্কিন পুঁজির জন্য হুমকি। আর এই কারণেই বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে আজ পর্যন্ত তারা এই অঞ্চলের পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এটা আমরা আমাদের পুরোটা জিন্দেগি ধরে দেখে আসছি। তাদের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম এশিয়ায় যাতে সত্যিকারের কোনো সার্বভৌম উন্নয়ন বা লিবারেশন (Liberation) না ঘটতে পারে। ইরানের সাথে এখন ঠিক এটাই হচ্ছে।

Varsha Gandikota: এবার আমি আপনাকে ভিন্ন একটা বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই। আমার মনে হয় আমাদের দর্শকদের বেশিরভাগই এটা জেনে অবাক হবেন না যে, গ্লোবাল নর্থ থেকে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করার কারণে গ্লোবাল সাউথের মানুষদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আমরা ইতিহাসে এটা বারবার দেখেছি: ফরাসি সাম্রাজ্য আলজেরিয়ায়, ব্রিটিশরা ভারতে, কিংবা স্প্যানিশরা ল্যাটিন আমেরিকায় ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনগুলোকে দমন করতে কেমন সহিংসতা চালিয়েছে। কিন্তু, আমরা মনে করি এসব বোধহয় অতীতের ব্যাপার। এখন আর এসব ঘটে না। কারণ, আমরা এখন এমন এক ‘পোস্ট-কলোনিয়াল’ বা উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্ব ব্যবস্থায় বাস করছি যেখানে জাতিরাষ্ট্রগুলো মোটামুটি স্বাধীন, কিংবা অন্তত তাদের সার্বভৌমত্বকে (Sovereignty) সম্মান জানানো হয়। তো, এই চিন্তাটা আসলে কতটা নতুন, নাকি পুরনোই চলছে? 

হিকেলঃ যারা আসলে চারপাশের ঘটনায় খেয়াল রাখছেন না, এটা শুধু তাদের কাছেই নতুন মনে হতে পারে। কিন্তু যারা ইতিহাস নিয়ে ন্যূনতম সচেতন, তাদের কাছে এটা খুব পরিষ্কার যে, এই অধীনতা (Subordination) এবং সহিংসতা একটা ঐতিহাসিক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্যাটার্নের ধারাবাহিকতা মাত্র। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্লোবাল সাউথে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের একটা জোয়ার তৈরি হয়েছিল। তারা তাদের দখলদারদের তাড়িয়ে দিয়ে সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছিল এবং নিজেদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছিল। এই সার্বভৌমত্ব ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর Capital Accumulation বা পুঁজি পুঞ্জিভূত করার পথে হুমকি ছিলো। আর একারণেই, ঠিক সেই সময় থেকেই তারা এই আন্দোলনগুলোকে ধ্বংস করার সাথে সাথে সেই রাষ্ট্রগুলোতে হস্তক্ষেপ করা শুরু করে।

আমরা দেখেছি প্যাট্রিস লুমুম্বার সাথে কী হয়েছিল। লুমুম্বা কঙ্গোর খনিজ সম্পদ নিজ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য ন্যাশনালইজ করতে চেয়েছিলেন। এর শাস্তিস্বরূপ তাকে যুক্তরাষ্ট্র এবং বেলজিয়ামের মদদপুষ্ট এক ক্যু-র মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে হত্যা করা হলো; হত্যার পর তার শরীর টুকরো টুকরো করে ব্যারেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার প্রথম স্বাধীন প্রেসিডেন্ট সুকর্নর কথাই ধরুন না। ১৯৬৭ সালে মার্কিন মদদপুষ্ট এক ক্যু-র মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দিয়ে একজন ডিক্টেটরকে ক্ষমতায় বসানো হয়। ক্ষমতায় বসার পর সেই ডিক্টেটর তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল। আমরা একই জিনিস দেখেছি ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের সময়, বিশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করে দেওয়ার সময়, কিংবা ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ায় ঘটা ইনভ্যাশন আর ‘রেজিম চেঞ্জ’ অপারেশনের সময়। যখনই কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, কিংবা ইউএস-নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়-ঠিক তখনই এ ধরণের ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপ শুরু হয়ে যায়।

বাহির থেকে দেখলে নিছক বিশৃঙ্খলাই মনে হতে পারে। কিন্ত, এই ঘটনাগুলোকে বুঝার জন্য এই পয়েন্টটা বুঝা সবচেয়ে বেশি জরুরী যে, এগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত কিংবা হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এই ভায়োলেন্স হচ্ছে কাঠামোগত। এটার পেছনে যে নিয়ামকগুলো আছে সেগুলো বুঝতে হবে আমাদের। আমার কাছে বিষয়টা অত্যন্ত পরিষ্কার; এই ভায়োলেন্স বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার চারিত্রিক বহিঃপ্রকাশ।

Varsha Gandikota: হ্যাঁ, অধিকাংশ মানুষই এটা বুঝে যে এই শাস্তি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেষ্টার জন্যে নয়, এর সাথে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বও জড়িত। এগুলো এখন আমাদের চোখের সামনে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ফাঁস হওয়া একটা রিপোর্টে দেখা গেছে, এই মুহূর্তে জাম্বিয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের HIV/AIDS ফান্ডের সুবিধা ব্যবহার করে সেদেশের স্বাস্থ্য বিভাগকে চাপে ফেলছে- যাতে জাম্বিয়া তাদের কপার বা তামা খনিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অ্যাক্সেস দেয়া সংক্রান্ত চুক্তিতে রাজি হয়। জাম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় কপার উৎপাদনকারী দেশ, আর এই বাজারটি এখন চীনের দখলে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র চরম হতাশ। আমি আপনার কাছে জানতে চাই: এই শাস্তি কি শুধু গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্যই? নাকি তাদের নিজেদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও যদি তাদের গ্রিপ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে, তাদের সাথেও এমনটা হয়?

হিকেলঃ হ্যাঁ, এটা খুবই ইন্টারেস্টিং একটা পয়েন্ট। অন্য পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্র যা করে, সেটা চোখ খুলে দেয়ার মতো ব্যাপার। গত অর্ধশতাব্দী বা তারও বেশি সময়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলোতে যাতে সোশ্যালিস্ট, কমিউনিস্ট বা অন্য কোনো বামপন্থী দল ক্ষমতায় আসতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র বারবার সেখানকার ইলেকশনে ইন্টারফেয়ার করেছে। গ্রিস এবং ইতালির ক্ষেত্রে এটা খুব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এমনকি পর্তুগালে যদি কোনো কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে সেখানেও মার্কিন ইনভ্যাশনের পরিকল্পনা ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটা সময় ছিল যখন সমাজতন্ত্র বা সোশ্যালিজম খুব জনপ্রিয় আইডিয়া ছিল; আর সেটা ঠেকানোর জন্য তখন সব ধরণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চায় পশ্চিম ইউরোপ যেন সব সময় তাদের ইম্পেরিয়াল প্রজেক্টের সাথে অ্যালাইনড থাকে। এটা যে তারা কেবল ‘বন্ধু’ বা ‘মিত্র’ পাওয়ার জন্য করে, তা কিন্তু নয়; বরং পশ্চিম এশিয়া এবং বাকি এশিয়ার দিকে যাওয়ার জন্য পশ্চিম ইউরোপকে একটা Bridgehead বা কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে তারা। যুক্তরাষ্ট্র আসলে পশ্চিম ইউরোপের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সেখানে মিলিটারি বেইজ বানাতে চায় এবং সেখান থেকে নিজেদের পাওয়ার প্রজেক্ট করতে চায়। আর আক্ষরিক অর্থে ন্যাটো আসলে এই কাজটাই করে। আমাদের মাথায় এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ন্যাটো হলো পশ্চিমের এক ধরণের ডিফেন্সিভ বা আত্মরক্ষামূলক জোট, কিন্তু গত কয়েক দশকে এটি মোটেও সেভাবে কাজ করেনি। তাই আমি মনে করি, এই ইন্সটিটিউশনগুলো তৈরির আসল উদ্দেশ্য আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার।

 

Varsha Gandikota: কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটা পারছে কীভাবে? শুনতে একটু সরল মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা তো জানি যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি হলেও তাদের সব আঘাত তো আর কেবল সামরিক নয়, কিংবা কেবল ন্যাটোর মাধ্যমেও নয়। তাহলে এই যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, অর্থ বা ফাইনান্স-এগুলোর ভূমিকা আসলে কী? বিশেষ করে, বর্তমানে আমরা ইরানের সাথে যা ঘটতে দেখছি, তার সাথে এই বিষয়গুলোর যোগসূত্র ঠিক কোথায়?

হিকেলঃ আমার মনে হয় এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট হলো ‘পেট্রোডলার’। দেখুন- যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ অবিশ্বাস্য এক সাম্রাজ্যবাদী সুবিধা ভোগ করে শুধু এই কারণে যে, বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের অসীম চাহিদা আছে। কেন এই চাহিদা? কারণ সারা বিশ্বে তেলের ব্যবসা হয় ডলারে, আর তেল বা এনার্জি সবারই প্রয়োজন।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র আক্ষরিক অর্থেই স্রেফ টাকা ছাপিয়ে বাকি বিশ্ব থেকে আসল পণ্যগুলো (Real goods) কার্যত ফ্রিতে কিনে নিতে পারে। মূলত অলিখিত চুক্তিটা ছিল এমন: “তোমরা সবাই ডলারে তেল বিক্রি করবে, আর বিনিময়ে আমরা তোমাদের এলাকায় মার্কিন মিলিটারি বেস বানিয়ে তোমাদের নিরাপত্তা দেব।” যদিও বর্তমান পরিস্থিতি (ইরান-ইসরায়েল সংঘাত) বলছে যে, এই নিরাপত্তার কথাটি ছিল একটা ডাহা মিথ্যা।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো-ইরান বা পশ্চিম এশিয়ার যেকোনো সার্বভৌমত্বকামী আন্দোলন এই ব্যবস্থাটাকে মানতে চায় না। তারা চায় মার্কিন ডলারের বাধ্যবাধকতা ছাড়া নিজেদের পছন্দমতো কারেন্সিতে তেল বা সম্পদ বিক্রি করতে। কিন্তু এটা মার্কিন সাম্রাজ্যের এই বিশেষ সুবিধার জন্য হুমকি। যদি এমনটা ঘটে, তবে সারা বিশ্বের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing power) আছে, শোচনীয়ভাবে সেটার পতন হবে। এর ফলে আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর Capital Accumulation বন্ধ হয়ে যাবে।

এছাড়া আছে ‘সুইফট’ (SWIFT) সিস্টেম। এটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় সব লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। এই সুইফট সিস্টেমের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আছে। তারা কোনো দেশের ক্ষতি করতে চাইলে কিংবা কোনো দেশকে শাস্তি দিতে চাইলে তাকে এই সিস্টেম থেকে বের করে দিয়ে নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশন চাপিয়ে দেয়। ফলে সেই দেশটির পক্ষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইরানের সাথে তারা ঠিক এটাই করেছে, রাশিয়ার সাথেও একই কাজ করেছে।

এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় আনলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য নিজস্ব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। আমাদের এমন একটা পেমেন্ট সিস্টেম দরকার যা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেরাই নিজেদের জন্য চালাবে। আমাদের দরকার তেল বা অন্যান্য কাঁচামাল যেন মার্কিন ডলার বা অন্য কোনো পশ্চিমা কারেন্সির বাইরেও কেনাবেচা করা যায়। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য এটা এখন অত্যন্ত ক্রুশিয়াল একটা বিষয়।

 

Varsha Gandikota: আমি জানি না আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো নমনীয় হতে দেখেছেন কী না। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে আমার ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। সে সময়ে আমরা দেখেছি কিউবার মতো দেশগুলো তখন তাদের নিজেদের নাগরিকদের ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য সিরিঞ্জের মতো সামান্য জিনিসও সংগ্রহ করতে পারছিল না। ভেনেজুয়েলা আর ইরান তখন অনুরোধ করেছিল যে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নিতে হবে না, অন্তত মহামারীর এই সময়টুকুর জন্য যেন স্যাংশন শিথিল করা হয় যাতে তারা বাজার থেকে ওষুধ কিনতে পারে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) বলেছিল যে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এসব অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র কানেই তোলেনি। তাহলে এই যে তথাকথিত ‘অ-সামরিক যুদ্ধ’, এবং এই স্যাংশন- এগুলো কতটা রক্তপাতহীন আসলে?

 

হিকেলঃ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্যাংশন হলো (সামরিক) যুদ্ধের বিকল্প। এটা তাদের একটা ‘সফট পাওয়ার’ (Soft power)। কিন্তু, এটাকে তারা নিছক অর্থনৈতিক কড়াকড়ি হিসেবে দেখাতে চায় মানুষকে। তাদের বয়ানটা এমনঃ “দেখো, আমরা তোমাদের ওপর কিন্তু আক্রমণ করছি না, তোমাদের ধ্বংস করছি না; আমরা শুধু একটু অর্থনৈতিক স্যাংশন দিয়ে তোমাদের মৃদু শাস্তি দিচ্ছি।” কিন্তু, স্যাংশন নিছক কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা কড়াকড়ি নয়।

সম্প্রতি ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’ (Lancet Global Health)-এ প্রকাশিত একটি স্টাডিতে দেখা গেছে যে, ১৯৭১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ (৩৮ মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতিতে এটাই হলো যুদ্ধের আসল রূপ। কারণ পশ্চিমা পুঁজিবাদের টিকে থাকার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি। আপনি যখন এই সিস্টেমের ফলে ঘটা ভায়োলেন্স আর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাটা বুঝতে পারবেন, তখন আপনার নিজের কাছেই এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আমরা কোনোভাবেই আর এই ব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারি না।

যদি পশ্চিম এশিয়া স্বাধীন হয়ে যায়, যদি এই অঞ্চলের মানুষের হাতে তাদের নিজেদের সম্পদ আর উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে, তারা যদি মার্কিন ডলারের বাইরে নিজেদের তেল বিক্রি করতে শুরু করে, নিজেদের ট্রেড রুট নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন আর ভোগ করে- তখন কী হবে? এটা মার্কিন পুঁজির জন্য হুমকি। আর এই কারণেই বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে আজ পর্যন্ত তারা এই অঞ্চলের পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

Varsha Gandikota: আচ্ছা, এবার যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটছে তা নিয়ে একটু কথা বলা যাক। যৌন সহিংসতার শিকার মানুষদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং এই সমস্যা সমাধান করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। বিশ্বজুড়ে যৌন সহিংসতা, যুদ্ধ, অপহরণ, ইন্টারভেনশন, স্যাংশন ইত্যাদীর মধ্যেই ‘এপস্টিন ফাইল’ ফাঁস হয়েছে। সেখানে আমরা দেখতে পেলাম গ্লোবাল এলিটদের ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী মানবতা, আইন, জবাবদিহিতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে যা খুশি তাই করে যাচ্ছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো এবং এর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে এটা আমাদেরকে কী বার্তা দেয়?

হিকেলঃ এপস্টিন ফাইল এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন ফিলিস্তিনে গণহত্যা চলছে। এটা অনেক কিছুরই বার্তা দেয় আসলে। এরা তথাকথি সেই  ‘ট্রান্স-আটলান্টিক রুলিং ক্লাস’ বা আটলান্টিক পাড়ের শাসক শ্রেণি যাদের নিষ্ঠুর সন্ত্রাস থেকে একজন শিশুও রেহাই পায় না। যে এলিট সার্কেলটার যৌন লালসা মিটানোর জন্য শিশুদের পাচার করা হলো, এ সার্কেলটাই কিন্তু প্যালেস্টাইনে গণহত্যা চালাচ্ছে, এরাই ইরানে কার্পেট বম্বিং করছে। ফলে এই শাসক শ্রেণির চারিত্রিক পতন বা বিকৃতি (depravity) দেখে আমি একদমই অবাক হই না।

তবে এপস্টিন ফাইলের আরেকটা মূল দিক হলো- এটা আমাদের সামনে এমন এক এলিট শ্রেণির চেহারা উন্মোচন করে দিয়েছে যারা সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ, এবং স্বেচ্ছাচারী উপায়ে সব সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো জবাবদিহিতা নেই। তারা যা কিছু করে, তার সবটুকুই স্রেফ নিজেদের স্বার্থে; সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কথা তারা ঘুণাক্ষরও ভাবে না। তারা যে অবলীলায় মানুষকে শোষণ ও অপব্যবহার করতে পারে- এটা তারই প্রমাণ।

আসলে এটা আমাদের জন্য একটা ওয়েক-আপ কল। আমরা মুখে বলি যে আমরা ডেমোক্রেটিক বা গণতান্ত্রিক সিস্টেমে বাস করি, কিন্তু বাস্তবে এই সিস্টেমগুলো ভেতর থেকে পুরোপুরি পঁচে গেছে। আমাদের এখন এমন এক সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দরকার যা এই শাসক শ্রেণির স্বার্থকে সাধারণ মানুষের স্বার্থের অধীন (subordinate) করতে পারবে। কারণ তারা আমাদের জন্য এবং আমাদের সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। আমাদের এখন মৌলিকভাবে ভিন্ন কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন।

 

Varsha Gandikota: হ্যাঁ, এটা দেখা সত্যিই আশ্চর্যজনক যে- যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্টার-টেররিজম ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সাবেক প্রধান জো কেন্ট ঠিক এই ঘোষণাটি দিয়েই চাকরি ছেড়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান আসলে বিশ্বাসযোগ্য কোনো সামরিক হুমকিই ছিল না; বরং ইসরায়েলই এই হামলা শুরু করার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

হিকেলঃ দেখুন, কেউ যদি মনে করে থাকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে বা ইউরোপে আক্রমণ করতে চায়-তবে সেটা পাগলের প্রলাপ। ইরান কেনইবা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপে হামলা করতে চাইবে? আর ইরান বা গ্লোবাল সাউথের কোনো দেশ পশ্চিমের জন্য কোনো ধরণের সামরিক হুমকি- এই পুরো আইডিয়াটাই আসলে একটা প্রোপাগান্ডা (Propaganda)। আপনি ইরানের সামরিক বাজেটের দিকে তাকান না; এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটের মাত্র ০.৫ শতাংশ! হ্যাঁ, মাত্র ০.৫%! আর এই ০.০৫% তো তো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করলে। তার ন্যাটো মিত্রদের সাথে তুলনা করলে এটা আরও কমে আসবে। অথবা চীনের কথা বলা যাক- চীনকে নিয়ে তারা সবসময় এমনভাবে কথা বলে মনে হবে যেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীন বিরাট এক সামরিক হুমকি। অথচ চীনের মাথাপিছু সামরিক ব্যয় (Military spending per capita) বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও কম। তাই আমি মনে করি, বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আসল হুমকি হলো সেই সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যাদের হাতে বিশাল ও হাইটেক সব সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং যারা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। পৃথিবীতে চলা বিশৃঙ্খলা আর অস্থিরতার জন্য আসলে এরাই দায়ী।

 

Varsha Gandikota: মার্চের শুরুর দিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরানের সামরিক ব্যয়ের সমালোচনা করে বলেছিলেন ইরানের সাধারণ মানুষ নাকি তাদের সরকারের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ; কারণ সরকার শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো জরুরি খাতে গুরুত্ব না দিয়ে সব টাকা ঢালছে মিসাইল আর লঞ্চারের পেছনে। আমার কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হয়, কারণ এর মধ্যে বড়সড় দুটো আইরনি আছে। প্রথমত, আপনি যেমনটা বলছিলেন- যুক্তরাষ্ট্র নিজেরই তো সামরিক বাজেট দুনিয়ার সব দেশের চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে সবসময় একটা হুমকির মুখে রাখা হয় এবং তাদের ওপর এমন এক সিকিউরিটি স্টেটের বয়ান চাপিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টেকাতেই সামরিক বাজেট বাড়াতে বাধ্য হয়। আমরা আবারও গ্লোবাল নর্থের আলোচনায় ফিরি। আপনি আজ যা বললেন, তাতে তো মনে হচ্ছে বিশ্বের সব বড় বড় অর্থনীতিগুলো আসলে একেকটা বিশাল স্বৈরতন্ত্র; রাজনীতিতে তা-ও আমরা নামমাত্র ভোট দেওয়ার সুযোগ পাই, কিন্তু অর্থনীতির কলকাঠি নাড়ানোর ক্ষমতা আমাদের হাতে একদমই নেই। গ্লোবাল নর্থে যারা বাস করেন, সেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব আসলে ঠিক কতটা?

হিকেলঃ হ্যাঁ, আমি মনে করি এটা খুব জরুরি একটা পয়েন্ট। মানুষ ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের কথা ভাবতে গেলে তাদের মাথায় সাধারণত বাজার, বিজনেসের কথা আসে। কিন্তু পুঁজিবাদ আসলে এটা নয়; এই বিষয়গুলো তো পুঁজিবাদের হাজার বছর আগে থেকেই বিভিন্ন রূপে ছিল। তাহলে পুঁজিবাদ আসলে কী? এটা হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে অর্থনীতির উৎপাদনযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ সমাজের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশের হাতে থাকে। এরা হচ্ছে সেই শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী, বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক আর বিশাল সব কর্পোরেশন। এরাই হলো ‘ক্যাপিটাল’ বা পুঁজি, যারা ঠিক করে দেয় উৎপাদন কোথায় হবে এবং কী উৎপাদিত হবে।

এর ফলে আমরা এক ধরণের বিকৃত উৎপাদন ব্যবস্থা দেখতে পাই। আমরা দেখি এসইউভি কার, ফাস্ট ফ্যাশন, লাক্সারি ক্রুজ শিপ কিংবা বিশাল ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’-এর পেছনে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে- কারণ এগুলো পুঁজির জন্য লাভজনক। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখতে পাই মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপাতির উৎপাদনে চরম ঘাটতি; যেমন অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং বা সস্তা আবাসন, রিনিউয়েবল এনার্জি, কিংবা পরিবেশবান্ধব খাদ্য উৎপাদন। আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার, সেগুলো আসলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম তৈরি হচ্ছে।

এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য- একদিকে আমরা এত বেশি উৎপাদন করছি যে আমাদের গ্রহের সহনসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে ইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে; আবার অন্যদিকে একই সাথে বিশাল সংখ্যক মানুষ চরম বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এমনকি ইম্পেরিয়াল কোরের রাষ্ট্রগুলোতে- যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপেও-ব্যাপক অভাব-অনটন রয়েছে। আমি সম্প্রতি পড়ছিলাম যে, এই কোর স্টেটগুলোর প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ‘ফুড ইনসিকিউর’ বা খাদ্যহীনতায় ভুগছে; তারা খাবারের মতো মৌলিক বিষয়েরও নিশ্চয়তা পায় না। আমরা আমাদের শাসক শ্রেণির চালানো এই সব যুদ্ধ আর অনিয়মের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেও যখন তাতে বিন্দুমাত্র সাড়া পাই না তখন কি আমরা বলতে পারি যে, পৃথিবীতে গণতন্ত্র আছে? তারা তাদের অপকর্ম চালিয়েই যায়। কোনো জবাবদিহি নেই তাদের। আমার মনে হয়, মানুষের জন্য এখন এই পুরো ব্যবস্থাটা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

 

Varsha Gandikota: পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে সত্যিকারের আপনি ‘ইকোনমিক ডেমোক্রেসি’র কথা বলেন। বিশ্বের কোথাও কি এটার মডেল আছে? এমন কোনো জায়গা- যেখানে মানুষই ঠিক করে দেয় তাদের সরকার কোন খাতে টাকা খরচ করবে, এবং যেখানে পুঁজিকে মুনাফার বদলে সোশ্যাল গুড বা সামাজিক কল্যাণে ব্যবহার করা হয়; অর্থাৎ মানুষের দরকারী খাতগুলোতে (যেমন খাদ্য আর স্বাস্থ্যসেবা) অর্থ ডাইভার্ট করা হয়?

হিকেলঃ আমার মনে হয় এর বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং উদাহরণ আছে। দেখুন, আমাদের ইকোনোমিক ডেমোক্রেসির মানে হলো এমন একটা সিস্টেম- যেখানে প্রোডাকশন বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে সাজানো হয় মানুষের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায়। চীনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি আর Public Finance System কিন্তু দারুণ শক্তিশালী। তাদের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের জন্য যে ধরণের উন্নয়ন দরকার, সেই অনুযায়ী তারা ইনভেস্টমেন্ট আর প্রোডাকশনকে কন্ট্রোল বা ডিরেক্ট করতে পারে। আজ তারা রিনিউয়েবল টেকনোলজির এক নম্বর প্রডিউসার এবং এই সক্ষমতা তৈরিতেও তারা বিশ্বে সবার আগে আছে। এছাড়া তারা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ক্যাম্পেইন চালিয়েছিল, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে মূলত ওই বিশেষ উদ্দেশ্যটাকে সামনে রেখে নেওয়া সুনির্দিষ্ট পলিসির কারণেই।

 

Varsha Gandikota: কিন্তু বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায় চীন তো একটা ব্যতিক্রম, তাই না? দেশটির বিশাল আয়তন আর স্কেলের কারণেই তারপক্ষে এমনটা সম্ভব হয়েছে। গ্লোবাল সাউথের অন্য ছোট দেশগুলো, যারা এই সিস্টেমে সবসময় অবদমিত হয়ে থাকে, তাদের জন্যে কি এটা সম্ভব? আর এটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে তাদের কোনো পথ আছে?

হিকেলঃ দেখুন, আমার মনে হয় কিউবা এখানে আরও একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। এই দেশটি তাদের সীমিত রিসোর্সগুলো যেভাবে সামাজিক লক্ষ্য পূরণে ব্যবহার করতে পেরেছে, এটাকে আমাদের বাহবা দিতেই হবে। মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থাকে সাজানোর ফলে তারা সত্যিই দারুণ কিছু সামাজিক ফলাফল অর্জন করতে পেরেছে। যত যাইহোক, শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মুক্তি কেবল প্রতিটি দেশের নিজেদের আলাদা আলাদা অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নির্ভর করলে আসবে না। আমার মনে হয়, এর জন্য গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের ভেতর জোরালো সমন্বয় (coordination) আর সহযোগিতা (collaboration) প্রয়োজন।

যারা নিজেদের ফোনে লাইভ স্ট্রিমিংয়ে ফিলিস্তিনের গণহত্যা দেখেছে, তারা সবাই উপলব্ধি করতে পারছে যে, এই অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। এই ব্যবস্থা মৌলিকভাবেই মানবতার জন্য হুমকি। এই সিস্টেমে কোনো মনুষ্যত্ব নেই, তাই আমাদেরই বিকল্প সিস্টেম তৈরি করে নিতে হবে। আমাদের এমন একটা পৃথিবী গড়তে হবে যেখানে সবাইকে সমানভাবে দেখা হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সবার সমান অধিকার থাকবে।

 

Varsha Gandikota: আপনি শুরুতেই বলেছেন যে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমই আসলে আজকের দুনিয়ার প্রোডাকশনের আসল ইঞ্জিন। তো, গ্লোবাল সাউথের মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে যদি এই পুরো সিস্টেম বা উৎপাদন যন্ত্রকে থামিয়ে দিতে চায়, তবে তার জন্য কী প্রয়োজন?

হিকেলঃ বিশ্ব অর্থনীতি আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পেছনে যে শ্রম খরচ হয়, তার ৯০ শতাংশই আসে গ্লোবাল সাউথ থেকে। আবার পৃথিবীর ৯০ শতাংশ প্রাকৃতিক সম্পদও কিন্তু এই গ্লোবাল সাউথেই আছে। তার মানে কী? মানে হলো, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিটা আসলে গ্লোবাল সাউথের জমি আর শ্রমের ওপরই টিকে আছে। এখন ভাবুন, এই দেশগুলো যদি নিজেদের মধ্যে জোট বাঁধে, তবে তাদের রাজনৈতিক শক্তি কতটা বড় হবে! এটা সত্যিই ভাববার মতো বিষয়।

সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ঠিক এরকম চেষ্টা একটা কিন্তু হয়েছিল। তখন জাতিসংঘে ‘নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অর্ডার’ (NIEO) পাশ করা হয়। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো তখন একজোট হয়ে একটা কথাই বলতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল, “আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা নিজেদের স্বার্থে একে অপরকে সাহায্য করব।”

স্বাভাবিকভাবেই, এই মুভমেন্টটা পশ্চিমা দেশগুলোর পুঁজির জন্য একটা বড় হুমকি ছিল। তাই তারা NIEO-র পলিসিগুলোকে বাতিল করতে যা যা করা দরকার সব করেছিল। এবং শেষ পর্যন্ত এতে তারা সফলও হয়েছিল।

কিন্তু এখন আমরা গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশের মধ্যে আবারও সেই একই চেতনা দেখতে পাচ্ছি। তারা আবারও একজোট হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। আমার মনে হয় ‘হেগ গ্রুপ’ (Hague group)-এর কাজের মধ্যেও আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। আমি জানি আপনি নিজেও এই NIEO আর হেগ গ্রুপের সাথে যুক্ত আছেন। তাই এই বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা শুনতেও আমি আগ্রহী।

 

Varsha Gandikota: আমার ভালো লাগছে যে, আপনি ‘নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অর্ডার’- এর কথা তুলেছেন। অনেকে মনে করে যে, এই আন্দলোনটা এমনি এমনি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি ঠিকই বলেছেন, এটাকে আসলে পরিকল্পিতভাবে ‘হত্যা’ করা হয়েছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো যাতে কোনোভাবেই ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, সেজন্য ওই সময় এই আন্দোলনের অনেক নেতাকে খুন পর্যন্ত করা হয়েছিল।
এই আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য এর উপর বর্ণবাদী প্রপাগাণ্ডাও চালানো হয়। বলা হয় যে, “আফ্রিকান বা এশিয়ান দেশগুলো তো কোনোদিন একে অপরের সাথে মিলেমিশে কাজ করতেই পারবে না।” কিন্তু ‘হেগ গ্রুপ’-এর ক্ষেত্রে আমরা এর চেয়েও শক্তিশালী কিছু দেখতে পাচ্ছি। এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় আইনি আর কূটনৈতিকভাবে এক হয়ে কাজ করছে। তারা খুব পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেঃ “আমরা আমাদের জমি আর শ্রম ব্যবহার করতে দেব না। আমাদের বন্দর দিয়ে কোনো অস্ত্র যেতে দেব না। এমনকি আমাদের ফ্যাক্ট্রিতে এমন কোনো অস্ত্র তৈরি করতে দেব না যা দিয়ে ফিলিস্তিনীদের হত্যা করা হয়। “আপনি একটু আগে হরমুজ প্রণালী, পেট্রোডলার আর পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্ব নিয়ে বলছিলেন। এই ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেছে। ইরান বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে- তাদের সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হলে তাদের থেকে তেল কিনতে হবে এবং মূদ্রা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে চীনা ‘ইউয়ান’; মার্কিন ডলার চলবে না। আপনি কি এটাকে একটা ‘সার্কিট ব্রেকিং’ বা আমূল পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন? আপনার কি মনে হয় যে, এর ফলে বিশ্ব-ব্যবস্থায় একটা বড় ধরণের স্থায়ী পরিবর্তন আসবে?

হিকেলঃ আমি এটাকে বিশাল এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখি। ইরান বিশ্বকে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে- বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি কীভাবে চলে, তা তারা খুব ভালো করেই বোঝে। তারা জানে এর ‘চোক পয়েন্ট’ বা দুর্বল জায়গাগুলো কোথায়। তারা স্রেফ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। শুধু তাই নয়, ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো- পশ্চিম এশিয়া থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে। কারণ, বর্তমানে সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০-এরও বেশি সামরিক ঘাঁটি আছে। কোনো দেশ যদি মার্কিন অর্থনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে যেতে চায়, এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

 

Varsha Gandikota: যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি সামরিক ঘাঁটি আছে এমন দেশ কি আছে বিশ্বে?

হিকেলঃ আশেপাশেও কেউ নেই! চীনের মতো এত বড় একটা দেশ, ১৪০ কোটি মানুষ যেখানে বাস করে, বিদেশের মাটিতে সেই চীনের সামরিক ঘাঁটি মাত্র একটা। আসলে একেই বলে ইম্পেরিয়াল পাওয়ার।

আমার মনে হয়, যারা নিজেদের ফোনে লাইভ স্ট্রিমিংয়ে ফিলিস্তিনের গণহত্যা দেখেছে, তারা সবাই উপলব্ধি করতে পারছে যে, এই অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। এই ব্যবস্থা মৌলিকভাবেই মানবতার জন্য হুমকি। এই সিস্টেমে কোনো মনুষ্যত্ব নেই, তাই আমাদেরই বিকল্প সিস্টেম তৈরি করে নিতে হবে। আমাদের এমন একটা পৃথিবী গড়তে হবে যেখানে সবাইকে সমানভাবে দেখা হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সবার সমান অধিকার থাকবে।

বর্তমানে সেই বাস্তবতা নেই। আর বিশ্বের এই ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস (Geopolitical power) যতদিন না বদলাচ্ছে, ততদিন সেই বাস্তবতা আসবেও না। মানুষ হিসেবে আমাদের সম্ভাবনাকে সত্যি করে তুলতে হলে সবার আগে এই বর্তমান ব্যবস্থাকেই পাল্টাতে হবে।