বিপিএল এর একটি ম্যাচ শেষে পিচ এবং আউট ফিল্ড নিয়ে তামিমের করা মন্তব্যের জন্য ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে এই জরিমানা করা হয়েছে বলে বিসিবির তরফে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। এটুকুতেই থেমে থাকেনি, তামিমের সে মন্তব্যকে ভয়াবহ উল্লেখ করে কোহলির কাছ থেকে শিক্ষা নিতেও নসিহত করেছেন বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তা।
কোহলির কথাই যদি বলি, নিঃসন্দেহে সে বর্তমান বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের অন্যতম। মাঠের খেলা বাদেও কোহলি বহুবার শিরোনাম হয়েছেন নানা রকম বিতর্কের জন্ম দিয়ে। ভারতীয় ক্রিকেটাঙ্গনে নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত অনিল কুম্বলে কোচের পদ থেকে ইস্তেফা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এই কোহলির কারণেই। অনেক উদ্ভট কাজ করার পরেও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড তাকে কোন শাস্তির মুখোমুখি করেনি। অন্যদিকে মাঠের আচরণের দিক থেকে তামিমের সাথে কোহলির তুলনাটা অযৌক্তিক তো বটেই বরং উল্টা করে বলা যায়, তামিমের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এবারের বিপিএলে আউট হওয়া ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে এনে তিনি যে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন তা থেকে ভারতের অনেক ক্রিকেটারের। বিশেষ করে আমরা যদি গত বিশ্বকাপের কোয়ারটার ফাইনালে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সেই স্মরনীয় খেলার কথা মনে রাখি।

যা হোক আমাদের ক্রিকেটের কর্তারা ক্রিকেট নিয়ে কোন ধরণের চৌকসতা ধারণ করেন তা বুঝা মুশকিল। তা না হলে কেন এমন উদ্ভট তুলনার কথা তাদের মাথায় আসবে। আমাদের খেলোয়াড়েরা যতটা না আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি অহেতুক কথার আওয়াজ পাওয়া যায় বোর্ড থেকেই। কিন্তু জরিমানার বেলায় দেখা যায় খেলোয়াড়দের তাঁরা এমনভাবে শাসন করেন যেন খেলোয়াড়রা কোন কয়েদ খানায় আটক আর সেখানে তারা কারাগারের নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। অথচ ঘটনার গভীরে গেলে অন্যকিছুর, ভিন্নরকম কিছুর হদিস মিলবে। যেমন, বাজে আউট ফিল্ডের কারণে ইতোমধ্যেই দুটি ডিমেরিট পয়েন্ট পাওয়া শেরে বাংলা স্টেডিয়াম নাকি তামিমের মন্তব্যের কারণে ঝুকির মুখে পড়বে! অন্তত বোর্ড প্রধান এমনটিই বলেছেন। পুরো যুক্তিটাই হাস্যকর ঠেকছে ক্রিকেট বোদ্ধাদের কাছে। প্রথমত, এই ডিমেরিট পয়েন্ট যোগ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ শেষে। সেই সিরিজ শেষে অনেকটা সময় চলে গেলেও আউট ফিল্ড এখনো বাজে অবস্থায় থাকার কারণে যদি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয় সেটি হওয়ার কথা গ্রাউন্ডসম্যানকে। কিন্তু তাকে নিয়ে কোন কথা নেই। তিক্ত সত্য কথাটা রিপিট করার দায়ে তামিমককে প্রথমে শোকজ তারপর সহ-অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া এবং সবশেষে জরিমানা করে যে নজিরটি বিসিবি স্থাপন করল, তাতে সমস্যার তো কোন সমাধান হয়ই নি, বরং বিতর্কিত করেছে বিসিবির ভাবমূর্তিকে।
এ ঘটনার জের ধরে খেলোয়াড়দের ওপর আরোপিত হয়েছে মিডিয়ার সাথে কথা বলার নিষেধাজ্ঞা! বিসিবির অনুমতি ছাড়া কেউই এখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে পারবেন না। মিডিয়ার সাথে কথা বলার জন্য এই ধরণের হুকুম জারি কোন চিন্তা থেকে মাথায় আসে তা বুঝার সাধ্য ক্রিকেট বিশ্লেষকদের নেই। খেলোয়াড়দের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগে একটু ভেবে দেখা দরকার অন্য কোন দেশের বোর্ড প্রধান কি এত ঘনঘন মিডিয়ার সামনে হাজির হন? মিডিয়ার সাথে কথা বলার জন্য বিসিবির আলাদা একটা উইং রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সেটি শুধু কাগজে কলমেই।
কোহলিকে খেলোয়াড়দের আদর্শ মানার সবক দেয়ার আগে বিসিবি প্রধানের ভেবে দেখার দরকার ছিল ক্রিকেট অষ্ট্রেলিয়ার (সিএ) প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি। মেলবোর্ন টেস্ট শেষে পিচ নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করেছিলেন ইংলিশ ক্যাপ্টেন জো রুট। তার সাথে গলা মিলিয়েছেন অজি ক্যাপ্টেন স্টিভ স্মিথও। এ কারণে স্মিথকে জরিমানা তো দুরের কথা, কারণও দর্শাতে হয়নি। উল্টো সাদারল্যান্ড নিজেই ক্ষমা চেয়েছিলেন বাজে পিচের কারণে।
সত্য বলতে শৃঙ্খলাভঙ্গ না বরং বোর্ডের কিছু কর্তা তামিমের মন্তব্যকে ব্যাক্তিগতভাবে নেয়ার কারণেই এই অযাচিত জরিমানা হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। মাথাব্যাথায় ওষুধ দেয়ার বদলে মাথা কেটে ফেলার নীতিই এখানে অনুসরণ করা হয়েছে বলা যায়। বিসিবির মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বোর্ডের সাথে ক্রিকেটারদের অবদানও কম না। এরকম হাস্যকর বিষয়ে জরিমানা করে নজির তো স্থাপন করা যায়; তবে, সেটি ইতিবাচক কিছু না। আমরা বরং বোর্ড প্রধানকেই বলতে চাই, যারা নির্লজ্জভাবে ‘১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল তাদের কাউকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আদর্শ হিসেবে হাজির করার চেষ্টা কোন সুফল বয়ে আনবে না। বরং, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের খেলোয়াড়দের নৈতিক অবস্থান বেশ উচুতেই – তা বারবার প্রমাণিত হয়ে চলেছে।
বিপিএল এ নিশ্চিত রান আউট ভেবে মাঠ ত্যাগ করা এক ব্যাটসম্যানকে ক্রিজে ফিরিয়ে এনে তামিম স্পোর্টসম্যানশীপের এক দারুণ নজির স্থাপন করেছেন যা গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় প্রসংশিত হয়েছে। আমাদের বিসিবি থেকে কোন শুভেচ্ছার বার্তাও উচ্চারিত হয়নি। বোর্ড কেবল প্রস্তুত থাকে খামোখা জরিমানা করে একটা আদালত যে আছে তা সব সময় দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঠুনকো অযুহাতে তামিমকে জরিমানা করে ঠিক কি বোঝাতে চাইছে বিসিবি? খেলোয়াড়দের স্বাধীনতার সীমা আর বোর্ডের এখতিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে।
অন্যদিকে ক্রিকেট নিয়ে ক্রিকেটারই তো কথা বলবেন। পিচের ভাল-মন্দ নিয়ে যিনি খেলেন তিনিই তো সঠিক অবস্থাটি জানেন বোঝেন। ক্রিকেটের উন্নয়ন চাইলে জরিমানার খড়গ তুলে খেলোয়াড়দের মুখ বন্ধের এই আয়োজন থামাতে হবে। জরিমানার সংষ্কৃতি থেকে বের হয়ে আরও সহযোগিতামূলক আচরণ কীভাবে রপ্ত করা যায় সবারই সেদিকটাতে নজর দেয়া উচিত। পীচ অথবা মাঠ নিয়ে কথা বলায় জরিমানার এহেন বিধান থাকার কোন দরকার নেই। আর যে সমস্ত বিধান আছে তা যেন সমানভাবে সবার ওপর প্রয়োগ করা হয়।