চড়ুই
ছোট্ট চড়ুই—গভীর আনন্দ তুমি আমার প্রিয়ার,
যাকে সে জড়িয়ে রাখে বুকের ভেতর, কখনো সে
ছড়িয়ে দেয় খুঁটিনাটি খুনসুটি, খোঁচা দেয় আঙুলের
কোমল ডগা, পাখিটি বাড়িয়ে দেয় তার তীক্ষè ঠোঁটের
প্রত্যাঘাত, আমার এই প্রোজ্জ্বল প্রেম হয়তো তেমনই
চায় অথবা চায় অন্য কিছু—সহজ দুষ্টুমি, চায় তার
ব্যথা থেকে ক্ষণিক নিষ্কৃতি, উত্তাল আবেগের শান্তিময়
মুহূর্ত। আমিও তো খেলতে পারতাম তোমারই মতন,
যেমন সে খেলে তোমার সঙ্গে, আর হালকা করতে
পারতাম আমার অসুখী মনের বেদনাভার। ভাবতেই
কম্পিত হই—গল্পের সেই তুখোড় মেয়েটির মতো,
যে কিনা সোনালি আপেলের প্রলোভনে ভেসে গিয়ে
হারিয়ে ফেলেছিল তার কুমারী পোশাক।
চড়ুইয়ের মৃত্যু
ভেনাস, কিউপিড অথবা যাদের হৃদয় আজ পরিশুদ্ধ,
চলো তবে শুরু করি শোকার্ত বিলাপ। চড়ুইটি মরে গেছে,
যে ছিল আমার প্রিয়ার সহায়, আহা চড়ুই, গভীর আনন্দ
তুমি আমার প্রিয়ার, প্রিয়তম যেন তার চোখের চেয়েও;
কেন না তার কাছে সে ছিল মধুর এক হৃদয়-সহচর,
মেয়েরা যেমন থাকে মায়ের কাছে। কখনো সে যায়নি
ছেড়ে তার আলিঙ্গন, ছিল কতো ছুটোছুটি-লুটোপুটি আর
মিটিমিটি তাকিয়ে থাকা—তার সখীর দিকে। এখন সে
চলে গেছে অন্ধকার পথে, যেখান থেকে কোনোদিন আর
কোনো ফিরে আসা নেই। শয়তান ছড়িয়ে দিয়েছে অপচ্ছায়া—
অর্কুস, খাদক তুমি সকল সুন্দরের! ছিনিয়ে নিয়েছো তুমি
সুন্দর পাখিটিকে! কী বিশাল দানবিক অপরাধ! আহা রে
ছোট্ট চড়–ই! তোমার মৃত্যুতে আমার প্রিয়ার মায়াবী চোখ,
দ্যাখো লাল, গড়িয়ে পড়ছে টলোমলো অশ্রুবিন্দু।
লেসবিয়ার প্রতি
চলো বাঁচি আর ভালোবাসি, লেসবিয়া আমার।
কানাকড়ি-ফুটো পয়সায় চলো কিনে ফেলি
নীতিবাদী বুড়োদের এইসব কানাঘুষা, ফিসফাস।
জানো তো, সূর্য ডুবে যায়, আবার জেগে ওঠে।
অথচ আমাদের আলোর দৈর্ঘ্য কতোটা সীমিত,
আর একদিন তা ডুবেও যায়, অতঃপর ঘুমাতে হয়
চিরতর অন্ধকারে। আমাকে দাও হাজার চুম্বন,
আরও এক শত, আরও এক হাজার, আরও
এক শত, আরও এক হাজার, আরও একশত—
এইভাবে যতক্ষণ না চুমুতে চুমুতে আমাদের
হারিয়ে ফেলি গণনার স্রোতে —আর ততক্ষণে
গুনে গুনে ব্যর্থ হবে মন্দ লোকের চোখ—ঠিক
কতগুলো চুমু আমরা খেয়েছিলাম!
কতগুলো চুম্বন পেলে
লেসবিয়া, তুমি জানতে চেয়েছো কতগুলো
চুম্বন পেলে পূর্ণ হবো আমি। সিলফিয়ামে ভরা
সাইরেনে লিবিয়ান মরুর ক’হাজার ধুলো
আলাদা করেছে প্রাচীন বাত্তুসের মিনার আর
জোভের মন্দিরকে? রাত্রির আকাশে স্থির
কতগুলো তারা ফিরে দেখে মানুষের গোপন প্রণয়?
আবেগে থরোথরো কাতুলুসকে যতো খুশি
দান করো তুমি, তার জন্য তা-ই তো অধিক,
কিছু কিছু সংখ্যা থাকে হিসেবের বাইরে,
কৌতুহলী চোখ যা গুণতে পারে না,
মন্দ কথায় যার কিছুই ঘটে না আর।
ইপসিথিল্লা
ইপসিথিল্লা, প্রিয়তম আমার,
মিনতি জানাই পাখি,
বন্ধ রেখো না দ্বার
ডেকে নিও দুপুর-শয্যায়।
আমারই প্রতীক্ষায় থেকো তুমি
তোমার ঘরে, সময় কোথায়
সময় নষ্ট করার! প্রস্তুতি নাও
পাখি—নয়টি দীর্ঘ সঙ্গমের।
দুপুরে খেয়েছি আমি, শুয়ে শুয়ে
ভাবছি, তোমাকে জানানো দরকার
আমার আলখাল্লা আর জোব্বার ভেতর
জেগে আছে তীক্ষèচূড় এক অঙ্গের উত্থান।
কায়েলিউসের প্রতি
কায়েলিউস, তুমি কি চিনতে লেসবিয়াকে,
আমাদের লেসবিয়া, আমার লেসবিয়া—
তুচ্ছ করে সব পরিবার পরিজন,
কাতুলুস যাকে ভালোবাসত নিজেরও অধিক,
এখন তাকে পাওয়া যায় চৌরাস্তায় আর
অন্ধ গলিতে—মহান রেমুসের বংশধরদের
তৃপ্ত করতে আর যৌনাঙ্গের খোসা ছাড়াতে।
প্রেম ও ঘৃণা
আমি ঘৃণা করি, আবার ভালোও বাসি;
তুমি বললে, কেন?
কে জানে? কিন্তু এটাই সত্যি, এমনই ঘটে;
আর জানি যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছি আমি।
রুফুস
রুফুস, তুমি খোঁজো না—মেয়েরা কেন
তোমার বাহুতে ছড়িয়ে দেয় না কোমল শরীর,
যদিও তুমি মণিমুক্তা আর পট্টবস্ত্র দিয়ে
ওদের বশে আনতে চাও।
তোমাকে নিয়ে কানাঘুষা চলছে:
তোমার বাহুর খাঁজে বাস করে বন্য এক পাঁঠা,
মেয়েরা তাই ভয়ে অস্থির। কেননা
পশুটির নেই মনোহরণের ক্ষমতা।
কোনো সুদর্শনাই যাবে না শয্যায় তেমন এক
পশুর সঙ্গে। আর তাই, হয় সেই জন্তুটিকে
হত্যা কর, নয় প্রশ্ন করো না আর—
মেয়েরা কেন তোমাকে দেখে পালায়।
বসন্ত
বসন্ত এসে গেছে, গলিয়ে দিয়েছে দ্যাখো এশীয়
শীতের হিম, পশ্চিমা বাতাসের উষ্ণ উল্লাস থামিয়ে
দিয়েছে সব স্বর্গের প্রমত্ত ঝড়ের পাগলামি।
এখনই সময় ছেড়ে যাবার—ফ্রিজিয়ান সমতল,
উর্বর পল্লী-জনপদ আর স্যাঁতসেঁতে নিকাইয়া।
চলো উড়ে যাই এশিয়ার সেইসব বিখ্যাত শহরে।
স্পন্দিত হৃদয় আমার, দুরুদুরু কম্পনে ভাবছি
সেইসব দিনের কথা যখন আমরা কাতর ছিলাম
দীর্ঘ ভ্রমণের প্রবল ইচ্ছায়। বিরামহীন, আনন্দে
উদ্বেল আমার পা; বিদায়, বিদায় হে ভ্রমণসঙ্গী
বন্ধুগণ! গত বছর আমরা এক সাথে ছেড়েছিলাম
ঘর, ভিন্ন ভিন্ন পথ আবার আমাদের পৌঁছে দেবে রোমে।
কাতুলুস: কবি। জন্মেছেন খ্রিস্টপূর্ব ৮৪-তে, ভেরোনায়। কাতুলুস ছিলেন ধনি পরিবারের সন্তান। তাঁর বন্ধু এবং শত্রু-তালিকায় ছিলেন বাগ্মী সিসেরো, রাষ্ট্রনায়ক জুলিয়াস সিজার, বিচারক ক্লোদিয়াস পুলখার, ঐতিহাসিক ও জীবনীকার কর্নেলিয়াস নেপোস, কবি ও বাগ্মী লিসিনিয়াস কালভুস, রাষ্ট্রনায়ক মেম্মিউস। কাতুলুসের কবিতায় উপস্থাপিত মানসসুন্দরী লেসবিয়া মূলত ক্লোদিয়াস পুলখারের বোন এবং প্রখ্যাত রাজনীতিক মেতেল্লুস সেলের স্ত্রী ক্লোদিয়ার সাহিত্যিক প্রতিমা।