Jobanউপাচার্যকে উদ্ধারে ছাত্রলীগ কেন?

উপাচার্যকে উদ্ধারে ছাত্রলীগ কেন?

আবারও স্বরূপে ছাত্রলীগ। গতকাল মঙ্গলবার ছাত্রী নির্যাতনকারী অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কারসহ চার দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)-র সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করতে গেলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অবরুদ্ধ ঢাবির উপাচার্য (ভিসি)-কে সরিয়ে নিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী আহত হন।

রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাবির উপাচার্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সম্মানহানি ঠেকানো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টোরিয়াল টিমের দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সেখানে বার বার সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কেন আসতে হচ্ছে- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ প্রশাসনের ওপর কি ঢাবি কর্তৃপক্ষের আস্থা নেই? ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগই কি সবার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত?

ছাত্রী নির্যাতনকারী নেতাকর্মীদের অপকর্ম ঢাকতে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ গণমাধ্যমকে জানান, উপাচার্যের সম্মান রক্ষা করতে ছাত্রলীগ সেখানে গিয়েছিল। এর আগের উপাচার্যও ছাত্রলীগকে নিজের কাজে লাগামহীনভাবে ব্যবহার করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। নবনির্বাচিত উপাচার্যের সঙ্গে অনেক বিষয়ে সাবেক উপাচার্যের দ্বন্দ্ব থাকলেও ছাত্রলীগের নীতিতে যেন দু’জনই সমান।

এ বিষয়ে ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, সাত কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কারণে আমাদের মান যাচ্ছে- ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওই মনোভাবে আমার সায় নেই। কিন্তু তাদের দাবি করতে তারা পারে। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতান্ত্রিক উপায়েই কর্তৃপক্ষ তা মোকাবেলা করবে- এটি প্রত্যাশিত। কিন্তু তাদের দমন করতে ছাত্রলীগকে ডাকা হলো। নেতাকে পুলিশের হাতে দেয়া হল। ছাত্রীদের নির্যাতন করা হলো। এবার হামলা, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ জানাতে যুক্ত হলো বাম সংগঠন আর কয়েক সচেতন ছাত্র-ছাত্রী। আন্দোলনকারীরা কয়েকটা গেট ভেঙেছে। ওই হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সম্পদ বিনষ্ট করেছে। আর তিনটি জোর দাবি জানিয়েছে। তা হলো প্রক্টরের পদত্যাগ, মামলা প্রত্যাহার ও নির্যাতনকারীদের বহিষ্কর। এগুলোর একটি দাবিও মানেনি কর্তৃপক্ষ। এর বিনিময়ে তারা পেয়েছে গুন্ডাদের মারধর।

ঢাবির সাবেক ছাত্রনেতা ফিরোজ আহমেদ মন্তব্য করেন, উপাচার্য প্রমাণ করলেন দলাদলিতে আলাদা হলেও যৌন নিপীড়ক লাঠিয়াল সন্ত্রাসীদের সঙ্গে দোস্তিতে তিনি আগেরজন থেকে ভিন্ন কিছু নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী ছেলেমেয়েদের অভিনন্দন জানাই, তারা জানিয়ে দিয়েছে- ওই শিক্ষাঙ্গনে শুধু জানোয়ারদের একচেটিয়া রাজত্ব নেই, সংগ্রামী চেতনাও রুখে দাঁড়াচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত

সাতটি কলেজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ১৫ই জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে হামলা ও ছাত্রী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের বিচারসহ চার দফা দাবিতে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) থেকে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থী’দের ব্যানারে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি দুপুর ১২টার দিকে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে আসে। এ সময় আগে থেকে তালা লাগিয়ে রাখা উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনের প্রশাসনিক ভবনের গেইটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনের আরো দুটি কলাপসিবল গেইটের তালা ভেঙে ফেলেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে ভিসির অফিস কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়ে তারা সেখানে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানীসহ কয়েক শিক্ষক আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে ভিসির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ভিসিকে অফিস কক্ষের বাইরে আসার দাবি জানান।

নেতাকর্মীদের ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল নিয়ে উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন। তারা উপাচার্যকে কক্ষে পাঠিয়ে আন্দোলনকারীদের করিডাের থেকে সরিয়ে দেন। এরই মধ্যে ছাত্রলীগের কয়েকশ’ কর্মী এসে জড়ো হয়। এরপর তারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরা বের হওয়ার সময় বিভিন্ন ফটকের সামনে থাকা ছাত্রলীগের কর্মীরা দফায় দফায় রড, লাঠি, ইটপাটকেল, লাথি, কিল, ঘুষি মেরে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

উল্টো আন্দোলনকারীদের বিচার দাবি

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা অস্বীকার করে উল্টো তাদের ‘বাম সন্ত্রাসী’ ও হামলাকারী আখ্যা দিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। মঙ্গলবার বিকালে মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ মম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সোহাগ বলেন, আন্দোলনের নামে তারা ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। উপাচার্যের ওপর হামলা করেছে, ভাঙচুর চালিয়েছে। আমরা তাদের বিচার চাই এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের জোর দাবি জানাই।

সংবাদ মম্মেলনে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, আন্দোলনকারীরা নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। শারীরিকভাবে নিপীড়ন চালিয়েছে। তিনি মোবাইল ফোনে ছবি দেখিয়ে বলেন, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা ওই আন্দোলনে লিড দিয়েছে। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী হয় কী করে? অবশ্য এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি দাবি করেন, আন্দোলনকারীরা জঙ্গি কায়দায় হামলা ও ভাংচুর চালিয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রশিবির ছিল।

ছাত্রলীগের ‘ভুয়া’ প্রচারণা

অন্যদিকে কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শায়লা শ্রাবণীকে কয়েকজন বাধা দিচ্ছে- এমন ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে আন্দোলনকারীদের হামলাকারী বলে আখ্যা দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অথচ ওই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় তুলে ধরেছেন ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী শ্রাবণা শফিক দীপ্তি।

দীপ্তি বলেন, “ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতানেত্রীরা একটা ছবি গণহারে শেয়ার করেছে। ওই ছবিতে দেখানো হয়, এক মেয়েকে ঘিরে আছে কয়েক ছেলে। ওই মেয়ে কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শায়লা শ্রাবণী। তারা দাবি করেছে, শ্রাবণীকে ঘিরে থাকা ছেলেরা তাকে নির্যাতন করছিল। আমি আজ ছাত্রলীগের হামলার শিকার। প্রকৃত ঘটনাটি সম্পর্কে আপনাদের জানাতে চাই। আজ আন্দোলনে দফায় দফায় ছাত্রলীগ হামলা চালায়। এক পর্যায়ে রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের চতুর্দিক থেকে ছাত্রলীগ দ্বারা ঘেরাও থাকা আমরা বের হতে গেলে তারা ভয়ঙ্করভাবে হামলে পড়ে। সেখানে আমাকে ছাত্রলীগের কয়েক নেতানেত্রী কিল-ঘুষি দিচ্ছিল, টানা-হেঁচড়া করছিল, চড়-থাপ্পড় মারছিল। এক পর্যায়ে আমার পেটে একটা লাথি পড়ে এবং আমি কোণায় ছিটকে পড়ি। এরপর আমার বন্ধু ও সাংবাদিক ভাইয়েরা আক্রমণকারীদের নিরস্ত করতে চেষ্টা করলে ওই মেয়ে তাদের গালাগাল করতে করতে ব্যারিকেড ভেঙে সামনে আসে। আমার সাহায্যকারীরা তাকে কোনােমতে গায়ে হাত না দিয়ে নিরস্ত করার চেষ্টা করছেলেন- যেটার ছবি ছাত্রলীগের নেতানেত্রীরা শেয়ার করেছে। কিন্তু ওই পর্যায়ে আরেকদিকে আমাদের এক সিনিয়র আপুর বুকে ছাত্রলীগের ছেলেরা ক্রমাগত লাথি দিলে আমার বন্ধুরা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়। আমাকে একা পেয়ে ওই মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। আমাকে সে তখনাে মেরে যাচ্ছিল আর বলছিল, ‘কেন আন্দোলন করলি? আন্দোলন করে কী করবি, আমরা তা দেখে নেবো’।”

ছবিটি শ্রবণা শফিক দীপ্তির ফেসবুক থেকে নেয়া। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসানের দেয়া ছবিও দেখা যাচ্ছে।

দীপ্তি বলেন, ‘ছবিতে আমার ওপর হামলা করতে দেখা গেছে যে মেয়েকে সে আমার চুল ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, জামা টান দিয়ে ছিঁড়ছে।’ এছাড়া ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ওই আন্দোলনকে কতিপয় বাম দলীয় ‘সন্ত্রাস’ বা ছাত্রদলের কার্যকলাপ বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জানিয়ে দিতে চাই- আমি কোনাে বাম দল করি না, ছাত্রদল করি না, ছাত্রশিবির করি না, ছাত্রলীগও কখনো করিনি। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ট্যাগবিহীন সাধারণ শিক্ষার্থী।’

ছবিতে ছাত্রলীগ কুয়েত মৈত্রী হল শাখার নেত্রী শায়লা শ্রাবণীকে (গোলচিহ্নিত) দেখা যাচ্ছে দীপ্তির ওপর হামলারত অবস্থায়।

নিজেরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে অন্যকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে মিডিয়ায় বিজ্ঞপ্তি প্রচারই প্রমাণ করে, তারা অপরাধ করলেও তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা নেই। বরং সবকিছু ক্ষমতা ও গায়ের জোরে নিজেদের পক্ষে নিতে সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা না করে যা খুশি তা-ই করে যাচ্ছে। এই উল্টা প্রচারণা সাধারণ ছাত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারকে অবাক করেছে। অভিভাবকরা সন্তানদের নিরাপত্তাহীনতার কথাও জানিয়েছেন মিডিয়ার কাছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  রাজনৈতিক কয়েক নতুন কর্মী তাদের মতামতে জানান, শুধু একা ছাত্রলীগের দোষ দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হবে না। মূল সংগঠন ও রাষ্ট্র যে সন্ত্রাসের সংস্কৃতি চর্চা করছে তাদের তরুণ সংগঠন ওই ধারারই বিষফোঁড়ারূপে হাজির হয়েছে। এই জুলুম ও সন্ত্রাসের অবসান করতে দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।

আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদেরের বায়ে দাড়িয়ে শায়লা শ্রাবণী।