Jobanআরবি গল্প ‘গীত’

আরবি গল্প ‘গীত’

মূল : সালমা মাতার সাইফ। বাংলায়ন : তাসনীম আলম।

‘আবার যদি ওই নষ্ট মেয়ের সঙ্গে দেখি তো পশুর মতো জবাই করে ফেলব’- উপুড় করে মাটিতে ফেলে স্থূল পা দিয়ে ঘাড়ে লাথি দিতে দিতে দাদা শাসালেন আমাকে। আরো জোরে পা ঘষতে শুরু করলেন আমার পিঠে-ঘাড়ে। তারপর পা দিয়ে সজোরে দূরে ঠেলে দিলেন। কাঁপছিলাম হৃৎস্পন্দনের মতো। ভয়ে এত বিবর্ণ হয়ে পড়েছিলাম যেন মরুভূমির প্রখর তাপে ঝলসে যাওয়া কোনাে গাছ।

জ্ঞান ফিরে মা কে পেলাম। ‘মা, ও কৃষ্ণ বলেই কি দাদা ওর সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেন?’

তোমার দাদা অবাধ্যতা একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। ও মুক্তা সংগ্রহের জাহাজের কাপ্তান ছিল। দুর্গম সাগরে মুক্তা তুলতে গিয়ে কত মৃত নাবিককে নিজ হাতে সাগরে নিক্ষেপ করতে হয়েছে তাকে! খুব কঠিন তোমার দাদার হৃদয়। জানি না, পায়ের তলায় তোমাকে পিষতে কোনাে কষ্ট অনুভব করেছেন কি না। তুমি আর ওই মেয়েটার প্রতি ওর ঘৃণাটা বাড়িয়ে দিও না।

মেয়েটিকে এত ঘৃণা করার কারণ জেনে খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। দাহমা আমাদের প্রতিবেশী হওয়ার পর থেকেই দাদা দেখেছি ভীষণ বিষণ্ন আর বিরক্ত। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে একপাশ ফিরে শুয়ে কী যেন ভাবেন সারাক্ষণ। বাইরেও যান না আর। রুক্ষ-কঠিন তার মুখটা সব সময় গম্ভীর থাকে। রাতে বেশ কয়েকবার আমার ঘুম ভেঙে যেত তার ধূমপান আর একঘেয়ে কাশির শব্দে। ভয়াবহ দুশ্চিন্তা দাদাকে মরণাপন্ন করে তুলেছিল। দাদার ওই পরিবর্তন শুরু হয় আমাদের নতুন প্রতিবেশী দাহমা আসার পর থেকেই। দাদা যখন টের পেলেন দাহমা-র কাছে আমি প্রায়ই যাই তখন প্রচণ্ড রাগে উন্মাদের মতো মায়ের সামনেই আমাকে মাটিতে ফেলে নিষ্ঠুরের মতো পিষতে লাগলেন। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো, আমি তার রক্তে-মাংসের অংশ।

দাদার ঘৃণার কারণ জানতেই আবার দাহমার কাছে যাওয়া শুরু করি। ওই মেয়ের মধ্যে খারাপ কিছুই দেখি না। তবু দাদার এমন মনোভাব আমাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তার সম্পর্কে। সে অসম্ভব সুন্দরী। ব্যাবিলনীয় বা সুমেরিয়ান দেবীর মতো নিঁখুত তার দৈহিক গঠন। যে কেউ তাকে দেখে থমকে যাবেন, মুগ্ধ হবেন। ঘুঘু পাখির মতো গোল মাথা আর প্রশস্ত তার হাতের তালু। কাছে থেকে দেখেছিলাম, তার বাদামি কাঁধে নিষ্ঠুর আঘাতের দাগ দগদগে হয়ে আছে। অমানবিকভাবে কেউ তাকে খুব মেরেছে। আমার বিস্ময় আর মুগ্ধতা দেখে সে শুধু নিঃশব্দে হেসেছে। কখনোই কোনাে কথা বলেনি। তার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাসি ছাড়া সে কোনাে উত্তর দেয়নি।

‘মা, দাহমার কথা শুনতে চাই আমি।’ যখনই মায়ের কাছে দাহমার কথা জানতে চাই তখন মা জ্বলে ওঠেন খুব রাগে।

‘ঠিক আছে। আমি আবার দাহমার কাছেই যাচ্ছি। দাদার যা খুশি করুক আমাকে।’

অসুস্থ রোগীর মতো মা কম্পিত হাতে আমার হাত টেনে ধরনি।

‘ওই মেয়ের খুব বদনাম আছে আর…’- মা থেমে যান। তবু দাহমার কাছেই যাই। তার কালো চোখ গভীর মেঘে ভারাক্রান্ত। কিন্তু বৃষ্টি হয়ে তা ঝরে পড়ে না। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি আপাদমস্তক। নাহ! কোনাে ভাবেই তোকে বীরাঙ্গনা ভাবতে পারি না। এত সুন্দর দেহটিতে কোনাে কালিমা দেখতে পাই না। মা নিশ্চয়ই সত্যটি জানতে পারনি তার ব্যাপারে।

আবার ধরি মাকে, ‘মা, দাহমার প্রকৃত কথা বলো আমাকে।’

মা মূহূর্তেই কঠিন হয়ে যান। বিবর্ণ হয়ে ওঠে তার চেহারা- ‘ওই মেয়ের কথা ভুলে যাও। তোমার দাদা আরেকবার ধরতে পারলে তোমাকে খুন করেই ফেলবেন।

‘ঠিক আছে। তবে দাদার কাছেই জানতে চাইবাে তার কথা।’

মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে রাগতস্বরে মা বলেন, যে মেয়ে তোমাকে এত মুগ্ধ করে সে তো এক মাতাল নারী ছাড়া আর কিছুই নয়। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখাে।’

পরদিন সকালেই দাহমার ঘরে যাই। সোজা ওর চোখে চোখে তাকাই। তার চোখ দুটো লাল। তবে এতে অ্যালকোলহের প্রভাব নেই। তার চোখে যে আগুন জ্বলছে তা নিদ্রাহীনতা বা গভীর বেদনায় প্রকাশ করছে।

‘দাদা, কেন দাহমার কাছে যেতে নিষেধ করেন? শুধু সে কৃষ্ণকায় বলে! আমি তো খুব পছন্দ করি তাকে।’

দাদা আমার চুল মুঠি করে ধরে জোরে জোরে নাড়াতে থাকেন যেন সব চুল উপড়িয়ে ফেলতে চান।

‘ভীষণ বেয়াদব হয়েছিস তুই। এত গোঁয়ার আর অবাধ্য মেয়ে দেখিনি। এর মাথা গুঁড়িয়ে দেবাে। এত দুঃসাহস তোর! এক বেশ্যার কথা জানতে চাস আমার কাছে। জানতে চাস তার ১০ জারজের কথা!

দাদা যখন বাজারে আড্ডা দিতে বেরিয়ে যায় তখন এক দৌড়ে দাহমার বাড়ি যাই। বুঝি না কেন আমি এত মুগ্ধ দাহমার প্রতি। দাদার কাছে শুনলাম তার ১০ জারজ সন্তান আছে। কিন্তু আমি তো তাকে একাই দেখি। এত মার খেয়েও দাহমাকে ছাড়তে পারি না শুধু এ রহস্য উদ্ঘাটনে যে, দাদা কেন ওই মেয়ের নাম শুনেই এত দুর্বল হয়ে পড়েন, এত রেগে ওঠেন।

আজ দাহমা-কে আর একা পেলাম না। ওর পাশে বসে আছে এক বয়স্ক কবি। খুব ভালো করেই চিনি তাকে। প্রতি ভোরেই রাস্তা থেকে ভেসে আসে তার গমগমে কণ্ঠের আবৃত্তি, তার গানের সুর। তার গান-কবিতা শুনে মনে হয়, দীন-দুনিয়া ভুলে সে যেন বুঁদ হয়ে আছে একটি নারীতে বা কোনাে বিশ্বাসে। তবে এখন তার মধ্যে কোনাে উন্মাদনা বা অস্থিরতার ছাপ নেই। শান্ত-স্থির হয়ে সে বসে আছেন দাহমার কাছে। আমার মনে হলো, একমাত্র ওই পাগলই আমাকে বলতে পারে দাহমার গোপন কথা। আমাকে দাহমা টেনে নিল তার কাছে। তার শরীরে পাম গাছের গন্ধ পেলাম যেন। তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এখন তার সঙ্গে কথা বলা নয়, এমনকি ওই কবির কাছেও এখন কিছু জানতে পারবাে না। আমার এখন যাওয়াই ভালো। আমাকে দাহমা আদর করলাে মৃদুভাবে।

বাড়ি ফিরে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পায়ে পড়লাম- ‘মা বলো, দাহমা কে?’ মা আমার মুখ চেপে ধরলেন। দৌড়ে দেখে এলেন দাদা বাড়ির কোথাও আছেন কি না। তিনি বাইরে গেছেন। নিশ্চিত হয়ে মা বলেন, দাহমা মানসিক ভারসাম্যহীন। ওর মা ছিল বদ্ধ পাগল। পুরো উলঙ্গ হয়ে থাকতেন। রাস্তায় নগ্ন হয়ে বের হলেই সবাই পাথর ছুঁড়তো বা মারতাে। একদিন তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কেউ নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তাকে। খেয়াল করি, মা এসব কথা বলতে বলতে ভয়ে কাঁপছেন। আহত প্রাণীর মতো গোঁঙাচ্ছেন। তবু বলে যাচ্ছেন- সাগর পাড়ের ওইসব মানুষের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনাহারে মারা যেত বহু মানুষ। অভাবের তাড়নায় সবাই তাদের দাস-দাসীদের পানির দামে বিক্রি করা শুরু করে। দাহমার মা যখন শুনেনে তার মালিক তাকে বিক্রি করে অজানা দেশে পাঠিয়ে দেবে তখন তিনি এক নির্জন তাঁবুতে লুকিয়ে থাকেন বহুদিন। আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় তিনি পাগল হয়ে যান একদিন।

‘কিন্তু দাদা কেন দাহমাকে ঘৃণা করেন?’

মা আর উত্তর দেন না। বুঝলাম, পেটের দায়ে মানুষ অনেক নিষ্ঠুর কাজ করতে বাধ্য হয়। দাহমা হয়তো তার মায়ের কষ্টেই নির্বাক থাকে অথবা এ পৃথিবীর নির্মমতা তার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। যে কারণই থাকুক, প্রচণ্ড ঘৃণা করা শুরু করি আমার দাদাকে। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাই দাহমার বাড়ির দিকে তাকিয়ে। কল্পনায় দেখতে থাকি এক নারী নীরবে বেঁচে আছে মুখে এক টুকরো অস্বস্তির হাসি ঝুলিয়ে রেখে।

একদিন সকালে দাহমার কাছে যেতেই সে যখন আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বুকে জড়িয়ে নিল তখন ওর শরীরে শিশির ভেজা ধুলার গন্ধ পেলাম। ফিস ফিস করে সে বললাে, তোমার দুঃখিনী মাকে আর কষ্ট দিও না, তোমার দাদা খুব নির্দয় মানুষ।

এরপর দাদার অবয়ব দেখে আমার মনে হয়েছে, এক রক্তচোষা কাপ্তান যিনি তার নাবিকদের বঞ্চিত করে ধনবান হয়েছেন। তবু দাহমা কেন নীরব থাকে দাদার এত ঘৃণা প্রকাশের পরও! দাদা কি বুঝতে পেরেছেন দাহমাকে খুবই পছন্দ করি- তার কাছ থেকে আমাকে দূরে রাখার জন্যই এত রাগ।

তবু দাহমার রহস্যময় সঙ্গ পছন্দ করি। আমাকে সে নানাভাবে সাবধান করে আমার পরিণতি সম্পর্কে যদি তার সঙ্গে সখ্য রাখি। সে আসার পর থেকেই তো আমার দাদা দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছেন।

এক জ্যোৎস্না রাতে ওই ক্ষ্যাপাটে কবি আমার জানালায় নক করে। আমরা এক সঙ্গে দাহমার ঘরে যাই। কাঠ জ্বালিয়ে ঘর আলো করেছে দাহমা। আগুনের আলোয় দাহমার স্বচ্ছ চোখ দুটি মরুর আকাশের জ্বলজ্বলে তারার চেয়ে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। দাহমার চলাফেরাও আজ খুব আকর্ষণীয়, দৃঢ়। দীর্ঘ দিনের কষ্ট ভোগের পর এক অদ্ভুত শান্তভাব আর স্থিরতা তার চাল-চলনে। কখনো নাচের ভঙ্গিমার চলা, কখনো বেদনার অভিব্যক্তি, অব্যক্ত কথার ইঙ্গিত, নীরবতা বা মৃদু কথা- সবকিছুর এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখলাম তার মধ্যে। কবি আর আমি চাঁদের আলোতেই বসলাম একটু দূরে। পূর্ণিমার আলোয় সেদিন খুব আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। বিষণ্নতার মধ্যেও আমি আনন্দে আত্মহারা তখন। দাহমাকে সেদিন ভীষণ সুন্দর লাগছিল। অমন সুন্দরী আর দেখিনি।
এটিই উপযুক্ত সময় তাকে জানার। কবিকে বললাম, কে এই নারী? কেন দাদা এত ঘৃণা করনি তাকে? সে কি সত্যিই পতিতা?’
‘দাহমার মা পাগল হয়ে নগ্ন অবস্থায় চলাফেরা করতেন। তাই গ্রামের মানুষ একদিন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। দাহমা তখন উঠতি বয়সের অসামান্য সুন্দরী। যে কোনাে সাধু-সন্নাস্যীর মাথাও ঘুরে যেত ওর সৌন্দর্যে। ওর মালিকের কুদৃষ্টি পড়ে ওর ওপর। ক্রীতদাসীর মেয়ে ক্রীতদাসী। এ কারণে অধিকার নিয়েই সে একদিন ওর ঘরে প্রবেশ করে। দাহমার বাধার কারণে প্রথম রাতেই ওর দু’পা ফাঁক করে খাটের দু’পাশে বেঁধে পাশবিক লালসা পূর্ণ করে মালিক। এরপর থেকে প্রতি রাতেই বন্য আনন্দ আর উত্তেজনায় গোঁঙাতো নিষ্ঠুর লোকটি। এমনি করেই দাহমা এক সময় গর্ভধারণ করে। গৃহকর্ত্রী ভীষণ ক্রুদ্ধ ছিল ওর প্রতি। স্বামীকে কিছু বলতে না পেরে শোধ নিত দাহমার ওপর। তলপেটে আঘাত করতাে আর উঁচু স্থান থেকে দাহমাকে ওই অবস্থাতেই লাফ দিতে বাধ্য করতাে যেন ওর গর্ভপাত হয়। ভীষণ মারতাে ওর ঘাড়ে-পিঠেও। তবু দাহমার গর্ভের সন্তানের কোনাে ক্ষতি হলো না। নিরাপদে ওর ভ্রূণ বেড়ে উঠলাে।’
কবির কথা শুনতে শুনতে দাহমার দিকে তাকালাম। এখনো সে একমনে আগুন প্রজ্বলিত রাখতে কাঠ দিচ্ছে, নাড়িয়ে দিচ্ছে। ওর হাতে একটি ঢোল দেখলাম আজ।

কবি আবার বলে, এরপর ওর আশ্রয় হয় পাম পাতায় ছাওয়া ছোট এক ঘরে। একাকী থাকতাে সেখানে। আমি তখন তার দেখা-শোনা করতাম, খাবার নিয়ে যেতাম। একদিন সে পুত্র সন্তান প্রসব করে। অপূর্ব সুরে সে গান গাইতাে ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর সময়। হৃদয়ছোঁয়া ওই গান আমাকে মুগ্ধ করতাে। দাহমা একদিন আমার সাহায্য নিতে অস্বীকার করে। ছেলে একটু বড় হয়েছে। তাই সে কাজ করেই জীবন বাঁচাতে চায়। কাজ থেকে ফিরে সে দেখে গলাকাটা অবস্থায় তার ছেলেটি নিথর পড়ে আছে।’

দাহমা আগুনের পাশে বসে আস্তে আস্তে ঢোলে আঘাত করছিল। কিন্তু এখন সে সজোরে আঘাত করছে। ঢোলের শব্দে আগুনের ফুলকিগুলো উড়ে যাচ্ছিল যেন মহাকাশের শূন্যতায় লাল পাখিগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে।

‘সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর মা-পাখির মতো ওকে আগলে রাখতাম পরম মমতায়। একদম পাল্টে যায় দাহমা। কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এক ভয়ঙ্কয় নীরবতা ওকে পেয়ে বসে। একদিন দাহমা লোকালয়ে যায়। তারপর থেকেই তার ঘরের চারপাশে মৌমাছির মতো মানুষের উৎপাত শুরু হয়।’

চাঁদের আলো পড়ছে দাহমার মুখে। ঢোলটা তার বুকের কাছে। বাদ্যের তালে তালে দাহমা আহত পশুর মতো ঘাড় ঘােরাচ্ছে।

‘এমনকি ধনবানরা পর্যন্ত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

‘সে কি দশ জারজের জন্ম দেয়…?’

‘দাহমা একজনকেই বেছে নিত। গর্ভধারণ করা পর্যন্ত তার সঙ্গেই থাকতাে। গর্ভ অবস্থায় নিজেকে ঘরেই আবদ্ধ রাখতো। মানুষ অবশ্য কুকুরের মতো তার ঘরের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতাে। সন্তান জন্মের পর শোনা যেত দাহমার করুণ সুরের অন্তর্ভেদী গীত। গ্রামের সবার হৃদয়ে গেঁথে যেত তার তীক্ষ্ণ সুর। গ্রামের অলি-গলিতে যেন প্রতিধ্বনিত হতো তার কণ্ঠস্বর। দুধ ছাড়ানোর পর থেমে যেত দাহমার গীত। দাহমা এরপর সন্তানকে রেখে আসতাে তার জনকের বাড়িতে। প্রত্যেকেই লুকাতে চাইতাে সন্তানের পরিচয়। কিন্তু তা প্রকাশ হয়ে যেত। কারণ প্রত্যেক সন্তানই দাহমার মতো কৃষ্ণবর্ণের হতো। তাই নিষ্ঠুর না হয়ে আর কোনাে উপায় থাকতো না পিতাদের।’

ঢোল থামিয়ে দাহমা এখন করুণ সুরে গীত গাইছে। ওর কণ্ঠের ওঠা-নামা একদম প্রসবকালীন নারীর আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে।

‘দশজনের সঙ্গেই দাহমা ওই কাজ করেছে।’

‘তার দশজনই ছিল পুত্র সন্তান।’

শত শত গীত জানে দাহমা। সারা দিন মনের দুঃখে সে গানে মত্ত থাকতাে। তার গান মানুষের অন্তর ছিন্ন-ভিন্ন করে দিতাে। একজনকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে শুনেছি, দাহমার সঙ্গে সে কী করেছিল। তাকে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি প্রচণ্ড অনুতাপে।

‘কিন্তু আমার দাদা কেন তাকে এত ঘৃণা করেন?’

‘তোমার দাদা ওই দশজনের একজন।’

গাইতে গাইতে দাহমা উঠে দাঁড়ায়। ক্ষ্যাপা কবিও উঠে যায় তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে। আমিও কম্পিত হয়ে টলমল পায়ে দাহমার কাছে এগিয়ে এলাম। জড়িয়ে ধরলাম দাহমাকে গভীরভাবে। ওর গীত আমার মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হলো।

বাড়ি ফিরে আসার পর আমাকে ভীষণ মারলেন দাদা। উঁচু গলায় চিৎকার করতে করতে তিনি বললেন, ‘ওই মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। পাপাত্মা তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। দুষ্টু আত্মা তাকে না ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকে মারতেই হবে।’

 

লেখক পরিচিতি : সালমা মাতার সাইফের আসল নাম মারয়াম আবু শিহাব। তার জন্ম আরব আমিরাতের আজমান শহরে। ভূতত্ত্ব ও রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করলেও তার আগ্রহ ছিল সাহিত্যে। রসাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেন আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের নামকরা লেখিকা সালমা। নারী স্বাধীনতা নিয়ে লেখালেখি করেন তিনি। উপসাগরীয় দেশগুলোর নারীদের দুঃখ-কষ্টের কথা তার গল্পের অন্যতম বিষয়। তার লেখার স্টাইল বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গভীর অর্থপূর্ণ। গীত গল্পটি আরবি ‘নাশিদ’ গল্পের অনুবাদ