২০১৭-১৮ মরশুম। আর কিছু না হোক, রিয়াল মাদ্রিদ এই মৌসুমের প্রথমার্ধ অবশ্যই ভুলে যেতে চাইবে। স্প্যানিশ লা-লিগার পয়েন্ট টেবিলে ৪র্থ স্থানে নেমে যাওয়া থেকে শুরু করে কোপা দেল রে থেকে দ্রুতই ছিটকে পড়া সবই ঘটেছে মাদ্রিদের সাথে। লিগ টেবিলে মাদ্রিদের এমনও সময় ছিল যখন টেবিলের শীর্ষস্থান থেকে মাদ্রিদের পয়েন্টের দুরত্বের চেয়ে রেলিগেশন জোনের সাথে মাদ্রিদের পয়েন্টের দুরত্ব ছিল কম। স্মরণকালের মধ্যে মাদ্রিদ এত বাজে ভাবে মৌসুম শুরু করেছে খুব কমই। রিয়াল মাদ্রিদের এই বাজে শুরুর পিছনে অবশ্য বেশ কিছু তাগড়াই কারণও ছিল।
একজন নিয়মিত গোলদাতার অভাব: মৌসুমের শুরু থেকেই রোনালদো লা-লিগায় ফর্মহীনতায় ভুগছে। রোনালদোর খারাপ সময়ে নিয়মিত গোল করবে এমন কেউই নেই মাদ্রিদে। বেঞ্জেমা দলের অন্যতম স্ট্রাইকার হলেও সে এমন কোন খেলোয়াড় না যে নিয়মিত গোল করবে। বরং গোল করার চেয়ে করানোতে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। আর গ্যারেথ বেল ইঞ্জুরির ছায়ায় পড়ে ছিল প্রায় পুরোটা মৌসুম। যদি সে ইঞ্জুরি সমস্যায় নাও থাকতো তবুও সে মিঃ গোলস্কোরার ধরণের কেউ না। মাদ্রিদের এই মৌসুমের শুরু থেকে দরকার ছিল একজন জাত স্ট্রাইকার, যেমন মোরাতা।
মাদ্রিদ স্কোয়াডের গভীরতা হ্রাস: গত মৌসুমে মাদ্রিদে বেঞ্চের শক্তির সামনে মাথা নিচু করতে হয়েছে সবাইকে। গত মৌসুমে মাদ্রিদের স্কোয়াড গভীরতা এতই ছিল যে জিদান তার মূল দলের ৯ জনকে বিশ্রাম দিয়েও পৃথিবীর যে কোন দলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার মত একটি একাদশ সাজাতে পারতেন। কিন্তু গ্রীষ্মকালীন দলবদলে মাদ্রিদ আলাভারো মোরাতা, দানিলো, মারিয়ানো ডিয়াজকে বিক্রি করে দেয়ার পাশাপাশি হামেস রদ্রিগেজকে লোনে পাঠিয়ে দেয় মিউনিখে। এছাড়াও মাদ্রিদ ডিফেন্সের মধ্যমণিদের একজন পেপে তার চুক্তি নবায়ন না করে ফ্রী এজেন্ট হিসেবে মাদ্রিদ ছেড়ে যোগ দেন বেসিকতাসে।
খেলার ধরণে পরিবর্তন: বেল যেহেতু প্রায় পুরোটা সময়ই ইঞ্জুরিতে ছিল তাই মাদ্রিদের বাধ্য হয়েই তার চিরাচরিত ৪-৪-৩ ফর্মেশনের বাইরে এসে ৪-৪-২ ফর্মেশনে খেলতে হয়েছে অনেক ম্যাচ। কারণটা হলো একজন রাইট উইংগার এর অভাব। যার ফলে রোনালদোকে তার স্বাভাবিক পজিশনের বাইরে এসে খেলতে হয়েছে। যেহেতু যথাযথ উইংগার ছিলনা দলে সেহেতু ক্রস দেয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাবে পরেছিল ফুলব্যাকদের ঘারে। যার ফলে ডিফেন্সেও স্থিরতার অভাব দেখা দেয়। আর হেড করে গোল করার মত একমাত্র বিশেষজ্ঞ ছিলো রোনালদো। বেল ছিল ইঞ্জুরড আর রামোস ডিফেন্সে তাই ডিফেন্ডাররা জানতো কাকে কাভার করতে হবে। তাই মাদ্রিদের একমাত্র অস্ত্র হয়ে পরেছিল কাউন্টার এ্যাটাক। এখানেও সমস্যা ছিলো। কাউন্টার এ্যাটাক সেইসব দলের বিপক্ষে ভাল কাজ করে যারা বল নিজেদের দখলে নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। আজকাল প্রায় সকল ছোট দলই বাস পার্ক করে খেলে। বাস পার্কিংয়ের বিপক্ষে তাই মাদ্রিদের এই স্ট্র্যাটেজি তেমন কাজে আসেনি। তাই লীগে মাদ্রিদ ছোট দলগুলোর বিপক্ষে লক্ষণীয় ভাবে পয়েন্ট হারিয়েছে।
রক্ষণভাগের ভুল করার প্রবণতা: ডিফেন্সে মনযোগের অভাব মাদ্রিদকে এই মৌসুমের শুরু থেকেই পুড়িয়েছে অনেক। গত মৌসুমে যেখানে মাদ্রিদ খেলার অন্তিম মুহূর্ত গুলোয় পয়েন্ট ছিনিয়ে এনেছে, এই মৌসুমে ঘটেছে তার উল্টোটা। খেলার শেষ দিকে এই মৌসুমে মাদ্রিদ রক্ষণভাগে মনযোগের অভাবে পয়েন্ট বিলিয়ে দিয়ে এসেছে বেশ কয়েকবার।
তরুণদের ব্যক্তিগত মহিমা সন্ধান: মৌসুমের শুরুতে এই সমস্যাটির খুব স্পষ্ট নয়নগোচর হয়েছে। ইস্কো, এসেনশিও, ভাস্কেস এর মতো তরুণেরা ব্যক্তিগত সাফল্য খোজার প্রতি মনযোগী হয়ে পড়েছিলো একটু বেশি। অনেকবারই এমন দেখা গেছে যেখানে একটা খুব সহজ পাস দেয়া সম্ভব সেখানে বল পাস না করে সরাসরি গোল করার চেষ্টা বা ড্রিবলিংয়ে পায়ের যাদু দেখানোর চেষ্টায় মগ্ন হয়ে পরছে তরুণেরা। যা অবশ্যই মাদ্রিদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি।
এইসকল সমস্যার একত্রিত প্রভাব হিসেবে মাদ্রিদের মৌসুম প্রায় শেষ হতে বসেছিল বলা চলে। মাদ্রিদ লিগ রেস থেকে ছিটকে পড়ার পাশাপাশি ছিটকে পরেছে কোপা দেল রে থেকেও। ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের গ্রুপ থেকে গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে উঠেছে রাউন্ড অফ ১৬ তে। যা রিয়াল মাদ্রিদের সাথে বড়ই বেমানান। রাউন্ড অফ ১৬ তে তাদের প্রতিপক্ষ উড়তে থাকা পিএসজি। যখন মনে হচ্ছিলো মাদ্রিদের এই মৌসুম বুঝি পুরোপুরি শেষ ঠিক তখনই ঘুরে দাঁড়ায় রিয়াল। সব মিলিয়ে গত ৭ ম্যাচ অপরাজিত রিয়াল। এরই মধ্যে তারা পিএসজিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনালের দিকে এক পা দিয়ে রেখেছে। টেবিলের ৪ নম্বর স্থান থেকে উঠে এসেছে ৩ নম্বর স্থানে। মাদ্রিদের হঠাৎ এমন ঘুরে দাঁড়ানোর পিছনে মুখ্য কিছু কারণ কাজ করেছে অবশ্য।
• রোনালদোর গোলের ধারায় ফেরা: রোনালদোর পরিবর্তে নিয়মিত গোলদাতা কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও রোনালদো ঠিকই খুঁজে পেয়েছেন নিজেকে। মাদ্রিদের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত ৭ ম্যাচে একটি হ্যাট্রিকসহ মোট ১২টি গোল করেছেন তিনি, সাথে সতীর্থদের দিয়েও করিয়েছেন ২টি গোল। মৌসুমের শুরুতে একটি গোল মেশিন রোনালদোর যে অভাব দেখা দিয়েছিল তা তিনি এখন নিজেই পূরণ করছেন।
• রোনালদোর সাথে বেঞ্জেমার বোঝাপড়া: গোল ক্ষরায় এখনো আছেন বেঞ্জেমা। সহজ সহজ গোলের সুযোগ এখনো হাতছাড়া করছেন বৈকি। তবে রোনালদোর সাথে মাঠে তার বোঝাপড়ার যে সামান্য অভাব দেখা যাচ্ছিলো তা আবার বিলীন হয়ে গেছে। জিদানের ঘন ঘন ফর্মেশন বদলের সাথে মানিয়ে নিতে পারছেন তার দুজনেই।
• বেল এর ইঞ্জুরি থেকে ফেরা: ইঞ্জুরি থেকে গ্যারেথ বেল এর ফিরে আসা বিরাট বড় স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে মাদ্রিদের জন্য। মাঠেও তার পারফর্মেন্স ধীরে ধীরে আবারো আগের রূপ পাচ্ছে। সবশেষ আলাভেস এর বিপক্ষে ম্যাচেও পুরনো বেল এর ঝলক দেখা গেছে। সেই ম্যাচে তিনি গোলও পেয়েছেন।
• লুকাস ভাস্কেস এর অবদান: মৌসুমের শুরুতে তেমন কিছু করে উঠতে না পারলেও ২০১৮ তে হঠাৎই জ্বলে উঠেছেন এই তরুণ। গোল এবং এসিস্ট মিলিয়ে ২০১৮ তে রোনালদোর পরেই সবচেয়ে বেশি অবদান তার।
• ক্যাসেমিরো খুঁজে পাচ্ছেন নিজেকে: মাদ্রিদের ট্যাংক হিসেবে খ্যাত ব্রাজিলীয় মিড ক্যাসেমিরোর জন্যও সিজনের শুরুটা ভাল যায়নি মোটেও। বল রিকভারি, পাসিং কিছুই যেন ঠিক মতো হয়ে উঠছিলো না তার জন্য। কিন্তু সকল সমস্যা ঝেড়ে ফেলে আবারো নিজের পুরনো রূপে ফিরে এসেছেন মাদ্রিদের ট্যাংক।
• মিঃ ডিপেন্ডেবল নাচো হার্নান্দেজ: মাদ্রিদের জন্য নাচোকে বলা যেতে পারে একটি আশির্বাদ। যখনই ডিফেন্সে কোন জায়গা শূন্য হয়ে পরে সেখানেই জিদান চোখ বুঝে লিখে দেন নাচোর নাম। নাচোর পারফর্মেন্স যদিও কেবলই শূন্যতা পূরণের মতন না বরং তার পারফর্মেন্স তাকে সেই পজিশনের দাবীদার হিসেবে তুলে ধরে প্রতিবার।
• নিয়মিত একাদশের বাইরের খেলোয়াড়দের ভাল ফল প্রদর্শন: প্রতিনিয়ত হয়তো এসেনশিও, কোভাচিচদেরকে একাদশে দেখা যায় না। কিন্তু জিদান সাম্প্রতিক সময়ে যখনই তাদেরকে মাঠে নামিয়েছেন তখনই তারা বিশেষ কিছু করে দেখিয়েছে। বিশেষ করে বলতে হয় পিএসজির বিপক্ষে এসেনশিওর ১১ মিনিটের তান্ডব। ওই ১১ মিনিটে এসেনশিও যা করেছে তা এই মৌসুমে রিয়ালের টার্নিং পয়েন্টের মতন।
রিয়াল মাদ্রিদের এই ঘুরে দাঁড়ানো নিষ্ফল হয়ে যাবে, যদি না তারা ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ভাল কিছু করে দেখাতে পারে। কিন্তু মৌসুমের শেষ অবধি যাই ঘটুক না কেন একটা জিনিস মাদ্রিদ আবারো পরিষ্কার করে দিয়েছে। কখনো রিয়াল মাদ্রিদকে হিসেবের বাইরে রাখতে নেই।