Jobanবিপুল পরিমাণ দর্শক সমাগমই কাল হয়েছিল সেদিন

বিপুল পরিমাণ দর্শক সমাগমই কাল হয়েছিল সেদিন

ফুটবলের ইতিহাসে ট্রাজেডি, বিপর্যয় কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নতুন নয়। আজকে তেমনি একটা মর্মান্তিক ঘটনার দিকে আলোকপাত করবো। যেটা ব্রিটেনের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক ঘটনা। আর এই ইতিহাসের শিকার হন পাঁচ শতাধিক ভক্ত সমর্থক। কেউ কেউ স্পটেই মারা যান, কেউবা হাসপাতালে। আবার কেউবা জানে বেঁচে যান। বলছি বারডেন পার্ক ডিজাস্টারের কথা।

বারডেন পার্ক ডিজাস্টারের পরে আরও এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালে যখন গ্লাসগোতে, ৬৬ জন রেঞ্জার্স ভক্তের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল সেদিন। এরপরে ১৯৮৯ সালে শেফিল্ডে ৯৬ জন ভক্ত সমর্থকের জীবননাশের ঘটনার সাক্ষী হয় গ্রেট বৃটেন তথা সারা বিশ্ব। আর এটাই বৃটেনের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা। আজকে আমরা বারডেন পার্কের দিকেই দৃষ্টি রাখবো।

প্রতিবছরই বোল্টন তথা গ্রেট বৃটেনের জনগন বোল্টনের ওয়ান্ডারাস স্টেডিয়ামের সেই নির্মম ঘটনার বার্ষিকী উপলক্ষে প্রাণ হারানো ৩৩ জন ভক্ত সমর্থকদেরকে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় স্মরণ করে থাকে। আজ শুক্রবার হচ্ছে ঘটনাটির ৭২তম বার্ষিকী। যদি আপনি বোল্টন ভক্ত হন তাহলে এই বিপর্যয়ের ইতিহাস অবশ্যই জেনে থাকবেন।

সবে ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা শেষে কেউকেউ দেশে ফিরছেন। একটা ধকল কাটতে না কাটতেই আরেকটা সম্মুখ বিপদের সাক্ষী হতে চলেছে গ্রেট ব্রিটেন।

১৯৪৬ সালের ৯ই মার্চ এফএ কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের সেকেন্ড লেগের ম্যাচ চলছিল বোলটের স্টেডিয়াম বারডেন পার্কে।স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা ছিল ৬৫ হাজার। কিন্তু ধারণা করা হয়, ম্যাচের গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা বিবেচনায় সেদিন স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিল ৮৫ হাজার দর্শক। আর স্টেডিয়ামের বাহিরেও ছিল অগনিত ভক্ত সমর্থক! ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় এই স্টেডিয়ামে এই ম্যাচের আগে দর্শক সমাগমের রেকর্ড ছিল ৬৯ হাজার ৯১২ জন ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে এক ম্যাচে।

যাইহোক, ঘটনার সূত্রপাত হয় মূলত রেলওয়ে ইমব্যাংকমেন্ট চত্বরে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব স্টেডিয়ামের সুযোগ সুবিধা বা নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল তারমধ্যে বারডেন পার্ক অন্যতম!  অসম টালি পাথর দ্বারা তৈরি রেলওয়ে চত্বরটি খোলা ও নোংরা ছিল। যদিও স্টেডিয়ামের বারডেন চত্বর গোছালো ছিল কিন্তু সেটা ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে মন্ত্রীসভা থেকে ব্যবহার না করার জন্য ফরমায়েশ করা ছিল। এমনকি ১৯৪০ সাল থেকে বারডেন চত্বরের সাথে রেলওয়ে চত্বরের সংযুক্ত প্রবেশদ্বারও বন্ধ ছিল!

সেজন্যে হাজার হাজার ভক্ত টিকেট না কিনে খোলা দরজা দিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েছিল। এর ফলে রেলওয়ে প্রান্ত অতিরিক্ত দর্শকে ঠাসা হয়ে যায় এবং বেলা ২ টা ৪০ মিনিটে দরজা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

কিন্তু স্টেডিয়ামে ঢুকতে অপেক্ষমান দর্শকদের আটকানো যায়নি। যে যেভাবে পারে স্টেডিয়ামে ঢুকতে থাকে। এভাবে ওভারলোডেড দর্শকের চাপ ও ঠেলাঠেলিতে বন্ধ গেট খুলে দেয়া হয় ফলশ্রুতিতে রেলওয়ে প্রান্তে দর্শকের ঢল নামে। পা রাখারই জায়গা নেই। প্রচণ্ড চাপাচাপির কারণে দর্শক একেবারে মাঠের বাউন্ডারি রোপের সন্নিকটে চলে আসে! আর পিছনে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যাদের অনেকেই ঠিকমত খেলা দেখতেই পারেননি।

ম্যাচ শুরু হল, বাড়তে থাকল দর্শকের চাপ, পেছনের দর্শকের চাপাচাপিতে সামনেরগুলো মাঠের ভেতরে আছড়ে পড়ার উপক্রম! এবং পড়লও বটে! ফলে রেফারি খেলা সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। মাঠ ক্লিয়ার করার পরে খেলা আবারো শুরু হল। এই সময়ে দুইটা বেষ্টনী ভেঙে গেল এবং দর্শক সামনের দিকে পড়ে যেতে লাগল। এবং পরিস্থিতির আরও খারাপের দিকে গেল

এমতবস্থায় একজন পুলিশ অফিসার মাঠে প্রবেশ করে রেফারির সাথে কথা বললেন এবং জানালেন সেখানে মারাত্নক ও নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রেফারি জর্জ ড্যুটন বোলটনের ক্যাপ্টেন হ্যারি হুবিক ও স্টোকসের ক্যাপ্টেন নিল ফ্র্যাংকলিনকে ডেকে নিলেন এবং পুনরায় খেলা বন্ধের বাঁশি বাজালেন।

ততক্ষণে বেশ কয়েকজনের প্রাণপাখি উড়ে গিয়েছে। পড়ে আছে নিথর দেহ। টাচলাইনে আছড়ে পড়া আহত ও মৃত দর্শকদেরকে রেলওয়ে প্রান্ত থেকে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু এই নশ্বরতার আধাঘন্টা পরে আবারো ম্যাচ শুরু হল। টাচলাইনে কাঠের গুড়ো মিশিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হল। প্রথমার্ধ এভাবেই শেষ হল।

দ্বিতীয়ার্ধ খেলার জন্য প্লেয়াররা নিজেদের প্রান্ত বদল করলে খেলা আবার শুরু হল। বহুল আলোচিতে এই ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয় এবং আগের রাউন্ডের ২-০তে জেতার ফলে বোল্টন পরের রাউন্ডে খেলার সুযোগ পায়।

 

ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

সেই নারকীয় ম্যাচ খেলার পর স্টোকের খেলোয়াড় স্ট্যানলি ম্যাথিউস জানান, ম্যাচ খেলার জন্য উনাকে জোরাজুরি ও পীড়া দেওয়া হচ্ছিল।

তিনি আরও বলেছিলেন,  “আমি হতবাক হয়েছিলাম এটা ভেবে যে, মাঠে এরকম হতাহতের ঘটনার পরেও কেন খেলা চালিয়ে নেয়া হল।”

ফুটবল ইতিহাসের এই নির্মম ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন বিল চেজম্যান নামের এক ব্রিটিশ। তিনি বলেন, “আমি আমার বোনের সাথে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। এটা খুবই মারাত্নক একটা ভিড় ছিল। আমরা সামনে ও পেছন থেকে চিপায় পড়ে গিয়েছিলাম। সবাই সমানে ধাক্কা দিচ্ছিল! এক পর্যায়ে দেখলাম যারা আমাদের সামনে ছিল তারা তাসের ঘরের মত নিচের দিকে ধসে পড়ছিল!! আমরা কোনমতে বাহিরে বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম।”

ক্লাব সেক্রেটারি ও হিস্টোরিয়ান সিমন মারল্যান্ড বলেন, “তখন যোগাযোগের কোন ব্যবস্থাই ছিল না। স্টেডিয়ামের ভেতরে কি ঘটেছিল মানুষকে সেটা বলারও কোন উপায় ছিল না। ধরে নেয়া যায় উপস্থিত ৮৫ হাজার দর্শকের ৮০ ভাগের কাছেই হতাহতের এই বিষয়টা অস্পষ্ট ছিল।”

এটা ছিল বিশ্বযুদ্ধের ধংসযজ্ঞের ঠিক পরে যখন মানুষ তান্ডবলীলা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। মনে স্বস্তির আমেজ ফিরিয়ে আনতে মানুষেরা স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন কিন্তু প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারেননি। প্রতিটা বোল্টন সমর্থক পরিবারের কেউ না কেউ হতাহত হয়েছেন। যা আসলেই দুঃখজনক। ফুটবলের গায়ে এসব ঘটনা কলঙ্কের দাগ টেনে দেয় যার জন্যে ফুটবল মোটেও দায়ী নয়।

—ক্লাব সেক্রেটারি সিমন মারল্যান্ড

 

পার্কের এই ঘটনার ৪৬ বছর পরে ১৯৯২ সালে বোল্টন নতুন একটা স্টেডিয়ামে স্থানান্তরিত হয়ে আসে। নতুন হোমগ্রাউন্ডেও স্মৃতিফলক স্থানান্তর করা হয় এবং ফলকটি এখনো স্টেডিয়ামের সুপার মার্কেটের দেয়ালে নিহত ভক্তের সম্মানে দাঁড়িয়ে আছে।

বোল্টন টিমের মার্চ মাসের ৯ তারিখ কিংবা এর আগের যেকোন ম্যাচ ডে থাকলেই ১৯৪৬ সালের এই নির্মম ইতিহাসকে স্মরণ করা হয়।যারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন তাঁদের নাম স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

বোল্টনের বর্তমান ম্যানেজার নিল লেনন বলেছেন, “বারডেন পার্কের দূর্ঘটনা বোল্টনের ইতিহাসের  জন্য একটা কালো অধ্যায়।এই স্মৃতিস্মারক আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইবে।”

এই ঘটনা শুধু বোল্টনের নয় এটা ফুটবল বিশ্বের সবার জন্যেই আসলে একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। আমরা চাইবো যেন, এরকম নারকীয় ঘটনা আর কখনোই যেন ফুটবলকে স্পর্শ করতে না পারে। ফুটবল যেন কালভাদ্রেও জীবন নাশের কারণ না হয়।