Jobanঅদ্ভুত এক লাইব্রেরি

অদ্ভুত এক লাইব্রেরি

হারুকি মুরাকামি এখন দুনিয়াজোড়া সাহিত্য খ্যাতি নিয়ে নিরলস লিখে যাচ্ছেন। জাপানি সাহিত্যে শুধু নয় সারা দুনিয়ায় তার মত শক্তিশালী এবং একই সাথে জনপ্রিয় সাহিত্যিক বিরল। তার ভিন্ন ধারার উপন্যাস ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জ লাইব্রেরি’র বাংলা অনুবাদ করেছেন গল্পকার ও অনুবাদক আফসানা বেগম।



সেদিন লাইব্রেরিটা ছিল অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই চুপচাপ।

আমার নতুন চামড়ার জুতো লাইব্রেরির ধূসর লিনোলিয়ামের মেঝেতে খসখস শব্দ করছিল। ঘষাঘষির গম্ভীর আর খসখসে শব্দটা আমার সবসময়ের হাঁটার পরিচিত শব্দের মতো নয়। যতবার নতুন জুতো কিনতাম, তার নতুন শব্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগে যেত আমার।

বই দেয়া-নেয়ার টেবিলে এমন একজন মহিলা বসে ছিলেন যাকে আমি আগে কখনো দেখিনি, মোটাসোটা একটা বই পড়ছিলেন তিনি। বইটা কেন যেন অতিরিক্ত চওড়া। তাকে দেখতে এমন লাগছিল যেন তিনি তার ডান চোখ দিয়ে বইটার ডান দিকের পাতা আর বাম চোখ দিয়ে বাম দিকের পাতা পড়ছেন।

“মাফ করবেন” আমি বললাম।

তিনি বইটা ঠাস করে বন্ধ করে ধপ করে টেবিলে রাখলেন। তারপর সরু চোখে আমার দিকে তাকালেন।

“আমি এসেছিলাম এই বইগুলো ফেরত দিতে” কাউন্টারের উপরে আমার হাতের বই দুটো রাখতে রাখতে বললাম আমি। একটা বইয়ের নাম সাবমেরিন কী করে বানায় আর আরেকটা হলো মেষপালকের স্মৃতি।

বই দুটো ফেরত দেবার তারিখ জানার জন্য লাইব্রেরিয়ান তাদের উপরের পাতা উলটে ভেতরের দিকটা দেখে নিলেন। ফেরত দেবার তারিখ পেরিয়ে যায়নি। এসব ব্যাপারে আমি বরাবর সতর্ক, কোনো কিছুই সময় পার করে হাতে রাখি না। আমার মা আমাকে এভাবেই শিখিয়েছেন। আমার পড়া বইটিতে মেষপালকদের অবস্থাও আমার মতো। তারা যদি তাদের নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে তাহলে ভেড়াগুলো একেবারে হাতছাড়া হয়ে যায়।

বইদুটোয় জমা দেবার নকশাওয়ালা কার্ডের উপরে লাইব্রেরিয়ান “ফেরত পাওয়া গেছে” সিল মেরে দিয়ে নিজের চওড়া বই পড়ায় মনোযোগ দিলেন।

“আমি আসলে কিছু বইয়ের খোঁজে এসেছিলাম” আমি বললাম।

“ওই সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে ডানদিকে ঘোরো” বই থেকে চোখ না উঠিয়েই তিনি বলে গেলেন। “তারপর সোজা করিডোর পেরোলে দেখবে রুম নম্বর ১০৭।”


অনেক লম্বা একটা সিঁড়ি ধরে আমি নীচে নেমে এলাম, ডানদিকে ঘুরলাম, তারপর অন্ধকার একটা করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলাম যতক্ষণ না নিশ্চিত হয়েছি যে আমি ১০৭ নম্বর রুমের সামনে এসে পৌঁছেছি। ওই লাইব্রেরিতে আমি আগে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, সেখানে যে মাটির নীচেও একটা তলা আছে এটা আমার কাছে ছিল নতুন খবর।

‘দ্য স্ট্রেইঞ্জ লাইব্রেরি’ বইয়ের প্রচ্ছদ

দরজায় টোকা দিলাম আমি। প্রতিদিন যেভাবে কোনো দরজায় টোকা দেই, তেমনই হালকা টোকা দিয়েছিলাম, তবু কেন যেন এমন কর্কশ শব্দ হলো যে মনে হচ্ছিল কেউ বেসবল খেলার ব্যাট দিয়ে বাড়ি মেরে নরকের দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। ভয়ানক শব্দটা করিডোরে ঘুরে ঘুরে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। দৌড়ে পালিয়ে যাবার জন্য আমি যেই ঘুরতে গেলাম, এক পা-ও এগোতে পারলাম না, যদিও আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। কারণ এই শিক্ষা দিয়ে তো আমাকে বড়ো করা হয়নি। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন যে তুমি যদি কোনো দরজায় টোকা দিয়ে ফেল, ভেতর থেকে কেউ উত্তর না দেয়া পর্যন্ত তোমাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

“ভেতরে এসো”, ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এল। শব্দটা তেমন জোরে নয় অথচ আমার কানে ভয়ানকভাবে বাজল। আমি দরজা ঠেলে খুললাম।

 

ঘরের ঠিক মাঝখানে দেখলাম ছোট্ট আর পুরোনো এক টেবিলের পেছনে ছোটোখাটো এক বুড়ো মানুষ বসে আছে। বিন্দু বিন্দু অসংখ্য কালো তিলে ঠাসা তার মুখটা দেখতে অজস্র মৌমাছি শান্ত হয়ে বসে থাকা মৌচাকের মতো। বুড়ো লোকটার মাথাভরা টাক আর চোখে পুরু কাচের চশমা। তবে তার মাথার টাকটা মনে হলো অসম্পূর্ণ; কারণ বেশ কিছু কোঁকড়ানো সাদা চুল দেখলাম তার মাথার দুপাশে যেন আলগাভাবে আটকানো আছে। ভালোভাবে বলতে গেলে তার মাথাটা দেখতে পর্বতের উপরে দাবানলে পোড়া কোনো জঙ্গলের মতো।

“আসো, ভেতরে আসো, খোকা” বুড়ো লোকটি বললেন। “বলো, আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?”

“আমি কিছু বই খুঁজছিলাম” ধীরে ধীরে বললাম। “কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে আপনি এখন ব্যস্ত। আমি আবার পরে কখনো আসব না-হয় . . .”

“বোকা ছেলে” বুড়ো লোকটা জবাব দিল। “এটাই তো আমার কাজ। মানে, আমার পেশা। আমি কখনোই বেশি ব্যস্ত নই। বলো, কী ধরণের বই তুমি খুঁজছ। আমি যেমন করেই পারি সেসব কোথায় পাবে না-পাবে তোমাকে জানাব।”

কথা বলার সময়ে কী হাস্যকরই না দেখতে লাগে লোকটাকে, ভাবলাম আমি। আর তার মুখের প্রত্যেকটা বিন্দু ভারি অদ্ভুত। তার কান থেকে কিছু লম্বা লম্বা চুল বেরিয়ে এসেছে। থুতনির নীচে কিছু কোঁচকানো চামড়া এমনভাবে ঝুলছে যেন বাতাস বেরিয়ে চুপসে যাওয়া বেলুন।

“কী হলো, ছোট্ট বন্ধু? এখন বলো দেখি, তুমি ঠিক কী বই খুঁজছ?”

“আমি জানতে চাচ্ছি অটোম্যান রাজ্যে কর কী করে আদায় করা হতো,” আমি উত্তর দিলাম।

বুড়ো লোকটার চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল।

“ও, আচ্ছা!” সে বলল। “অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম। পড়ার জন্য এমন মজাদার বিষয় পৃথিবীতে আর যদি একটাও থাকত!”


বিষয়টা বলার পর থেকেই আমার ভেতরে অস্বস্তি শুরু হলো। সত্যি কথা বলতে কী, অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুন জানার বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। ঘটনাটা হয়েছিল কী, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমার মাথায় কেন যেন হুট করে ওই বিষয়টা এল। আমি ভাবছিলাম, আচ্ছা, অটোম্যান রাজ্যে কর আদায় করত কীভাবে? এরকম একটা সাধারণ চিন্তা থেকে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল। ঘটনা হলো, সেই ছোটোবেলা থেকে আমার মা আমাকে বলতেন, যখনই তোমার মনে কোনো প্রশ্ন আসবে যার উত্তর তোমার কাছে নেই, তুমি সোজা লাইব্রেরিতে চলে যাবে আর সেই বিষয় নিয়ে লেখা বই খুঁজে বের করবে।

“থাক, দয়া করে ওই বিষয়ের উপরে বই খুঁজবেন না,” আমি বললাম। “আমার মনে হচ্ছে আমার জন্য ওটা সেরকম দরকারি না। আর বিষয়টা বলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক। তা ছাড়া, হাজার হলেও …” আমি আসলে ওই থমথমে, ভয়ে গা ছমছম করা ঘরটা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম।

“আমার সঙ্গে ফাজলামো কোরো না” বুড়ো লোকটা দুম করে বলে দিল। “অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুনের উপরে বিশাল ভল্যিউম বইয়ের সংগ্রহ আছে আমাদের কাছে। তুমি কি এখানে লাইব্রেরিতে খামোখা খেলাধুলো করতে এসেছ? এরকম কোনো ভাবনা ছিল নাকি তোমার?”

“তা নয়, স্যার,” আমি মিনতি করে বললাম। “বিশ্বাস করেন, তেমন এক ফোঁটা ইচ্ছেও আমার ছিল না। ভয়াবহ কোনো বিষয় নিয়ে আমি কখনো হাসি তামাশা করি না।”

“ঠিক আছে, তাই যদি হয়, তবে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঠিক এইখানে লক্ষী ছেলে হয়ে অপেক্ষা করো।”

“নিশ্চয়, স্যার” আমি বললাম।

বুড়ো লোকটা নড়েচড়ে তার চেয়ার থেকে উঠল। চেয়ারের পেছন দিকে ঘুরে গেল, তারপর ঘরটির পেছনের দেয়ালের একটা স্টিলের দরজার দিকে এগোতে লাগল। দরজাটা খুলে ফেলল আর পরপরই সেদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি টানা দশ মিনিট সেখানে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম, অপেক্ষা করছিলাম কখন সে ফিরে আসে। ঘরের ছাদে বাতির ছায়ার নীচের দিকটায় কতকগুলো কালো পোকা সমানে আঁচড় কাটছিল।

শেষপর্যন্ত বহুক্ষণ বাদে বুড়ো লোকটা ঘরে ফিরে এল, তার হাতে তিনটা মোটা মোটা বই। প্রত্যেকটা বই সাংঘাতিক পুরোনো আর সেগুলোর কারণে ঘরের বাতাসে কাগজে বানানো কৃত্রিম গোলাপের প্রাচীন গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

“নাও, এসব নিজেই দেখেশুনে নাও” বুড়ো লোকটা বলল, তার মুখে তৃপ্তি লেগে ছিল। “আমাদের কাছে অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুনের উপরে বিস্তর বই আছে। তার মধ্যে অটোম্যান রাজ্যে কর আদায়ের নিয়ম, অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়কারীর ডায়রি আর অটোম্যান-টার্কিশ রাজ্যে কর অনাদায় ও তার শাস্তি, এই তিনটি বই গুরুত্বপূর্ণ। খুবই চমৎকার সংগ্রহ কিন্তু, পড়লে তোমাকে স্বীকার করতেই হবে।”

“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ,” আমি ভদ্রভাবে বললাম। বইগুলো হাতে নিয়ে আমি দরজার দিকে এগোলাম।

“ওরকম তাড়া কেরো না,” বুড়ো লোকটা পেছন থেকে হুঙ্কার দিয়ে উঠল। “এই বই তিনটি এখানে বসেই পড়তে হবে। কোনো কারণেই এগুলো এই লাইব্রেরির বাইরে নেয়া যাবে না।”

হারুকি মুরাকামি


লোকটা সত্যি বলেছে, প্রত্যেকটা বইয়ের মেরুদÐ বরাবর লাল লেবেল লাগানো, “কেবলমাত্র লাইব্রেরিতে ব্যবহারযোগ্য”।

“এই বইগুলো পড়তে হলে তোমাকে ভেতরের একটা ঘরে বসে পড়তে হবে” বুড়ো লোকটা জানিয়ে দিল।

আমি চট করে আমার ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তখন ৫:২০ বাজে। “কিন্তু লাইব্রেরি বন্ধের সময় তো প্রায় হয়েই এসেছে, আর আমি যদি রাতের খাবারের আগে বাড়িতে উপস্থিত না হই তবে আমার মা খুব চিন্তায় পড়ে যাবেন।”

জঙ্গলের মতো ঘন দুটো ভুরু কুঁচকে কপালের উপরে এক লাইনে নিয়ে এল বুড়ো লোকটা।

“লাইব্রেরি কখন বন্ধ হবে সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না” খানিকটা রেগে গিয়ে উচ্চারণ করলেন তিনি। “ওরা তখনই দরজা বন্ধ করবে যখন আমি তাদের তা করতে বলব। যদি বলি খোলা থাকবে, তবে খোলাই থাকবে। কিন্তু কথা সেটা নয়, এখানে আসল কথা হলো এই যে আমি তোমাকে বইগুলো পড়ার জন্য এত সাহায্য করছি, তার কোনো মূল্য তোমার কাছে আছে কি নেই? তুমি কী মনে করো, প্রচন্ড ভারি এই তিনটা বই আমি আমার নিজের জন্য এই ঘরে বয়ে আনলাম? আমি কি শরীরচর্চা করছি?”

“মাফ করবেন, মাফ করবেন” আমি তাড়াতাড়ি তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। “আমি কখনো কাউকে এতটা বিরক্ত করতে চাইনি। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি যে এই বইগুলো আমি বাড়ি নিয়ে যেতে পারব না।”

বুড়ো লোকটা জোরেসোরে একটা গলা খাকারি দিয়ে উঠল। তারপর একটা টিস্যুর মধ্যে এক দলা কফ ফেলল। তার নাকের উপরের কালো মোটা ফ্রেমের চশমাটা মনে হলো রাগের চোটে কয়েকটা লাফ দিল।

“তুমি কী জানতে আর কী জানতে না সেসব নিয়ে এখন কথা বলা অর্থহীন” উপরের ঠোঁট ফুলিয়ে বুড়ো লোকটা চিৎকার করে উঠল। “আমার বয়স যখন তোমার মতো ছিল, সামান্য কিছু পড়ার সুযোগ পেলে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম। আর সে জায়গায় তোমাকে দেখ, বিড়বিড়িয়ে আমাকে সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ, বাড়িতে রাতের খাবারের জন্য দেরি হবে বলে আফসোস করছ। কত্ত সাহস!”

“আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি এখানেই থাকব আর পড়ব” আমি বললাম। “তবে আমি ঠিক তিরিশ মিনিট পড়ব।” আমি আসলে কাউকে মুখের উপরে না বলতে পারি না। “আর আমি কিন্তু তিরিশ মিনিটের বেশি একদম থাকতে পারব না। আমি যখন খুব ছোটো ছিলাম, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে আমাকে একটা কালো কুকুর কামড়ে দিয়েছিল। আর তারপর থেকে আমি যদি বাড়িতে সামান্য দেরি করেও ফিরি, মা আমার সঙ্গে অদ্ভুত ব্যবহার করেন।”

বুড়ো লোকটার মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল।

“যাই হোক, তুমি এখন পড়ার জন্য থাকছ তো?”

“অবশ্যই, তবে মাত্র তিরিশ মিনিটের জন্য।”

“ঠিক আছে, পড়তে চাইলে আমার পেছনে পেছনে আসো” বুড়ো লোকটি হাঁটা শুরু করল। ভেতরের দিকের স্টিলের দরজার পরে প্রায় অন্ধকার একটা করিডোর, সেখানে কাঁপা কাঁপা আলো দেয়া একটা মাত্র ইলেকট্রিক বাতি। প্রায় নিভুনিভু সেই আলোর মধ্যে আমরা দুজন হাঁটতে লাগলাম।


“আমার পেছনে পেছনে আসো,” বুড়ো লোকটি বলল।

করিডোর ধরে সামান্য এগোতেই একটা বাঁকে এসে পৌঁছলাম। বুড়ো লোকটা ডান দিকে ঘুরল। সেখান থেকে আরেকটু সামনে গেলে আরেকটা বাঁক। সেখানে সে ধরল বামের করিডোর। আর তারপর থেকে কেবল বাঁক আর বাঁক, একের পর এক বাঁক। প্রতিটা মোড়ের কাছে এসে বুড়ো লোকটা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই নতুন একটা দিকে হাঁটা শুরু করছিল। একবার ডানে তো আরেকবার বামে। তার মধ্যে আবার কখনো হুট করে সে একটা দরজা খুলে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আর আমরা সম্পূর্ণ নতুন অন্য একটা করিডোরের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছিলাম।

আমার তখন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! একটা শহরের প্রধান লাইব্রেরির মাটির নীচের তলায় এমন ভয়ানক আর অদ্ভুতুড়ে গোলোকধাঁধা থাকবে কেন? মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, জনগণের জন্য বানানো যে লাইব্রেরি সেখানে বরাবর টাকাপয়সার টানাটানি লেগে থাকার কথা। তাই বিল্ডিং হবার কথা ছোটোখাটো, যতটুকু না হলেই নয়। এরকম ঘোরালো প্যাচালো গোলকধাঁধার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার মনে হলো বুড়ো লোকটাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা জরুরি। কিন্তু আবার ভয়ও হলো যে আমার প্রশ্ন শুনতেই সে না আবার আগের মতো চিৎকার শুরু করে দেয়!

এলোমেলো করিডোরের এক প্রান্তে আমরা শেষ পর্যন্ত একটা স্টিলের দরজার সামনে এসে পৌঁছলাম। বিশাল সেই দরজার উপরে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে, লেখা “পড়ার ঘর”। ঘরটি জুড়ে মধ্যরাতের কবরস্থানের মতো শীতলতা আর নীরবতা।

বুড়ো লোকটা তার ঢিলেঢালা কাপড়ের পকেট থেকে বড়ো একটা চাবির রিং বের করল। তারপর সেই রিঙে ঝুলে থাকা অসংখ্য চাবি নাড়াচাড়া করে খুবই পুরোনো গোছের একটা চাবি বেছে নিল। স্টিলের দরজার তালায় ঢোকাল সে চাবিটা। আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে দ্রুত তাকিয়ে নিল একবার, তারপর চাবিটা ডান দিকে মোচড় দিল। চাবির চাপে তালার বোল্টটা সরে যাওয়ার সময় পুরোনো ধাঁচের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজাটা লম্বা শব্দ করে ধুলো উড়িয়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল।

“হয়ে গেল। এই হলো তোমার পড়ার জায়গা” বুড়ো লোকটা বলল। “এবারে তুমি ভেতরে যেতে পার।”

“এই ঘরের ভেতরে?” আমি অবাক হলাম।

“হ্যাঁ, এই ঘরের ভেতরেই।”

“কিন্তু এখানে তো ঘুরঘুটি অন্ধকার” শুনলে মনে হবে আমি যাব না বলেই প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু এটা সত্যি যে সেই ঘরের ভেতরে ছিল এমনই অন্ধকার যেন কৃষ্ণ গহŸরের মধ্যে কোথাও একটা ফুটো করে তাকিয়ে আছি।


বুড়ো লোকটা এবারে সোজা হয়ে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তখন কেন যেন হঠাৎ করে তাকে বিশাল লম্বাচওড়া মনে হচ্ছিল। আর ঠিক তখনই তার ঘন ভুরুর নীচে চোখদুটো এমনভাবে জ্বলে উঠল যেন শেষ বিকেলের আলোয় দেখা কোনো ছাগলের চকচকে চোখ।

“আচ্ছা, তুমি কি সেইরকম একটা ছেলে যে কিনা সবকিছুতেই কোনো না কোনো খুঁত খুঁজে পায়? মানে, বিষয়টা যতই জরুরি হোক, তবুও?”

“বিশ্বাস করেন, স্যার, আমি মোটেও তেমন ছেলে নই। কিন্তু ঘরটার ভেতরে তাকিয়ে আমার সত্যি সত্যিই এমনটা মনে হলো যে–”

“শোনো, তোমার আবোলতাবোল কথা যথেষ্ট হয়েছে” বুড়ো লোকটা বলল। “যারা তাদের জন্য কেউ ভালো কিছু করতে চেষ্টা করছে দেখেও তাকে অগ্রাহ্য করে সমস্ত কিছুতে একগাদা অজুহাত তৈরি করে, তাদের আমি দুই চোখে দেখতে পারি না। এরকম লোকেরা সব জায়গাতেই থাকে, অকর্মণ্য একেবারে।”

“আমাকে মাফ করবেন দয়া করে” আমি ক্ষমা চাইলাম। “আর আমি অবশ্যই পড়ার জন্য এই ঘরের ভেতরে যাব।”

আমি কেন সবসময় এমন করি, যখন কিনা একটা বিষয়ে আমি সত্যিই একমত হতে পারছি না, তখন অন্য কাউকে কেন আমি আমার ইচ্ছের উপরে জোর খাটাতে দিই?

“এই দরজার ওপাশে দেখবে একটা সিঁড়ি আছে” বুড়ো লোকটা বলল। “সিঁড়িটার রেলিং টাইট করে ধরবে যেন আবার পড়ে না যাও।”

ঘরটিতে ঢোকার সময়ে আমিই প্রথমে পা দিলাম। বুড়ো লোকটা তখন আমাদের পেছনের দরজাটা লাগিয়ে দিল, সামনে পেছনে সবকিছু মুহূর্তেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল। দরজার তালাটায় লোকটার চাবি ঘোরানোর শব্দটা আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম।
“আপনি দরজায় তালা লাগালেন কেন?”

“এটাই এখানকার নিয়ম। এই দরজা অবশ্যই সব সময় তালা লাগিয়ে রাখতে হবে।”

আমার তখন আর কী-বা করার ছিল? আমি হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়ি ধরে নামতে লাগলাম। সিঁড়িটা ছিল অসম্ভব লম্বা। এতই লম্বা যেন মনে হলো নামতে নামতে ব্রাজিলে চলে যাব। রেলিঙের উপরে ধরার জায়গাটার লোহায় গুঁড়ো গুঁড়ো জং ধরে ছিল। কোনোদিকে এক ফোঁটাও আলো ছিল না। নামতে নামতে শেষপর্যন্ত আমরা দুজন সিঁড়ির শেষ মাথায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। সেখান থেকে খানিকটা সামনে আমি অস্পষ্ট একটা আলো দেখতে পেলাম। খুবই ক্ষীণ একটা আলো। তবু বহুক্ষণ ধরে অন্ধকারে অভ্যস্ত আমার চোখকে ধাঁধিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। কে যেন সেখানে পেছন থেকে এসে আমার একটা হাত ধরল। দেখলাম ছোটোখাটো একটা লোক গায়ে একটা ভেড়ার চামড়া জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“এসেছ? এখানে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ” ভেড়ার চামড়া জড়ানো লোকটা বলল।

“শুভ সন্ধ্যা” বললাম আমি।


ভেড়ার চামড়াটা সত্যিকারের। ভেড়ামানুষের শরীরের প্রতি ইঞ্চি চামড়াটা দিয়ে মোড়ানো ছিল। শুধুমাত্র তার মুখের জায়গায় খানিকটা খোলা। তবে সে যাই হোক, ওইটুকুর মধ্যেই তার এক জোড়া মমতাময় চোখ চিকচিক করছিল। গায়ের চামড়ার পোশাকটা তাকে বেশ মানিয়েও যাচ্ছিল। ভেড়ামানুষটা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আর তারপর তার চোখ নেমে এল আমার হাতের ভারি তিনটা বইয়ের উপরে।

“হায় হায়, তুমি এখানে পড়তে এসেছ? মানে, আসলেই পড়বে?”

“অবশ্যই, পড়তে এসেছি” আমি উত্তর দিলাম।

“মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে তুমি সত্যি সত্যি ভেবেচিন্তে এখানে এই বইগুলো পড়তে এসেছ?”

ভেড়ামানুষটির কথা বলার ভঙ্গিটা ছিল খুবই অদ্ভুত। আমি ঠিক বুঝলাম না তার কথার কী উত্তর দেব।

“এদিকে আসো, ফালতু আলাপ বন্ধ কর,” বুড়ো লোকটা আদেশ করল। “তুমি তো এখানে পড়তে এসেছ, ঠিক না? তো ওকে সরাসরি সেটা বলে দিলেই হয়ে যায়।”

“একদম ঠিক, আমি এখানে পড়তেই এসেছি।”

“এবারে তুমি ভালোভাবে শুনতে পেয়েছ তো?,” বুড়ো লোকটা ভেড়ামানুষের দিকে চিৎকার করে বলল।

“কিন্তু, স্যার,” ভেড়ামানুষটা কোনোরকমে বলল। “এ তো একেবারেই বাচ্চা।”

“চুপ করো!” বুড়ো লোকটা গর্জে উঠল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই সে তার পোশাকের পেছনের পকেট থেকে একটা সরু বেত বের করে ভেড়ামানুষের মুখে আড়াআড়ি দিল এক বাড়ি। “একে পড়ার ঘরে নিয়ে যাও, এক্ষুণই!”

ভেড়ামানুষকে দেখে মনে হলো দারুণ বিপদে পড়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে তারপর ঠিকই আমার হাতটা ধরল। বেতের বাড়িটা তার ঠোঁটের পাশটায় একটা লাল দাগ ফেলে গেল। “ঠিক আছে, যেতে যখন হবেই, চলো।”

“কোথায়?”

“পড়ার ঘরে, আর কোথায়? তুমি তো এখানে ওই মোটা বইগুলো পড়তে এসেছ, ঠিক না?”

ভেড়ামানুষ আমাকে আরও খানিকটা নীচে এক হলরুমের ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বুড়ো লোকটা সামান্য দূরত্ব রেখে আমাদের পেছনে পেছনে আসছিল। ভেড়ামানুষের পোশাকের পেছন দিকে ছোট্ট একটা লেজ। সে যখন হেঁটে যাচ্ছে তখন প্রতিবার পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সেটা পেন্ডুলামের মতো একবার বামদিকে তো আরেকবার ডানদিকে দুলছিল।

“হয়েছে, হয়েছে,” হলরুমের শেষ প্রান্তে এসে ভেড়ামানুষটা বলে উঠল। “জায়গামতো এসে পড়েছি আমরা।”

“একটু দাঁড়ান, ভাই ভেড়ামানুষ,” আমি বললাম। “এটা কি আসলে একটা জেল?”

“জেলই তো,” ভেড়ামানুষ বলল।

“একদম ঠিক ধরেছ,” বুড়ো লোকটা বলল।


“এরকম কোনো কিছু তো আপনি আমাকে আগে বলেননি,” বুড়ো লোকটাকে বললাম আমি। “আমি আপনার কথা শুনে এতদূর পর্যন্ত হেঁটে এসেছি। আপনি আমাকে কেবল বলেছিলেন পড়ার ঘরে যেতে হবে।”

“আরে, তোমাকে তো ধরে আনা হয়েছে,” মাথা দুলিয়ে ভেড়া মানুষটা বলল।

“সে ঠিক বলেছে। আমি তোমার চোখে ধুলো দিয়ে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি,” বুড়ো লোকটা বলল।

“আপনি এটা কীভাবে পারলেন . . .”

“একদম চুপ, গাধা কোথাকার,” বুড়ো লোকটা হুঙ্কার দিয়ে উঠল। দ্রুত সে তার পেছনের পকেট থেকে বেতটা টেনে আনল আর আমার মাথায় মারার জন্য দিল একটা বাড়ি। আমি সঙ্গে সঙ্গে দুই পা পেছনে সরে এলাম। আমি কিছুতেই আমার মুখের উপরে আড়াআড়ি একটা দাগ চাইনি।

“এবারে তুমি সোজা ভেতরে যাও– আর একটা কথাও শুনতে চাই না। এই তিনটা বইয়ের সামনের কভার থেকে পেছনের কভার পর্যন্ত ঝরঝরে মুখস্থ করো গে,” বুড়ো লোকটা বলল। “আজকে থেকে এক মাস পরে আমি নিজে এসে তোমার পরীক্ষা নেব। যদি আমি দেখি যে বইগুলোতে যা আছে সেসব আগাগোড়া তোমার নখদর্পণে এসে গেছে, তখন তোমার ছুটি।”

“এরকম ভারি ভারি তিনটা বই মুখস্ত করা তো অসম্ভব,” আমি কোনোরকমে বললাম। “আর আমার মা সত্যিই এতক্ষণে আমার জন্য ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছেন . . .” বুড়ো লোকটা দাঁত বের করে হো হো করে হাসল আর প্রায় সাথে সাথেই বেতটা শূন্যে উঠিয়ে আমার পায়ের দিকে একটা বাড়ি মারল। আমিও বাড়ি পড়তে না পড়তেই শূন্যে লাফিয়ে উঠলাম। বেতটা আবার গিয়ে লাগল সেই বেচারা ভেড়ামানুষের মুখে। রাগের চোটে বুড়ো লোকটা তখন ভেড়ামানুষকে আরো কয়েকটা বাড়ি লাগিয়ে দিল। এই কাজটা করে সে সাংঘাতিক অন্যায় করেছিল।

“একে ধাক্কা দিয়ে জেলের ভিতরে ঢুকিয়ে দাও। তোমার উপরে কাজটা ছেড়ে দিয়ে গেলাম,” বুড়ো লোকটা আদেশ করল আর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।

“তোমার কি খুব ব্যথা লেগেছে, ভাই?” ভেড়ামানুষের কাছে জানতে চাইলাম আমি।

“নাহ্, অসুবিধা নেই। এসব বেতের বাড়িতে আমার অভ্যাস আছে,” ভেড়ামানুষ বলল। এমনিতেও দেখে মনে হচ্ছিল না যে তত জোরে তাকে মারা হয়েছে।

“শুধু এই কাজটা করতে আমার ভীষণ খারাপ লাগে। কিন্তু আমাকে সেটা করতেই হবে। তোমাকে জোর করে জেলে ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে দিতে হবে আমাকে।”

“আচ্ছা, আমি যদি বলি জেলের ভেতরে ঢুকব না, আমি যদি কিছুতেই না ঢুকি? তাহলে কী হবে?”

“তাহলে আর কী, বুড়োটা আমাকে আরো জোরে জোরে পেটাবে।”

ভেড়ামানুষের দুর্ভাগ্যের জন্য আমার খুব কষ্ট হলো। তাই আমি নিজে নিজেই জেলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। সেখানে ছিল খুবই সাধারণ একটা বিছানা, একটা টেবিল, একটা বেসিন। আর পাশে ফ্ল্যাশ আর কমোড-বেসিনের উপরের দিকে একটা টুথব্রাশ আর কাপ। কোনোটাই তেমন মনে হলো না যাকে বলা যায় পরিস্কার। সেখানে রাখা টুথপেস্টটা স্ট্রবেরির গন্ধওলা, যেটা আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না। ভেড়ামানুষটা টেবিলের উপরে রাখা টেবিল ল্যাম্পটা নিয়ে খেলছিল, একবার অফ আরেকবার অন।

“অ্যাই, এদিকে দেখ” আমার দিকে তাকিয়ে খুশি খুশি মুখ করে সে বলল। “এটা অন অফ করতে মজা না?”


“আমি দিনে তিনবার তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসব” ভেড়ামানুষটা বলল। “তাছাড়া বিকেল তিনটার সময়ে নাস্তা হিসেবে তোমার জন্য ডোনাডও আনব। ডোনাডগুলো খাওয়ার ঠিক আগে আগে আমি নিজে ভাজি, তাই সেগুলো কুড়মুড়ে আর খেতেও মজা।”
খাওয়ার আগমুহূর্তে বানানো ডোনাড বরাবর আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার।

“ঠিক আছে, এবারে তোমার পা দুটো দাও দেখি।”

আমি দুটো পা জোড়া করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।

ভেড়ামানুষটা একটু ঝুঁকে খাটের নীচ থেকে একটা ভারি ধাতব বল লাগানো চেন টেনে বের করে আনল। চেনটা আমার দুই পায়ের গোড়ালি জড়িয়ে পেঁচিয়ে ফেলল। ভালো করে প্যাঁচানো হয়ে গেলে তালা লাগিয়ে দিল। তালা লাগিয়ে চাবিটা যত্ন করে নিজের বুকপকেটে রেখে দিল।

“চেনটা তো ভয়ানক ঠান্ডা” আমি বললাম।

“অত চিন্তার কিছু নেই। কিছুক্ষণ পায়ে থাকতে থাকতেই অভ্যাস হয়ে যাবে।”

“ভাই, ভেড়ামানুষ, সত্যিই কি আমাকে এখানে টানা এক মাস আটকে থাকতে হবে?”

“হ্যাঁ, তুমি যা যা বই পড়তে এনেছ, সেসবের কথা ধরলে এক মাসই তো লাগার কথা।”

“কিন্তু আমি যদি আগে আগে বইগুলো মুখস্ত করে ফেলি তবে নিশ্চয় বুড়ো আমাকে আগেভাগেই ছেড়ে দেবে, দেবে না?”

“আমার মনে হয় না বুড়ো তোমার প্রতি এতটা সদয় হবে।”

“কিন্তু তারপরে সে আর আমাকে নিয়ে করবেটা কী?”

ভেড়ামানুষটা বিষণ্নভাবে দু’দিকে মাথা দোলাল। “কী আর বলব, সেটা বলাই আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন।”

“দয়া করে বলো, ভেড়ামানুষ। জানোই তো, আমার মা বাড়িতে অস্থির হয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

“ঠিক আছে, বাবু, আমি তাহলে তোমাকে সত্যি কথাটাই বলে দিই। তুমি এই বইগুলো মুখস্ত করে ফেললে তোমার মাথার উপরে একটা ফুটো করা হবে। তারপর তোমার মগজটা চু চু করে চুষে খাওয়া হবে, বুঝলে?”

কথাগুলো নিজ কানে শোনা আমার জন্য ছিল ভয়ানক বেদনার।

“তার মানে হলো গিয়ে– ” ভেড়ামানুষের কথা শুনে ধাতস্থ হতে আমার একটু সময় লাগল। আমি বললাম, “তোমার কথার মানে হলো গিয়ে বুড়ো লোকটা আমার মাথার ভেতরের মগজটা খেয়ে ফেলবে?”

“ঠিক তাই, আমার সত্যিই খারাপ লাগছে তোমার জন্য। তবে এখানে শুরুর থেকে এমনই হয়ে আসছে” অবলীলায় বলল সে।

১০
আমি বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লাম আর হাত দিয়ে আমার মুখ ঢেকে ধরলাম। এরকম একটা মারাত্মক ঘটনা কি আমার সাথেই ঘটবার প্রয়োজন ছিল? আমার অপরাধ কী, আমি একমাত্র যা করেছি তা হলো লাইব্রেরিতে এসেছিলাম কিছু ভালো বইয়ের আশায়।

“আমার কথায় কষ্ট পেও না” ভেড়ামানুষটা আমাকে সান্ত¦না দেবার চেষ্টা করল। “আমি যাই, তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। গরম গরম রাতের খাবার তোমার মন ভালো করে দেবে।”

“ভাই, ভেড়ামানুষ” আমি পেছন থেকে ডাকলাম তাকে, “আমাকে বলতে পার বুড়ো লোকটা আমার মগজটা খেতে চায় কেন?”

“কারণ যে মগজে অনেক জ্ঞান ঠুসে ঠুসে ভরা হয় সেটা খেতে অনেক মজা, এই জন্য। নানান তথ্যে ঠাসা মগজ হলো গিয়ে সুস্বাদু আর মোলায়েম ক্রিমের মতো। আবার নরম ক্রিমের মধ্যে কিছুটা আঁশ আঁশ ভাবও থাকে।”

“এইবার বুঝলাম। মানে এজন্যেই সে চায় যে এক মাস ধরে আমি আমার মাথার মধ্যে নানান তথ্য ঢুকাই যেন শেষে গিয়ে সে খুব মজা করে আমার মগজটা খেতে পারে?”

“একদম ঠিক ধরেছ।”

“আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না যে এটা ভীষণ নিষ্ঠুর একটা ব্যাপার?” আমি ভেড়ামানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম। “মানে আমি তার নিষ্ঠুরতার কথা বলছি যে আমার মগজটা চিবিয়ে চিবিয়ে চুষে চুষে খাবে।”

“সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ, তবে এ আর এমন কী, এ ধরনের ব্যাপারস্যাপার তো পৃথিবীজুড়ে সমস্ত লাইব্রেরিতেই কমবেশি হয়ে আসছে। মানে, তুমি জানতে কি না ঠিক জানি না, চারপাশের ঘটনাগুলো বলতে গেলে এমনই।”

ভেড়ামানুষের বলা এই কথাটা আমাকে বিভ্রান্ত করে ফেলল।

“পৃথিবীর সবখানে? সব লাইব্রেরিতেই?” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।

“একটা জিনিস চিন্তা কর, সমস্ত লাইব্রেরিগুলো যদি বিনা পয়সায় শুধু জ্ঞান বিতরণ করতে থাকে তবে বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য কী?”

“কিন্তু জ্ঞান বিতরণ করছে বলে কি তারা মানুষের মাথার খুলিটা ভেঙে মগজ চিবিয়ে খাওয়ার অধিকার পেয়ে যাবে? তোমার কি মনে হয় না এটা জ্ঞানের বিপরীতে খুবই বিরাট চাওয়া?”

ভেড়ামানুষ আবারও বিষণ্ন হয়ে আমার দিকে তাকাল। “তোমার ভাগ্য খারাপ, ভাই। সত্যিকার অর্থে ভেতরের অবস্থাটা আসলে এমনই। এরকম ঘটনা খুবই সাধারণ ব্যাপার।”

“কিন্তু আমার মা যে আমার কথা ভাবতে ভাবতে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ভাই, ভেড়ামানুষ, তুমি কি আমাকে এখান থেকে লুকিয়ে বের হয়ে যেতে সাহায্য করতে পার না?”

“নাহ্, কোনো বুদ্ধিই এখানে কাজ করে না আসলে। আমি যদি সেটা চেষ্টা করেও ফেলি, আমাকে শুঁয়োপোকাভরা একটা বৈয়ামের ভেতরে রাখা হবে। একটা বিশাল বৈয়াম, সেখানে থাকবে দশ হাজারেরও বেশি শুঁয়োপোকা, আর বৈয়ামটার ভেতরে কাটাতে হবে পুরোপুরি তিন-তিনটা দিন।”

“কী বিশ্রী ব্যাপার” বললাম আমি।

“সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমি তোমাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারব না, বাবু। আমি সত্যিই দুঃখিত।”

১১
জেলখানার ওই ছোট্ট ঘরটিতে আমাকে একা ফেলে ভেড়ামানুষ চলে গেল। আমি শক্ত বিছানাটাতে ধপাস করে শুয়ে পড়লাম। শক্ত তক্তপোষে মুখ লুকিয়ে পুরো এক ঘণ্টা কাঁদলাম। সেখানে আমার জন্য রাখা নীল বালিশটা যবের খোসায় ভরা, আর বালিশটার একটা কোণের দিকে কেন যেন ভেজা। পায়ের দিকে তাকালাম। আমার পায়ের সঙ্গে আটকানো চেনটার ওজন কমপক্ষে এক টন।

আমি অন্য কিছু করতে না পেরে নিজের ঘড়িতে চোখ রাখলাম, ঠিক সাড়ে ছয়টা বাজে। আমার মা এতক্ষণে নিশ্চয় রাতের খাবার বানিয়ে ফেলেছেন আর আমার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম যে মা রান্নাঘরের মেঝে বরাবর পায়চারি করছেন আর ঘনঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। খাবারের সময়ের কথা বাদ দিলাম, রাতে ঘুমানোর সময়ের আগেও যদি আমি বাড়িতে না ফিরি তবে তার দুশ্চিন্তা চরমে উঠে যাবে। আমার মা ঠিক এমনই। কোথাও কিছু হলে আর সেটা না জানলে তিনি কল্পনা করার জন্য সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাটাকেই বেছে নেন। আর তারপর সেটাকে বাড়িয়ে চড়িয়ে ভয়ানক চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সুতরাং এই মুহূর্তে হয় তিনি নানারকম খারাপ সম্ভাবনার চিন্তার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন অথবা নিজেকে সোফায় এলিয়ে দিয়ে টেলিভিশনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

ঠিক সাতটায় দরজায় কে যেন হালকা দুটো টোকা দিল। শব্দটা খুব আস্তে অথচ দ্রুত।

“ভেতরে আসুন” আমি বললাম।

দরজার তালায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেলাম, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি মেয়ে হাতে চা-নাস্তার ট্রলি নিয়ে আমার ঘরে ঢুকল। মেয়েটা দেখতে এত সুন্দর যে তার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ টনটন করছিল। তাকে দেখতে আমার বয়সিই মনে হলো। তার গলা, হাতের কব্জি, পায়ের গোড়ালি এতই সরু যে দেখে মনে হলো সামান্য চাপ দিলেই সেগুলো ভেঙে যেতে পারে। তার লম্বা আর ঝরঝরে সোজা চুলগুলো এত চকচক করছিল যেন নানারকমের রতœ দিয়ে সাজানো। মনে হলো কিছু বোঝার জন্য সে আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আর তারপর ট্রলি থেকে খাবারের থালাগুলো উঠিয়ে সে টেবিলটার উপরে লাইন করে সাজিয়ে রাখল। একের পর এক রাখতে লাগল কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। আমি নিজেও একেবারে চুপ, তার রূপ দেখলে এমনিতেও মুখে কথা জোটার কথা নয়।

খাবারগুলো দেখতে চমৎকার। সামুদ্রিক শাকের ধোঁয়া ওঠা স্যুপ আর আঁচে পোড়ানো স্প্যানিশ ম্যাকারেল মাছের সঙ্গে টক ক্রিম, সাদা অ্যাসপারাগাসের উপরে তিল দিয়ে সাজানো, পাশে শশা-লেটুসের সালাদ আর মাখন পোরা একটা রুটির রোল। এসব ছাড়াও একটা বড়ো গ্লাসে আঙুরের জ্যুস। সমস্ত থালা, বাটি আর গ্লাস সাজানো শেষ হয়ে গেলে মেয়েটি আমার দিকে ফিরল। আর তারপর নিজের হাত দিয়ে নানান ভঙ্গি দিয়ে কথা বোঝাতে শুরু করল, এবারে চোখ মুছে ফেল দেখি। তোমার খাবারের সময় হয়েছে।

১২
“তুমি কি কথা বলতে পার না?” আমি জানতে চাইলাম তার কাছে।

নাহ্, আমি কথা বলতে পারি না। আমার গলার কথা বলার যন্ত্রটা ছোটোবেলাতেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

“নষ্ট করে ফেলা হয়েছে মানে?” আমি বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলাম। “কে করেছে এই কাজ?”

সে কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেবার বদলে সে বরং একটু হাসল। তার মুচকি হাসিটা এতই মধুর যেন মনে হলো আশেপাশের বাতাস ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে।

বোঝার চেষ্টা করো, মেয়েটি বলল। ভেড়ামানুষটা কিন্তু খারাপ না। তার মনটা খুব নরম। কিন্তু ওই যে বুড়ো লোকটা, সে-ই তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখে।

“আমি জানি” আমি বললাম। “কিন্তু তারপরেও . . .”

মেয়েটি আমার কাছে এগিয়ে এল আর তার একটা হাত আমার হাতের ওপরে রাখল। তার হাতটা ছোটো আর খুবই নরম। আমার মনে হলো আমার হৃদয় ভেঙে দুটো টুকরো হয়ে গেল।

তোমার খাবারটা গরম থাকতে থাকতেই খেয়ে ফেলো, সে বলল। গরম গরম খেলে তুমি শরীরে শক্তি পাবে।

মেয়েটি দরজা খুলে চা-নাস্তার ট্রলিটা ঠেলে বের করল, তারপর নিজেও ঘরের বাইরে চলে গেল। তার নড়াচড়া এতই দ্রুত অথচ স্নিগ্ধ, যেন বসন্তের হাওয়া।

খাবারগুলো সত্যিই খুব মজার ছিল কিন্তু আমি সেসবের অর্ধেকমতো কোনোরকমে গলা দিয়ে নামাতে পারলাম। আমি যেহেতু এখনো বাসায় যাইনি, চিন্তায় চিন্তায় আমার মা কী যে ভেঙে পড়বেন! আর তিনি নিশ্চয় দুশ্চিন্তা করতে করতে আমার পোষা পাখি স্টার্লিংকে খাওয়াতে ভুলে যাবেন। স্টার্লিং না খেয়ে থাকতে থাকতে একসময় মরে যাবে।

কিন্তু তাতে কী, আমি কি আর এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারব? আমার পায়ের গোঁড়ালির সঙ্গে ভীষণ ভারি একটা ধাতব বল চেন দিয়ে বাঁধা আর ঘরের দরজায়ও তালা। কোনোরকমে দরজাটা খুলে ফেলতে পারলেও, পায়ে এই ওজন নিয়ে আমি কি গোলকধাঁধাঁর মতো প্যাঁচানো ওই লম্বা লম্বা করিডোরগুলো পেরোতে পারব? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁদতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু বিছানায় গোল হয়ে শুয়ে থেকে আর পড়ে পড়ে কেঁদে তো কোনো লাভ হবে না। তাই নিজেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার উঠে বসলাম আর খাবারগুলো শেষ করলাম।

১৩
ভেবে দেখলাম সবচেয়ে ভালো যে কাজটা আমি ওই ঘরে বসে করতে পারি তা হলো ওই টেবিলে বই নিয়ে বসা আর পড়াশোনা শুরু করা। আমাকে যদি পালানোর কোনা পথ খুঁজতেই হয় তবে প্রথমে আমার শত্রুর সমস্ত কথা মেনে নিতে হবে যাতে সে আমার উপরে খুশি থাকে। আমি তার প্রতিটা হুকুম মেনে চলব। আমার কাছে মনে হলো ওই কয়টা নিয়ম ধরে কাজ করা তেমন কোনো কঠিন হবে না। আর এমনিতেও আমি হলাম গিয়ে সেই ধরণের ছেলে যে সবরকমের আদেশ সহজেই মেনে চলে।

আমি তিনটি বইয়ের মধ্যে অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়কারীর ডায়রি বইটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর পড়তে শুরু করলাম। বইটা প্রাচীন তুর্কি ভাষায় লেখা; কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পড়ে দেখলাম সহজে বোঝার জন্য দারুণ একটা বই। আর কেবল সহজে পড়ে বোঝার ব্যাপার নয়, প্রতিটা পাতায় যা পড়ছিলাম তাই যেন সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখস্থ হয়ে যাচ্ছিল, একেবারে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর। কোনো আশ্চর্য কারণে কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই আমি যা পড়ছিলাম সবকিছু কেন যেন আমার মাথা ভেতরে জমিয়ে ফেলছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মনে হলো আমি তুর্কি কর আদায়কারী, ইবনে আরমাত হাসির হয়ে গেছি, যে কিনা কোমরে একটা একদিকে ধারওলা বাঁকানো তলোয়ার ঝুলিয়ে ইস্তানবুলের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত আর কর আদায় করত। আমার ঘরের বাতাসে কেন যেন ফলমূল, মুরগির মাংস, তামাক আর কফির গন্ধ ভেসে বেড়াতে লাগল তখন। ইস্তানবুলের পুরো শহরে একই গন্ধ, নদীর পানি এক জায়গায় জমে থাকলে যেমন হয় তেমন জমাট গন্ধওলা বাতাস সেখানকার সব রাস্তায়। সমস্ত রাস্তায় ফেরিওলারা বিভিন্ন জিনিস নিয়ে বসত, যে যা বিক্রি করত তারই নাম ধরে চিৎকার করে ডাকত, যেমন খেজুর, তুর্কি কমলা, আরো কত কিছু। হাসির সেখানে গম্ভীর হয়ে হাঁটত, তবে এমনিতে তেমন কোনো চিন্তাভাবনা থাকত না তার মাথায়। তার বউ ছিল তিনজন আর ছেলে মেয়ে ছয়টা। হাসিরের ছিল একটা পোষা টিয়া যে কিনা সব দিক থেকেই দেখতে একদম আমার পোষা পাখি স্টার্লিঙের মতো।

নয়টা বাজার সামান্য পরে ভেড়ামানুষকে দেখা গেল। সে ট্রেতে করে আমার জন্য কোকা আর বিস্কিট নিয়ে ঘরে ঢুকল।

“বাহ্, তুমি তো ভীষণ ভালো ছেলে!” সে বলল। “তবে শোনো, এই গরম কোকার জন্য পড়াশোনা থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিতে পার না?”

আমি বই বন্ধ করে রাখলাম আর গরম কোকায় চুমুক দিয়ে নিয়ে বিস্কিট খেতে শুরু করলাম।

“আচ্ছা, ভাই, ভেড়ামানুষ” আমি বললাম। “তোমাদের এখানে ওই সুন্দরী মেয়েটা কে যে তখন আমাকে খাবার দিতে এসেছিল?”

“মানে? আবার বলো তো? কোন সুন্দরী মেয়ে?”

“আরে, যে আমার জন্য রাতের খাবার নিয়ে এল খানিক আগে।”

“খুবই অদ্ভুত কথা বলছ তো” ভেড়ামানুষ বোকা বোকা দৃষ্টি নিয়ে বলল। “তখন আমিই না তোমার জন্য রাতের খাবারের ট্রলি নিয়ে এলাম। তুমি তো বিছানায় শুয়ে ছিলে, ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলে। আর তুমি আমার দিকে তাকালেই দেখতে পাবে, আমি কোনো সুন্দরীও নই, এমনকি মেয়েও নই। আমি কেবলই একটা ভেড়ামানুষ।”

“আচ্ছা, এমন কি হতে পারে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?”

১৪
পরের দিন সকাল সকাল সুন্দরী মেয়েটা আবার এসে উপস্থিত হলো। সেবারে সে সঙ্গে নিয়ে এল আলুর সালাদ আর সসেজ। ভেতরে মশলা পোরা স্ন্যাপার মাছ, মুলার সালাদ, বড়ো একটা ক্রস্যান্ট আর মধু দেয়া লাল চা। খাবারগুলোর দিকে এক নজর তাকিয়েই আমার পেট চোঁ চোঁ করে উঠল।

সময় আছে কিন্তু। তুমি ধীরে ধীরে খাও। সবকিছু খেতে হবে, কেমন! মেয়েটি তার হাত নেড়েচেড়ে বলল।

“আমাকে বলো না, তুমি কে” আমি বললাম।

আমি তো আমিই, এটাই আমার পরিচয়।

“অথচ দেখ, ভেড়ামানুষটা বলল তোমার নাকি কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধু তাই নয়, সে বলল–”

মেয়েটি তার ছোট্ট আঙুল নিজের ঠোঁটের ওপরে রাখল। আমি কথা বন্ধ করলাম।

দেখ, ভেড়ামানুষের নিজস্ব পৃথিবী আছে। আমার আছে আমার। আর তোমারও নিশ্চয় একান্ত একটা পৃথিবী আছে। ঠিক বলিনি?

“কিন্তু তুমি তো আছ, তাই না?”

অবশ্যই, কথা হলো আমি ভেড়ামানুষের পৃথিবীতে নেই, এর মানে তো এই নয় যে আমি কোথাও নেই।

“এইবার বুঝেছি” আমি বললাম। “আমাদের পুরো পৃথিবীটা আসলে প্রত্যেকের টুকরো টুকরো পৃথিবীর সমষ্টি। যেমন, আমার পৃথিবী, তোমার পৃথিবী, আবার ভেড়ামানুষের পৃথিবী। আর কখনো এমন হয় যে একজনের পৃথিবী আরেকজনের পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যায়, আবার কখনো একেবারেই হয় আলাদা। এটাই তো তুমি বলতে চাচ্ছো, তাই না?”

মেয়েটি দুবার মাথা দুলিয়ে একমত হবার কথা জানাল।

আসলে আমি বোকা হলেও তত বোকা নই। তবে আমাকে সেই কালো কুকুরটা যখন কামড়েছিল তখন আমার মাথা কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছিল। সত্যি কথা বলতে কী, তারপর থেকে সেই ঝামেলা আর ঠিকও হয়নি। মেয়েটি আমার বিছানায় বসে অপেক্ষা করল আর টেবিলের দিকে তাকিয়ে আমার খাওয়া দেখল। তার ছোটো ছোটো হাতদুটো দুই হাঁটুর উপরে পড়ে থাকল। তাকে দেখে মনে হলো সে যেন কাচের তৈরি একটা অমূল্য পুতুল, সকালের রোদে ঝলমল করছে।

১৫
“আমার ভীষণ আনন্দ হতো যদি আমার মা আর আমার পোষা পাখি স্টার্লিঙের সঙ্গে তোমাকে দেখা করিয়ে দিতে পারতাম” মেয়েটিকে বললাম আমি। “আমার পোষা পাখিটার ভীষণ বুদ্ধি আর দেখতেও খুব সুন্দর।”

মেয়েটি আমার কথা শুনে তার মাথা একদিকে সামান্য দোলাল।

“আমার মা-ও আসলে খুব ভালো। শুধু একটা সমস্যা, তিনি আমাকে নিয়ে সবসময় ভীষণ দুশ্চিন্তায় ভোগেন। আর এটার এমন একটা ফালতু কারণ আছে যে কী বলব, কারণটা হলো ছোটোকালে আমাকে একটা কালো কুকুর কামড়ে দিয়েছিল, এই আর কী।”

কী রকম কুকুর?

“অনেক বড়ো, কালো একটা কুকুর। কুকুরটার গলায় ছিল চামড়ার একটা বেল্ট। বেল্টের উপরে রঙ বেরঙের পাথর বসানো। কুকুরটার চোখ ছিল সবুজ আর পাগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। দুই হাতে অন্তত ছয় ইঞ্চি করে থাবা। কুকুরটার অদ্ভুত কানগুলোর শেষ মাথাটা দুই ভাগ করা। নাকটা ছিল লালচে বাদামি, দেখে মনে হয়েছিল যেন রোদে খুব পুড়েছে। আচ্ছা, তোমাকে কখনো কুকুরে কামড়েছিল?”

নাহ্, আমার এরকম কোনো অভিজ্ঞতা নেই, মেয়েটি বলল। যাই হোক, এখন কুকুরের কথা বাদ দাও তো। আগে তোমার খাবারগুলো শেষ করো।

আমি কথা বলা বন্ধ করলাম আর খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। খাবার পরে মধু মেশানো চা খেলাম। চা খেয়েই আমার শরীর গরম হয়ে গেল। আরাম লাগল আমার।

“আমাকে যে কোনো উপায়ে এই জায়গা থেকে ভাগতে হবে” আমি বললাম। “আমার মা খুব চিন্তায় আছেন আর আমার প্রিয় স্টার্লিং তো মনে হয় না খেয়েই মারা যাচ্ছে।”

আচ্ছা, পালানোর সময়ে তুমি কি তোমার সঙ্গে আমাকেও নিতে পার?

“অবশ্যই” আমি উত্তর দিলাম। “কিন্তু সমস্যা হলো আমি ঠিক জানি না যে আদৌ এখান থেকে পালাতে পারব কি না। দেখতেই তো পাচ্ছো, আমার দুই পায়ের গোঁড়ালির সঙ্গে চেন দিয়ে কত্ত ভারি একটা বল আটকানো আছে। তা ছাড়া, জানোই তো এখানকার করিডোরগুলো গোলকধাঁধার মতো। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, আমি পালিয়ে গেলে ওই ভেড়ামানুষটাকে আমার জন্য জঘন্য একটা শাস্তি পেতে হবে।”

তাহলে ভেড়ামানুষকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে নেব। আমরা তিনজন একসঙ্গে পালাব।

“তোমার কি মনে হয় যে তাকে বললে সে আমাদের সঙ্গে যাবে?”

মেয়েটা চোখমুখ উজ্জ্বল করে হাসল।

তারপর ঠিক তার আগের সন্ধ্যার মতোই সামান্য খোলা দরজার সরু ফাঁক দিয়ে সে গলে বেরোল আর চোখের সামনে থেকে মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।

১৬
দরজার তালা খোলার শব্দটা যখন পেলাম তখন আমি টেবিলে বসে চুপচাপ পড়ছিলাম। ভেড়ামানুষটা ডোনাড আর লেবুর শরবত নিয়ে ঘরে ঢুকল।

“এই যে আমার বানানো কুড়মুড়ে ডোনাড যেটার কথা আমি তোমাকে বলেছিলাম, এইমাত্র ভেজে ওঠালাম।”

“অনেক ধন্যবাদ, ভাই, ভেড়ামানুষ।”

আমি চট করে বই বন্ধ করে ফেললাম। ডোনাডগুলো থেকে একটা উঠিয়ে নিয়ে কামড় দিলাম। সত্যিই ডোনাড বানানোটা ভীষণ ভালো হয়েছিল। বাইরে ভীষণ কুড়মুড়ে আর ভেতরে এত নরম যে মুখে দিতেই গলে যাচ্ছিল।

“জানো, আমার জীবনে আমি যত ডোনাড খেয়েছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভালো” আমি বললাম।

“হবেই তো, আমি এইমাত্র এগুলো বানিয়ে এনেছি” ভেড়ামানুষ বলল। “আর তোমাকে তো বলেইছি যে আমি এগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজে হাতে বানাই।”

“আমি বাজি ধরতে পারি যে তুমি যদি ডোনাডের একটা দোকান দাও, সেটা খুবই হিট হবে।”

“ঠিক বলেছ। আমি নিজেও এই কথা বহুবার ভেবেছি। আহা, সেরকম করতে পারলে কতইনা ভালো হতো।”

“আমি নিশ্চিত যে তুমি এটা করতে পারবে।”

“কিন্তু আমাকে কি কেউ এত পছন্দ করে যে আমার দোকানে ডোনাড নিতে আসবে? আমি হাস্যকর কাপড় পরি, আর আমার দাঁতগুলো এত বিশ্রী! আমি তো কারো সামনে ঠিকমতো যেতেই পারব না।”

“আমি তোমাকে সাহায্য করব” আমি বললাম। “আমি নিজে তোমার ডোনাডগুলো বিক্রি করে দেব আর কাস্টমারদের সঙ্গেও আমিই কথাবার্তা বলব। তোমার টাকাপয়সা গুছিয়ে রাখব আর দোকানের পরিচিতির ব্যাপারেও যা করার দরকার করব। আমি তোমার বাসনপত্রও পরিষ্কার করে দিতে পারি। তোমার কেবল যেটা করতে হবে তা হলো, দোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডোনাড বানানো। আমি তোমাকে দাঁত মেজে ঝকঝকে করাও শিখিয়ে দেব।”

“বলো কী, এমন হলে তো চমৎকার হয়” ভেড়ামানুষ বলল।

১৭
ভেড়ামানুষ যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আমি আমার বইয়ের পাতায় ফেরত গেলাম। আগের মতোই, আমি কর আদায়কারী ইবনে আরমাত হাসির হয়ে গেলাম, যে কিনা টেবিলের উপরের বইটা, মানে, অটোম্যান রাজ্যে কর আদায়কারীর ডায়রি বইটা লিখেছে। আমি সারাদিন ইস্তানবুলের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেরিয়ে কর আদায় করলাম, আর যখন সন্ধ্যা নামল, আমি বাসায় ফিরে এলাম, খুব যতœ করে আমার পোষা টিয়াকে খাবার দিলাম। ফেরার সময়ে খুবই সরু আর বাঁকা একটা চাঁদ আকাশে ভেসে থাকতে দেখেছিলাম। অনেক দূরে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছিল, আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলাম। আমার ঘরে জ্বালানো আগরবাতি সাজিয়ে দিয়ে আফ্রিকা থেকে আসা চাকর বেরিয়ে যাচ্ছিল, যাবার সময়ে হাতের কিছু একটা দিয়ে মশা আর মাছি তাড়াতে তাড়াতে বেরিয়ে গেল।
ভীষণ সুন্দরী একটা মেয়ে, আমার তিন বউয়ের মধ্যে একজন, শোবার ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আরে, এটা তো সেই মেয়েই, যে আমাকে প্রতিদিন রাতের খাবার দিতে আমার জেলখানার ঘরে আসে!

আজকের চাঁদটা খুব সুন্দর, সে বলল। আগামীকাল অমাবশ্যা, পুরো আকাশ কাল ঢেকে থাকবে অন্ধকারে।

“টিয়াপাখিটাকে খাবার দেয়া দরকার,” আমি বললাম।

তুমি কি একটু আগেই টিয়াকে খাবার দিয়ে এলে না? সে জানতে চাইল।

“তুমি ঠিকই বলেছ, আমি ওকে খাবার দিয়ে এসেছি,” আমি বললাম, মানে, ইবনে আরমাত হাসির বলল।

মেয়েটির রেশমের মতো শরীর সরু চাঁদের নিবু নিবু আলোয় ঝিলিক দিচ্ছিল। আমার মনে হলো কোনো ভাষা দিয়ে আমি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারব না।

আজকের চাঁদটা সত্যিই খুব সুন্দর, সে আবার বলল। এরপরে যে নতুন চাঁদ উঠবে, সেই বলে দেবে আমরা কোন দিকে যাব আর কোথায় আমাদের যাত্রা শেষ হবে।

“সে তো ভীষণ মজার ব্যাপার হবে” আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম।

১৮
অন্ধ ডলফিনের চলাফেরার মতো নিঃশব্দে ধীরে ধীরে অমাবশ্যা পেরিয়ে নতুন চাঁদের দিনটা চলে এল।

বুড়ো লোকটা সেই বিকেলে আমাকে দেখতে এল। আমাকে বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে দেখে সে ভীষণ খুশি হলো। তার খুশি দেখতে আমার অবশ্য ভালোই লাগল। এমনিতে অবস্থাটা যাই হোক, অন্য মানুষের আনন্দ দেখলে আমার বরাবর আনন্দ হয়।

“আমার কিন্তু তোমাকে এর কৃতিত্বটা দিতেই হবে” থুতনিতে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল সে। “আমি তোমাকে যা ভেবেছিলাম তুমি তার চেয়ে অনেক বেশি করে দেখিয়েছ। তুমি আসলে ভারি ল²ী ছেলে।”

“ধন্যবাদ, স্যার” আমি বললাম। কেউ প্রশংসা করলে আমার ভালো লাগে।

“যত তাড়াতাড়ি তুমি এই বইগুলো মুখস্ত করে শেষ করবে, তত তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে পার” বুড়ো লোকটা আমাকে বলল। তারপর হাওয়ার মধ্যে সে তার একটা আঙুল উঁচু করে তুলে ধরল, “কথাটা বুঝতে পেরেছ তো?”

“জি, বুঝেছি,” আমি বললাম।

“তোমার অন্য কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?”

“তা একটু হচ্ছে” আমি বললাম। “আপনি কি আমাকে একটু খবর নিয়ে বলতে পারেন যে আমার মা আর স্টার্লিং ভালো আছে কি না? এই ব্যাপারটা আমাকে ভয়ানক ভাবিয়ে তুলেছে।”

বুড়ো লোকটা ভীষণ রেগে গেল। “শোনো, পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলে” সে বলল। “প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা থাকে, প্রত্যেকে তার নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে যায়। ঠিক যেমন তোমার মা তার নিজের জীবনের নিয়মে চলছে, তেমনি তোমার স্টার্লিংও নিজের মতোই আছে। আমাদের সবার ক্ষেত্রেও তাই, আমরা যে যার নিয়মে চলছি। পৃথিবীও নিজের মতো করেই চলতে থাকে।”
এর পরেও বুড়ো লোকটা জীবনের নিয়ম কানুনের ব্যাপারে কী সব বকবক করে যাচ্ছিল আমি কিছুই ধরতে পারলাম না। তবে তার কথা শেষ হলে আমি দায়িত্ব পালনের মতো করে ‘হ্যাঁ’ বললাম।

১৯
বুড়ো লোকটা বেরিয়ে যাবার পরপরই মেয়েটি এল। আর বরাবরের মতো দরজা আর চৌকাঠের সামান্য সরু ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

“আজ রাতে নতুন চাঁদ উঠবে” আমি বললাম তাকে।

মেয়েটি চুপচাপ বিছানায় বসল। তাকে দেখতে ক্লান্ত লাগছিল। সে কেন যেন তার শরীরের রঙ হারিয়েছে আর তাই তাকে দেখতে স্বচ্ছ মনে হলো। বিছানায় বসে থাকা সত্তে¡ও আমি তার শরীর ভেদ করে পেছনের দেয়ালটা দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমাকে এরকম দেখাচ্ছে ওই নতুন চাঁদের কারণে, মেয়েটা বলে উঠল। এই নতুন চাঁদ আমাদের থেকে অনেক কিছু জবরদস্তি কেড়ে নেয়।

“আমাকে অবশ্য এটা কেবল সামান্য চোখ জ্বালা করানো ছাড়া আর কিছু করতে পারে না।”

মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাল। নতুন চাঁদের তাহলে তোমার উপরে তেমন কোনো প্রভাব নেই। তাহলে তো তোমার কোনো সমস্যা হবার কথা না। আমার মনে হয় তুমি এখান থেকে পালানোর একটা বুদ্ধি তাড়াতাড়িই পেয়ে যাবে।

“আর তুমি?”

আমাকে নিয়ে ভেবো না। দেখেশুনে মনে হচ্ছে না যে আমরা সবাই একসাথে এখান থেকে পালাতে পারব। তবে আমি নিশ্চিত যে তুমি চলে যাবার পরে বাইরে তোমার সাথে আমার দেখা হবে।

“কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি এই জায়গা থেকে পালাবইবা কী করে?”

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। কোনো কথা বলার বদলে সে আমার দিকে এগিয়ে এল, আমার গালে ছোট্ট একটা চুমু বসিয়ে দিল। আর তারপর দরজার সেই সামান্য ফাঁক দিয়ে পিছলে বেরিয়ে উধাও হয়ে গেল। আমি বিছানার ওই জায়গাতেই ঠায় বসে থাকলাম। তার যাওয়ার দিকে বহুক্ষণ ধরে তকিয়ে থাকলাম। তার চুমুটা আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে গেল যে আমি কিছুই ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছিলাম না। আর একইসাথে আমার দুশ্চিন্তা এমন বেড়ে গেল যে সেটা আর দুশ্চিন্তা না থেকে আশঙ্কায় পরিণত হলো। এটা অবশ্য ঠিক যে একটা দুশ্চিন্তা বাড়তে বাড়তে যদি আশঙ্কাই না হবে তবে সেই দুশ্চিন্তার কথা বলে লাভ নেই।

২০
তারপর বেশি সময় পেরোয়নি, ভেড়ামানুষটা আমার ঘরে ফিরে এল। তার হাতে একটা থালা যেটায় ডোনাডের স্তূপ।

“অ্যাই ছেলে, কী হয়েছে তোমার? তোমাকে এমন নড়বড়ে মনে হচ্ছে, শরীর-টরির খারাপ না তো, হুম?”

“নাহ্, আমি আসলে চিন্তা করছিলাম।”

“তোমার কথা যা শুনলাম সেটা কি ঠিক? মানে তুমি নাকি আজ রাতে এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবে? আমিও কি তোমার সঙ্গে আসতে পারি?”

“অবশ্যই তুমি চাইলেই আমার সঙ্গে যেতে পার। কিন্তু তোমাকে একথা বললটা কে?”

“এই তো কয়েক মিনিট আগে করিডোরে একটা মেয়ের সঙ্গে দেখা, সে-ই বলল তোমার কথা। বলল তুমি নাকি তাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে আজ। এই জায়গায় যে এত সুন্দর একটা মেয়ে থাকে আমার জানাই ছিল নাÑ ওই কি তোমার বান্ধবী যার কথা তুমি সেদিন বলেছিলে?”

“তা বলতে পার, আমার বান্ধবীই বটে. . .” আমি আমতা আমতা করে বললাম।

“ও আচ্ছা। ভাবাই যায় না, বান্ধবী হিসেবে এমন সুন্দরী কাউকে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।”

“ভাই, ভেড়ামানুষ, আমরা যদি এখান থেকে কোনো না কোনোভাবে ভেগে যেতে পারি, আমি নিশ্চিত তোমারও এমন অনেক বন্ধুবান্ধব হবে।”

“সে তো মহা আনন্দের ব্যাপার হবে” ভেড়ামানুষ বলল। “কিন্তু আমরা যদি সফলভাবে পালাতে না পারি, আমাদের দুজনের কপালে শাস্তি হিসেবে কেবল নরক আছে।”

“নরকের শাস্তি বলতে কি তুমি ওই দশ হাজার শুঁয়োপোকাওলা বৈয়ামের ভেতরে থাকার কথা বলছ?”

“কত শুঁয়োপোকা থাকবে সেটা বৈয়ামের আকৃতির উপরে নির্ভর করে” ভেড়ামানুষ মন খারাপ করে বলল।

সংখ্যা যাই হোক, অন্তত দশ হাজার শুঁয়োপোকার সঙ্গে একটা বৈয়ামের ভেতরে তিনদিন থাকার কথাটা ভেবে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা অনুভূতি নেমে গেল। যদিও আমার পেটে কুড়মুড়ে ডোনাড আর গালের উপরে চমৎকার মেয়েটির একটি চুমু কেমন করে যেন আমাকে সমস্ত ভয় কাটিয়ে দেবার জন্য যথেষ্টই মনে হচ্ছিল। আমি তিনটা ডোনাড খেলাম আর ভেড়ামানুষ খেল ছয়টা।

“আমার এত্ত ক্ষিদে পেয়েছিল যে খাবার সময়ে হুঁশ ছিল না” ভেড়ামানুষ হাসতে হাসতে বলল, তার মুখ দেখে মনে হলো বেশি খেয়ে ফেলার জন্য সে ক্ষমা চায়। নিজের মোটা আর খাটো একটা আঙুল দিয়ে সে মুখের পাশে লেগে থাকা চিনির গুঁড়ো মুছে নিল।

২১
আশেপাশে কোথাও একটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে নয়টা বাজল। ভেড়ামানুষ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল আর নিজের ঝুলে থাকা পোশাকটা ঠিকঠাক করে নেবার জন্য কয়েকবার হাত দিয়ে ঝাড়ল। আমাদের পালাবার সময় হলো। ভেড়ামানুষ আমার পা থেকে চেন আর চেন দিয়ে আটকানো ভারি ধাতব বলটা খুলে দিল।

আমরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম আর আলোআঁধারি করিডোর ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। আমি যেহেতু জুতোজোড়া জেলখানার ঘরেই ফেলে এসেছি তাই খালি পায়ে হাঁটছিলাম। জুতো কোথাও ফেলে এসেছি শুনলে মা অবশ্য মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়বেন। সত্যি বলতে কী, জুতোগুলো ভীষণ ভালো চামড়া দিয়ে বানানো আর মা আমাকে আমার জন্মদিনে ওই জুতোজোড়া উপহার দিয়েছিলেন। সবকিছু বুঝেও আমি সেগুলো জেলখানার ঘরে ফেলে এলাম। কারণ জুতোর সামান্যতম খসখস শব্দেও যদি বুড়ো লোকটার ঘুম ভেঙে যায় তবে সর্বনাশ হবে।

স্টিলের বিশাল দরজাটা পেরোনোর সময়ে আমার ওই জুতোজোড়ার কথা খুব মনে পড়ছিল। ভেড়ামানুষ আগে আগে যাচ্ছিল। তার চেয়ে আমি আমার মাথার অর্ধেকটার সমান বেশি লম্বা। তাই দু’দিকে তার দুটো কানের লাফঝাঁপ সারাক্ষণ আমার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল।

“শোনো, ভাই, ভেড়ামানুষ” আমি তার কানে কানে বললাম।

“কী বলছ?” সে ফিসফিস করে বলল।

“বুড়ো লোকটা কানে কেমন শুনতে পায়?”

“আজকে তো নতুন চাঁদের দিন, সুতরাং সে খুব তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু তার কান খুব খাড়া, তুমি তো আগেও দেখেছ সেটা, এমনকি ঘুমের মধ্যেও সতর্ক থাকে। তাই তুমি তোমার জুতোজোড়ার কথা ভুলে গেলেই ভালো। দেখ, তুমি সুযোগ মতো ঠিক ওইরকম আরেক জোড়া জুতো কিনে ফেলতে পার, কিন্তু তোমার মগজ বা তোমার শরীর তো আর নতুন করে বানাতে পারবে না।”

“এই ব্যাপারে তুমি একদম ঠিক কথা বলেছ, ভাই, ভেড়ামানুষ।”

“এখন কোনো কারণে যদি বুড়োর ঘুম ভেঙেই যায়, তবে নিশ্চিত যে পেছনের পকেট থেকে সে তার বেতটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। তার ওই বেতটা আমাদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে মুহূর্তেই। আমি তখন আর তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না। সে যখন আমার শরীরে সপাং সপাং বেত মারবে, আমার আর কিছুই করার থাকবে না– ব্যাপারটা এমন যে বেতের বাড়ি খেলেই আমি তার দাস হয়ে যাই।”

“তুমি কি মনে কর ওই বেতটায় বিশেষ কোনো ক্ষমতা লুকানো আছে?”

“তুমি একদম ঠিক ধরেছ” ভেড়ামানুষ বলল। তারপর সে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। “বুড়োর হাতে বেতটা দেখতে সাধারণ একটা বেতের মতোই। কিন্তু আমি ঠিক জানি না সাধারণ কি না, ওতে কোনো জাদু থাকলে থাকতেও পারে।”

২২

“কিন্তু বুড়ো যখন তোমাকে বেত দিয়ে বাড়ি দেয়া শুরু করে তোমার আর কিছুই করার থাকে না, তাই না?”

“বেতটা অনেক বড়োও তো, সুতরাং ভালোয় ভালোয় তুমি জুতোর কথা ভুলে যাও।”

“জুতোর কথা একেবারে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি” আমি বললাম।

তারপর কোনো কথা না বলে আমরা সবচেয়ে লম্বা করিডোরটা ধরে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলাম।

“ভালো কথা, শোনো” ভেড়ামানুষ বলল।

“কী বলছ?”

“এরই মধ্যে তুমি তোমার জুতোর কথা ভুলে গেছ, গেছ না?”

“অবশ্যই, সে তো আমি কখনই ভুলে গেছি” আমি বললাম। যাই হোক, আবার জানতে চাওয়ার জন্য মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। যে চমৎকার জুতোজোড়া আমার ছিল তা যে আমি সত্যিই পেছনে ফেলে এসেছি, আর কখনো মাথায় আনব না।
লম্বা সিঁড়িটা ভীষণ ঠান্ডা আর পিচ্ছিল। প্রতিটা সিঁড়ির সামনের অংশটুকু ব্যবহার করতে করতে ক্ষয়ে মসৃণ হয়ে ছিল। যতবার সেই মসৃণ অংশে আমার পা পড়ছিল, মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো পোকার মসৃণ গায়ে পা দিচ্ছি। ঘুরঘুটি অন্ধকারে কেউ যদি ওরকম একটা সিঁড়ি ধরে উপরের দিকে উঠতে থাকে তো সেটা মোটেই সহজ নয়। কখনো মনে হচ্ছিল নরম কিছুর উপরে পা দিলাম, যেন পা দিতেই সেটা কুঁকড়ে গেল। আবার কখনো মনে হচ্ছিল যেন আমার পায়ের চাপে কিছু একটা মড়মড় করে ভেঙেচুরে গেল। এই সমস্ত কষ্টকর অভিজ্ঞতার কারণে তখন হুট করে মনে হলো, ধুর, আমি জুতোটা পায়ে দিয়ে এলেই পারতাম।
তবে সেভাবেই ধীরে ধীরে আমরা সিঁড়িটার শেষ মাথায় পৌঁছলাম আর সেই স্টিলের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেড়ামানুষ তার পোশাকের পকেট থেকে বিশাল একটা চাবির রিং বের করল।

“এই কাজটা খুবই তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি কিছুতেই চাই না যে বুড়ো হাবড়াটা ঘুম থেকে জেগে উঠুক।”

“একদম ঠিক বলেছ” আমি বললাম।

একটা চাবি বেছে নিয়ে সে দরজার তালায় ঢোকাল আর বামদিকে মোচড় দিল। চাবি ঘোরানোর সাথেসাথেই বিশ্রী কিরকির শব্দ শোনা গেল আর দরজাটা বিকট ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল। কোনো কিছুই আর নিস্তব্ধ ছিল না সেখানে তখন।

“আমার মনে আছে এই দরজার পর থেকে শুরু হবে সত্যিকারের গোলকধাঁধা,” আমি বললাম।

“ঠিক বলেছ তুমি,” ভেড়ামানুষ বলল। “সত্যিই এর পর থেকে করিডোরগুলো ভীষণ গোলমেলে। আমি নিজেও ঠিকমতো মনে করতে পারি না অনেক সময়। তবে আমরা দুজনে মিলে ঠিকই খুঁজে পথ বের করে চলে যাব।”

সে-ও মনে করতে পারে না অনেকসময়, ভেড়ামানুষের এই কথায় আমি কিছুটা হতাশ হয়ে গেলাম। গোলকধাঁধার ব্যাপারে আমি যতটুকু বুঝি তা হলো, যে কোনো রাস্তা বেছে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার শেষ মাথা পর্যন্ত যাবার আগে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই যে ঠিক যাচ্ছি নাকি ভুল। আর শেষে গিয়ে যদি দেখা যায় যে রাস্তা বেছে নিতে ভুল হয়েছে তখন আবার শুরুতে ফিরে এসে নতুন রাস্তা পছন্দ করতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। গোলকধাঁধায় হেঁটে সঠিকভাবে শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এটাই বড়ো সমস্যা।

২৩
আমি যেমনটা ভেবেছিলাম, ভেড়ামানুষকে নিশ্চয় অনেকবার বিচিত্র করিডোর দিয়ে হাঁটা ধরতে হবে আর ভুল হয়েছে বোঝার পরে আবার শুরুর জায়গায় ফিরে আসতে হবে। অথচ আমার মনে হলো, মানে, আমি ধারণা করলাম যে কোনো না কোনোভাবে আমরা আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। দেখলাম, হাঁটতে হাঁটতে কখনো কখনো ভেড়ামানুষ থমকে দাঁড়ায় আর করিডোরের দেয়ালে নিজের আঙুল ছুঁয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর আঙুলটা নিজের দাঁত দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে যায়। কখনো আবার মেঝের উপরে উপুড় হয়ে কান লাগিয়ে রাখে। কখনো ছাদ থেকে ঝুলে পড়া মাকড়সার ঝুলের উপরে বসা মাকড়সাদের সঙ্গে অদ্ভুত নিচু স্বরে কী যেন কথাও বলে। আর যখনই করিডোরে কোনো বাঁক আসে সেইখানে দাঁড়িয়ে সে বাতাসে পাক খাওয়ার মতো নিজের চারদিকে বেশ কয়েকবার ঘুরে নেয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয় কোনদিকে এগোবে। গোলকধাঁধার মধ্যে সঠিক রাস্তা খুঁজে পাবার জন্য ভেড়ামানুষের ওটাই হয়ত কৌশল। তবে যেভাবে সেদিন এই করিডোরগুলো পেরিয়ে জেলখানার ঘরটা পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম, অত সহজে যে বেরোনো যাবে না এটুকু নিশ্চিত।

ধীরে ধীরে সময় এগোতে লাগল। ভোরের কাছাকাছি তখন প্রায়। নতুন চাঁদের আগের রাতের ঘুরঘুটি অন্ধকার যেন প্রতি মুহূর্তে হালকা হয়ে আসছিল। ভেড়ামানুষ আর আমি দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। আমাদের জানা ছিল যে দিনের আলো ফোটার আগেই আমাদেরকে শেষ দরজাটায় পৌঁছতে হবে। তা না হলে বুড়ো লোকটা জেগে যাবে আর টের পেয়ে যাবে যে আমরা আমাদের জায়গায় নেই। তারপর যথারীতি আমাদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করবে।

“তুমি কি মনে কর যে আমরা শেষ পর্যন্ত ওই দরজাটায় পৌঁছতে পারব?” আমি জানতে চাইলাম।

“নিশ্চয়, সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলছে বলেই মনে হচ্ছে, একদম তুলতুলে কেকের একটা টুকরোর মতো।”

তার কথায় আমি নিশ্চিত হলাম যে ভেড়ামানুষ এর পরের রাস্তাটুকু ভালোভাবেই জানে। আমরা করিডোর ধরে দৌড়োতে লাগলাম। প্রথম কয়েকটা মোড়ে বামে, তারপর উলটোদিকে, কোথাও এতটুকু থামিনি আমরা। শেষ পর্যন্ত শেষ করিডোরটা একটা দরজায় এসে শেষ হলো। করিডোরের শেষ মাথায় দরজাটা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, দরজার লম্বা ফাটা অংশ দিয়ে বাইরের কোনো বাতির আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছিল।

“দেখলে তো” ভেড়ামানুষ গর্বিতভাবে বলল। “আমি আগেই জানতাম যে আমি এই পর্যন্ত আসতে পারব। এখন আমাদের আর শুধু যা করতে হবে তা হলো, এই দরজাটা খুলে বাইরে চলে যেতে হবে। ব্যস, তাহলেই তুমি আর আমি একেবারে স্বাধীন।”
ভেড়ামানুষ দরজাটা যেই খুলল, ঠিক দরজার ওপারে বুড়ো লোকটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। সে যেন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

২৪
এটাই সেই ঘর যেখানে বুড়োর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। রুম নম্বর ১০৭, মাটির নীচে লাইব্রেরির যে তলা, সেখানে। বুড়ো লোকটা নিজের টেবিলে গিয়ে বসল, তার দুটো চোখ আমার দিকে স্থির।

বুড়োর ঠিক পাশেই বসে ছিল বড়ো কালো একটা কুকুর। কুকুরটার চোখদুটো সবুজ আর গলায় নানারকমের পাথর বসানো একটা চামড়ার বেল্ট। কুকুরটার থাবাগুলো ইয়া বড়ো, আর প্রতিটা থাবায় ছয়টা করে নখ। তার কানের শেষ প্রান্তগুলো দুই ভাগ করে চিমটের মতো করে রাখা, আর তার নাক হলো লালচে বাদামি, সূর্যের আলোয় পোড়া। এটাই সেই কুকুর যে বহুবছর আগে আমাকে কামড়ে দিয়েছিল। বুড়োর পাশে বসে থাকা কুকুরটা তার বড়ো বড়ো দাঁতের ফাঁকে আমার পোষা পাখি স্টার্লিঙের রক্তাক্ত শরীরটা আটকে ধরে রেখেছিল।

আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠে পেছন দিকে পড়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু ভেড়ামানুষটা পেছন থেকে আমাকে ধরে ফেলল।
“আমরা সেই কখন থেকে তোমাদের জন্য এখানে অপেক্ষা করছি” বুড়ো লোকটা বলল। “গাধা, তোমাদের এত বেশি সময় লাগল কেন, হ্যাঁ?”

“আমি পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারি, স্যার”

“চুপ কর, গাধা কোথাকার” বুড়ো লোকটা চিৎকার করে উঠল। বুড়ো তার পোশাকের পেছনের পকেট থেকে বেতটা টান মেরে বের করল আর টেবিলের উপরে সপাং করে এক বাড়ি বসিয়ে দিল। কুকুরটার কানদুটো খাড়া হয়ে গেল আর ভেড়ামানুষ ভয়ে একেবারে পাথরের মতো স্তব্ধ।

“ঠিক আছে, যা হবার হয়েছে” বুড়ো লোকটা বলল। “এখন ভাবতে হবে তোমাদের দুজনকে আমি শেষ করব কী করে।”

“আচ্ছা, তাহলে আপনি নতুন চাঁদের রাতে মোটেও তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাননি?” আমি মিনমিন করে জানতে চাইলাম।
“তুমি ভীষণ মিষ্টি একটা ছেলে, ঠিক না?” বুড়ো লোকটা ভেংচি কাটার মতো করে বলল। “আমি জানি না এই ফালতু খবরটা তোমাকে কে দিয়েছে, কিন্তু আসল কথা হলো আমাকে বোকা বানানো অত সহজ নয়। আমি তোমাদের দুজনের মতো বোকাদের চালাকি এমন সহজে ধরে ফেলতে পারি যে দিনের কটকটে আলোয় একটা মিষ্টি তরমুজ বেছে নেয়াও তার চেয়ে কঠিন।”
আমার চোখের সামনে ঘরটা ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে এল। আমার সামান্য অসতর্কতার জন্য সমস্ত কিছু বরবাদ হয়ে গেল। এমনকি আমার বোকামির সাজা ছোট্ট পাখি স্টার্লিংকেও পেতে হলো। আমি আমার চমৎকার জুতোজোড়া হারালাম আর সম্ভবত আমার মাকেও আর কখনো দেখতে পাব না।

“আর তুমি” তার বেতের লাঠিটা হাওয়ার মধ্যে উপরে তুলে ভেড়ামানুষের দিকে তাক করে হুঙ্কার দিল বুড়ো লোকটা। “আমি তোমার শরীরটাকে সুন্দর সুন্দর টুকরোয় কুচিকুচি করে কাটব আর হাজার হাজার পোকামাকড়কে খাইয়ে দেব।”
ভেড়ামানুষ চট করে আমার পেছনে এসে লুকাল। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছিল।

২৫
“প্রথমে তোমার কথা বলি, প্রিয় ছোট্ট বন্ধু আমার” বুড়ো লোকটা আমার দিকে ইশারা করে বলল, “তোমার জন্য যা শাস্তি হবে তা হলো এই কুকুরকে দিয়ে আমি তোমাকে খাইয়ে নেব। একেবারে জ্যান্ত অবস্থায় সে তোমাকে খাবলে খাবলে খাবে। চিৎকার আর আর্তনাদ করতে করতে তুমি মারা যাবে। কিন্তু তোমার মগজটা থাকবে আমার জন্য। অবশ্য তুমি ওই বইগুলো সব মুখস্ত করে ফেললে মগজটা যতটা মজাদার ক্রিমে ঠাসা হতো ততটা হবে না। তবে তা নিয়ে আমার তেমন আফসোস নেই। তোমার মগজের শেষ বিন্দু পর্যন্ত আমি মজা করেই খাবো।”

বুড়ো লোকটা তার দাঁতগুলো বের করে অদ্ভুত আর কুৎসিতভাবে হাসল। সেই হাসি দেখে কুকুরটার সবুজ চোখগুলো আনন্দে চিকচিক করে উঠল।

আর ঠিক তখনই আমি লক্ষ করলাম আমার পোষা পাখি স্টার্লিং কুকুরটার দুই পাটি দাঁতের মাঝখানে আটকে থাকা অবস্থায়ই আস্তে আস্তে ফুলে উঠছে। ফুলে বড়ো হতে হতে সে যখন একটা মুরগির সমান আকৃতির হয়ে গেল তখন গাড়ির ভেতরে যে কপিকল থাকে তার মতো করে কুকুরটার মুখের দুটো পাটি খুলে দিল। কুকুরটা নতুন করে স্টার্লিঙের শরীরে কামড় বসাতে চেষ্টা করল কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কুকুরটার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। সেখান থেকে মড়মড় করে হাড় ভাঙার শব্দ শোনা গেল। বুড়ো লোকটা উন্মাদের মতো উত্তেজিত হয়ে তার হাতের বেতটা দিয়ে স্টার্লিংকে বাড়ি দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু পাখিটার শরীর ফুলতেই থাকল যতক্ষণ না সেটা একটা বড়োসড়ো ষাঁড়ের সমান হয়েছে। তারপর সেই শরীর বুড়ো লোকটাকে দেয়ালের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরল। ছোট্ট ঘরটা স্টার্লিঙের বিশাল দুটো পাখার ফরফর আওয়াজে গমগম করতে লাগল।
দৌড় দাও। পালাও। এটাই তোমাদের সুযোগ, স্টার্লিং বলল। স্টার্লিঙের কথাগুলো সেই সুন্দরী মেয়েটার কণ্ঠস্বরে শোনা গেল।

“কিন্তু তোমার কী হবে?” আমি স্টার্লিংকে জিজ্ঞাসা করলাম, যে আসলে সেই মেয়েটা।

আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি তোমাদের পেছনে পেছনে আসছি। ভাগো, দৌড়াও, তাড়াতাড়ি না গেলে তোমরা চিরকালের জন্য এখানেই হারিয়ে যাবে, মেয়েটা বলল যে আসলে স্টার্লিং।

আমি তার কথামতো কাজ করলাম। এক ঝটকায় ভেড়ামানুষের হাতটা টেনে ধরে আমি ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আর একবারও পেছনে ফিরে তাকাইনি।

তখন ছিল ভোর, লাইব্রেরি একেবারে সুনসান। আমরা দুমদাম করে সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম, পড়ার বড়ো হলরুমটা দৌড়ে পেরিয়ে গেলাম। শেষ মাথায় এসে একটা জানালা ধাক্কা দিয়ে খুললাম, তারপর লাফিয়ে বেরিয়ে গেলাম সেখান থেকে। আর তারপর আমরা যত জোরে দৌড়ানো সম্ভব দৌড়াতে দৌড়াতে পাশের পার্কটাতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সেখানে গিয়ে সবুজ ঘাসের উপরে ধুপ করে শুয়ে পড়লাম। ভালো করে নিশ্বাস নেয়ার জন্য চোখ বন্ধ করে বহুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। আমার মনে হয় আমি তারপরের অনেকক্ষণ চোখ খুলিনি।

যখন চোখ খুললাম, ভেড়ামানুষকে কোথাও দেখতে পেলাম না। ঘাসের উপরে উঠে দাঁড়ালাম আর চারদিকে তাকে খুঁজতে লাগলাম। ফুসফুসে যতটা সম্ভব বাতাস ভরে চিৎকার করে করে আমি তার নাম ধরে ডাকতে লাগলাম। কিন্তু কোনো জবাব এল না। সকালের সূর্যের আলোর প্রথম রশ্মি উঁচু গাছের পাতায় এসে পড়ল। ভেড়ামানুষ আমাকে কোনো কিছু না জানিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সেখানকার ঘাসের উপরে কিছুক্ষণ আগে পড়ে থাকা শিশিরের মতোই উবে গেল।

২৬
মা আগেই আমার জন্য গরম গরম খাবার টেবিলে দিয়ে রেখেছিলেন। আর আমি বাসায় ফিরে দেখলাম আমার জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন। তিনি আমাকে দেরি করার জন্য কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। এমনকি আমি স্কুল থেকে কেন সোজা বাসায় ফিরে আসিনি, অথবা শেষ তিন তিনটে রাত আমি কোথায় কাটিয়ে এলাম, কিংবা আমার পায়ে কেন জুতো নেই– একটা সামান্য কথাও তিনি জানতে চাইলেন না। কোনো অভিযোগ করলেন না। এটা একেবারেই বলতে গেলে তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই কোনো ব্যবহার ছিল না।

আমার পোষা পাখি স্টার্লিং হাওয়া। তার শূন্য খাঁচাটা পড়ে ছিল শুধু। আমিও মাকে স্টার্লিঙের ব্যাপারে কিছুই জিজ্ঞাসা করলাম না। মনে হলো যা হয়েছে, হয়েছে; এ নিয়ে আর কথা বড়িয়ে লাভ নেই। মায়ের মুখ কেন যেন আগের চেয়ে বেশ কালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল তার চারদিকে যেন ছায়া ঘিরে আছে। তবে সেটা এমনও হতে পারে যে যা ভাবছি তা আমার মনের ভুল ছাড়া কিছুই না।
তারপর থেকে আমি কোনোদিন শহরের বড়ো লাইব্রেরিতে যাইনি। তবে আমার প্রায়ই মনে হতো যে ভীষণ প্রতাপশালী মানুষদের ভেতরে একজনকে আমার খুঁজে বের করতে হবে যিনি কিনা ওই লাইব্রেরিটা পরিচালনা করেন। তার কাছে জানতে হবে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলো কেন। আর তাকে এ খবরটাও দিতে হবে যে লাইব্রেরির মাটির নীচের তলায় জেলখানার ঘরের মতো ঘর আছে। এটা যদি প্রকাশ না করি তবে অন্য কোনো নিরীহ বাচ্চার ভাগ্যে ঠিক আমারই মতো দুর্ঘটনা ঘটবে। যদিও, তারপর থেকে বরাবর সন্ধ্যায় ওই রাস্তা দিয়ে ফিরে আসার সময়ে লাইব্রেরির বিল্ডিংটার দিকে চোখ পড়লেই আমি কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াই।

আমি অবশ্য এমনিতেও প্রায়ই আমার সেই প্রিয় চামড়ার জুতোজোড়ার কথা ভাবি যেগুলো আমি লাইব্রেরির নীচে জেলখানার ঘরে ফেলে এসেছি। সেগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে আমি আবার ভেড়ামানুষ আর কণ্ঠস্বরবিহীন সেই চমৎকার মেয়েটির কথা ভাবতে শুরু করি। তাদের দু’জনের কি সত্যিই কোনো অস্তিত্ব ছিল? সেখানে আমার বা তাদের সঙ্গে যা যা ঘটেছিল তার কতটুকুইবা আমি মনে করতে পারি? সত্যি কথা বলতে কী, একের পর এক ঘটনার ব্যাপারে আমি নিজেও আসলে নিশ্চিত নই। মোট কথা, আমি যা জানি তা হলো আমি আমার জুতো আর সবচেয়ে প্রিয় পোষা পাখি স্টার্লিংকে হারিয়েছি।

গত মঙ্গলবারে আমার মা মারা গেছেন। নানানরকম রহস্যময় সব অসুখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন। আর সেদিন সকালে টুঁ শব্দ না করে টুপ করে মরে গেলেন তিনি। তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠানটাও হলো খুব সাদামাটাভাবে। তারপর থেকে আমি একেবারে একা। আমার মা নেই। আমার পোষা পাখি স্টার্লিং নেই। ভেড়ামানুষ উধাও। চমৎকার সেই মেয়েটিও মিলিয়ে গেছে। আমি অন্ধকারে রাতভর একা একা শুয়ে থাকি, এমনকি ভোররাত প্রায় দুটো পর্যন্ত। আমি চুপচাপ লাইব্রেরির মাটির নীচের জেলখানার সেই ছোট্ট ঘরটার কথা ভাবতে থাকি। আমি ভাবতে থাকি একা হয়ে যাওয়াটা ঠিক কেমন। আমার চারদিকের ভারি অন্ধকারের ঘনত্ব নিয়েও ভাবি আমি। আমার চারপাশে ঘিরে থাকে নতুন চাঁদ ওঠার ঠিক আগের রাতগুলোর মতো গাঢ় অন্ধকার।