Jobanখেলা সম্প্রচারের একাল সেকাল

খেলা সম্প্রচারের একাল সেকাল

খেলাধুলা এখনকার সময়ে শুধুই আর খেলাধুলা নেই। খেলা এখন কোটি কোটি টাকার একটি শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। খেলা দেখতে এখন কারো সশরীরে মাঠে উপস্থিত থাকতে হয় না। টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মাধ্যমে এর সাহায্যে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে বসে আপনি আপনার পছন্দের খেলাটি উপভোগ করতে পারবেন। খেলা সরাসরি সম্প্রচার, বা সংক্ষেপে স্পোর্টসকাস্ট এর সুবাদে এখন চীনের রাজধানীতেও স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবল এর সমর্থক পাওয়া যায়।

কিন্তু কারো কি জানা আছে টেলিভিশনে বিশ্বের প্রথম সরাসরি সম্প্রচারকৃত খেলা কোনটি? উত্তরটি হলো ১৯৩৬ এর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস। ১৯৩৬ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের আয়োজক দেশ ছিল নাৎসি জার্মানি। সেবারের খেলাগুলো সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করছিল “টেলিফুনকেন” এবং “ফারনসেহ” নামক দুটি জার্মান ফার্ম। টেলিফুনকেন এই সম্প্রচার কার্যে ব্যবহার করছিলো আরসিএ প্রযুক্তি অপরদিকে ফারনসেহ ব্যবহার করছিলো ফার্নসওয়ার্থ প্রযুক্তি। এটিই ছিল টেলিভিশনে সরাসরি খেলা সম্প্রচারের প্রথম ঘটনা। উভয় প্রযুক্তির মাধ্যমেই ২৫ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে খেলা সম্প্রচারিত হচ্ছিলো। ১৯৩০ এর দশকে লাইভ টিভি স্পোর্টসকাস্ট নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিক সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে যা জিতে নেয় জার্মানি।

১৯৩২ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে। জার্মান শাসক এডলফ হিটলারের লক্ষ্য ছিল যেভাবেই হোক ১৯৩২ এর অলিম্পিক গেমসের চেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিছু আয়োজন করে দেখানো। এবং সেই অনুযায়ী তিনি বেশকিছু পদক্ষেপও নেন। বার্লিনে তিনি ১ লক্ষ আসনসংখ্যা বিশিষ্ট একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেন, সাথে নির্মাণ করেন ৬টি জিমনেসিয়াম এবং তুলনামূলক ছোট আরও কিছু স্টেডিয়াম। ১৯৩৬ এর বার্লিন অলিম্পিকই ছিল প্রথম টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত কোন স্পোর্টস ইভেন্ট যা এই অলিম্পিক গেমসে প্রদান করে অন্য মাত্রার অনন্যতা। এছাড়াও রেডিওর মাধ্যমে ১৯৩৬ এর বার্লিন অলিম্পিক সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিলো ৪১টি দেশে। জার্মানির অলিম্পিক কমিটি কর্তৃক চলচিত্র নির্মাতা লেনি রিফেন্শতালকে দায়িত্ব দেয়া হয়। রিফেন্শতাল তার ১৯৩৬ অলিম্পিকের মুভি অলিম্পিয়ায় এমন কিছু চিত্রগ্রহণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন যা আজও খেলাধুলার চিত্রগ্রহণে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

বার্লিন অলিম্পিকের সবচেয়ে সফলতম দেশ ছিল আয়োজক নাৎসি জার্মানি। সবমিলিয়ে ৮৯টি পদক জিতেছিল জার্মানরা। জার্মানির পরেই সফলতম দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা সব মিলিয়ে মোট ৫৬টি মেডেল জিতে নেয়। সেই অলিম্পিকে সবচেয়ে সফলতম ক্রীড়াবিদ ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জেসে ওয়েনস। জেসে বার্লিন অলিম্পিকে ৪টি স্বর্ণপদক জিতে নেন। তিনি যথাক্রমে ১০০ মিটার দৌড়, ২০০ মিটার দৌড়, ৪০০ মিটার রিলে রেস এবং লং জাম্পের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন। জার্মানির কাছে যুক্তরাষ্ট্র লাইভ স্পোর্টসকাস্টের প্রতিযোগিতায় হেরে গেলেও জার্মানরা টিভিতে সর্বপ্রথম সরাসরি যাকে স্বর্ণপদক পেতে দেখেছিলো তিনি হলেন জেসে ওয়েনস। ১৯৩৬ এর অলিম্পিকই ছিল আগামী ১২ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত শেষ অলিম্পিক গেমস। তারপরে ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ব স্থিতিশীলতায় ভাঙন ধরলে আগামী ১২ বছর আর কোন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পরে অলিম্পিক গেমস আবার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে (শীতকালীন সুইজারল্যান্ডে এবং গ্রীষ্মকালীন লন্ডনে।)

টিভিতে খেলা সরাসরি দেখানোর জন্য দেশগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছিল তা জার্মানি জিতে নিলেও খুব শীঘ্রই অন্যান্য দেশগুলোও সরাসরি কোন খেলা সম্প্রচার করে জার্মানির সাথে নাম লিখাতে মরিয়া হয়ে পড়ে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য তাদের প্রথম কোন খেলার সরাসরি সম্প্রচার করে ১৯৩৭ এর ১৬ই সেপ্টেম্বর। ম্যাচটি ছিল ফুটবল ক্লাব আর্সেনাল এবং তাদেরই রিজার্ভ দলের মধ্যকার একটি এক্সিবিশন ম্যাচ। ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করার দায়িত্ব নিয়েছিল বিবিসি। বিবিসি ম্যাচটি মাত্র ১৫ মিনিটই সরাসরি সম্প্রচার করতে পেরেছিল। সেই ম্যাচের ফলাফল কি হয়েছিল তার কোন নথিই আজ নেই। কিন্তু আর্সেনাল বনাম আর্সেনাল রিজার্ভ দলের সেই ম্যাচটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসের প্রথম কোন খেলার সচিত্র সরাসরি সম্প্রচারিত খেলার পাশাপাশি ছিল ইতিহাসের প্রথম টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত কোন ফুটবল ম্যাচ।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রথম সরাসরি কোন খেলার টিভি সম্প্রচার করে প্রায় আরও ২ বছর পরে। দিনটি ছিল ১৯৩৯ সালের ১৭ই মে। কলাম্বিয়ার বেকার ফিল্ডে আয়োজন করা হয় কলেজ বেসবলের একটি ম্যাচ। ম্যাচটি ছিল কলাম্বিয়া লায়ন্স এবং প্রিন্সটন টাইগার্সদেরর মধ্যে। সেই ম্যাচটি টিভিতে সবাসরি সম্প্রচারের দায়িত্ব নেয় আমেরিকার ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (NBC)। এবং এভাবেই সূচনা হয় স্পোর্টসকাস্টিং শিল্পের।

আমাদের চারপাশে এমন খুব কম মানুষই খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি কোন খেলা টেলিভিশন, ইন্টারনেট বা রেডিওর মাধ্যমে উপভোগ করেন না বা কোনদিনই করেন নি। খেলা দেখা এবং খেলাধুলার ব্যাপারে আবেগী হওয়া এখন খুবই স্বাভাবিক। খেলাধুলোকে আমাদের জীবনের একটি অংশই বলা যায় এখন। এবং এত কিছু কেবল সম্ভব হয়েছে স্পোর্টসকাস্টের জন্যই। টিভি বা রেডিওতে খেলার সরাসরি সম্প্রচারই আমাদের জন্য প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ করার পথ উন্মোচন করে দিয়েছে। এছাড়া খেলাধুলা বা স্পোর্টসকে জনপ্রিয় এবং কোটি টাকার একটি বাণিজ্য খাতে রূপান্তরের পিছনেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এই স্পোর্টসকাস্ট।

ফুটবল

খেলাধুলা এবং তার জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা উঠলে যে খেলার নাম না নিলেই নয়, সেটি হচ্ছে ফুটবল। অনেক এমন দেশ আছে যারা রাগবি বা ক্রিকেটকে বাদ দিয়ে ফুটবলকেই নিজেদের প্রাথমিক খেলা হিসেবে গ্রহণ করে নিচ্ছে। ব্রাজিল বা স্পেনের মত অনেক দেশে ফুটবল তাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল যে আসলেই খেলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু তা অনুধাবনের জন্য বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না। ব্রাজিল – আর্জেন্টিনার সুপার ক্লাসিকো কিংবা লিভারপুল – ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর নর্থ ওয়েস্ট ডার্বি অথবা রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মধ্যকার এল ক্লাসিকোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় ফুটবল আসলে কি। স্পোর্টস্কাস্টে ফুটবল এর আধিপত্য তুলে ধরতে হলে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট।

পৃথিবীতে সব খেলার সব ম্যাচ মিলিয়ে যে ম্যাচটি টিভিতে সবচেয়ে বেশি দেখা হয় সেটা হলো ফিফা বিশ্বকাপ এর ফাইনাল ম্যাচ। তারপরে সব খেলা মিলিয়ে ২য় সর্বোচ্চ ভিউয়ারশিপ যে ম্যাচটি পায় সেটি হলো ইউয়েফা ইউরো ফাইনাল। এবং ৩য় সর্বোচ্চ দর্শকপ্রিয়তা প্রাপ্ত ম্যাচ হচ্ছে উইয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল। ২০১৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের কথা ধরা যাক। আমাদের গ্রহের ৩২০ কোটি মানুষ ২০১৪ বিশ্বকাপ উপভোগ করেছে। শুধুমাত্র জার্মানি বনাম আর্জেন্টিনার ফাইনাল ম্যাচটি একসাথে সারা বিশ্বের ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ উপভোগ করেছে। ভাবা যায়? ১০০ কোটি মানুষ একই সময়ে টিভি সেটের সামনে বসে আছে? এটাই স্পোর্টসকাস্টের ক্ষমতা।

ক্রিকেট

শুধুমাত্র ভক্ত সংখ্যার দিক দিয়ে হিসেব করলে ফুটবলের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশগুলোয় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বেশি। বিশ্বব্যাপি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার অন্যতম কৃতিত্ব দেয়া যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে এবং তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। নিজেদের সংস্কৃতি পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াসের ফল হলো আজ কমনওয়েলথ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ক্রিকেটের এই জনপ্রিয়তা। ক্রিকেট ভারতীয় উপমহাদেশে, ওশেনিয়া মহাদেশ, ইংল্যান্ডে এবং আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপি ক্রিকেটের ভক্তসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটির কাছাকাছি। সবশেষ ২০১৫ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ পৃথিবীব্যাপী প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ উপভোগ করেছে বলে জানা যায়।

রাগবি

পৃথিবীর বেশ কিছু উন্নত দেশে রাগবি একটি জনপ্রিয় খেলা। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডে রাগবি ব্যাপক জনপ্রিয় এবং সকল খেলার মধ্যে রাগবির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ইতালি, জাপান, আর্জেন্টিনা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও রাগবি এখন জনপ্রিয়। ফিফা বিশ্বকাপের পরে ২য় সর্বোচ্চ এটেন্ডেন্সি প্রাপ্ত টুর্নামেন্ট হচ্ছে রাগবি ২০১৫ বিশ্বকাপ। ২০১৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপের ২৪ লক্ষ ৭০ হাজার টিকেট বিক্রয় করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ড বনাম সাউথ আফ্রিকার ফাইনাল ম্যাচটি বিশ্বব্যাপি ১২ কোটিরও বেশি মানুষ দেখেছে।

বাস্কেটবল

ফুটবলের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কোনটি সেটা নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে। কিন্তু বৈশ্বিক ভক্ত-সমর্থক, টিভি দর্শকপ্রিয়তার সংখ্যা, পৃথিবীব্যাপি পেশাদার লিগের সংখ্যা, টিভি সত্ত্ব চুক্তি, এন্ডোর্সমেন্ট এবং স্পন্সরশিপ চুক্তি, গড় খেলোয়াড়দের বেতন ইত্যাদি একত্রে বিবেচনা করলে ফুটবলের পরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে বাস্কেটবল। বাস্কেটবলের জনপ্রিয়তা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, স্পেন, চায়না, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি দেশে মোটামুটি ভাবে জনপ্রিয়। ফুটবলের পরেই বাস্কেটবলের পেশাদার লীগের সংখ্যা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। এবং রাগবির পাশাপাশি বাস্কেটবলও সবচেয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া খেলা গুলোর একটি।