সত্তর কিংবা আশির দশকে এমন কিছু ফুটবল ক্লাব ছিল যারা এখন শুধুই অতীত! তাদের ছিল আভিজাত্য, ছিল রাজকীয়তা। কিন্তু সেই প্রভাব, প্রতাপের অধঃপতন হয়েছে অনেক ক্লাবেরই। তারা এখন নিষ্প্রভ মলিন। স্বর্ণালি অতীতের আয়াক্স কিংবা মিলানের মতো ক্লাব হয়তো এখনো সাফল্য-ব্যর্থতার দোলাচলে আছে। কিন্তু নটিংহ্যাম ফরেস্ট নামে একটি ক্লাব ছিল যেটি একেবারেই ইতিহাসের অতল গহ্বরে ডুবে গেছে।
ওই কােরণে আয়াক্স, মিলান যদিও এখনো মাঝে মধ্যে আলোচনায় আসে নটিংহ্যাম ফরেস্টের নাম নিতে তাহলেও কাউকে দেখা যায় না। অথচ ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম শহরের ওই ক্লাবটির ইতিহাসে যুক্ত আছে ইংলিশ লিগ কাপ, এমনকি ইউরোপিয়ান কাপের শিরোপাও!
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সাল থেকে ইংল্যান্ডের ফুটবল লিগ ফার্স্ট ডিভিশন নাম থেকে পরিবর্তিত হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নামে এবং ইউরোপিয়ান কাপ বর্তমানে ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নামে পরিচিত।
এটি ওই নটিংহ্যাম যারা ইএফএল কাপের চারবারের শিরোপাধারী দল। শুধু তা নয়, তাদের ঝুলিতে আছে দুটি এফএ কাপ ও একটা কমিউনিটি শিল্ড কাপ। এছাড়া আছে দুটো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও একটি সুপার কাপের মর্যাদা। এতকিছুর পরও এটা শুধুই অতীত।
এককালের ওই প্রতাপশালী ক্লাবের নামই হয়তো অনেকে এখন জানেনই না। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিল এই তথ্য তো অনেকেরই অজানা। আজ ওই অজানা অতীতকেই সবার সামনে নিয়ে আসার জন্য দুই পর্বে সাজানো নটিংহ্যাম পর্বের ১ম পর্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
১৯৭৭-৭৮ সালে ৪২ ম্যাচে ৬৪ পয়েন্টস পেয়ে ৫৭ পয়েন্টস নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিভারপুলকে পেছনে ফেলে ইংলিশ লিগ জয় করে নটিংহাম। আর ওই জয়ের সুবাদে ১৯৭৮-৭৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপ তখা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশ নেয় নটিংহ্যাম ফরেস্ট।
রাউন্ড অফ ৩২-এ ভাগ্যক্রমে ফরেস্টের খেলা পড়ে স্বদেশি ক্লাব লিভারপুলের বিপক্ষে। এটি ওই লিভারপুল যেটি ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমের আগের দু’আসরেরই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ছিল।
১৯৭৮-৭৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপের রাউন্ড ৩২-এর প্রথম লেগে ১৩ সেপ্টেম্বর নটিংহ্যাম ফরেস্টের হোম গ্রাউন্ড সিটি গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামে খেলার ২৬ মিনিটে বার্টলেস ও ৮৭ মিনিটে ফরেস্ট ডিফেন্ডার ব্যারেটের গোলে ফরেস্ট ২-০ গোলে চিত্তাকর্ষক জয় পেয়ে সেকেন্ড লেগের আগে মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকে। উল্লেখ করা যেতে পারে, পরাশক্তি লিভারপুলের ওই দলেই ছিলেন ৭ নাম্বার জার্সিধারী লিভারপুল লিজেন্ড কেনি ডালগ্লিস।

২৭ সেপ্টেম্বর অ্যানফিল্ডে অনুষ্ঠেয় সেকেন্ড লেগেও সুবিধা করতে ব্যর্থ হয় স্বাগতিক লিভারপুল। খেলাটি ০-০ গোলে ড্র হয় এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে পরবর্তী রাউন্ডে যেতে ব্যর্থ হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলটি। এছাড়া দুই লেগ মিলিয়ে ভালো খেলে ২-০ এগ্রিগেটে জিতে চমক দেখিয়ে যোগ্যতর দল হয়ে পরের রাউন্ডে পা রাখে ইংলিশ ম্যানেজার ব্রায়ান ক্লয়ের অধীন খেলতে থাকা নটিংহ্যাম ফরেস্ট। উল্লেখ করা যেতে পারে, ব্রায়ান ক্লয়ের অধীন ফরেস্ট ৯৬৮ ম্যাচ খেলেছে এবং জিতেছে ৪৪৭টি ম্যাচ যা ক্লাবের ইতিহাসে যে কোনো ম্যানেজারের অধীন সর্বাপেক্ষা বেশি ম্যাচ ও বেশি জয়ের রেকর্ড।
প্রথম রাউন্ডে জয়ের পরে সেকেন্ড রাউন্ডে গ্রিক ক্লাব এইকে এথেন্সকে দুই লেগ মিলিয়ে ৭-২তে বিধ্বস্ত করে পরাশক্তি হয়ে ওঠে ইংলিশ ক্লাবটি। দুই লেগে ফরেস্ট তারকা বার্টলেস করেন ৩ গোল এবং এভাবেই চ্যাম্পিয়ন্স কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ফরেস্ট শিবির।
আসরের কোয়ার্টারে তাদের মুখোমুখি হয় সুইজারল্যান্ডের গ্রাসহপার ক্লাব জুরিখ। জুরিখের বিপক্ষে প্রথম লেগে বার্টলেসের ৩১ মিনিটে ওপেনার, রবার্টসন, গিমিল ও লয়েডের গোলে ৪-১-এর বড় ব্যবধানে প্রত্যাশিত জয় পায় নটিংহ্যাম ফরেস্ট। আর দ্বিতীয় লেগে জুরিখে গিয়ে ১-১ গোলে ড্র করে দুই লেগে এগ্রিগেটে ৫-২ গোলে জিতে সেমিতে উঠে ইংলিশ ক্লাব নটিংহ্যাম ফরেস্ট।
আসরের সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ জার্মান ক্লাব কোলন এফসি। সিটি গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামে প্রথম লেগে ৬ মিনিটে ও ২০ মিনিটে মুলারের গোলে ২-০তে এগিয়ে যায় জার্মান ক্লাবটি। কিন্তু ২৮ মিনিটে বার্টলেস, ৫৩ মিনিটে বোয়ের ও ৬৩ মিনিটে রবার্টসনের গোলে ৩-২তে এগিয়ে যায় ইংলিশ ক্লাব নটিংহ্যাম ফরেস্ট। কিন্তু ওই লিড ধরে রাখতে পারেনি স্বাগতিক ইংলিশ ক্লাবটি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ৬ মিনিট আগে ওকুদেরার গোলে খেলায় ৩-৩ গোলে সমতা আনে জার্মান ক্লাব এফসি কোলন। নির্ধারিত সময়ে আর কোনো দল গোল করতে ব্যর্থ হলে টান টান উত্তেজনাকর ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হয়।

হোম ম্যাচে তিন গোল খেয়ে চাপে পড়েই অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে যায় নটিংহ্যাম ফরেস্ট। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলে ওই চাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ম্যাচের সময় যতই গড়ায় ততই স্নায়ুচাপে পড়ে নটিংহ্যাম। চালাতে থাকে আপ্রাণ চেষ্টা। আক্রমণ সাজাতে থাকে মুহুর্মুহু। অতঃপর ৬৫ মিনিটে বোয়েরের গোল। ফরেস্টের ১-০তে এগিয়ে যাওয়া আর ম্যাচের বাকি সময়ে আর গোল না হলে ১-০ গোলে জেতার সুবাদে এগ্রিগেটে ৪-৩ গোলে জিতে ফাইনাল নিশ্চিত করে ফরেস্ট শিবির।
ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ সুইডিশ ক্লাব মালমো এফএফ। খেলার প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে ইংলিশ ফুটবলার ট্রেভর ফ্রান্সিসের করা একমাত্র গোলেই শিরোপা উৎসবে মাতে নটিংহ্যাম ফরেস্ট। রচিত হয় ক্লাবের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। প্রথমবারের মতো তারা জেতে ইউরোপ সেরার মুকুট।
পুরো ইউরোপে নটিংহ্যাম ফরেস্টের নাম উচ্চারিত হতে থাকে। বাড়তে থাকে ফ্যানস, ফলোয়ার্স।
উল্লেখ্য, ওই আসরে রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, মোনাকো ও লিভারপুলের মতো দলও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু কেউই কোয়ার্টার ফাইনালেও যেতে পারেনি। অবশ্য কালের বিবর্তনে কেউ কেউ হয়ে উঠেছে ফুটবলের সুপারপাওয়ার, কেউবা সাফল্য-ব্যর্থতার দোলাচলে দুলছে আবার কেউবা কালের বিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে ব্যর্থতার সর্বনিম্ন স্তরে তলিয়ে গেছে।
মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো অবস্থাও অনেক সাবেক পরাশক্তি দলের নেই। আগামী পর্ব নটিংহ্যাম ফরেস্টের অধঃপতন এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা দিয়ে শেষ হবে।