একদিন যিনি খুঁজেও পাননি মৃত্যু ওই মৃত্যুপিপাসু চিরঅমর বিপ্লবী সাহিত্যিক মাক্সিম গোর্কি-র ১৫০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার ভোল্গা নদীর তীরবর্তী প্রাচীন বন্দর শহর নিজনি নভগরোদ-এর পেশকভ বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বংশীয় কোনো আভিজাত্য বা সাহিত্যিক কোনো বলয়ে তার জন্ম হয়নি। জীবনের কঠোরতা, রূঢ়তা, নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও শ্রমিকদের মুক্তিকামিতাই তাকে আলেক্সিয়েই মাক্সিমভিচ পেশকভ থেকে মাক্সিম গোর্কি-তে রূপান্তর করে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত মুক্তিকামী সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বাবা মাক্সিম সাভতাতেভিচ পেশকভ যখন ৩১ বছর বয়সে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তখন তার বয়স মাত্র ৪ বছর। বাবার মৃত্যুর পর মা ভার্ভারা ভাসিলিয়েভনা পেশকভা নানার বাড়ি চলে যান। সেখানে নানা ভাসিলি সাশিরিন মেয়ে ও নাতির আগমনে বিশেষ খুশি তো ছিলেনই না, বরং নারাজ ছিলেন! এর বিশেষ কারণও ছিল বটে। তা হলো পরিবারের অর্থকষ্ট ও ছেলেদের ঝগড়া-ঝাটি সংসারে এক নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে রেখেছিল। ফলে গোর্কি-কে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হলেও লেখাপড়া তেমন আগায়নি। তবে পড়ার প্রতি ছিল তার অদম্য ইচ্ছা ও আগ্রহ। হাতের কাছে কোনো লেখা কাগজ পেলেই পড়তেন। ১৮৭৯ সালে মায়ের মৃত্যু হলে পুরো জগৎটিই তার ঘরবাড়িতে পরিণত হয়, দেখা মেলে কঠিন বাস্তবতার। আজকের গোর্কি সেদিনের আলেক্সিয়েই কর্মের সন্ধানে নেমে পড়লেন পথে পথে। মুচির দোকান থেকে শুরু করে জেলেদের মাছের আড়তের চাকরি পর্যন্ত তাকে করতে হয়েছে।
গোর্কির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নেয় ১৮৮৪ সালের শেষ দিকে কাজান শহরে এসে। এখানে এখানে এসে আবার পড়ার প্রতি আগ্রহ জাগে, পরিচয় হয় অনেকের সঙ্গে এবং পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ও মার্কস-অ্যাঙ্গেলস রচনার সঙ্গে পরিচিত হন ওই কাজান শহরে এসেই। এখানেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি তিনি। ভর্তি হতে চেয়েছিলেন ‘কাজান বিশ্ববিদ্যালয়’-এ। তবে সেখানেও ব্যর্থ। ওই ব্যর্থ ছেলেই পরে লেখেন তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘মই-ই উনিভের্সিতিয়েতি’ (আমার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো)। কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে শিক্ষার সুযোগ না দিলেও পৃথিবীর পাঠশালাতেই ঘটেছিল তার শিক্ষা পর্ব।
জীবনের প্রতি অনীহা ও তিক্ততা ১৯ বছর বয়সে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তে ধাবিত করে তাকে। তবে মৃত্যু তাকে ভর্ৎসনা করে দুই-দু’বার ফিরে গেছে। জমানো অর্থ দিয়ে একটি পুরনো পিস্তল কিনেছিলেন আত্মহত্যার জন্য। গুলিও করেছিলেন বুকে নল ঠেকিয়ে। যার সাহিত্যকর্মের জন্য বিশ্ব অপেক্ষায় তাকে কী মৃত্যু গ্রাস করতে পারে? গোর্কিকেও পারেনি। পুলিশ নদীর পাড় থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে আরো একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয় তার জামার পকেট থেকে যেখানে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর সব দায়দায়িত্ব জার্মান কবি হাইন-এর। হৃদয়ের দন্তশূল তিনিই আবিষ্কার করেছেন…।’
এখানেই গোর্কি দমে যাননি, আত্মহত্যার জন্য দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ঘুমের বড়ি খেয়ে। এবারেও ব্যর্থ তিনি। ওই ব্যর্থতা ও বন্ধুর ভর্ৎসনা তাকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। মৃত্যুই যে মুক্তির একমাত্র পথ নয়, মুক্তির জন্য চাই সংগ্রাম- এ বোধ তার জাগ্রত হতে বেশি সময় লাগে না।
আবার চলতে শুরু করলেন পৃথিবীর পথে। ১৮৮৮ থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত প্রায় সারা রাশিয়া হেঁটে ঘুরে বেড়ালেন কাজের সন্ধানে। পরিচয় হলো বিপ্লবীদের সঙ্গে। বিপ্লবীদের পথ হয়ে গেল তার পথ। সংগ্রাম-ই যে শ্রমিকদের একমাত্র মুক্তির পথ, এ ক’বছরে তা তিনি বুঝে গেছেন। ১৮৯০ সালের দিকে শ্রমিকদের আন্দোলন আরো জোরদার হতে থাকে। দেশের রাজনৈতিক শক্তিরূপে শ্রমিক শ্রেণির উত্থান ক্রমেই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। মার্কসবাদ জনগণের জীবনে রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং লেনিন, সের্গিয়েই ত্রাভচিনিস্ক, পাভেল আক্সেলরত প্রমুখ রাজনৈতিক কর্মীদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের মধ্যে গোর্কিও সর্বদিক থেকে জড়িয়ে পড়েন ওই আন্দোলনের সঙ্গে। সৌভাগ্যবশত ১৮৮৯ সালে জেলে যান তিনি। আবার ১৮৯১ সালে পর পর দু’বার। ১৮৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার ‘কাফকাজ’ পত্রিকায় ‘মার্কা চুদ্রা’ গল্পটি ছাপা হয়। এই প্রথম আলেক্সিয়েই মাক্সিমভিচ পেশকভ থেকে হয়ে ওঠেন ম্যাক্সিম গোর্কি। খুঁজে পান নিজস্ব পথ, হয়ে ওঠেন বিপ্লবী লেখক। এরপর তাকে লেখক হিসেবে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেন গোর্কি। ওই বছরের ১১ জানুয়ারি রিগা শহরে বিক্ষোভ মিছিলে বক্তব্য রাখার সময় তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সংগ্রাম ও শাস্তি তাকে যে বড় আকারের বিপ্লবী সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এতে সন্দেহ নেই। ১৯০৬ সালে গোপনে দেশ ছাড়েন। ১৯০৭ সালে লন্ডনে রুশ সোশ্যালিস্ট পার্টির সম্মেলনে লেনিন ও গোর্কির দেখা হয়। এর আগেই ‘মা’ উপন্যাসটি নিউ ইয়র্ক ও বার্লিন থেকে ছাপা হয়। তখন লেনিন ওই উপন্যাস সম্পর্কে গোর্কিকে বলেন, ‘বেশির ভাগ শ্রমিকই না বুঝে-শুনে বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তারা এখন ‘মা’ পড়ে উপকার পাবেন। ঠিক সময়ই বইটি পাওয়া গেছে।’
গোর্কির সাহিত্যকর্ম যে রাশিয়ার বিপ্লবী অন্দোলনটি বিশেষভাবে উৎসাহিত ও তরান্বিত করেছে তা লেনিন-এর ওই কথাতেই স্পষ্ট।
১৯১৩ সালে দ্বিতীয় নিকলাই রাজনৈতিক কর্মীদের একাংশকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে গোর্কি পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের ফলে জারতন্ত্র উৎখাত হয়। তিনি বলশেভিক দলের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মেনশেভিকদের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন। ফলে লেনিনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক মত ও আদর্শ নিয়ে বিতর্ক চলে। তবে ওই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে পার্টির সঙ্গে মিলে দেশ গড়ার কাজে লিপ্ত হন। কিন্তু নতুন দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেননি।
গোর্কি ১৯২১ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে লেনিন চিকিৎসার জন্য জার্মানি পাঠান এবং ১৯২৮ সালে দেশে ফেরেন। তৎকালীন গোর্কি ছিলেন সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট। ১৯৩২ সালে তার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৎকালীন রাশিয়ার শাসক স্টালিন রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জন্ম উৎসব পালন করেন।
১৯৩৬ সালের ১৮ জুন আকস্মিকভাবে গোর্কির মৃত্যু হয় এবং স্টালিন তার চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন ও শাস্তি দেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির কয়েক নেতার ওই বিষ প্রয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে তাদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অনেকের ধারণা, স্টালিনই গোর্কিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছেন এবং তার সঙ্গে যাদের মতের অমিল ছিল তাদেরই গোর্কি হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। স্টালিন শুধু রাজনীতিই বুঝতেন না, নাটকও ভালোই জানতেন। গোর্কিকে সমাহিত করার সময় নিজে কফিন বহন করেন।
সমাজ পরিবর্তনে যুগে যুগে লেখকদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। আজ ওই মুক্তিকামী সাহিত্যিকের ১৫০তম জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা। বিশ্ব মানবতা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা সব লেখক সম্প্রদায়ের কাছে। জয় হোক মানব সম্প্রদয়ের, জয় হোক মানবতার। গোর্কি বেঁচে থাকুন প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে।