Jobanকোটাপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

কোটাপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

“যারা খেয়েছে তাদের জন্য ভাত বাড়ো (নিয়ে এসো), আর যারা খায়নি তাদের জন্য রাঁধো (রান্না করো)” একেই বৈষম্য বলে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিও ঠিক এই প্রবাদের মতো। লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার চাকরি না পেয়ে এক দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। এদিকে কোটার জোরে কেউ কেউ বারবার চাকরি পরিবর্তন করছেন। এখানেই শেষ নয়, তাদের জন্য বিশেষ পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে! তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াচ্ছে, কোটাধারীরা গাছেরটিও খাচ্ছেন, আবার নিচেরটিও কুড়িয়ে নিচ্ছেন। এখানে যে বিষয়টি বোঝা দরকার সেটি হচ্ছে, কোটা ব্যবস্থার অন্তরালে রয়েছে রাষ্ট্রের সাথে ক্ষমতার এক গোপন পরকীয়া। ১৯৭২ সালের কোটা পদ্ধতি কোনো নেক নিয়তে জিইয়ে রাখা হয়নি। বরং এর সাথে রাষ্ট্র ক্ষমতার এক গভীর বোঝাপড়া রয়েছে। এদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জোনাকি আলোর মতো মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে কোটাবিরোধী আন্দোলন। যা কারণে অকারণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এর পেছনেও আছে গভীর রাজনীতির খেলা। রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী শাসনের নামে শোষণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে। কোটা পদ্ধতিও তেমনি রাষ্ট্রীয় শোষণের একটি উদাহরণ মাত্র।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ। অর্থাৎ, কোটায় নিয়োগ ৫৬ শতাংশ এবং বাকি ৪৪ শতাংশ মেধায়। গণতান্ত্রিকভাবে কোটা বিজয়ী। তাহলে কি বাংলাদেশ এখন কোটাপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। সত্যিকারের মেধাবীদের কি এখানে অবহেলা করা হচ্ছে না?

১৯৭২ সালে প্রণীত ইন্টেরিম (অন্তবর্তীকালীন) রিক্রুটমেন্ট পলিসিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ কোটার কথা বলা হয়। যেহেতু সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বচ্ছলতা দরকার ছিলো। তাই সে উদ্যোগ যৌক্তিক ছিলো। ১০ শতাংশ জেলা কোটা করা হয় তখন মোট জেলা ছিলো ২১টি। সে সময়ের জন্য ঠিক আছে। অনগ্রসর নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে ১০ শতাংশ নারী কোটাও ছিলো উৎসাহব্যঞ্জক। উপজাতিদের মূলধারার দেশের কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে ৫ শতাংশ উপজাতি কোটার তৎকালীন প্রয়োজনীয়তা ছিলো। কিন্তু একটি অন্তবর্তীকালীন পদ্ধতি আজীবন চলতে পারে না। তখনকার বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশ এক নয়। দেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। মেধাবীদের সংখ্যা বেড়েছে তখনকার থেকে কমপক্ষে হাজার গুণ। অথচ এখনো চাকুরির ক্ষেত্রে একই নিয়ম থাকে কীভাবে?

এবার আসি বর্তমান পেক্ষাপটে, এখন মুক্তিযোদ্ধারা ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা পান, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, চাকুরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে দুই বছর। তাহলে এখন মুক্তিযোদ্ধা কোটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অসম্ভব নয়। আরো একটু এগিয়ে গেলে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে অদ্ভুত কান্ডকারখানা দেখতে পাবো। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ছে। ১৯৮৬-৮৭ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রণীত তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। ১৯৯৭-০১ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রণীত তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জন। ২০০১-০৬ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার ৪৮১ জনে। বর্তমান সরকার আবার যাচাই বাছাই করছে। তাতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। তাহলে যে তালিকা প্রশ্নবিদ্ধ তার উপর ভর করে চাকরী কেন? আর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের সাথে এখন নাতি-নাতনি কোটা চালু হয়েছে। যা রীতিমতো অবিবেচনাপ্রসুত একটি কাজ। এদিকে জেলা বর্তমানে ৬৪টি। তাই জেলা কোটার সেই আগের ধারণা পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। নারীর অবস্থান আগের চেয়ে অনেক সুদৃঢ়। ১০ শতাংশ নারী কোটা এখন নারীদের অবমূল্যায়ন করার শামিল। দেশে যদি ১৬ কোটি মানুষ ধরে নেওয়া যায়, তাহলে আনুপাতিক হারে উপজাতি কোটা এখন দেড় শতাংশের বেশি হওয়ার কথা না।

বর্তমান বাংলাদেশে কেউ কোন আওয়াজ তুললেই তাকে বলা হয় স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থি চেতনার লোক। ছাত্রসমাজের কোটাবিরোধী আন্দোলনকেও একই ক্যাটাগরিতে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুখঃজনক। তবে ইতিহাস উল্টো কথা বলছে। ড. মো. মাহবুবুর রহমান তার ‘বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯৪৭-৭১’ বইয়ের ৩৪১ পৃষ্ঠায় জানিয়েছেন, “কেবল সিভিল সার্ভিসেই নয়, ফরেন সার্ভিস, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানের মধ্যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল। এই বৈষ্যমের বিরুদ্ধেই বাঙালিরা মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল।”

যেহেতু পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কোটা। তাই এক কোটা একবার ব্যবহার করা যেতে পারে। ওয়ান কোটা, ওয়ান ইউজ। ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে, আর চাকুরির ক্ষেত্রে পারবে না। একজনের কোটা একবারই ব্যবহার হবে

 

তারই পরিপেক্ষিতে যোগ্যতা-মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সরকারি চাকরির দ্বার উন্মুক্ত করা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা রয়েছে, “..বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি…”

এদিকে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে: “সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।” এবং ২৯ (১) ধারায় বলা হচ্ছে, “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।”

এ কথার সূত্র ধরে আমরা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদেরই প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী যুবসমাজ বলতে পারি। তারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সমাজিক ন্যায় বিচারের জন্য লড়ছেন। তাদের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি বলা অযৌক্তিক এবং অবিচনাপ্রসুত মিথ্যাচার। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত একেকটি উপনিবেশিক আখড়া মাত্র। এখানে জ্ঞানের চর্চা ও মুক্ত বুদ্ধির চর্চা শূণ্যের কোঠায়। আর জ্ঞানহীন মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে কোনদিনই সচেতন নয়। তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা যে বেশি স্বার্থ সচেতন, সেটার প্রমাণ তারা দিয়েছে। তারা ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন করে সফল হয়েছে। কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল করতে পারছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর পেছনে আন্দোলনে সকলের অংশগ্রহণের অনিচ্ছাও দায়ী। বর্তমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের সাথে দাসসুলভ আচরণ করেন শিক্ষকগণ। ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনাও বাড়ছে, এসব অভিযোগ শিক্ষক-ছাত্র এমনকি বহিরাগতদের বিরুদ্ধেও উঠছে। শিক্ষদের দাসত্বসুলভ মনোভাব তাদের মানসিকতাকে ছোট করতে করতে একসময় দড়ি দিয়ে বাধা সেই পুড়ে যাওয়া সার্কাসের হাতির মতো করে তুলেছে। যার প্রমাণ এখনকার কোটা বিরোধী আন্দোলনের চালচিত্র। এবং আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে গুটিকয়েক বাম চিন্তাধারার শিক্ষক ব্যতিত কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে শরীক হচ্ছেন না। মিডিয়াতেও তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না এই আন্দোলন। সবাই সরকারের রোষানলে পড়া নিয়ে চিন্তিত।

এদিকে কোটা পদ্ধতিতে কোন রকম সংস্কারের চিন্তা বর্তমান সরকারের নেই তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট। সরকারের তরফ থেকেও এ আন্দোলনকে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলন বলা হচ্ছে। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা একটি বড় ফ্যাক্ট বটে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে যুগ যুগ চালু রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদেরও এর অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। সরকার এদের চাকরি নিশ্চিত করার মাধ্যেমে একদল অনুগত সরকারি কর্মকর্তা শ্রেণী (ইতিপূর্বে, ১৯৯৬ সালের “জনতার মঞ্চ” কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকেই তৈরি হয়েছিলো) তৈরি করতে চাচ্ছে কিনা সেদিকে নজর দিতে হবে। আর এ জন্যই অন্য কোটাগুলোও সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে না। কারণ একটি অংশ সংষ্কার করলে অন্যগুলোও সংষ্কার করতে হবে।

এমনিতেই চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা অযৌক্তিক। পিছিয়ে পড়া মানুষ বিবেচনা করলেও, মোট কোটা ১০ ভাগের বেশি হওয়া ঠিক নয়। জেলা কোটা, নারী কোটা একেবারে বিলুপ্ত করার সময় এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংষ্কার করে নাতি-নাতনিদের বাদ দিয়ে এবং চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে কমিয়ে ৩০ বছরে করা যেতে পারে। যেহেতু পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কোটা। তাই এক কোটা একবার ব্যবহার করা যেতে পারে। ওয়ান কোটা, ওয়ান ইউজ। ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে, আর চাকুরির ক্ষেত্রে পারবে না। একজনের কোটা একবারই ব্যবহার হবে। কোটা যেহেতু কোন “যৌক্তিক সাংবিধানিক” ব্যাপার নয়, সেহেতু এটাকে সুযোগ বললে একবারই দেওয়া যায়। বারবার নয়। আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা যেহেতু উপহার স্বরুপ। সাধারণত উপহারও বারবার দিলে তার কোন মূল্য থাকে না। তাই ওয়ান কোটা ওয়ান ইউজের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো যেতে পারে।

সবশেষে অবস্থাটিকে এভাবে বলি, খাবারের অভাবের সময় খাবার মজুদ যদি অপরাধ হয়। ঠিক একইভাবে, এই অপ্রতুল চাকরির বাজারে কোটার নামে পদ সংরক্ষণও তদ্রুপ অপরাধ বলেই বিবেচিত। তাই কোটার বেড়াজাল থেকে শিক্ষিত বেকার সমাজের মুক্তি এখন সময়ের দাবি।