Jobanশবে কদর নির্দিষ্ট রাতে না হওয়ার কারণ কী?

শবে কদর নির্দিষ্ট রাতে না হওয়ার কারণ কী?

রমযান মাস সমাপ্তপ্রায়। রহমত মাগফেরাতের পর নাজাতের দশক চলছে। জাহান্নাম থেকে মুক্তির দশদিন। রাসূল (সা:) রমযানে অন্য সময়ের তুলনায় ইবাদত বেশি করতেন। শেষ দশকে তার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিতেন। আয়েশা (রা:) বলেন, “রমযানের শেষ দশকে রাসূল খুব বেশি ইবাদত করতেন। এমনকি অব্যাহত ইবাদতের কারণে যেন ক্লান্তি ভাব না আসে সেজন্যে কোমর বেঁধে রাখতেন।”

কারণ এ দশকেই রয়েছে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। কোরআনে যে রাতকে হাজার মাস থেকে উত্তম বলা হয়েছে। এ রাতেই দয়াময় আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্যে আলোকবর্তিকা স্বরূপ মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাযিল করেন। এ রাতের মাহাত্ম্য বোঝাতে কোরআনে ‘কদর’ নামে স্বতন্ত্র একটি সূরা অবতীর্ণ করা হয়েছে।

আগের উম্মতের তুলনায় এ উম্মতের হায়াত বা জীবনকাল যেহেতু অতিঅল্প তাই হাজার মাস থেকে উত্তম এ মহিমান্বিত রাত এই উম্মতকে দেয়া হয়েছে সময়ের ঘাটতিকে ইবাদতের সওয়াবের মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়ার জন্য।

আল্লাহর রাসূল (সা:) এরশাদ করেন, “সওয়াবের আশায় ইমানের সাথে যে ব্যক্তি শবে কদরে ইবাদত করবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমুহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।”

অনির্দিষ্ট রাতের বিষয়টি যদিও আবু দাউদ শরীফের এক বর্ণনা থেকে প্রমাণিত তবে আবু দাউদেরই আরেক বর্ণনায় একুশ তারিখের কথাও আছে। মুআত্তা মালেকের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আওজাযুল মাসালিক প্রণেতা শবে কদরের ব্যপারে পঞ্চাশের অধিক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।তবে এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হল, অধিকাংশ হাদীসে যেহেতু অনির্দিষ্ট করে শেষ দশদিনে শবে কদর তালাশের কথা বলা হয়েছে তাই এ দশদিনের যেকোন দিন হতে পারে। আর হাদীসের বিরোধ থেকে বুঝা যায় একেক বছর একেক দিন হতে পারে।

তবে শবে কদর অনির্দিষ্ট থাকার অনেক হেকমত বা রহস্য রয়েছে। শবে কদর যদি নির্দিষ্ট করা হতো তবে অলস স্বভাবের অনেক লোক রমযানের অন্যান্য দিনের ইবাদতে মন দিত না। তখন তাদের ইবাদত হতো কেবল শবে কদর কেন্দ্রিক এক রাতের জন্য। পক্ষান্তরে অনেক লোক এমন আছেন শবে কদরের তালাশে একাধিক রাত ইবাদত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অনেকদূর অগ্রসর হয়ে যান।

তাছাড়া কিছু লোক আছেন যারা অভ্যাসবশত, জানা থাকা স্বত্ত্বেও অসাবধানতায় সে রাতেও গোনাহ করে ফেলতে পারতেন। তখন তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ চূড়ান্ত হয়ে যেত।

এছাড়াও শবে কদরের সন্ধানে অন্য যেসব রাতে ইবাদত করা হয় সেসব রাতের আলাদা সওয়াব পাওয়া যায়। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে শবে কদর অনির্দিষ্ট রাখার পেছনে।

মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় শবে কদরের আলামত উল্লেখ করা হয়েছে, সে রাতে বেশি গরম থাকবে না খুব ঠাণ্ডাও না। উজ্জ্বল রাত হবে। সকালে সূর্য তাপহীন উদিত হবে যেন চতুর্দশীর পূর্ণচন্দ্র। সে রাতে সামান্য বৃষ্টিও হতে পারে। একদিন সকালে রাসূল সাহাবিদেরকে বলেন গতরাত শবে কদর ছিল। তারা রাসূলের কপালে কাদার চিহ্ন দেখতে পান তখন। যেহেতু মসজিদে নববীর মেঝে ছিলো কাঁচা মাটির আর ছাদ ছিল খেজুর পাতার।

বায়হাকী শরীফে (আনাস রা:) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা:) বলেছেন, কদরের রাতে জীবরাঈল (আ:) একদল ফেরেশতাসমেত দুনিয়াতে অবতরণ করেন এবং যে সকল বান্দা বসে বা দাঁড়িয়ে দয়াময় আল্লাহর ইবাদাত ও জিকিরে লিপ্ত থাকেন তাদের জন্যে রহমতের দোয়া করতে থাকেন। রমযানের শেষ দশকে এ রাতটিকে তালাশের ব্যপারে অনেক হাদীসে জোর তাগিদ করা হয়েছে।

তদুপরি কেউ যদি এ রাতটিকে হেলায় কাটিয়ে দেয়, হাদীসে তার বিরুদ্ধে কঠিন ঘোষণা এসেছে। রাসূল (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি শবে কদরের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত সে সর্বপ্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত।

এ রাতে বিশেষ কোন আমল বা নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতিতে নামাযের বিবরণ কোথাও পাওয়া যায়নি, তবে সুফিয়ান সাওরী (রহ:) এ রাতে বেশি বেশি দোয়া করার কথা বলেন। ইবনে রজব হাম্বলি (র:) সকল প্রকারের ইবাদতই কিছু কিছু করে করে করার কথা বলেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হল গোনাহমুক্ত থাকা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শবে কদরের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে ফজিলতের আশায় সে রাত্রি তালাশের তৌফিক দান করুন।