কাম-কল্কি
বাকবিভূতি দাও, নৈশবিদ্রুপ আজ শরীর জুড়ে; মাঝরাতে কেঁপে ওঠে শঙ্খচূড়।
আমাদের দেহ থেকে আজ খুলবো গূঢ়ার্থ, গম্ভীরা; দুই কিশোরীর যৌনতার নীচে
পড়ে থাকে ষড়রিপু। প্রতিদিন হাত, পা খুলে শব্দকণিকার দিকে হেঁটে যাই; বালিতে
অঙ্গ পুতে অমাবশ্যার তারাচূর্ণ আঁকি। আর মাথার ভিতর যে অফিস ফাইল জমা হয়
তার হাত কামড়াই। ন্যাংটা দুই কিশোরীকে আভিকর্ষ দেয় ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি;
ন্যাংটা দুই কিশোরীকে এ সমাজ বিড়াল-ইঁদুর খেলা শেখায়; ন্যাংটা দুই কিশোরীকে
রান্নার কড়াইয়ে তেলেভাজা কৈ মাছের কনুই দিয়ে হেঁটে যাওয়া শেখায়। বাকবিভূতি দাও,
নৈশবিদ্রুপ আজ শরীর জুড়ে; মাঝরাতে কেঁপে ওঠে শঙ্খচূড়। সমাজের কাম-কল্কি
আজ আকাশে ছড়া কাটে; আমাদের দেহ থেকে আজ খুলবো গূঢ়ার্থ, গম্ভীরা…।
প্রত্যেক সমাজে আজ পুরুষেরা বহুকৌণিক-নাটক; স্বামী সাজে শঙ্খসরণি,
বেটাছেলে সেজে করে একটুখালি গীতলুণ্ঠন। বাকবিভূতি দাও, নৈশবিদ্রুপ আজ
শরীরে। দুই কিশোরীর যৌনতার নীচে পড়ে থাকে ষড়রিপু।
ভূমিজল
ভৈরবীচক্র একটিবার প্রস্তরীভূত হও, এক টুকরো সত্য তোমার বৈকুণ্ঠে পৌঁছে দেবো।
তোমার সঙ্গে কাটাবো একটি রাত, একটি দিন, অথবা কাঞ্চনকল্যাণীরা যেভাবে খুলে
রাখে রাতায়ন- ঠিক সেভাবে। একটি অণুসত্য আজ মালা গেঁথে চলেছে বকুলের; একটি
কামিনীরগুহা চাঁদলাগা তাঁতযন্ত্র খুলে দেয়। ভৈরবীচক্র একটিবার প্রস্তরীভূত হও, বুকের
কাছে শ্রুতিপথগামী হয়ে জমা থাকো; নাড়িছিন্ন হয়ো না- এক টুকরো সত্য তোমার
বৈকুণ্ঠে পৌঁছে দেবো। আজ হাড়হাবাতের বসন্ত, আজ যৌনশিক্ষিকার কাছে যেতে
আমি ভুলে গেছি; ভুলে গেছি এক ও সাত- সতেরো তারিখের ভাসান দেখতে।
মেঘেঢাকা মনখারাপ নিয়ে, জন্মদিনের দেহ নিয়ে তুমি ব্রতে যাও নি।
আজ তোমার ধড়খানা দাও, ময়ূরীর বন্দনা করবো। ভৈরবীচক্র একটিবার,
একটিবার প্রস্তরীভূত হও রাতে; তোমার মহাপৃথিবী, ভূমিজল পেলে আর
হাহাকার করবো না। ভৈরবীচক্র একটিবার প্রস্তরীভূত হও- হেমন্তের গোধূলী
থেকে একটা লাল বিরহকাতর বটফল তোমার বৈকুণ্ঠে পাঠাবো।
উৎকীর্ণ দিন
‘উৎকীর্ণ দিন’- আমি এই নাম ধরে তোমাকে ডাকি একবার, দুবার অথবা তোমার
পুরানো বিছানায় ঘুমাবার আগে; ডাকি আর একবার। চাঁদ বেড়াতে বেড়াতে গুড়ি
মেরে বসে থাকে কলোনিতে, আমিও কলোনিতে থাকি; কেরাণি ও শিক্ষকের মতো।
আমার মুখটা তোমার বুকের পাশে রাখি; তবু আমাদের এইখানে এমন রাত্রি আসে না আর।
তারপরও আমরা এমনি থাকি তোমার দেহের ছায়া নিয়ে, খোলাচুল, পা বাড়ানো ফাঁদ
আর নিরস্ত্র হাত পা যোনিগর্ভ নিয়ে। তোমাকে বলি রাতজাগা বকুল, তোমার ভাষা
শেখাও আমাকে। চাঁদ বেড়াতে বেড়াতে গুড়ি মেরে বসে থাকে কলোনিতে। এভাবে
বছর যায়, যায় বছর- তবু নোতুন বিকেল আসে না। আমি একা একা বসে থাকি ‘উৎকীর্ণ দিন’
এই নামে তোমাকে ডাকি। গত বছরের মতো আমি সারাদিন একা একা বসে থাকি। কে আমাকে
ফেলে রেখে গেছে; আমাকে ফেলে রেখে গেছে গতকাল…
তোমার বেলিবাগান থেকে কত দূরে আমি। কত অসংখ্য বেলি আমার গলার স্বর ভুলে থাকে;
তবু এইখানে এমন রাত্রি আসে না আর। মানুষ ভালোবাসার নামে কেমন অসুখী, কতবছর
আমি চটিজুতোর মতো মানুষের ভালোবাসার সাথে সাথে একা একা বসে থাকি। আর
তোমাকে ডাকি ‘উৎকীর্ণ দিন’ এই নামে- একবার দু’বার তোমার বিছানায় ঘুমাবার আগে
ডাকি- ফাঁদ দাঁড়িয়ে থাকে খোলাচুলে, বারান্দায় বেলির টবে তোমার বিছানায় ঘুমাবার আগে।

দ্রষ্টা ও লেখক
পুরাকালের এক দ্রষ্টা ও লেখক আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তার ধারণা বাকরুদ্ধ এই
শোক পৃথিবীর করোটিকে একদিন থেতলে দেবে। পুরাকালে এই শোক পাথর হয়েছিল
যেমন তোমাকে আবিস্কার করতে আমার অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায়। অনেকদিন,
অনেক একটা দিন, আমার কণ্ঠনালী ছেদ করে অর্ধদগ্ধ কথাগুলি পাঠযোগ্য হয়। এক দ্রষ্টা ও
লেখক আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়- হয়তো এই শোক পৃথিবীর করোটিকে থেতলে দেবে!
তবু, শব্দ ও সন্তাপের ভাষা থেকে মুক্তি পাবার সময় এখন- তবু, তবুজানি তোমাকে
বুঝতে আমার অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায়। তুমি দুধের আড়ৎ পেতে রাখো সন্ধ্যারতির
দরোজায় আর লিখে রাখো পুরুষরে প্রবেশ নিষেধ। তারপরও আমার অর্ধেক জীবন পার হয়ে
যায়? আজ জানি, তোমার বুক চিরে জন্ম নেবে আমার হা-ভাতের ইস্কুলবাড়ি; পেছনে আমি
দাঁড়িয়ে বালির স্তুপে- যোনিহীন পৃথিবীতে একা…
নুড়ি ও জলরেখা
একটা ক্ষুদ্র প্রক্ষালন করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, এসো নগ্নবেশ দুইহাতে তুলে নাও
তার প্রাচীন কথা। দুই হাতে তুলে নাও, তুলে নাও পাগলের চটিজুতো। যে অপরাহ্নে
আমি হারিয়ে যায়, একশত বছর ধরে ক্ষতের মুখে বসে থাকি। আর ওগো পরনেশ্বরী
ওগো অচেনা আগুন- ছেঁড়া পৃষ্ঠা, ছেঁড়া পঙক্তির মধ্যে; ছেঁড়া আগুনে একশত বছর ধরে
আমি পুড়ে যাই; তবু তুমি একটা ডুমুরের কাছে শোনো গোপন প্রেমালাপ। একটা ক্ষুদ্র
প্রক্ষালন নিজেকে হারিয়ে ফেলে পদচিহ্নের মধ্যে; নিজেকে হারিয়ে ফেলে শত যোনিদেশে।
একটা ক্ষুদ্র প্রক্ষালন করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছে তোমার পথে, নাভিদেশে- নুড়ি ও জলরেখায়।
কবিতার বিষে আমি পালিভাষাটির সাথে একদিন আত্মহারা করজোড়া দাঁড়িয়ে আছে, চেয়ে দেখ।
সর্বনাশের তাপ
কতবার তোমাকে ছুঁয়ে আসার পর, কতবার তোমার ভ্রুযুগল অতীত হয়ে থাকে; কতবার
অক্ষরজ্ঞানের অভাবে তোমার স্তনযুগল অভুক্ত হয়ে কাঁদে। আমি তোমার পাশে রইলাম
কিছুক্ষণ অরণ্য ও পুষ্পবৎ হয়ে; তোমার দুর্লভ সামগ্রী, অবশিষ্টে পৌঁছাবার শেষ পথ আর
আমার পায়ে পায়ে পূর্বমেঘে জড়িয়ে থাক স্মৃতিশতাব্দী নিয়ে-তবু দেখি একটি সীমান্তরেখার
বৃক্ষ শাখার মতো, তোমার কটাক্ষকে আঘাত হানার জন্য বুক পেতে রাখো। ধীরে ধীরে যে
মেঘ জমেছে তাকে জটিল হতে দিওনা বরং শেষ বিকেলে বৃষ্টির দু’টুকরো ফোটা হয়ে ঝরে পড়ো।
আজ বলি ওগো মালতীলতা তোমার পেছনে সামান্য রোদ ও ছায়ায় আমি ভালোবাসার গুড়ো
হয়ে বসে আছি। তারপরও ওগো নিরুদ্বেগ ঘুড়ি তুমি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাট্টা হয়ে যেতে পারো।
পারো, সব কিছু পারো আমি ছুঁয়ে আসার পর। কতবার, কতবার নানা বিষয়, আকারে প্রকারে
আমি তোমাকে ছুঁয়ে আসি, তোমার পেছনে শ্বাসপ্রশ্বাসে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি; কতবার আর
একবার তোমার ভ্রুযুগল অতীত হয়ে থাকে। কতবার, আর কতবার এই মূক আবেদনে তুমি
সপ্তর্ষীমণ্ডলের বোটা ছিঁড়ে আমার কাছে আসো; পৃথিবী সৃষ্টির কালো গহ্বর থেকে
তুসি সর্বনাশের তাপ নিয়ে আসো, বসে থাকো দীর্ঘশ্বাস হয়ে আমার হাহাকার আর না পাওয়া-
নীচগলায় লুকিয়ে থাকা ছুরির মাথায়। কতবার আর একবার, আমি অরণ্য ও পুষ্পবৎ হয়ে,
এই আমি তোমার অশ্রুমোচন করি।