অধিবিদ্যায় কবিতার মাতৃভাষা বাংলা ভাষার আদি নিদর্শনেও সে সাক্ষ্য মেলে। বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন পদ্ধতিমূলক এই গীতিকাগুলো সহসা বুঝবার উপায় নেই, কিছু বুঝা যায় কিছু বুঝা যায় না- এই দুরূহতা কবিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সর্বদা। টীকা-টিপ্পনী ও সমালোচকদের ব্যাখ্যা সেই দুরূহতাকে সুদূর প্রসারী করেছে। গূঢ় ধর্মকথা আর ট্যাবুকে ব্যাখ্যা করার চেয়ে তার ভেতরে ঢুকে স্বাদ নেওয়া সহজ। ব্যাখ্যা দিলে তা জল থেকে ডাঙায় রাখা জলের মধ্যে থাকা মৎস্যের প্রাণহীনতা প্রকাশ করে। জলের ভেতর তার নিঃশ্বাসের স্পন্দন ও উদ্ভাবন চোখে পড়ে না। ফলে, চর্যাপদের আলো আঁধারি ভাষার মধ্যে অধিজগত লুকায়িত। এর মধ্যে ডুবে থাকা সাধন ভজনকে আবিষ্কারই- নির্বাণ।
থিওলজিতত্ত্বের উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেনো-এর আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে থাকে তন্ত্র- কতকগুলি আচারের সমষ্টি, ফলে আচার শরীয়ত আর কবিতা তরীকত। শূন্যতা ও করুণার হাত ধরে বোধিবিত্তের উন্মেষ- এই সন্ধ্যাভাষা বক্ষে ধারণ করেই সৃষ্টি হল বাংলা কবিতার ইড়া, পিঙ্গলা,সুষ্ণুার অধিকথামালা। যেখানে পার্থিব কোনো বস্তুর নিজস্ব কোনো স্বরূপ নেই- ভাষা ও ধ্বনিগুঞ্জনমালা ছাড়া কবিতারও কোনো অবয়ব নেই। কিন্তু এই সকল-ই শূন্যতা জ্ঞান- তাকে প্রকাশ করে পার্থিব জীবনে মুক্তি খোঁজে কবিতার বর্ণমালা। দেহ যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিমূর্তি চর্যাপদের এই ভাবকথা ভুলে রামরাম বসুরা কেরির নেতৃত্বে রচনা করলেন সক্ষম ও সফল সাহিত্য মিশনারীর ভূমিকা। উহ্যত, ১৮০০ শতকে বাংলার জন্ম নিল উপনিবেশের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি। চর্যাপদের কবি’রা ভাবতেন সত্য বিরাজিত আমাদের দেহ অভ্যন্তরে, ফলে বাইরের চাঁদ-সূর্য, সুমেরু-কুমেরু, গঙ্গা-যমুনা- যাবতীয় তান্ত্রিকতত্ত্ব দেহের মধ্যে বাস করে। এই দেহ-ই তাদের কাছে ব্রহ্মাণ্ড, সত্যের মানমান্দির তত্ত্বের অধিবাহন। সত্যম্, শিবম, সুন্দরম- এই মন্ত্র উন্মুখ হয় দেহকে ঘিরে, দেহকে যন্ত্র করে। শিবশক্তির মিলন এই- দেহমন্ত্র, মোক্ষলাভ। পশ্চিমা সাহিত্যের সত্য হচ্ছে- সত্য ও সুন্দর। সেখানে শিব নেই। মূলত থিওলজিগুলি গড়ে উঠেছে প্রাচ্যে। প্রথম ঈশ্বরদূত পারস্যের জরাথুস থেকে মুহাম্মদ পর্যন্ত। এর মধ্যে মিশরের রাম, ভারতের কৃষ্ণ, তিব্বদের বৌদ্ধ, চিনের কনফুসিয়াস যে ঈশ্বরকণার কোডগুলি তুলে ধরলো- তা নিয়েই আমরা সাধকের মতো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে ফিরে আসি দেহভাণ্ডে। পাশ্চাত্যের কোনো থিওলজি নেই, পাশ্চাত্যের কোনো শিব নেই। পাশ্চাত্য জ্ঞান চর্চাকে নিষ্ক্রিয় করার এই কঠিন কাজটি তাই দেহভাণ্ড, শিব- এই ধারণের উদ্দীপক দিয়ে শুরু করা দরকার।
বাংলায় সাহিত্য মিশনারীর অভিযাত্রা ১৮০০ শতকে শুরু হলেও, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাশ্চাত্য শক্তিগুলির বলপ্রয়োগ ও সর্বমাত্রিক আগ্রাসন আর আধিপত্যর সূচনা হয়েছিল ১৬০০-১৭০০ শতকে। জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এই ভয়াবহ ধরণ ও ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্টিত হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। ১৮০০ শতকে ইউলিয়াস কেরি’র সেই উপনিবেশী চিন্তা- ১৯৪৭শে দেশ স্বাধীন হবার পরও ছড়িয়ে আছে আমাদের বিশ্বাসে; সাহিত্য, ভাবে, ভাবনায়, চর্চায় ও কর্মে। তাই চর্যাপদের কুলকুণ্ডলিনীরূপিণী শক্তি সুষ্ণুা- যা নিদ্রিত তাকে যোগসাধানার দ্বারা জাগাতে হবে। উপনিবেশী চিন্তার বিন্যাসগুলি উল্টে দিতে হবে, নিষ্ক্রিয় করে তার মাথার খুলিতে পুততে হবে ‘সহস্রা’ ও ‘মূলাধার চক্রে’র নিশান। ফলে, ১৮০০ শতক থেকে ত্রিশের দশক পর্যন্ত মিশনারী সাহিত্যের যে জ্ঞানভাণ্ডারগুলি গড়ে উঠেছে তার ভেতকের রাজনীতি খোলসা করে না বুঝলে, বাংলা, বাংলা কবিতার ঐতিহ্য ও মিশনারী ধ্যান-ধারনায় প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ভাণ্ডারকে, চিন্তাকে আলাদা করা যাবে না।
উপনিবেশিক জ্ঞানতত্বের মোকাবেলা জরুরী কাজ হলেও তা এখন প্রায় দূরূহ ব্যাপার। কেননা, বাংলার সংস্কৃতির উপর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের প্রভাব- প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতির স্বার্থ ও সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডার- প্রাচ্য নিকৃষ্ট ও পশ্চিম উৎকৃষ্ট এই মনোভাবকে পৃষ্ঠাপোষকতা দিয়েছে, তাদের বিপুল রচনা গ্রন্থের মাধ্যমে। এই মনোভারের উপর লিখিত বিপুল পাশ্চাত্যজ্ঞান ভাণ্ডারই আমাদের হীনমন্যতা তৈরি করতে, তাদের মানসিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। এগুলি আমাদের অভিজ্ঞতা- ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে বিকৃত করার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া মাত্র। বর্তমান কর্পোরেট পুঁজি সেই ধারাকে অব্যাহত রেখেছে- নর্মদা নদীর জলকে পেপসি, কোকাকোলা বানিয়ে কিংবা ভারতীয় সিনেমার নারী দেহকে বাণিজ্যিকীকরণ করে। স্বামী-স্ত্রীর ট্যাবু ভেঙে পর-নারী-পুরুষের অবাধ যৌনচারকে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতার মোড়কে উপস্থাপন করেছে
কায়া সাধনায়- বামদিকের নাড়ি ইড়া এবং ডানদিকে পিঙ্গলাতে শক্তি ও শিবরূপে কল্পনা করে আর মধ্যে রাখি সুষ্ণুা। এই উড়া-পিঙ্গলায় প্রবাহিত অপ্রাণ ও প্রাণবায়ু যোগসাধনায় দ্বারা সুষ্ণুায় এসে- উর্ধ্বাভিমুখে ‘সহস্রা’রে নিয়ে যেতে হবে। এই যাত্রাপথ অতিক্রম করে ষটচক্র। উপনিবেশের ফলে গড়ে ওঠা বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার এক তরফা ভাবে তাদের ধারণায়ভিত্তি করে উপনিবেশিতকে নিকৃষ্টরূপে চিহ্নিত করেছে। ১৮০০ শতক থেকে রায়বাহাদুর, খান বাহাদুর, বায়চৌধুরীরা উচ্ছৃষ্টভোগী এই বাবু কালচারের হাত ধরে ইতিহাস, সাহিত্য, নৃতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্বসহ নানা অনুষঙ্গে ঢুকিয়ে দিয়েছে পাশ্চাত্যের বিপুল গ্রন্থ ফোড়া ও অশেষ চিন্তারপুঁজ। তারপরও- চর্যাপদের মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যের নাভিতে ছড়িয়ে আছে নির্বাণচক্র। বোধিচিত্তের অবধুতিকারূপে আমরা অর্জন করেছিলাম তিনটি প্রবৃত্তির রাজ্য জয়ের তলোয়ার। কিন্তু আজ আমাদের সাহিত্যকে বটতলার সাহিত্য বলে, কেন্দ্র আর প্রান্তিকের ধারণা জন্ম দিয়েছে, নিকৃষ্ট আর উৎকৃষ্টের অভিধা। ফলে, আমাদের সাহিত্য, ভাবকথা, ইশারা, ঐতিহ্যের হদিস আমাদের কাছে আক্ষরিক অর্থ ‘কালো’, নিকৃষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্রাজ্য তাই শাদা চামড়ায়- আমরা ফেয়ার এণ্ড লাভলি মেখে শাদা হতে চেয়েছি। কালো চামড়ার যিশুকে নিয়ে ইউরুপ বানিয়েছে নোতুন থিওলজি। ইউরুপের যিশু শাদা এবং নিল চোখের। মুহম্মদকে দুধ খায়িয়েও যে দুধমা হতে পারি নি সেই জামিলা ছিলেন কাবিলা মাহফাজ ভাষাধারী নিগ্রোউপজাতি। অন্যদিকে দুধ না খায়িয়েও যে দুধ মা হল সে হালিমা, সে কোরাইশ। এই উপনিবেশিত মনজগতের কারণে আমাদের সাহিত্যাত্মা আজ নৈরামণিকে হারিয়ে হেসাস খিস্তের ক্রুশে বিঁধে গেছে। আমাদের সাহিত্যের মক্তবে, কবিতার টোলে আর লোকাচারের পাঠাশালা আজ দখল নিয়েছে স্কলাসটিকা, সেভ দ্যা চিলড্রেন এর মত ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান।
মূলত চর্যাপদ যে তান্ত্রিক পরিভাষার জন্ম দিয়েছিল বাংলা কবিতার জ্ঞানভাণ্ডারে আলো সেই প্রদীপ জ্বালিয়েই হানা দিতে হবে ঐতিহ্যের খোয়াড়ে। এখন রক্তাক্ত ভাগাড়ে পড়ে আছে আমাদের গল্পের গুরু। কেননা, আমাদের কোড, ইশারাগুলি সাধারণ অর্ধে নয়, এক অভীষ্ট অর্থে প্রযুক্ত। মূলত পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডার আর ভাষা জ্ঞানে দক্ষ আমাদের কাছে এখন আমাদের সাহিত্যের আদি নিদর্শনগুলির ভাষা হয়ে উঠেছে প্রহেলিকাপূর্ণ ভাষা, কথিত দূরূহ তত্ত্বব্যাখ্যা তার মধ্যে লুকায়িত। যেমন-
এভাবে বৌদ্ধত্মা মহাজনদের অধিভাষা আমাদের ঐতিহ্যের কুহকতা লাভ করে, সেই গীতিতত্ত্ব হতে আমাদের কাব্যের প্রাণভ্রমরা সঞ্চারিত হয়েছে। আমাদের সেই অধিঐতিহ্য, কুহকঅভিজ্ঞতা, ইড়া, পিঙ্গলা, সুষম্মার বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং Colonized (উপনিবেশিক)দের নিকৃষ্ট চিহ্নিত করে চিত্রিত করলো পাশ্চাত্য বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার, চিন্তার কোড। অবশ্য হস্তক্ষেপ শুরু থেকেই হয়েছিল বাংলার মানুষের জীবনেও সাহিত্যে। যেমন কর্ণটক থেকে সেনারা আর উত্তর ভারত থেকে ব্রাহ্মণ’রা বাংলায় বৌদ্ধ ঐতিহ্য ধ্বংস করেছিল। তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে শিবের পতাকা বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিল বাঙালি যেমন, তেমনি গুপ্ত থেকে সেনগুপ্ত, দাস থেকে দাশগুপ্ত প্রকৃতি নামের আড়ালে বিজেদের ট্যাবু বিসর্জন দিয়েছেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ‘ব্লাকস্কিন হোয়াইট মাস্ক’ বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম থেকেই ছিল। যেমন ব্রাহ্মাণ্য সংস্কৃতি ঢোকার পর চর্চাপদের ছন্দকে ‘পঞ্ঝটিকা’ ছন্দে বেধেঁ ব্যাখ্যা করার প্রবণতা সেই প্রচেষ্টারই অংশ মাত্র। আমার অনুমান গীতিকাররা ছন্দ বা স্বর প্রয়োগে স্বাধীন ছিলেন। কোনো শব্দকে সুর তাল বেঁধে দীর্ঘ করে দুটি স্বর বা হ্রস করে একটি স্বরে রূপান্তর সেই প্রচেষ্টার নামন্তর হিশাবে গণ্য করা যায়।
ইউরোপের রাজনৈতিক অরাজকতার আদলে বাংলা সাহিত্যে কৃত্রিম অন্ধকার যুগ, ১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি’র বাংলা সাহিত্য (যা পারসি বর্জন ও সংস্কৃত আত্মকরণ), রবীন্দ্রনাথের ক্রিয়া ভিত্তিক ভাষা ছেড়ে প্রতীকী ভাষা গ্রহণ, ত্রিশের কেরাণী কাব্য- ইত্যাদি প্রক্রিয়ার দীর্ঘতালিকা সংযুক্ত হতে পারে।
ফলে উপনিবেশিক জ্ঞানতত্বের মোকাবেলা জরুরী কাজ হলেও তা এখন প্রায় দূরূহ ব্যাপার। কেননা, বাংলার সংস্কৃতির উপর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের প্রভাব- প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতির স্বার্থ ও সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডার- প্রাচ্য নিকৃষ্ট ও পশ্চিম উৎকৃষ্ট এই মনোভাবকে পৃষ্ঠাপোষকতা দিয়েছে, তাদের বিপুল রচনা গ্রন্থের মাধ্যমে। এই মনোভারের উপর লিখিত বিপুল পাশ্চাত্যজ্ঞান ভাণ্ডারই আমাদের হীনমন্যতা তৈরি করতে, তাদের মানসিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। এগুলি আমাদের অভিজ্ঞতা- ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে বিকৃত করার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া মাত্র। বর্তমান কর্পোরেট পুঁজি সেই ধারাকে অব্যাহত রেখেছে- নর্মদা নদীর জলকে পেপসি, কোকাকোলা বানিয়ে কিংবা ভারতীয় সিনেমার নারী দেহকে বাণিজ্যিকীকরণ করে। স্বামী-স্ত্রীর ট্যাবু ভেঙে পর-নারী-পুরুষের অবাধ যৌনচারকে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতার মোড়কে উপাস্থাপন করেছে। কিংবা ইউনুসের প্রামীণ ব্যাংক কিংবা প্রামীণফোন পরিসেবার নামে কর্পোরেট পুঁজির বাইরে থাকা বিপুল মানুষকে কর্পোরেট পুঁজির শোষণের সুযোগ করে দিয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের আত্মপরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘চৈতন্যের’ প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ব্রজ রাখালদের বন্ধু নিমাই বললেন- ‘জগৎ জীবের জন্য’ আর ‘প্রেমই পঞ্চম পুরুষার্থ’-চরম ও পরম সাধন। এখানে জীব আর কৃষ্ণ- উভয়েই নিত্যদাস। মানুষের মেরুদণ্ড প্রেম, জগতের প্রাণ প্রেম- এই প্রেমই মানুষ চিনবার নিকষ পাষাণ। ফলে যে প্রেমিক সেইতো দ্বিজোত্তম, সেই জগৎ শ্রেষ্ঠ মানুষ। মুহম্মদ যে নিরাকার ট্যাবু দিয়ে মানুষকে বড় করে তুললেন, চৈতন্য সেই মানুষের রক্তে প্রেম সঞ্চার করে তাকে মধুভাণ্ড করে জগৎকে নিত্যসিদ্ধ করে তুলেছেন। ফলে যেই মানুষ সেই প্রভু কিংবা জীবাত্মা পরাত্মা এক সঙ্গে মিলে সমাজের সমতলে এসে দাঁড়ালো। উহ্যত, যবন হরিদাসও এই মন্ত্রে দ্বিতত্ব লাভ করলো। তাই রাধা কৃষ্ণের পরকীয়া প্রেম নয়, ঘটলো জীবত্মার সঙ্গে পরাত্মার মিলন। রস ও ভাবের এই নামকীর্তনে হাজির হয়েছেন জয়দেব হতে চণ্ডীদাস, বিল্বমঙ্গল হতে বিদ্যাপতি- এই অদ্বৈতে তারা আশ্রয় লাভ করেছেন। বাংলায় জৈন-বৌদ্ধদের অবস্থান দু’হাজার বছরের আর সপ্তম শতক থেকে সুফীদের আগমন। এই আগমনে ঘটলো মহীরূহ হবার ঘটনা-
তপি তপি লুপি লুপি হাথ মরোড়উ।
বাওলী হোউ সো শহু লোরউ।।
তই সহি মন মহিঁ কীয়া রোষ।
মুঝ অওগণ সহি (তাস) নাহি দোষ।।
তই সাহিব কী মই সার না জানী।
জোবন খোই মাছই পছতানী।। ধ্র“।।
কালী কোইল তু কিতগুণ কালী।
অপনে প্রীতমকে (হউ) বিরহই জালী।।
পির হি বিহূন কতহি সুখ পায়ে।
জো হোই কৃপাল তা প্রভু মিলায়ে।।
বিরুদ্ধ খুহী মুন্ধ ইকেলি।
না কো সাধী না কো বেলী।।
করি কিরপা প্রভু সাধসঙ্গ মেলী।
জা ফিরি দেখা (মেরা) আল্লাহ বেলী।।
বাটা হামারী খরীউ ডীনী।
খন্নি অহু তিথী বহুত পিঈণী।।
উস উপর হউ মারগ মেরা।
শেখ ফরীদা পন্থ সমহারি সবেরা।।
[সুফী কবিতা/ শাহ ফরিদুদ্দীন]
(বিরহ) জ্বরে পুড়ে পুড়ে আমি হাত জোড় করছি, বাউলী হয়ে আমি সেই স্বামীকে খুঁজছি। সখি, সে মনের মধ্যে রোষ করছে আমারি গুণহীনতা, সখি, তার দোষ নাই। সেই স্বামীর আমি সার (মর্ম) জানলাম না, যৌবন খোয়াইয়া শেষে অনুতাপ (ভোগ) করছি। কালা কোকিলা, তুই কত গুণ কালো। আমার প্রিয়তমের বিরহে আমি জ্বলিতেছি। (বিরহে) পীড়া বিহীন (কোকিলা) কতসুখ পায়। যে কৃপালু হয় সে প্রভুর সঙ্গে (আমাকে) মিলিয়ে দেয়। দুঃখের কূপে আমি একেলা নারী। না আছে কোনো সাথী, না আছে কোনো সাহায্যকারী। কৃপা করে প্রভু সাধুসঙ্গে মিলিয়েছেন। (কিন্তু) যখন (ঘরে) ফিরে দেখি তখন আল্লাহ-ই আমার সহায়। পথ আমার দুর্গম দূরতায়, খড়ের মতো তীক্ষ্ণ ও অত্যন্ত সংকীর্ণ। তারই উপর দিয়ে আমার পথ। শেখ ফরিদ, বেলা থাকতে পথ চিনে নিতে হবে।
চৈতন্য পর্বে দেখি বৌদ্ধ, জৈন, সুফী ও চৈতন্য প্রভাব বৈষ্ণবপদাবলীকে গতিদান করেছে। সুফী ভাষায় মসজিদ-মন্দির আল্লাহকে পাবার জন্য মানুষ নির্মিত ঘর। আর আল্লাহর নিজ হাতে তৈরি ঘর ‘মানুষ’। ফলে আল্লাহকে পেতে গেলে আল্লাহর তৈরি ঘরেই আল্লাহকে খুঁজতে হবে। মানুষের তৈরি ঘরে তাকে পাওয়া যাবে না। কেননা মানুসের অন্তর ভূমিই আল্লাহর আরশ (আসন)। কার্যত সুফীদের পরোক্ষ প্রভাবে বাংলার চৈতন্য ভক্তি আন্দোলনের আবির্ভাব। সুফিবাদ মূলত, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধুর বাতাবরণ এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির দুর্জেয় ব্যবধান ভেঙে নিবিড় সেতুবন্ধন। চৈতন্য যাকে রূপায়িত করলেন জীবাত্মার সঙ্গে পরাত্মার মিলন অভিধায়। ইসলামের অচিন্তনীয় ইতিহাস ও সর্বশ্রেষ্ট উপহার হল সুফি জগত। (যা বিশ্বপতিকে উদ্ধার যেমন একদিকে, অন্যদিকে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধন প্রয়োগহীন এবাদত, আর প্রাণহীন দেহ একই) ফলত, ভারতবর্ষে সুফি প্রভাবে বৈষ্ণব ও ব্রহ্ম ধর্মের জন্ম আর জৈন ধর্মের বিকাশ। এই ধারায় ধর্ম সাধনার তিনটি পথ- কর্মমার্গ, জ্ঞানমার্গ ও ভক্তিমার্গ। জীবনে সৎকর্মের মাধ্যমে মোক্ষপ্রাপ্তি, জ্ঞানের দ্বারা জগৎ ও জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি করে মোক্ষের উপায় দর্শন আর ভক্তির দ্বারা ভগবৎ- অনুগ্রহে মোক্ষলাভ। বৈষ্ণবেরা এই তৃতীয় পথের পথিক। এই সূত্র ধরেই চৈতন্য- সুফী থেকে ধার করলেন জীবন নদীর আচরণ জল, আখলাকের পানিতে নিরন্তর স্নান করার মন্ত্র, নিরাকারকে সন্ধান করতে গিয়ে আপন আকারকে হারিয়ে ফেলার বীজপত্র, মরে যাবার আগে-ই মরে যাওয়া কিংবা পরার পরও জীবিত থাকা- এইসব ভাবসূত্র। ফলে, উইলিয়াম কেরি’র বাংলা সাহিত্যে মিশনারীর ভূমিকা পালনের আগে, বাংলার কোনো ইতিহাস নেই, সভ্যতা নেই বলার আগেই- বাংলা অর্জন করেছিল বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের অমৃত গীতিকা। অর্জন করেছিল শূন্যপুরাণ, সেক শুভোদয়া, শ্রী কৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলীর মতো তথাকথিত ইউরোপ কথিত ‘অর্বাচীন কালো মানুষের নন্দনতত্ত্ব।’ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে যে বাঙালির সাহিত্য উপলব্ধি ঘটে, যেখানে ছিল ইউরোপীয় আদর্শ বা প্রতিবিম্বের বিপোরীত জগত। সেখানে ভুসুক ঘোষণা দেন-
আজি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী।
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলী।।
এই ঘোষণা ফ্রানৎসা ফানো কর্তৃক ‘ব্লাক স্কিন হোয়াইট মাক্স’ বিনির্মাণ হবার আগেই। ফলে বাঙালির ইতিহাস নেই, সভ্যতা নেই, পাশ্চাত্যের প্রচারিত আক্ষরিক অর্থে ‘কালো জীবন’- এই হীনমন্যতাকে অস্বীকার করে। অস্বীকার করে উপনিবেশি যুগে নির্মিত চিহ্নবিজ্ঞান, তথাকথিত অন্ধকার যুগ কিংবা ১৮০০ শতকে উইলিয়াম কেরি কর্তৃক সংস্কৃতকে বাংলায় সংযুক্ত করে মিশনারী সাহিত্য নির্মাণ প্রকল্প। হীনমন্যতার বীজ আর পশ্চিমাদের উন্নাসিকতার জবাব আছে উপনিবেশিক আগের যুগের বাংলা কবিতায়-
কাহৈরি ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস।
বেটিল ডাক পড়অ চৌদীস।।
আপণা মাংসে হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়অ ভুসুক আহেরী।।
তিণচ্ছুপই হরিণা পিবই না পাণী।
হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জানী।।
হরিণী বোলঅ হরিণা সুণ হরিআ তো।
এ বণচ্ছড়ী হোন্ত ভান্তো।।
তারসঁন্তে হরিণার খুর ণ দীসঅ।
ভূসুক ভণই মুটা হিঅহি ণব পইসঈ।।
ভুসুকপাদানাম বলছেন- কাকে নিয়ে আর কাকে ছেড়ে কেমন করে যে আছি। চারিদিকে হাঁক ডাক পড়ে। আপন গোস্তের জন্য হরিণ হল তার জীবনের শত্রু। তাকে এক মুহূর্তও শিকারি ভুসুক ছাড়ে না। আর হরিণ জলপানও করে না- খায় না ঘাস। হরিণ-হরিণীর কোনো বাড়ির খবর জানা যায় না। তারপর হরিণী বলে শোন প্রাণসখা আমার হরিণ- এ বন ছেড়ে চল আমার পালাই। কিন্তু লাফ দেবার জন্য হরিণের পায়ের যে খুর- তা দেখা যায় না। তারপর ভুসুক বলে- আমি গাহি যে তত্ত্ব তা মূঢ় ব্যক্তির মনে প্রবেশ করে না।
এই গুঢ় তত্ত্ব, সান্ধ্য ভাষার বচন অবিশ্বাস্য- সাংঘাতিকাভাবেই সমস্ত হীনমন্যতাভেদকারী বক্ষে বিঁধে যাওয়া কাব্যতীর। লুইপার অন্য একটি গীতকা থেকে এই তত্ত্বের গূঢ়তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে-
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুখ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।।
সঅল সহিঅ কাছি করিঅই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই।।
এড়ি এই ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস।।
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেশি পিত্তি বইঠা।।
লুইপাদানাম বলেন- পাঁটটি ডাল নিয়ে গড়া আমাদের তরুশরীর। চঞ্চল চিত্তে এই শরীরে প্রবেশ করে কাল। তাই চিত্তকে দূঢ় করে মহাসুখকে পরিমাপ করতে হবে। লুই বলেন, যে জ্ঞানগুরু তাকে শুধিয়ে জেনে নিতে হবে। সদগুরুই জানেন কেনো করা হয় সমস্ত সমাধি? সুখে দুঃখে সে নিশ্চিত মারা যায়। ফলে ছলবদ্ধ কপট ইন্দ্রিয়ের এই আশা পরিত্যাগ করো। শূন্যতার দিকে ধাবিত হও। কেননা, আমার পিত্তি বইঠা ধমন ও চমন এই দুই পিঁড়িতে।
এই তান্ত্রিক গূঢ় তত্ত্ব ও জীবনাচার চর্যাগীতিকার অন্যতম প্রতিবাদ্য বিষয়। গাছকে শরীর ভেবে তরুশরীরের মতো মানব শরীরের ইন্দ্রিয়ের উপস্থাপনা। আর ইন্দ্রিয় যে সকল স্খলনের মূখ্য তার দুর্দান্ত অধিপাঠ চর্চাপদকে আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বনন্দনের ডালে ফুল হয়ে ফুটতে সাহস যুগিয়েছে।
মারি সাসু ননন্দ সালী।
মাঅ মারি কাহ্ন ভইঅ কবালী।।
আশ্বরিক অর্থ- ‘ঘরে শাশুড়ী ননদ শালীকে ও মাকে মেয়ে কাহ্ন কাপালিক হল।’ কিন্তু যোগের দিক থেকে এখানে ‘সাসু’ অর্থ শ্বাস, ‘ননন্দ’ অর্থ বিষয়নন্দনকারী ইন্দ্রিয়াদি, ‘সালী’ অর্থ নিঃশেষ, ‘মাঅ’ অর্থ মায়া, আর ‘মারি’ অর্থ নিঃস্বভাবীকৃত করা। ফলে, কাহ্নকে কাপালিক হতে হলে শ্বাস, বিষয়ানন্দ ইন্দ্রিয়কে, মায়াকে নিঃশেষ করে নিঃস্বভাবীকৃত হতে হবে। অর্থাৎ যোগের বা তন্ত্রের এই মন্ত্রজ্ঞান যা আচরিক সমস্ত ইন্দ্রিয়বাসনাকে মুক্ত করেই নির্বাণ লাভ অর্থাৎ কাপালিক হতে হবে। চর্যাপদের নন্দনগূঢ় ভাষা আক্ষরিক অর্থের অন্তরালে অধিবিদ্যার গূঢ়ার্থ লুকিয়ে রেখেছে এভাবেই- যা অচিন্তনীয় কবিতাকল্পনালতা। পৃথিবীর এ ভূভাগ শুধু চর্যাগীতিকায় মেলে। পরমার্থ সত্যের এই বজ্রযান সাধনপ্রণালী তাই তত্ত্বকথার মোড়কে বিধৃত করেছে জন্ম-মৃত্যু, উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখে দোলাচল মনবৃত্তি, জরা-মরণ ও পূর্বজন্মের বিষচক্র থেকে মোক্ষলাভ পর্যন্ত। আর অর্থের অবগুণ্ঠনে সদগুরু তাকে পৌঁছে দিয়েছে নির্বাণের দরোজায়।
বাংলা কবিতার- এই দর্শনপরিভাষা ও তন্ত্রকথা তার অনাদি উৎস থেকেই যেমন পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় লোকজীবনের ছবি। ভবনদী পারাপর, শবর-শবরীর মদমত্ত উল্লাস, গোস্তলোলুপ শিকারীর দল, ভয়ার্ত হরিণের আশ্রয় না খুঁজে পাওয়া, কাহ্নপার পটহমাদল বাজিয়ে ডোম্বী বিয়েতে যাওয়া। কিংবা-
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।
বহির-শত্রুর ভয়ে টিলার উপর বাস করে শবরী। তার পাড়াপড়শী নেই। নিরন্ন সংসার তবু মধুলোভী নাগরের নিত্য আনাগোনা। টিলার উপর বাসকারী শবরী কালিকা যার বক্ষে অরণ্য সৌন্দর্য, তার খোঁপায় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে কোন এক কবি গুঁজে দিয়েছিল চাঁদরূপী গুঞ্জরীমালা। সেই থেকে শব্দগুঞ্জমালা-
তইলা বাড়ীর পাসেঁ জোহ্ণা বাড়ী তা এলা।
ফিটেলি অন্ধারি রে আকাম ফুলিলা।।
কঙ্গুচিনা পাকেলা রে সবরসবরি মাতেলা।।
অনুদিন সবরো কিম্পি ণ চেবই মহাসুঁহে ভোলা।।
তৃতীয় বাড়ির পাশে সে সময় জ্যোৎস্নাবাড়ি হল, দূর হল অন্ধকার, ওরে আকাশ কুসুমিত হল। কঙ্গুচিনা পেকে উঠলো, মেতে উঠলো শবর-শবরী। অনুদিন শবর কোনো কিছুতেই জাগ্রত হয় না, সে মহাসুখে বিভোর হয়ে গেল।
তথাকথিত অন্ধকায়যুগ (যা ইউরোপের রাজনৈতিক সংকট-এর আদলে নির্মিত, বাংলায় যার কোনো অস্তিত্ব নেই)-এ অমর কিছু সৃষ্টি আমরা দেখি ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ যা প্রাকৃত ভাষায় গীতিকবিতা গ্রন্থ। রামাইপণ্ডিত-এর ‘শূন্যপুরাণ’, ‘কালিমা জলাল’ বা ‘নিরজ্ঞনের রুষ্মা’, ‘ডাক ও খনার বচন’ হলায়ুধ মিশ্রের ‘সেক শুভোদয়া’ (পীর-মাহাত্ম্যজ্ঞাপক বাংলা আর্যা)
এক.
আপনি চণ্ডিকা দেবী তিহঁ হৈলা হায়া বিবি
পদ্মাবতী হৈলা বিবিনুর।
জথক দেবতাগণ সভে হয়্যা একমন
প্রবেশ করিল জাজপুর।।
[শূন্যপুরান]
দুই.
পীন পয়োধর বাগে আর।
প্রাণ ন জায় গেল বহিঞা ভার।।
নয়ান বহি ঞা পড়ে নীর নিতি।
জী এ ন প্রাণী পালা এ ন ভীতি।।
আশে পাশে শ্বাস করে উপবাস।
বিনা বায়ুঁতে ভাঙ্গে তালের গাছ।।
[সেক শুভোদয়া]
এইসব নন্দনপদব্রজে বাংলা কবিতা পৌঁছিল চৈতন্যের মহা বৈষ্ণব পদাবনীতে।
এক.
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এভরা বাদর মাহভাদর
শূল্য মন্দির মোর।।
[বিদ্যাপতি]
দুই.
এমন পিরীতি কুভু নাহি দেখি শুনি।
পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা আপেনি।।
দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভারিয়া।
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।
জল বিনু মীন যেন কবহুঁ না জীয়ে।
মানুষে এমন প্রেম কোথা না শুনিয়ে।।
[চণ্ডীদাস]
তিন.
শ্যামবন্ধু চিতনিবারণ তুমি।
কোন শুভদিনে দেখা তোমা সনে
পাসরিতে নারি আমি।।
যখন দেখিয়ে এ চাঁদ বদনে
ধৈরজ ধরিতে নারী।
অভাগীর প্রাণ করে আনচান
দণ্ডে দশবার মরি।।
[সৈয়দ মুর্তজা]
ফলে চিহ্নবিজ্ঞান নিয়ে আজকের পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র, ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা থেকে সব ভাষা সৃষ্টি। সংস্কৃত পিতৃ আর জর্মাণ Father-এর কষ্টকল্পিত মিল খুঁজে পাওয়া সব কিছুই মিশনারীর আজকের প্রচেষ্টা; ষোল-সতেরো শতকে যে প্রচেষ্টা তারা গ্রহণ করেছিল- তার প্রক্রিয়া অব্যাহত আজকের এনজিও ও মিশনারীদের অপতৎপরতার মধ্যে নিহিত। এনজিও ও কর্পোরেট পুঁজি বিশ্বায়নের নামে আর মিশনারীরা ধর্মের নামে এক রাষ্ট্র, এক ভাষা এক ধর্ম জাতিতে পরিণত করতে চায় বিশ্বকে। আর তা হল- এটা হবে হেসাস খিস্তের দুনিয়া- যার ভাষা হবে ইংরেজি আর ধর্ম হবে খ্রিস্টধর্ম। পশ্চিমের এই জ্ঞানকাণ্ড যা আমাদের শিখায় ‘আমাদের কিছুই নেই’- তাদের এই ভাবনার বিপরীতে চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী জ্বেলে রাখে আলো তপোবনশাসিত ঐশ্বর্য। কেননা, আমাদের ইতিহাস হীনতার লজ্জা নেই, অন্যের ধর্ম যাপন করার দ্বিধা নেই। ফলে, পশ্চিমের সংস্কৃতির হাতসাফাইয়ে পড়ে আমাদের প্রকৃতি নির্ভর উৎপাদন পদ্ধতি যেমন ভেঙে গেছে, তেমনি ফেয়ার এণ্ড লাভলি মেখে কালো চামড়া শাদা করার পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক মতাদর্শিক অস্ত্রকে কাদা মাখা চামড়ায় লাগিয়েছি। বাংলার ভাষায় বাগধারা ও প্রবাদপ্রবচনের মধ্যে আমাদের সাংস্কৃতিক নিগ্রহের তাৎপর্য লুকায়িত। সংস্কৃতি দখলের এই একরাশ নির্যাতন কৌশলকে প্রত্যাখ্যান তাই চর্যাপদও বৈষ্ণবকবিতা ভাব থেকে শুরু করতে হবে। কেননা, সংস্কৃতির হাজার ফল আর ধর্ম-জাতির শত ফুল ফুটতে দেখার এই জগতকে থামিয়ে দেওয়ার তৎপরতাকে রুখতে হবে। তাই, সেই প্রক্রিয়ার বাংলার কবি কাশীরারম দাসের অনুসরণে পাবলো শাহি’র ভণিতা-
কবিতাকল্পনালতা অমৃত সমান।
শ্রী পাবলো শাহি ভনে, শোনে পূন্যবান।।