কুড়িগ্রাম সীমান্তে ২০১১ সালের ৭ ই জানুয়ারী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘গুলিতে’ নিহত হন ফেলানী খাতুন। গত কয়েক বছর ধরে এই দিনটিকে সীমান্ত হত্যা দিবস বা ফেলানী হত্যা দিবস হিসেবে স্মরণের ডাক দিয়েছে বেশ কয়েকটি নাগরিক ফোরাম। সামাজিক মাধ্যমগুলোর বাইরে বৃহত্তর নাগরিক সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন কর্মসূচি বা উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফেলানী হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্তির দিনে (৬ জানুয়ারী ২০১৮) মানবাধিকার সংস্থা অধিকার সীমান্ত হত্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। এদের মধ্যে ২৬৯ জনকে গুলি করে, ১০৯ জনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড সেইসময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তুমুল প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায়। বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানীর লাশ দীর্ঘক্ষণ কাঁটাতারে ঝুলন্ত থাকার ছবি বিশ্ব গণমাধম্যে প্রকাশিত হলে, বিএসএফের এই নিষ্ঠুরতা সারা দুনিয়ার মানুষকে বাকরুদ্ধ করে। এই নির্মমতার পরেও অবশ্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন নীতিগত পরির্বতন লক্ষ্য করা যায়নি।২০১১ সালের ২৭ শে জানুয়ারী দৈনিক আমাদের সময়ের তৎকালীন রিপোর্টার রেজাউল করিম রনি সীমান্ত থেকে ফিরে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে ফেলানীর মা, বাবা, খালাতো ভাই, নানা এবং ওই গ্রামের মুয়াজ্জিনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
ফেলানির বাবা নুরু হোসেন জানান, ‘ফেলানিকে নিয়ে অনন্তপুর সীমান্ত পার হওয়া জন্য তিনি কুঁচবিহার এলাকার দালাল মুশাররফকে ৩ হাজার টাকা দেন। দালালের কথা মতো তিনি ও ফেলানি রাত ৩টায় কাঁটাতারের সঙ্গে লাগানো মই বেয়ে উপরে ওঠেন। উপরে উঠে বাংলাদেশ সীমান্তে পাতা মইয়ে যখন তিনি পা রাখতে যাচ্ছিলেন তখনই সামনে থেকে গুলি করে বিএসএফ। ফেলানী নুরু হোসেনের ডান দিকে ছিল। গুলি এসে ফেলানীর ডান বুকের একটু উপরে লাগে। আতঙ্কে নুরু হোসেন মই থেকে ছিটকে পড়ে যান বাংলাদেশ অংশে। তিনি বলেন, আমি তাড়াতড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলি- মা নেমে আয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ৪/৫ জন বিএসএফ দৌড়ে এসে একজন মই বেয়ে উঠে যায়, বাকিরা তার দিকে অস্ত্র তাক করলে ভয়ে তিনি দৌড়ে পালিয়ে আসেন। এরপর তিনি দিকভ্রান্তের মতো সীমান্তের আশপাশে ছোটাছুটি করতে থাকেন। এ সময় তিনি থেকে থেকে ফেলানীর কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। নুরু হোসেনের বিলাপ শুনে আশপাশের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসে। স্থানীয়দের নিয়ে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও ফেলানীকে আর পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা নুরু হোসেনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সকালের দিকে তিনি তার গ্রাম বানারবিটায় ফিরে আসেন।
এরপর ভোরে ঘটনা জানাজানি হলে ওই এলাকায় মানুষের ঢল নামে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের উপেক্ষা করে মানুষ কাঁটাতারের বেড়ার কাছে পৌঁছে যায়। এ সময় ভারত সীমান্তে প্রায় ১০০ বিএসএফ ও বাংলাদেশ অংশে ২০/২৫ জন বিজিবি সদস্য অবস্থান নেয়। ফেলানির খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন জানান, কাঁটাতারের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ফেলানীর লাশ বাঁধা ছিল। পরে দুজন মেথর ওড়নার বাঁধন কেটে ফেলানীর লাশ নিচে নামান। দুই দিন পর বিএসএফ অনন্তপুর বিজিবি ক্যাম্পে ফেলানীর লাশ হস্তান্তর করে।
ঘটনার ২০ দিন পর করা ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেলানির পরিবার ও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, গুলিবিদ্ধ ফেলানীকে হত্যা করে কাঁটাতারের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে বিএসএফ সদস্যরা। তারা আরো অভিযোগ করেন, বিএসএফ ফেলানীর কাছে থাকা তার মায়ের দেয়া বিয়ের খরচের ৫০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছে।
ফেলানীর নানা কবিরাজ রশিদ আলী জানান, আমরা সীমান্ত সংলগ্ন শরিষা ক্ষেতে রক্ত দেখেছি। তার মানে, গুলিবিদ্ধ ফেলানীকে কাঁটাতার থেকে নামনো হয়েছে। হত্যা করে আবার ঝুলিয়ে রাখা হয়। লাশ নামানোর সময় দেখা গেছে ফেলানীর মৃত দেহ কাঁটা তারের সাথে ওড়না দিয়ে বাঁধা। তার মানে মরে সে ঝুলে ছিল না। সীমান্ত সংলগ্ন জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আকবর আলী জানান, আমি যখন ওজু করতে উঠি, ক্ষেতের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পাই।
ভারত থেকে পাঠানো ময়নাতদন্ত রিপোর্টে গুলিবিদ্ধ হয়ে ফেলানীর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের চিকিৎসক নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে ওই প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি। রাজাপুর থানার ওসি রুহুল আমিন জানান, ভারতের রিপোর্ট ও এখানকার রিপোর্ট একই।
সে সময় ফেলানী হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করতে আসা মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক স্কট কার্নি ঘটনাস্থলে ওই প্রতিবেদককে বলেন, ‘‘সাধারণ সীমান্ত হত্যাকাণ্ড আর ফেলানী হত্যা এক নয়। এমনকি ফেলানী যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে সেটা কোনো ক্রাইম স্পটও নয়। এটা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি হত্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে ফেলানী।”
উল্লেখ্য, হত্যা ছাড়াও বিগত অাট বছরে বিএসএফ সদস্যদের হাতে আহত হওয়া ৫৯৩ জন বাংলাদেশীর মধ্যে ২১৯ জনই নির্যাতনে আহত হন। এছাড়া ৩৩৭ জন বিএসএফ’র গুলিতে আহত হন। এই সময়ে বিএসএফ ৪৬৮ জন বাংলাদেশী নাগরিককে অপহরণ করেছে বলে অধিকার তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
এদিকে শনিবার বিবিসি বাংলায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ফেলানীর বাবা বিচার নিয়ে হাতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে তিনি কয়েক দফা ভারতে গিয়েছেন। কিন্তু সেখানে বিএসএফের আদালতে অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়া হয়েছে। এখন মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে।” এই হত্যা মামলার বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য মানবাধিকার কর্মী, কুড়িগ্রাম জেলা জজকোর্ট পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন। তিনি জানান, আগামী ১৮ জানুয়ারি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার শুনানি রয়েছে।
কিন্তু পরিবার এতে কোন আশা দেখছেন না। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ, ক্ষোভ প্রকাশ করার পরেও অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। ভারতের তরফ থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। ফেলানী হত্যার পরে সীমান্তে একান্ত প্রয়োজন হলে রাবার বুলেট ব্যবহার করার বিষয়টি উঠে এসেছিল। কিন্তু তা কার্যকরী হয়নি। এখনও বিসেএফর গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।