হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
-শঙ্খ ঘোষ ( ‘সঙ্গিনী’, মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়)
১.
প্রথমে শওকত আলীর লেখক-প্রবণতা নিয়ে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার। সেটি হলো: তিনি কোনোভাবেই আমোদবিলানো লেখক নন। লেখালেখির শুরু থেকেই তিনি সমাজ ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ লেখক। সেই সঙ্গে ব্যক্তি-মানুষের আবেগ-অনুভূতির প্রতিও তাঁর দায় আছে। সেই দায় থেকেই তিনি এমন কোনো কাহিনি বেছে নেন না, যেখানে ‘বয় মিটস গার্ল’ দিয়ে কাহিনির শুরু-শেষ হবে। ফলে প্রেমের ওপর ভিত্তি করে তিনি যদি কিছু লিখতে চান তো সেখানে একটা ভিন্নতা থাকবে, সেটা বলা বাহুল্য। সেই দিক থেকেই হয়তো শওকত আলী ১৯৮৭ সালে লিখেছিলেন ‘ভালোবাসা কারে কয়’, আর ১৯৯২ সালে লিখেছিলেন ‘প্রেমকাহিনী’।
দুটোকেই আমরা নভেলা বলতে চাই বা ছোট উপন্যাস বলতে চাই। যদিও ছোট উপন্যাসের চেয়েও আকারে ছোট এই দুটো রচনা। কিন্তু তারপরও এদুটোকে নভেলেটও বলা গেল না। কারণ নভেলেটের সুদৃঢ় বুনন এবং জীবনে সামগ্রিকতাকে স্বল্প জায়গার ভেতরে বিস্তার দেওয়ার কাজটি এদুয়ে নেই। তার বদলে ‘প্রেমে’র বিষয়টিকে খতিয়ে দেখার ইচ্ছা আছে।
প্রথমটার ভেতরে, মানে ‘ভালোবাসা কারে কয়’-তে, মাদাম বোভারির মতো লীলা নামের নারীটি ভালোবাসার সন্ধান করেই চলে, কিন্তু যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু পায় না। রবীন্দ্রনাথের গান থেকেই বোধ করি তিনি বইটির নাম রেখেছিলেন। বইটির সার কথাও বোধ করি ওই গানে থাকা:‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়’-এর মতো; আর ‘প্রেমকাহিনী’তে প্রেমটা শেষ পর্যন্ত শরীরে গড়ায়। আর সেখানেই কাহিনির ইতি হয়। ‘ভালোবাসা কারে কয়’ নামের নভেলাটি কাহিনির দিক থেকে বেশ জটিল, নানান উপকাহিনি ও সেসবের জালচক্র আছে, অন্য দিকে ‘প্রেমকাহিনী’ নভেলাটাতে তিনি একটু মেটাফিকশান ধাঁচ আনতে চেয়েছেন। রচনাটি সম্পর্কেই রচনার ভেতরে নানান প্রশ্ন ও প্রস্তাবনা এনেছেন। পাঠককে সম্বোধন করে এটা-ওটা উত্থাপন করেছেন। কোন দিকে, কী যাচ্ছে যা যেতে পারতো- সেগুলি সম্পর্কে স্বাগত-ভাষণের মতো করে লেখক এসে বার বার হাজির হয়েছেন।
দুটো নভেলাতেই যে দু জোড়া নারী-পুরুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারা দুজনেই যৌবন পার হয়ে পৌড়ত্বের দিকে পৌঁছেছে। দুটো উপন্যাসের ভেতরে মিলও আছে। দুটো নারী চরিত্রই তাদের বিপরীতে থাকা এক বা একাধিক পুরুষ চরিত্রের চেয়ে উজ্জ্বল। দুটো নভেলাতে থাকা নারী চরিত্র দুটির সন্তান ক্যাডেট কলেজে পড়ে। তবে ‘ভালোবাসা কারে কয়ে’র লীলা, ‘প্রেমকাহিনী’র নিরুর তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত। লীলা যতটা প্রজাপতি মনের অধিকারী, নিরু সেখানে যথেষ্ট হিসাবি ও সর্তক। দুজনেই রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান। লীলা গান গাইতে পারে, সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত, নিরুরও একটি বিশেষ মন আছে। নিরু গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচুড’ বইটি পড়েছে। প্রথমজনের প্রেমানুসন্ধান আদতে কোথাও পৌঁছায় না, আর দ্বিতীয়জন প্রেম দৈহিক মিলনের ভেতর দিয়ে একটা মানে হয়তো পেতে চেয়েছে। কিন্তু লীলার ক্ষেত্রে যে-আয়োজন ছিল, ঘটনাপরম্পরার, সেখানে নিরুর সেটি ছিল না। আগেই বলেছি যে, এতে বার বারই লেখক তার মতো এসে হাজির হয়ে কাহিনির ধারাগতি নিয়ে কথা বলেছেন। পাঠকদের জানাতে চেয়েছে, কী থেকে কী হলে এই কাহিনি কোন দিক কীভাবে মোড় নিতে পারে। এবং পাঠককে উসকে দিতে চেয়েছেন যখনই ঘটনাক্রমে বর্ণনা একটু ঝুলে পড়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
নারীপুরুষের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখাটা একদিকে বেশ সহজসাধ্য হলেও, সত্যিকারের প্রেমের গল্প-উপন্যাস লেখাটা ততটাই কঠিন। কথিত আছে জগদ্বিখ্যাত আইজ্যাক বেশেভিচ সিঙ্গারের মতো লেখক গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মতো লেখককেও নাকি মার্কেসের উপন্যাসে এত কিছু থাকার পরও প্রেম তেমনটা নেই বলে তার কাছে নিজের(সিঙ্গারের) অনুযোগ জানিয়েছিলেন। মার্কেস এর জবাব দিয়েছিলেন ‘লাভ ইন দ্যা টাইম অব কলেরা’ লিখে।
প্রথমটার ভেতরে, মানে ‘ভালোবাসা কারে কয়’-তে, মাদাম বোভারির মতো লীলা নামের নারীটি ভালোবাসার সন্ধান করেই চলে, কিন্তু যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু পায় না। রবীন্দ্রনাথের গান থেকেই বোধ করি তিনি বইটির নাম রেখেছিলেন
আসলে কী কোনভাবে লিখলে গল্প-উপন্যাসে প্রেমটা প্রেমের মতো হয়ে ওঠে, সেটাই বোধ হয় হাজির করা কঠিন। তারপর প্রেমের মতো এত চর্চিত বিষয় নিয়ে নতুন করে তো কিছুই বলবার নেই। তাই অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার চেয়ে চরিত্রের বয়স, স্থানকাল বদলে দিয়ে একটু নতুনত্ব আনা হয়ে থাকে। তুর্গেনেভ যেমন ‘ফার্স্ট লাভ’ লিখেছিলেন, যেখানে বাবা ও ছেলে একই নারীর প্রেম পড়েছে, তলস্তয় আনা ও ভ্রনস্কির প্রেমকাহিনি লিখতে গিয়ে রুশ সমাজের নানান দিকের কথা হাজির করেন।
ধর্মগ্রন্থ বলে: জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে তাবৎ জীবজগতকে। সেই জোড়ায় জোড়ায় মিলটা কেবল শারীরিক মিলনেই শেষ হয় না। কারো সঙ্গে প্রেমের মিলন মানে তাকে দেহমনে পেলেই হয় না। ভালোবাসাও বলে প্রেম নয়। প্রেম মানেই ভালোবাসা নয়। প্রেমটা অনেকটা নির্দিষ্ট, আর ভালোবাসা অনির্দিষ্ট। প্রেমটা শারীরিক, ভালোবাসা মানসিক।
তবে শওকত আলীর দুটো নভেলাতে প্রেম ও ভালোবাসা যেন অনেকটাই এমন স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দেখা দিয়েছে- এটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। ‘ভালোবাসা কারে কয়’তে লীলা তার ভালোবাসার গতিপথ খুঁজে পায় না। কোনো কিছু নির্দিষ্ট করতে পারে না। কিন্তু ‘প্রেমকাহিনী’তে নিরু ঠিকই একটা সমর্পনের ভেতর দিয়ে প্রেমের তৃপ্তি ও সুখ পেতে চায়। লীলার মন সন্ধান করে সত্যিকারের ভালোবাসার আর নিরু খোঁজে প্রেম চরিতার্থ করেছে শরীরের মাধ্যমে। কিন্তু আসলে দুটোর কোনোটাই কি একালের বিবেচনায় সত্যিকারের প্রেম ছিল? নাকি অন্যকিছু ছিল? এই প্রশ্নটা আমার এজন্য করতে চাই যে, প্রেমের যে নতুন গতি ও প্রকৃতি একালের দার্শনিক ও মনোবিদদের কাছে ধরা পড়েছে, তাতে আগে যা প্রেম বলে পরিচিত ছিল, তার ভিত্তিটাই নড়ে যায়।
২.
মার্কস শ্রমকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু প্রেমকে কি ততটা গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করেছিলেন? সভ্যতায় প্রেমের কি ভূমিকা সেই প্রকল্পটি হাতে নিলে তাঁর হাতে কি পুঁজির মতো কোনো মহাগ্রন্থ লেখা হতে পারতো?
পুঁজির মূল ভিত্তি শ্রম-শোষণ। আর প্রেমের ভিত্তি কী? মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের মুখে শোনা যায়, করুণাবৃক্ষই প্রেম নামের কাণ্ডের জন্ম দেয়। আর ফ্রয়েডের ‘সিভিলাইজেশান অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্ট’ বই পড়ে শুরুতেই বুঝে নিতে কষ্ট হয় না যে, প্রেম ও শ্রম- এই দুয়ের বিলিবণ্টনের ওপরই সভ্যতা বিকশিত হয়। এর সঠিক বিলিবণ্টন হয় না বলেই মানুষের অতৃপ্তি কখনো দূর হয় না। ফলে শ্রম নামের বিষয়টি নিয়ে ‘পুঁজি’ লেখা হয়, আর প্রেম যে জীবনের আরেক পুঁজির নাম- তাও তো বোধ করতে হয়, নাকি? আর্থার শোপেনহাওয়ার তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মেটাফিজিক্স অব লাভ’-এ প্রেমের যে স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, তাতে এর প্রতি এক ধরনের তিক্ততার বোধই আসলে তৈরি হয়। প্রেমের গোপনীয়তা প্রেমের শক্তি ঠিকই, কিন্তু এটাই হয়ে ওঠে ব্যক্তি-পরিবার ও সমাজ জীবনে বিচিত্র সব বিপর্যয়ের উৎস।
প্রেম আগুন। হয় জ্বলবে, নয়তো নিভে যাবে, কিন্তু কখনোই শীতল বা ঠান্ডা হয়ে যাবে না। প্রেমও প্রতিভার মতো- হয় জ্বলবে, নয়তো নিভে যাবে। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে না। প্রেম এসে শুদ্ধ করে দিয়ে যায়, জীবনের সমস্ত প্রান্তর- এই সত্যে যারা বিশ্বাস রাখেন, তাতে প্রেমের ওই অগ্নিদীপ্তিটাই বাস্তবতা পায়। প্রেমের আগুন দিয়েই জীবনের গহনা তৈরি করা যায়, জীবনকে অলংকৃত করা যায়। প্রেম হলো জীবনের এমন এক মিষ্টতা (সুইটনেস অব লাইফ) যা সমস্ত তিক্ততা থেকে মানুষকে রক্ষা করে- সেটি স্মৃতি হিসেবেও কি বর্তমান হিসেবেও।
তবে প্রেমের আরেকটি বড় দিক মনে হয় এই যে, প্রেম সমস্তর রকমের চরমপন্থার বিরুদ্ধে আঘাত হানে। মজার ব্যাপার হলো: এই আঘাতটা সে নিজে সক্রিয়ভাবে হানে না। বরং সমস্ত আঘাত থেকে প্রেম নামের সম্পর্কটা নিজেকে রক্ষা করতে চায়, কিন্তু অন্য উপাত্ত বা ফ্যাক্টরগুলি প্রেমকে মেনে নিতে পারে না। সেজন্য প্রেমের সম্পর্ক মানেই কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তির কাছে, কর্তৃত্ববাদী সমাজের কাছে একটা আতঙ্কের মতো। এটি নিজে কারো ওপরে হামলে পড়ে না, কিন্তু সবাই এর ওপরে হামলে পড়ে। আর সেই প্রেম যদি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতি-দেশ-শ্রেণিভেদ সব কিছুর অগ্রাহ্য করে হয়, তাহলে তো কথাই নেই। গেল গেল সব গেল বলে শোরগোল, বা হাহাকার শোনা যায় নীতিবাগিশদের মুখে। আর সেইসব নীতিবাগিশদের তোথামুখ ভোঁতা করে দিয়ে প্রেম নামের একটা অনুভূতির একটার পর একটা দেওয়াল ভেঙে চলে।
আঁলা রেনের বিখ্যাত সিনেমা ‘লাস্ট ইয়ার অ্যাট ম্যারিয়ানবাদ’, এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ফরাসি নব-উপন্যাস-ধারা বিশিষ্ট লেখক আঁলা রবগ্রিয়ে, এই সিনেমায় কোথাও এ-কথাটা বলা হয়নি, কিন্তু কারো না কারো এটা মনে হয় যে- ‘প্রেমের পথে যত দেওয়াল, তত করিডোর, তত দরোজা।’-প্রেম এর নিজস্ব গতিপথ খুঁজে বের করে নিবেই নিবে।
প্রেম এমন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তির নাম, যাকে কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। লা রোশ ফুকো যতই বলেন, প্রেম ও ভূত একই রকম জিনিস, দুটোর কথা অনেক শোনা যায়, কিন্তু কোনোদিন কেউ তাদের দেখেনি, তা দিয়ে প্রেমকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়া যায় না। হ্যাঁ, প্রেম তো দেখার ব্যাপার নয়, দেখানোর ব্যাপারও নয়। প্রেমের সবচেয়ে বড় দিক হলো, যে সত্যিকারের প্রেমে পড়ে সে কোনোদিন সেটি মুখে বলে না, না-বলা এই প্রেমই হল আসল প্রেম। হয়তো লিখে বলতে পারে, কিন্তু মুখে তার এই কথাটা আসেই না। আর প্রেমের কথা তো কথা দিয়ে বোঝানো যায় না। বরং কথা দিয়েই যদি প্রেমের কথা বলতে হয়, তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না, এতে লিপ্ত নারী ও পুরুষ দুটো দিক থেকেই যথেষ্ট খামতি-ঘাটতি বিরাজ করছে।
আরো একটা ব্যাপার এই যে, প্রেমের নামে যে-উন্মাদনাকে, প্রেমের নামে যে-দুর্ভোগ পোহানোকেই প্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হতো- এতে একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। আরেকজনের প্রতি তীব্র টান, তাকে ছাড়া দিবসরজনী আর কোনো কিছু ভালো লাগে না- এই যে প্রেম; যে-প্রেম জীবন থেকে সমস্ত উদ্দীপনা কেড়ে নিয়ে জীবনকে নিংড়ে মৃতপ্রায় করে দেয়- সেটা আসলে প্রেমই নয়; সেটা একধরনের আসক্তিমাত্র। যারা মাদক বা ড্রাগে আসক্ত- তাদের ডাক্তারি ভাষায় ‘ডিপেন্ডেন্ট’ বলা হয়। এর মানে এটা এক ধরনের নেতিবাচক নির্ভরশীলতা, যা জীবনকে প্রসারিত করার বদলে, বিস্তার দান করার বদলে সংকুচিত ও সংকীর্ণ করে দেয়। এটাকে আর প্রেমই বলা হচ্ছে না, এটা আসলে ‘আসক্তি’। আর আসক্তি প্রেম হতে পারে না। মনোবিদ এম.স্কট পিক তাঁর বিখ্যাত বই,‘দ্য রোড লেস ট্রাভলড’-এ উন্মাদনা নামের প্রেমকে এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। তাহলে তাঁর মতে, প্রেম কী? প্রেম হলো যা জীবনকে উদ্দীপ্ত করে, বিস্তার দান করে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ব্যক্তিত্বের দুটো নারী-পুরুষ যদি এভাবে তাদের একজন অন্যজনকে হৃদয়ের ঔদার্যে, সৃষ্টিশীলতায়, এবং বোধ ও মননের দিগন্তকে প্রসারিত করে তোলে, সেটাই হলো প্রেম। একালের অনেক মনোবিদের ব্যাখ্যায় এই প্রেম শরীরকে অতিক্রম করে যায়। অনুভূতির এমন এক স্তর যেখানে জীবন নতুন আনন্দে-সৃজনে মুখর হয়। এটা দেহনির্ভর যদিও হয়, তারপরও সেটি দেহাতিরিক্ত হয়ে ওঠে। এই প্রেম মনকে যন্ত্রণা দেয় না, বরং যন্ত্রণামুক্ত করে। সমস্ত রকমের দ্বিধাদ্ব›দ্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করে। এবং বোধ করি এই প্রেমেরই ‘নিত্য নবায়নের’ কথাই আমরা পাই নিকোলাস ক্রয়েনের সঙ্গে একালের ফরাসি দার্শনিক আঁলা বাদিয়ুর একটি আলাপচারিতায়। পর্তুগিজ কবি ফার্নান্দো পেসোয়ার উক্তি ‘প্রেম একটি চিন্তা’-এটিকে সমর্থন করেন বাদিয়ুর। ফলে প্রেমের প্রকৃতির একটি দিক হয়ে দাঁড়ায় এই যে, যে-নারী ও পুরুষ একের পর এক সম্পর্ক জড়িয়ে প্রেম ও কাম চরিতার্থ করে, সে প্রেমিক বা প্রেমময় কেউ নয়; বরং একটি সম্পর্কে, বা একটি নারী ও পুরুষকেই অবিরাম নতুন নতুন দিক থেকে আবিষ্কার করে: শত শত জনকে ভালোবাসা নয়, বরং একজনকেই শত শত দিক, লক্ষকোটিভাবে ভালোবাসা- সেটটাই হলো প্রেম, এবং এই কাজটিই আসলে প্রেমকে রক্ষা করার প্রধানতম দিক, যেখানে সম্পর্ক ক্লান্তিতে ভোগে না। সম্পর্ক অবিরাম নিত্যনতুন রূপ ও অরূপে একে অন্যের ভিতরে আবিষ্কৃত হতে থাকে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রেম কোনো গন্তব্য নয়, বরং মন বা হৃদয়ের অন্তহীন এক যাত্রা বা অভিযান।
প্রেম আগুন। হয় জ্বলবে, নয়তো নিভে যাবে, কিন্তু কখনোই শীতল বা ঠান্ডা হয়ে যাবে না। প্রেমও প্রতিভার মতো- হয় জ্বলবে, নয়তো নিভে যাবে। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে না। প্রেম এসে শুদ্ধ করে দিয়ে যায়, জীবনের সমস্ত প্রান্তর- এই সত্যে যারা বিশ্বাস রাখেন, তাতে প্রেমের ওই অগ্নিদীপ্তিটাই বাস্তবতা পায়
এই সব বিবেচনায়, জগতের বহু গল্প-উপন্যাস, কাব্যগাথা, কেচ্ছাকাহিনিকে, যেগুলি প্রেমকাহিনি নামেই খ্যাত, তার বেশিরভাগই বাতিল করে দিতে হয়, কারণ সেখানে প্রেম এক উন্মাদনার নাম, আত্মবিধ্বংসী প্রবণতার নাম। পেসোয়ার মতে ‘প্রেম’ যদি ‘একটি চিন্তা’ হয়, তাহলে প্রেম তো বুদ্ধিমান ও সৃজনশীল মানুষের একটি কৃত্য। বোকার জন্য, আহাম্মকের জন্য প্রেম রীতিমতো বিষ (ওমর খৈয়াম ‘মদ’ সম্পর্কে যেমন বলেছিলেন, ‘জ্ঞানীর তরে অমৃত এ, বোকার তরে উহাই বিষ’, -বলাা বাহুল্য, এই ‘মদ’ মদিরার মদ নয়, যেকোনো বিষয়ে মেতে থাকা, ডুবে থাকার ‘মদ’) আর সেই বিষের জ্বালা দিয়েই ভরে আছে জগতের এখনও পর্যন্ত প্রেমকাহিনি নামের চিহ্নিত কীর্তিগুলি।
প্রেমের এই নতুন দার্শনিক বিচারে প্রেম আর আগের জায়গায় থাকেনি বলে, যে-প্রেমকাহিনিগুলি, প্রেমের এই মাত্রাটিকে স্পর্শ করেনি, তাও ক্রমে এর প্রসঙ্গিকতা হারাবে? নাকি প্রেম নয়, আসক্তির এক একটি বিষাক্ত উন্মাদনা হিসেবে টিকে থাকবে- সেটাই এখন নতুন প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।
ফলে প্রেমের মান-মর্যাদা ও ঐশ্বর্য আগের স্বাভাবিক বা স্বভাবগত জায়গা থেকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত জায়গার দিকে এগিয়ে যায়। প্রেমের এই শান ও শওকতই আগের প্রেমকাহিনিগুলিকে ¤্রয়িমাণ করে দেয়। ঠিক এজায়গা থেকেই শওকত আলীর ‘ভালোবাসা কারে কয়’ এবং ‘প্রেমকাহিনী’ নভেলা দুটোকে দেখলে, সেই সত্যটাই ফুটে ওঠে যে, এখানে থাকা প্রেম ‘প্রেম’ নয়, বরং এটি একটি ‘আসক্তি’ এবং জ্বালাযন্ত্রণার উৎস- যার কোনো লক্ষ্য নেই; যে-প্রেম মানুষকে কিছুই দেয় না- কেবল আত্মক্ষরণ ছাড়া। আর ক্ষয়কে যা জয় করতে পারে না, সেটি প্রেম নয়; সেটি বিষ, সেটি অপ্রেম।
এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়-যে, প্রেমকাহিনি বা ‘প্রেমের ভাব’ (থীম) নিয়ে নামের জগতে যা কিছু লেখা হয়েছে, হচ্ছে, এর মূল ব্যাপারই হলো ‘প্রেমের অভাব’। প্রেমের অভাবই প্রেমকাহিনিকে প্রেমকাহিনি করে তোলে। তবে এমন প্রেমকাহিনিও কম নেই, যেখানে প্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই প্রেমিক- প্রেমিকা সমস্ত বাধাবিপত্তি পার হয়ে চলে। তাদের সমস্ত ত্যাগ, তিতিক্ষা, দুর্ভোগ্যকে, তারা অতিক্রম করে যেতে পারে। প্রেম তাদের সমস্ত যন্ত্রণার নিরাময় হয়ে দেখা দেয়। চলচ্চিত্রে এরকম প্রেমকাহিনি নিত্যই দেখা যায়। তবে সেগুলিতে ‘প্রেম একটি চিন্তা’ হয়ে থাকে না। সেখানে একটি শরীরী ব্যাপার থাকে যেমনটা সাহিত্যেও থাকে। আগেও বলা হয়েছে যে, প্রেম শরীর বাদ দিয়ে তৈরি হয় না। বরং শরীরকে নির্ভর করেই তবে শরীরকে অতিক্রম করে। একটি বিশেষ রকমের আধ্যাত্মিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। আত্মিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। কিন্তু ঠিক কোন জায়গা থেকে সেটি আত্মিক ব্যাপার হয়ে ওঠে, এখানেই প্রেমের রহস্য, সেই রহস্য ভেদ করা যায় না। বরং সমাকামী প্রেমের মতো বিষয়গুলিতেও যখন দেখা যায়, শরীর নয়, ওই আত্মিকতাই তীব্র হয়ে দেখা দেয়, তখন মনেই হয় প্রেম কেবল যোনি ও লিঙ্গের বা একটি ছিদ্রান্বেষী ব্যাপার নয়। বরং জীবনের বিচিত্রসব ছিদ্রপথকে ভরাট করে দেওয়ার ব্যাপার। বা যা কিছু জীবনকে ছিদ্র করতে চায়, ঝাঁঝরা করে দিতে চায়, প্রেম হয়ে ওঠে একটি ছিদ্রহীন অবিনশ্বর ঢাল। প্রেম তো আসলে আর্ট বা শিল্পকলার মতো। আগে থেকে ছক কেটে সেটা নির্মাণ করা যায় না। কিন্তু নির্মিত হলে সেটিকে গড়েপিটে নেওয়া যায়। প্রেমের পাগলামিই বরং প্রেম নয়। প্রেমর জন্য উন্মাদনা প্রেম তো নয়ই বরং তা হিংস্রতা ও অমানবিকতার দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়। সিগুমুন্ড ফ্রয়েড থেকে আঁলা বাদিয়ুর প্রেম বিষয়ক তত্ত্বগুলি পড়লে একটা ধারাক্রম পাওয়া যায়। প্রেম বিষয়ক সাম্প্রতিক আরো যে যে ধারণা পাওয়া যায় সেসবও অনেকটাই ভারসাম্যনির্ভর।
এই নশ্বর জীবনে এই প্রেমই অমরত্ব এনে দিতে পারে। যে-প্রেমের কাহিনি আগে একভাবে লেখা হয়েছে, কিন্তু সেটি আরো নতুন করে, নতুন চেতনায় এখানো সাহিত্যে ফলতে পারে। আর সেই প্রেম ফলানোর ক্ষেত্রে আগের প্রেমকাহিনিগুলিতে দেখা প্রেমগুলি এক ধরনের নির্দেশক। সেদিক থেকেই শওকত আলীর মতো আরো যারা কেবল ‘বয় মিটস গার্ল’ হিসেবে প্রেমকে দেখেননি, তাদের মূল্য হারায় না।