Jobanশওকত আলী ও লখিন্দরের বাসরঘরের সাপ

শওকত আলী ও লখিন্দরের বাসরঘরের সাপ

আধুনিক বিশ্বে মানুষের শ্রেণিবিরোধের ইতিহাস সরল হয়ে এসেছে। এক শ্রেণির মানুষ নিরঙ্কুশ পাচ্ছে, নিচ্ছে আর ভোগানন্দে মত্ত আছে। অন্য একটি শ্রেণি প্রতি মুহূর্তে হারাচ্ছে, জমি-সম্পদ-শ্রম-শরীর সব হারাচ্ছে, যেখানে দাঁড়াচ্ছে সেখানেই তার কিছু না কিছু খোয়া যাচ্ছে। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে’ জানিয়েছিলেন, গোটা সমাজটাই এমন দুটি বিশাল শত্রু শিবির বিভক্ত হতে যাচ্ছে যেখানে লড়াই অনিবার্য। তারা অনেক সূত্র, ব্যাখ্যা তৈরি করে লড়াইয়ের একটি কার্যকরণ বের করেন। এই লড়াইয়ের সমাপ্তির জন্য সমস্ত পৃথিবীটাকেই বিরাট বিপ্লবের মধ্যে ঠেলে দিয়ে কত কিছুই না ঘটিয়ে ফেললেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মানবসভ্যতার এই আদিঅন্তহীন বিরোধের কী কোন মীমাংসা আছে? এই বিরোধকে চিহ্নায়িত বা সংজ্ঞায়িত বা ব্যাখ্যায়িত করার বিরাট চেষ্টাকেও একসময় এসে থেমে যেতে হয় কেন? কমিউনিস্ট বিপ্লবের মতো স্বর্গ-মর্ত্যব্যাপী একটি বিপ্লবকেও মোটামুটি ব্যর্থ বলেই চালিয়ে দেওয়া যায়। এসব প্রশ্নের সরল কোন ব্যাখ্যা নেই। এই লড়াইয়ের শুরু বা শেষ বলে কিছু নেই। এক জীবন থেকে প্রবাহিত হয় আরেক জীবনে। তবে, এই অমোঘ লড়াইয়ে পক্ষ-প্রতিপক্ষ যেহেতু একটাই, তাই শত্রæকে চরম আঘাত ও বিজয় এই লড়াইয়ের একমাত্র লক্ষ্য। চরমতার চূড়ান্ত ধাপে না পৌঁছা পর্যন্ত প্রতিপক্ষের লড়াইয়ে শেষ নেই।

সময় পাল্টে গেছে। শুধু মার্কস-এঙ্গেলেসের অনুগামীরা নয়, অতি সাধারণ মানুষটিও জানে, দুনিয়া এখন দুভাগে বিভক্ত। একটি শোষকের দুনিয়া, আর একটি শোষিতের দুনিয়া। একদিকের সম্পদ ও সুখের প্রাচুর্য, আরেকদিকে মৃত্যুপরাকীর্ণ জীর্ণ জীবনের কোলাহল। তাই, শওকত আলীর ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থটির ১০টি গল্প পাঠ শেষে আমার উপলব্ধিটা প্রকাশের জন্য উপরের কথাগুলো বলার কোন দরকার ছিল কি না এ বিষয়ে আমি সংশায়িত। এমনিতেই, খুব অবাক হয়ে বা খুব সন্তুষ্টচিত্তে শওকত আলীর গল্প কোনদিনই পড়তে পারিনি। হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প পড়তে গিয়ে এমন অসন্তুষ্টি ও তিক্ততার মুখোমুখি হই। গল্প পাঠ শেষে পিঠে চাবুক পড়বেই। কঠিন চাবুক দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে সমস্ত শরীর।

‘শুন হে লখন্দর’ গল্পগ্রন্থের রচনাকাল ১৯৭৪-১৯৮৫। এতদিনে স্বাধীনতার শরীরে ক্লেদ, ক্লান্তি ও নতুন জিজ্ঞাসাচিহ্ন যোগ হতে শুরু হয়েছে। নিজের কাছে সৎ থাকলে বলতেই হবে, এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বিজয়দিবসের পরের দিন থেকেই। প্রায় নিরস্ত্র সাধারণ কৃষক, ক্ষেতমজুর, ছাত্রের জীবন, সম্পদ, শ্রম ও রক্তের মূল্যে স্বাধীনতা আসে। তারা ভাবেনি, এর থেকে ফায়দা লুটা যায়। রাষ্ট্রের শাসনের শুরুর স্তম্ভ থেকে শেষ স্তম্ভ পর্যন্ত সর্বত্র জেঁকে বসে সেই পুরনো সুবিধাবাদীরা। আর গ্রামপর্যায়ে জেঁকে বসে ভূমিমালিক সেই ধূরন্ধর জোতদার ও সগোত্রীয়রা, যাদের প্রায়াংশ প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ রাজাকার বা যুদ্ধবিরোধী ছিল। তাদের কিছুই খোয়া যায়নি। বরং সম্পদ ও নারীর প্রাচুর্যের নয়মাস তাদের চিরকালের তপস্যা। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ফের আরেকবার সম্পদ ও অবাধ নারীসঙ্গপ্রাপ্তির সুখ লাভের দুর্লভ সুযোগ এনে দেয়। এবার তারা শ্রেণিশোষকের ভূমিকায়। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের পরে এরাই রাষ্ট্রশাসনের অংশীদারিত্বে পরিণত হয়। সামরিক শাসকের ক্ষমতা ও দল দুটিতেই এদের অবস্থান মাকড়সার জালের মতো-শাসন-শোষণে পাকিস্তানি ঐতিহ্য পুনঃপ্রবর্তনের নিমিত্তে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে সর্বব্যাপী প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। বাস্তবতা তাদের অনুকূলে ছিল। তারা দুই জাদরেল সামরিক শাসকের প্রধান সহায়ক ছিল। তারাই তৃণমূলে দলগঠনের প্রধান নির্ভরতা ছিল। এই অজেয় শক্তির জোতদার-মহাজান ও তাদের শোষণের শিকার কৃষক-শ্রমিকের বিরোধ ও সংঘর্ষকে বিষয় করে শওকত আলী লেখেন প্রায় ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থের সবকটি গল্প। এর পশ্চাৎ কারণ কী হতে পারে? তবে কি শওকত আলী সামরিক শাসনের রোষানল বাঁচিয়ে গ্রামীণ জোতদার-মহাজনদের শোষণকে বিষয় করেছেন, যা মূলত শরৎচন্দ্রযুগেরই অনুকৃতি? নাকি সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাজনীতি বিবর্জিত স্বৈরশাসনের একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে আঘাতের জন্য একেবারে মূলের দিকে তাকিয়েছেন। তাই হতে পারে। কারণ, সেই দুর্দান্ত ষাটের দশকের সবকিছু উল্টেপাল্টে ফেলোর দলের একজন ছিলেন শওকত আলী।

একদিন শোষিতের প্রতিশোধ লিপ্সা কী ভয়ানক ও বীভৎস হতে পারে তার দৃষ্টান্ত ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পের গোসাপজীবী সাঁওতাল গুপীনাথ। জনবিচ্ছিন্ন স্থানে নির্জন রাতে একটি ঘরে লখিন্দরের মতো সুরক্ষিত মহাজন লক্ষ্মীকান্ত ও অন্ত্যজ গুপীনাথর মুখোমুখি হয়েছে। কমিউনিস্ট ইশতেহারের বর্ণিত দুই শত্রু শিবিরের দুই প্রতিনিধি তারা। মহাজন বেহুলা-লখিন্দর-চাঁদসওদাগর গোত্রীয়, আর সাঁওতাল গুপীনাথ দেবী মনসার সন্তানতুল্য। গল্পের বিষয়-বিন্যাসে বেহুলা-লখিন্দরের লোককাহিনীকে প্রতীকায়িত করেন গল্পকার। দেবী মনসা ও চাঁদসওদাগরের দ্ব›দ্বকে ধনী-গরিবের লড়াই হিসেবে দেখানো হয়। প্রথমেই গুপীনাথ শ্রেণিবিরোধের জায়গাটিকে স্পষ্ট করে নিয়েছে।

চান্দো সওদাগর কে-আর বিষহরি মায়ী কে? ই তোর মানুষ আর দেবতার নাঢ়াই নহে বাবু মসয়-ই হইল গরিব আর ধনীর নাঢ়াই। যেমন বিষহরির সন্তান, হামার বাড়ি নাই, ঘর নাই, জমি নাই, জিরাত নাই-আর তুই হইলো ধনী চান্দো সদাগরের সন্তান। তোর সব আছে। হিসাব করে দেখ বাবু মসয়, কথাটা হামার ঠিক কি না।

এরপরেই শুরু হয় গুপীনাথের প্রতিশোধ উন্মত্ততা। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ও শোষণের অলিখিত বহু হিসাব জমে আছে মহাজন লক্ষীকান্তের কাছে, কিন্তু সে শুধু তার নিজের হিসাব চায়নি। বিরাট এক লেনদেনের খাতা খুলে বসে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মহাজন অসহায়ভাবে দু’দফা টাকা দিয়েও আত্মরক্ষার কোন ব্যবস্থা হয়নি। গুপীনাথের এক থলেতে বিষাক্ত সাপ আছে। গোসাপের শরীর থেকে নৃশংস কায়দা চামড়া বিচ্ছিন্ন করে বীভৎস সাপ ছেড়ে দিচ্ছে ঘরে। সেই চামড়ার ক্রেতাও মহাজন লক্ষীকান্ত। সে গুপীনাথের দু’শো চামড়ার টাকা আত্মসাৎ করেছে। টাকা চাইতে গিয়ে উল্টো প্রহৃত হতে হয় গুপীনাথকেই। তাই, প্রথমে তার সেই দুশো চামড়ার টাকা দাবি করে। তারপর সে দাবি করে সাঁওতাল পাহাড়ের অধিবাসী তার দাদা, পরদাদার হিসাব, যারা এই মহাজনদের দ্বারাই উচ্ছেদ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। গুপীনাথের এই হিসাব মহাজন লক্ষীকান্তের মাথায় ঢুকে না। গুপীনাথ ধরিয়ে দেয় সেই হিসাব ‘আকালের সময় কত চাউল তুই কিনে রাখিছিলি, সেই হিসাবটা কর পরথমে-তারপর বানের সময়কার হিসাবটা, তার ফের গহমের হিসাবটা। এই রকম করে করতে থাক হিসাবটা।’

প্রলেতারিয়েত মানুষরা বুর্জোয়া শ্রেণিশোষকদের খুববেশি নিজেদের আয়ত্তে¡ পায় না। তারা শুধু আঘাত সয়ে যায় নীরবে, কিন্তু একবার যদি পায় তবে এমন মরণ আঘাত করে বসে, তখন আর উঠে দাঁড়াবার কোন সুযোগ রাখে না। মহাজন লক্ষীকান্ত যতভাবেই আপোষরফায় আসতে চায় না কেন, গুপীনাথ কিন্তু উদ্দিষ্ট লক্ষ্যচ্যুত হয় না। কারণ, এই রাতই তার মোক্ষম রাত। এরপরে কী হতে পারে সে ভাল করেই জানে। গুপিনাথ অত্যন্ত নির্বিকার ও নিষ্ঠুর। তার নিজের, তার দাদা-পরদাদার, আরও আগের পূর্বপুরুষের এবং সমস্ত অন্ত্যজ, বঞ্চিত ও শোষিত প্রলেতারিয়েতের পক্ষে হিসাব তার নিতেই হবে। ‘হামার হিসাবটা মিটায় দে তুই’-বলে গুপীনাথ বস্তার মুখ খুলে বিষাক্ত কালি গহমা ছেড়ে দেয়। বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘরের মতো মহাজন লক্ষীকান্তের অন্ধকার ঘরে এবার উন্মুক্ত হিং¯্র কালিগহমা, অন্ত্যজদের দেবতা। অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায় গল্পকার বেহুলা-লখিন্দরের লোককাহিনিকে শেষ পরিণতিতে ব্যবহার করেন।

একদিন শোষিতের প্রতিশোধ লিপ্সা কী ভয়ানক ও বীভৎস হতে পারে তার দৃষ্টান্ত ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পের গোসাপজীবী সাঁওতাল গুপীনাথ। জনবিচ্ছিন্ন স্থানে নির্জন রাতে একটি ঘরে লখিন্দরের মতো সুরক্ষিত মহাজন লক্ষ্মীকান্ত ও অন্ত্যজ গুপীনাথর মুখোমুখি হয়েছে

 

অপেক্ষা আর বাকির ফাঁকি ও ফাঁদে পড়েনি গুপীনাথ। কারণ এই ফাঁক-ফাঁকির ফাঁদে পড়েই তাদের অবশিষ্ট বলে কিছু নেই। কোথাও তাদের আশ্রয় নেই। তাদের ঘরবাড়ি, পুকুর, মাটি, জল সবই মহাজন লক্ষীকান্তের মতো মুষ্টিমেয় কিছু মহাজন-জমিদার বা শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাদের শ্রমে উৎপাদিত সম্পদ মহাজনের ঘরে উঠে, কিন্তু তাদের অনাহারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আর যারা এই অপেক্ষা করতে অস্বীকার করে তাদের হয় চোর হতে হয়, না হয় সর্বস্বান্ত হয়ে দেশান্তরি হতে হয়। ‘অচেনা’ গল্পের কিসমত আলী মহাজনের গোলার ধান চুরিকে বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচনা করে। তার শ্রমে উৎপাদিত ধান তাকেই রাতের আঁধারে চুরি করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য ‘,জমিতে চাষ করলাম আমি, ফসল ফলালাম আমি, সেই ফসল যদি আমি নিই তাহলে চোর হব কেন? … একবার করে আকাল পড়ে আর শালা তোমাদের জমি বাড়ে।’ এরপর একে একে যা ঘটে তাতে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়, শওকত আলী সামাজ-বিন্যাসটাকে ভেঙে ফেলার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। মহাজনের অকহতব্য নিষ্ঠুরতার ও বৈষম্যপীড়নের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ন্যায়বাদিতার ধারণা থেকে সরে এসেছেন তিনি। ধান চুরি করে বিরাট বস্তা পিঠে ফেলে সগৌরবে মহাজনের উঠোন দিয়ে বেরিয়ে আসে কিসমত। যে দুজন দেখেছে, বাড়ির কাজের পুরুষ ও মেয়েমানুষ, তারাও কিসমতের এই ধান চুরির সমর্থক। তাই অবলীলায় অস্বীকার করে কিসমতকে দেখার বিষয়টি। অর্থাৎ গল্পকার স্পষ্টতই দুটি শ্রেণির বিরোধকে সামনে আনেন। এ বিরোধকে আরও শানিয়ে তুলেন ‘সোজা রাস্তা’ গল্পে। দুর্ভিক্ষপীড়িত, অনাহারী প্রাণসর্বস্ব মানুষগুলোকে সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়ে যে রাস্তা তৈরি হতে যাচ্ছে, যে রাস্তা তাদেরই শ্রমে হবে, সেখানে লুকিয়ে আছে পরিকল্পিত এক প্রহসন। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের রুদ্র-নিষ্ঠুররূপ পাই গল্পে। খাদ্যাভাবে মানুষ আর মানুষ নেই, ভিটে-মাটি-জল সব মহাজনের দখলে চলে যাবার পরে নিরুপায় পিতা যুবতী কন্যাকে খাদ্যের বিনিময়ে মহাজনের কাছে বন্ধক দিতে ঘুরে, এই বীভৎসতার মধ্যেও ভূমিহীন অন্ত্যজ মানুষদের জন্য নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি হয়। রাস্তা তৈরি ফাঁদ শুধু ভুখাদের শ্রমশোষণই লক্ষ্য নয়, একেবারে নিঃস্ব ও নিশ্চিহ্ন করার কৌশল করেছে। তাই, সোজা রাস্তার নামে এমন এক জটিল ও বক্র রাস্তার মানচিত্র তুলে ধরে গ্রামের ভুখাদের সামনে, যেখানে মহাজন-জোতদারের ঘরবাড়ি-জমি-সম্পদ বাঁচিয়ে দেয়া হয়েছে। এই কাজে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা আছে। দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর হিড়িক চলছে, তাদের জন্য খাদ্য ও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা না করে সরকারের রাস্তা তৈরির তোড়জোরের পশ্চাৎ কারণ কী হতে পারে, এ কথা গ্রামের ভুখাদের অজানা থাকে না। বিশেষত, কালু মণ্ডলের মতো ভূমিখেকো যখন রাস্তার কাজে সম্পৃক্ত, সরকারি কর্মকর্তার পরামর্শক, তখন তাদের আর বিশ্বাস করবার কারণ নেই যে, এই রাস্তা তাদের কল্যাণে হচ্ছে। এমনকি, রাস্তার মাটিকাটার বিনিময়ে যে গম দেবার কথা, সেটিও এক ধরনের ফাঁকি ও চালবাজি। সমস্ত গ্রামের ভুখা মানুষদের একত্রিত করে, উন্নয়ন ও সুদিনের কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে ভরে দিয়ে অবশেষে যখন কোদালে কুপ ফেলতে যায় তখন তারা টের পায়, কী ভয়ানক ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। যুদ্ধ ও আকাল সমভাবে আক্রমণের পরেও অবশিষ্ট যে যৎসামন্য ভিটে-ঘরবাড়ি ছিল, এবার রাস্তার পেটে তার পুরোটাই যাচ্ছে। কিন্তু সরকার বাড়ি, মণ্ডল বাড়ি, চৌধুরী বাড়ির পাকা ভিটে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকছে। আর তারা ভুল করেনি। সম্মিলিত কোদাল একত্রে শূন্যে উঁচিয়ে সেদিকেই ফেলতে যায় যেদিকে মহাজন-জোতদারের বাড়ির ভিটে। তাদের ‘উত্তোলিত কোদালের ফলা ক্রদ্ধ চৈত্রের রোদে ভয়ানক ঝকঝক করে ওঠে’। শ্রমজীবী শোষিত জনগোষ্ঠীর ভেতরের অবদমিত ক্রোধ বিপ্লবে রূপান্তিত হয়। এবার তারা মহাজন-জোতদারের একটি সুকল্পিত অপচেষ্টাকে রুখে দিতে পারে।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে গ্রামীণ জীবন ও জনপদে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নেমে আসে। মুক্তিযুদ্ধের ধকল শরীরে থাকতেই অনাকাক্সিক্ষত এই দুর্ভিক্ষ গ্রামবাংলার কৃষি নির্ভর সামাজিক-বিন্যাস ভেঙে পড়ে। স্বল্পজমির চাষি, ক্ষেতমজুর, শ্রমিক শ্রেণির মানুষ পরিপূর্ণ বেকার হয়ে পড়ে। অন্নাভাবে পতিত এই শ্রেণির মানুষকে মৃত্যুর নিয়তি বরণ করে নিতে হয়। এদের বিরাট অংশ মৃত্যু ও ক্ষুধাকে সঙ্গে নিয়ে শহরে ছুটে আসে বটে, তবে শহরে এসে তারা নতুন এক সংকটে পড়ে। কোথাও তাদের খাদ্য বা আবাসনে ব্যবস্থা নেই। মৃতবৎ মানুষগুলোকে ড্রেন-ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে খাদ্যের প্রতিযোগিতায় নেমে প্রায়শ হেরে যেতে হয়। এই মানুষকে বাঁচানোর কোন উদ্যোগ নেই সরকারের। এমনকি শহরের কোন সংগঠন বা ধনীক শ্রেণির কোন মানুষ তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতি প্রদর্শন করে না। যারা সামান্য খাদ্য ও অর্থ নিয়ে আসে তারা বিনিময়ে ভাসমান ক্ষুধার্ত যুবতী নারীদের শরীর দাবি করে। বিরাট প্রত্যয়, ভয়াবহতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট, নারী নির্যাতনের অর্থাৎ বিপুল জীবন ও সম্পদের বিনাশের ভেতর দিয়ে আসে স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার সুফলপ্রাপ্তিতে সাধারণ মানুষের কোন অধিকার নেই। একশ্রেণির জোতদার-জমিদার-পুঁজিপতি স্বাধীনতার নিরঙ্কুশ সুখ-সুবিধা-প্রাপ্তি নিজেদের করে নেয়। তারাই দুর্ভিক্ষের প্রকোপে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা ক্ষুধার্ত নারী ভোগের মতো পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে উঠে। ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থের প্রায় সবকটি গল্পেই এই দুর্ভিক্ষের ছায়া বা প্রত্যক্ষ দুর্ভিক্ষের উপস্থিতি আছে। তবে ‘ডাকিনী’ গল্পে দুর্ভিক্ষের নিরেট বাস্তবরূপ পাই। ‘এ এক প্রাচীন নিয়ম- দুর্ভিক্ষ হলে মেয়েছেলে সুলভ হয়ে যায়।’ এই সুলভতার সুযোগ সকলেই কমবেশি গ্রহণ করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। এমনি এক বাস্তবতায়, শহরের জনবহুল এক স্থানে এসে দাঁড়ায় সুঠাম স্বাস্থ্যের এক গ্রাম্য যুবতী। আকালের প্রকোপে যারা গ্রাম ছেড়েছে তাদের চেহারার চেয়ে এই মেয়েমানুষটির পার্থক্য সকলের চোখে ধরা পড়ে। শুকনো মরা হাড্ডিসার নেতানো শরীরের বীভৎস চেহারার মেয়েমানুষ দেখে চোখ যাদের পচে গেল, তাদের জন্য এরকম বেওয়ারিশ সুঠাম যুবতী নারী লোভনীয় বটে। তাই হোটেলের কর্মচারি থেকে মহাজন, সবজিবিক্রেতা, এমনকি লঙ্গরখানার সাহেবরা পর্যন্ত মেয়েমানুষটিকে কীভাবে দখলে আনা যায় একপ্রকার সেই প্রতিযোগিতায় নামে রুদ্ধশ্বাসে। আকালের বাচ্চাদের ধরে নিতে আসলে নাটকীয়ভাবে পুলিশের সাথে মেয়েমানুষটি সংঘর্ষ বাঁধে এবং একটি যুদ্ধপরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশের আক্রমণে রক্তাক্ত মেয়েমানুষটি প্রায় উলঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত ক্লান্ত শরীর নিয়ে নেকবর মিয়ার হোটেলে আশ্রয় নিলে সেখানে তৈরি হয় নতুন এক দৃশ্যপট।

মেয়েমানুষটির সাহসে মুগ্ধ নেকবর মিয়া। কারণ, ‘ভেজা ত্যানার স্তূপের মতো পড়ে থাকবে-নড়বে না চড়বে না- এই দেখে তার ঘেন্না ধরে গেছে। জ্যান্ত, তেজী, মাংসল মাগুর মাছ হাতের মুঠোর মধ্যে যেমন জোর করে, পিছলে বেরিয়ে যেতে চায়, মেয়েমানুষ তেমন না হলে কি আর সুখ আছে ? ’মেয়েমানুষটি হোটেলে আশ্রয় নিলে এই সুখ রাতেই হাতের মুঠোয় চলে আসে। হোটেলের বাইরে ক্ষিপ্ত পুলিশের টহল, ভেতরে বাতি নিভিয়ে নেকবর মিয়া ধীরে ধীরে মেয়েমানুষটির শরীরে হাত রাখে, পোশাক খুলে। কিন্তু সেদিকে মেয়েমানুষটি কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত সত্তা জুড়ে আশ্রয় নেয় তিস্তাপাড়ের যুবতী বধূটি, তার সংসার, স্বামী, সন্তান। এমনকি, ‘অন্ধকার ঘরে মনে হয় সে দুধ দিচ্ছে ছেলেকে। হাত দিয়ে ধরে মাথাটা। আর তক্ষুণি মনে হয় বোঁটা কামড়ে যেন ছিঁড়ে নিতে চাইছে একটা জানোয়ার।’ দিনে পুলিশের সাথে সে একা লড়েেেছ। মধ্যরাতের অন্ধকার ঘরে আদিম হিংস্র এক জন্তুর কাছে সে নিঃশর্ত পরাজয় মেনে নেয় কী করে? নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নেকবর মিয়া তার স্বপ্নের মেয়েমানুষটির শরীর দখলে নিতে গেলে প্রথমে সে হাত-পা ছুঁড়ে, খামচে, ঠেলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েমানুষটির প্রতিটি আঘাত নেকবর মিয়ার নেশায় উন্মত্ত কম্পমান শরীরে নতুন নতুন আনন্দের শিহরণ জাগিয়ে তুলে।

নেকবর মিয়া তার স্বপ্নের মেয়েমানুষকে পেয়েছে যেন। প্রতিটি আঘাতে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটা ঝটকায় তার ঠোঁট কেটে গেলো-নোনতা স্বাদ টের পেল জিভে, সে থৈ থৈ উল্লাসে ভাসতে লাগল। যখন কঠিন আঙ্গুল তার গাল খামছে ধরে, তখন তার মুখ দিয়ে আরামের শব্দ বার হলো, আহ্। যখন মেয়েটা তার ঘাড় কামড়ে ধরেছে, তখনো তার গলায় চরম সুখের স্বর শোনা গেল, আখ্। আরো দে, জোরে কামড় দে-চাপা উত্তেজিত শব্দ বাইরে থেকেও শুনতে পেল রুদ্ধশ্বাস বাবুর্চি আর মনু মিয়া।

তিস্তাপাড়ের মেয়েমানুষ তখন জানোয়ারটির টুঁটি কামড়ে ধরেছে। দাঁত বসিয়ে দিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছে মাংস ছিঁড়ে আনার জন্যে। আর জানোয়ারটা তখন ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার আরম্ভ করে দিয়েছে, ছাড়, লাগে, উহ্ ,বাঁচাও-মাইরা ফালাইলো-বাঁচাও।

মধ্যরাতে একজন প্রৌঢ়ের হিংস্র নেশার উন্মত্ততা ও একজন গ্রাম্য যুবতী বধূর আত্মরক্ষার হিংস্র চেষ্ট-এই দুই হিংস্রতার শেষে জয় হয় গ্রাম্য বধূটির। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে গ্রামে টিকতে না পেরে স্বামী-সন্তান-সংসার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বেঁচে থাকার দুর্মদ আকাক্সক্ষা নিয়ে শহরে এসেছিল এই গ্রাম্য বধূ। এখানে এসে তার খাদ্যের সংস্থান হয়নি, বরং সে নিজেই খাদ্যে পরিণত হয়। প্রচণ্ড ক্রোধ ও ঘৃণা নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী পুলিশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে যেমন একাই লড়েছে, তেমনি সে আত্মরক্ষা করে মহাজনের যৌনলিপ্সা থেকে। মহাজনকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে মেয়েমানুষটি যখন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে তখন তার হাতে, ঠোঁটে, জিভে, বুকে সমস্ত শরীর জুড়ে টকটকে তাজা রক্ত। সে তখন আদিম হিংস্র ক্ষুধার বিরুদ্ধে বিজয়িনী এক নারী।

শওকত আলীর গল্পে প্রলেতারিয়েতের বিপ্লব সংঘটনের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ কোন আয়োজন করতে হয় না। কাহিনিতরঙ্গের শেষ তরঙ্গে সেটি এমনিতেই বিপ্লবে রূপান্তরিত হয়। প্রত্যেকটি গল্পের কাহিনির সমাপ্তির একই প্যাটার্ন। প্রত্যেক গল্পেরই কেন্দ্রীয় চরিত্রই মহাজন বা জোতদারের অন্যায় নিষ্পেষণের শিকার হয়ে শ্রম, সম্পদ বা স্ত্রী হারিয়েছে। তবে কেউ-ই নির্বাক্যে এই অন্যায় মেনে নেয় না, বা নির্যাতনকে নিয়তি মেনে নিয়ে জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ করে বেঁচে থাকতে চায় না, অথবা স্বেচ্ছামৃত্যুর পথেও হাঁটে না। প্রকাশ্যে ক্রোধ প্রকাশের সামর্থ্য নেই বটে, তবে তারা বিশেষ একটি মুহূর্ত ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তারা জানে, এই সুযোগ একদিন আসবেই, আসতেই হবে। কারণ, দিবসের শেষে রাত আছে। রাতের পৃথিবী যখন আদিম অন্ধকারে তলিয়ে যায়, তখন মানুষের ভেদাভেদ কমে আসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে ‘প্রগৈতিহাসিক’ গল্পে কথিত সেই আদিম অন্ধকারে ভিখুরাই চিরকাল জয়ী হয়। তাই দেখা যায়, শওকত আলীর ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থের প্রায় প্রত্যেকটি গল্প সংঘটনের সময়কাল রাত। সাঁওতাল সাপুড়ে গুপীনাথ, ‘অচেনা’ গল্পের কিসমত আলী নিজেদের হিস্যা বুঝে নিতে রাতের পৃথিবীকে বেছে নিয়েছে। একইভাবে ‘অন্ধকারের গান’, ‘কুদরতের গল্প’, ‘ডাকিনী’, ‘অপেক্ষা’ গল্প চতুষ্টয়ের কাহিনি সমাপ্তিতে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের আবহ তৈরি হয়েছে। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসলে অন্ত্যজ মানুষদের আচরণ ও কথাবার্তা আদিম হয়ে উঠে। তাদের শরীরে জেগে উঠে আসুরিক শক্তি। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রও আদিম চাকু-দা। নিম্নশ্রেণির হওয়ায় তাদের ক্রোধ ও প্রতিশোধপরায়ণতার মধ্যে কোন প্রকার আবরণ থাকে না। তাদের ভিটেবাড়ি, জীবন-জীবিকা, নারীসুখ, সংসারসুখ কেড়ে নিয়ে যারা তাদের এই আদিম আততায়ী বানিয়েছে, তাদের জীবন ও সম্পদের উপরে তারা তখন ক্ষমাহীন নিষ্ঠুর আক্রমণ করে বসে। ‘অন্ধকারের গান’ গল্পের নিরীহ সাধারণ গোবেচারা টাইপের কসিমউদ্দিন, আর জেল ফেরত কসিমউদ্দিনের বিস্তর ফারাক ঘটে যায়। মহাজন তার সুন্দরী স্ত্রী নুরবানুকে করায়ত্ত করার নিমিত্তে পরিকল্পিতভাবে চোর সাব্যস্ত করে জেলে পাঠিয়েছিল। জেলফেরত কসিমউদ্দিনকে ফের মণ্ডল মহাজন বিচারের মুখোমুখি করে। কিন্তু এবার কসিমউদ্দিন জীবনের ধারাপাত শিখে এসেছে, তাই নিচু গলায় কিন্তু স্পষ্ট ভাষা জনসম্মুখে বলে ফেলে, ‘নুরবানু কেমন আছে?’ আতঙ্কিত ও ক্রদ্ধ মহাজনের প্রচণ্ড লাথিতে ছিটকে পড়লেও কসিমউদ্দিন উঠে দাঁড়ায়। দূর থেকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে মহাজনের আতঙ্কের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে সে। মহাজনের আমোদশালায় বন্দি নুরবানু পোশাকে, অলঙ্কারে, খাদ্য-খাবারে সুখ-প্রাচুর্যের মধ্যে আছে, এই খবরটিও কসিমউদ্দিনকে নিবৃত করতে পারেনি। মহাজনের বাড়ানো হাত থেকে আত্মরক্ষার কোন উপায় ছিল না অনাথ যুবতী নুরবানুর, বিশেষ একটি দুর্বিপাকে পড়ে নুরবানুর দেহের শুচিতা নষ্ট হয়েছে, তাই সে পবিত্র ও ক্ষমার্হ। এমন একটি যৌক্তিক চিন্তা নিয়ে নিশীথ রাতে নুরবানুর মুখোমুখি হয় কসিমউদ্দিন। আর তখনি তৈরি হয় গল্পের নতুন টার্ন। মহাজান পিতা-পুত্রের নিষ্ঠুর যৌনপীড়ন নিরীহ যুবতীকেও আততায়ী বানিয়েছে। সামনের পথ চলায় স্বামীর সঙ্গপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও আগামী দিনের লড়াইয়ের পথকে নির্দিষ্ট করার পরেই মহাজনকে খুন করার কঠিন প্রত্যয় ঘোষণা করে নুরবানু।

নুরবানুর মুখ কিন্তু তখন আর নিচুতে নামানো থাকে না।… থেমে থেমে সে বলে, মহাজনের নফর মোক কামড়ায় কামড়ায় খায় একবার, একবার খায় মহাজনের ব্যাটা, ফের একবার খায় মহাজন নিজে। কিন্তু মুই কিছু কহো না। মহাজন এখুন নিন্দাছে-মহাজনের চাকর নফর নিন্দাছে-মহাজনের ব্যাটাবেটিরা নিন্দাছে-কেহ কুনোঠে জাগিল নাই। বুঢ়া মহাজনের খাটের তলাত একখান ছুরি-ভারি চখা-কুরমানির স’ম ঐ ছুরি দে’ গরু জবাই করে মহাজন। ছুরিখান মুই দেখোঁ-কিন্তু মুই কিছু করিবা পাঁরো না। মোর হাত দুই খান মোটে। মোর চোখ তো একজোড়া মোটে, মোর কানও দুইটার বেশি নাই-কিন্তক মহাজনের হাত হাজার খান, চোখের সুমার নাই, কান আসমান জমিন তক পাতা। মুই কিছু করিবা পাঁরো না।

নুরবানুর দু’হাতের সাথে আর দুটি হাত একত্রিত হতেই নতুন একটি ক্রোধ জেগে উঠে। এই ক্রোধ একটি খুনের প্রস্তুতি বা একটি খুন সংঘটিত করে বটে, কিন্তু এমন একটি ক্রোধ থেকেই বিরাট বিপ্লবের জন্ম হতে পারে। এই ক্রোধ ব্যক্তি থেকে জন্ম নিয়ে সমষ্টিতে প্রবাহিত হতে পারে। আবার সমাজের ভাঁজে ভাঁজে ছোট ছোট ক্রোধ জমে বিরাট একটি বিপ্লবের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। মহাজনের লিপ্সার বিরুদ্ধে নুরবানু একা লড়তে পারেনি, কিন্তু লড়াবার অসম্ভব ক্রোধ সে তৈরি করেছে ভেতরে ভেতরে, যেকারণে কসিমউদ্দিনের সম্মতির পরে আর অপেক্ষা করেনি। একইভাবে ‘ডাকিনী’ ও মীর জাহান আলীর ইন্তেকাল’ গল্পেও দেখা যায় সাধারণ এক গ্রাম্য নারী আততায়ীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। ‘মীর জাহান আলীর ইন্তেকাল’ গল্পে একদা সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী মীর জাহান আলী সম্পূণ সার্থক, সফল ও পরিকল্পিত একটি জীবন অতিবাহিত করে মৃত্যুশয্যায় শায়িত। এমনি একটি জীবন তিনি অতিক্রম করেছেন যেখানেই হাতমুঠো করেছেন সেখানেই সোনা হয়ে ফলেছে। ছেলে দুটির একজন ঠিকাদার, একজন ওষুধ কোম্পানির মালিক। প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক দুজনেই। শুধুমাত্র মেয়ে বিশ্বদ্যিালয়ে পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল এবং এক হাভাতে কলেজ টিচারকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু সেও ভুল বুঝতে পেরে কলেজ টিচারকে ছেড়ে ভাইয়ের বন্ধু শিল্পপতিকে বিয়ে করে। অর্থাৎ মীর জাহান আলীর পরিকল্পিত জীবনের ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। নিজের কবরের জায়গাটি পর্যন্ত ঠিকঠাক করে রেখেছেন। এই বাস্ততায়, তার মৃত্যুটি সুখদ ও স্বর্গীয় হবার কথা। তার মৃত্যু শয্যার আয়োজনও তেমনি ঐশ্বর্যময় ও পবিত্রতায় পরিপূর্ণ।

স্ত্রী হিসেবে জানু বিবি নামাজ পড়ে আল্লার কাছে বিচার চাইতে পারে, অথবা স্বামীর জন্য ক্ষমাও চাইতে পারে। কিন্তু মরিয়মের কী করতে পারে? মীর জাহান আলীর শয্যাঘরে মরিয়মের প্রবেশাধিকার নেই

 

মীর জাহান আলীর মৃত্যুশয্যার অসাধারণ ও ব্যঞ্জনাময় চিত্রকল্প তৈরি করেন গল্পকার। ভারি নরম বালিশ, নিপাট ভাঁজের ধবধবে শাদা চাদর শরীরের উপরে-নিচে, নানান লতাপাতায় নকশা আঁকা মেহেগনি কাঠের রঙিন খাট, পাশে বড় ফুলদানিতে এক গোছা শাদা ফুল, ওষুধের স্ট্যান্ড, রকমারি ওষুধের বোতলের বাহার, ফ্লাক্স সব মিলিয়ে মীর জাহান আলীর মৃত্যুশয্যায় একটি শান্তিময় শুভ্রতা বিরাজমান। ‘মেঝের মোজাইকে, দেয়ালে, দরজা-জানালার পর্দায়-সর্বত্র শাদা রঙ। চারদিকে শ্বেত শুভ্রতার মাঝখানে মীর সাহেবের শয্যাখানি। মনে হয়, শয্যাখানি যেন আরো শুভ্রতর পবিত্রতর কিছু।’ শ্বেত-শুভ্রতার মধ্যে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমান মীর জাহান আলীর বাইরের জীবনের জৌলুস বা চাকচিক্যের অন্তরালে আছে অন্ধকারময় একটি জগৎ। আর এই অন্ধকার জগতের খবর জানে একজন। হতে পারে দুজন। মীর সাহেবের স্ত্রী জানু বিবির রহস্যময় আচরণ ও ঘর-বাইরের অস্থির হয়ে একটা কিছু খোঁজার মধ্যে আপাত কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে একটি অব্যক্ত জিজ্ঞাসা থাকতে পারে। তা হতে পারে মীর সাহেবে অনৈতিক জীবনাচরণ সম্পর্কিত। অনেক পুরানা কথা যেমন মীর সাহেবের অর্ধ-মৃত চোখ জুড়ে লুকোচুরি খেলে বেড়ায়, ধরা দিতে না দিতেই আবার হারিয়ে যায়, তেমনি জানু বিবিরও পুরানা কথা আছে। আর পুরানা কথা ভুলেনি জানু বিবির বাঁদী মরিয়ম। ভুলেনি কর্নেল সাহেব, ইস্তিয়াক সাহেবদের কথা, যাদের উপকারের উপটৌকন হিসেবে মরিয়মকে ব্যবহার করে মীর সাহেব। এই দুই নারী সমস্ত জীবনের হিসাব নেবার সুযোগ এটি। মীর জাহান আলীর অনুভূতিশূন্য নিথর শরীরের সেই শক্তি নেই, যে শক্তির হিংস্রতার কাছে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মুল্য ছিল না। স্ত্রী হিসেবে জানু বিবি নামাজ পড়ে আল্লার কাছে বিচার চাইতে পারে, অথবা স্বামীর জন্য ক্ষমাও চাইতে পারে। কিন্তু মরিয়মের কী করতে পারে? মীর জাহান আলীর শয্যাঘরে মরিয়মের প্রবেশাধিকার নেই। একবারের জন্য মীর সাহেবকে দেখার সাধ নিয়ে ঘরের আশেপাশে ঘুরে। সেই দুর্লভ সুযোগ আসে এক শান্ত সকালে। নার্স ডেকে নিয়ে মরিয়মকে মীর সাহেবের শয্যাপাশে বসিয়ে সারারাতের ক্লান্তি নিয়ে বিশ্রাম যায়।

এককালের পুরুষ সিংহের শীর্ণ, হাড়হাড্ড্রি নিস্পন্দ শরীর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাকিয়ে দেখে মরিয়ম। মাথাভর্তি সুন্দর ও নরোম চুল, বিরাট দুটি চোখ, বাঘের থাবার মতো হাত, কপাটের মতো চুলভর্তি বুক এসব নিয়ে এককালে যে যুবক যৌবন উন্মত্ততায় মজে ছিল, যে উন্মত্তার নিষ্ঠুরতার শিকার মরিয়ম, সেই মানুষটির পরিণতি মরিয়ম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। সমস্ত জীবন মীর জাহান আলীর অন্যায় আচরণকে বোবা মরিয়ম নিঃশব্দে হজম করে এসেছে। তার কিছুই করার ছিল না। এখনও তার বেশি কিছু বলার নেই। শুধু একটি কাজই সে করে-শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মীর জাহান আলীর কণ্ঠনালি চেপে ধরে। তখন মৃতবৎ শরীর নড়ে উঠে, গলায় গোঙানির আওয়াজ হয়, হাত দুটিও একবার উপরে উঠে আসে। কিন্তু মরিয়মের হাতের মুঠো আলগা হয় না, বরং আরো শক্ত করে। মরিয়মের সারা জীবনে ক্রোধ ও ঘৃণা কান্না হয়ে বেরিয়ে আসে। জীবনে অবশেষ আর তারও বেশি নেই। ‘একটা অচেনা অজানা কান্না মনের গভীর মর্মমূল থেকে ঐ সময় উঠে আসে এমন বেসামাল করে দেয়, যে হাতের মুঠোটা যথাস্থানে শক্ত হয়ে থাকতে পারে না। কেমন আলগা হয়ে খসে যায়।’ তাই শেষপর্যন্ত সে ব্যর্থ হয়। রোগীর শরীর ঢেকে দিয়ে ‘ধীরে ধীরে সেই সাজানো-গোছানো, শাদা, নিঃশব্দ ঘরে থেকে খুবই নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়। ঐদিন সকালে, সাতটার সময়, মীর জাহান আলীর ইন্তেকাল হয়-।’

স্বাধীনতার একদশকের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দারিদ্র্যপীড়িত দেশের প্রধান হর্তা-কর্তা হয়েছিল মীর জাহান আলীর মতো সরকারি আমলারা। রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতার ঘনঘন রদবদলের সুযোগকে ব্যবহার করে একশ্রেণির আমলারা করেনি এ হেন কাজ নেই। আশির দশকের শুরুতেই আমলাদের লাম্পট্য ও সম্পদলিপ্সার প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে সামরিক সরকারের অতিমাত্রায় আমলা নির্ভরতার কারণে জনগণের সেবক আমলারা শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলে একদিকে নিজের সন্তান বা অন্য বেনামে ঠিকাদারি বা ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে, তেমনি নারী ভোগের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। আমলাদের সুন্দরী নারী লিপ্সা আর ভোগবিলাস মধ্যযুগের রাজা-বাদশাহ-সুলতানদেরকেও হার মানায়। সচিবালয়ে প্রকাশ্য সুন্দরী নারীর যাতায়াত বেড়ে যায়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ত্রিশজন সুন্দরী নারীর তালিকা করে সচিবালয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু বাইরের সুন্দরীদের হোটেলে বা বাসায় নিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে পারেননি। মীর জাহান আলীর ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তার দুই ছেলে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক। আর তার যৌনলিপ্সার শিকার অনেকে। মৃত্যুশয্যার বিকারে মধ্যে স্ত্রীকে নয়, শ্যালিকাসহ তার যৌনলিপ্সার শিকার অনেকে ছবি অস্পষ্ট হয়ে চোখে ভাসে। মীর সাহেবের একনিষ্ঠ চাকর আবদুলের প্রথম স্ত্রী নবীতুন মীর সাহেবের হাত থেকে বাঁচতে শেষে আত্মহত্যা করে। স্ত্রী জানু বিবির বাঁদী মরিয়ম স্বামী নিয়ে পালিয়েও আত্মরক্ষা করতে পারেনি।

প্রত্যেকটি গল্পে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের ক্রোধ প্রায়শ ব্যক্তির হলেও সেটি আর ব্যক্তির থাকে না, সমষ্টির ক্রোধে রূাপান্তরিত হয়। মহাজনের পরিকল্পিত নিষ্পেষণের শিকার অধীনস্থরা দ্রোহ করে। দ্রোহিরা যেহেতু মহাজনের একান্ত নিকটবর্তী থাকে, ভেতর-বাইরের সকল খবর জানে, তাই তাদের আক্রমণের জন্য খুব বেশি প্রস্তুতির দরকার হয় না। তবে, প্রত্যেকটি গল্পেই শোষিতরা তাদের সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে লড়ে। তাদের জয়-পরাজয়ের দ্বিধা নেই। অসম্ভব শক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রবল প্রতাপশালী শ্রেণিশোষকের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থের ১০টি গল্পে পুুঁজিবাদী নিয়ন্ত্রিত সমাজ কাঠামোয় ব্যক্তির মনোজাগতিক সংকট বা অন্তর্জটিলতা নেই। ব্যক্তি তার ক্রোধ প্রকাশ বা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সোজাসাপ্টা পথ ধরে হাঁটে। এ কারণে তাঁর গল্পে প্রতীক বা আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনা নেই। গল্পের কাহিনি-বিন্যাসে ও নির্মাণ-কৌশলে স্বতন্ত্র কোন রোল মডেল তৈরি হয়নি। অনেকাংশে সাবেকি বা সনাতনী ধারায়, অথবা বলা যায় শরৎচন্দ্রীয় ধারার কাহিনি-বিন্যাস গল্পগ্রন্থটিতে। তবে নামগল্প ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পটির বিষয় বাকি নয়টির মতো হলেও বিন্যাস-কৌশল, ভাষা, প্রতীক ও অলঙ্কার প্রয়োগে লেখক অধিক মনোযোগী ও শ্রমশীল হয়েছেন। বাকি নয়টি গল্পেই লেখক একরৈখিক একটি চিত্রকল্প তৈরি করে একটি উদ্দেশ্যকে সংঘটনের জন্য অগ্রসরমান হন। তা হল, শোষিতের বিজয়, আর শোষকের পরাজয়। সব কটি গল্পেরই শেষ একই সমাপ্তি, একই ব্যঞ্জনা।

গল্পগুলো লেখার সময় মার্কস-এঙ্গেলসের পুঁজিবাদী ধারণা প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল শওকত আলীর লেখকসত্তায়। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। যে কারণে, তার চরিত্র মহাজনের গোলার ধান চুরিকেও অপরাধ বলে বিবেচনা করে না। শুধু বাংলাদেশের জোতদার-মহাজনের ক্ষেত্রে নয়, বিশ্বের সকল দেশেই পুঁজি সংগ্রহের একটিই কৌশল-শোষণ, লুণ্ঠন, জবরদস্তি। আর পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্গত উপাদানই হচ্ছে অমানবিকতা (inhumanity) বা বি-মানবিকরণের (নব-humanization)। উৎপাদক শ্রেণির শ্রম, সম্পদ, শরীরের রক্ত চুষে নিয়ে একে নিঃস্ব থেকে নিঃস্ব করে পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এই সমাজের অভ্যন্তরে শ্রমজীবী মানুষ নিষ্ঠুরতা, দাসত্ব, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বিকলাঙ্গতা ও মৃত্যুকে নিয়ে বেঁচে থাকে তারা। শওকত আলীর পুঁজিবাদী এই সমাজ-বিন্যাসের একেবারে প্রথম স্তম্ভেই প্রচণ্ড রকমের আঘাত করেন। লখিন্দরের বাসর ঘরের সাপটির মতো এমন একটি সাপ পুঁজিবাদী সমাজের অভেদ্য শক্তির ফাঁক গলিয়ে ছেড়ে দেন। আর নির্বিকার দর্শকের মতো দূরে দাঁড়িয়ে দেখেন সাপের বিষাক্ত ছোবল। দেখেন, কীভাবে দুভিক্ষপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষ মহাজনের গোলার ধান চুরি করে নিচ্ছে। আরো দেখেন, একজন সামান্য গ্রাম্য বধূ বা বাঁদী কীভাবে ডাকিনী বা আততয়ী হয়ে যাচ্ছে, আর প্রবল প্রতিশোধ ক্রোধ ও জিঘাংসা নিয়ে সরকারের সাবেক আমলা বা ক্ষমতাধর মহাজনের বুকে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে বা গলা টিপে ধরছে অথবা কামড়ে মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছে।