আনিসুর রহমান ঘুমাচ্ছিলো। আনিস আসলে ঘুমাচ্ছিলো না, সে যেন ডুবসাঁতার কাটছিলো। তার মনে হয়, বুড়িগঙ্গায় সে গোছল করতে নেমেছে। আলকাতরার পিঁপের ভেতরে সে হাবুডুবু খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। জিনিসটা অবশ্য আলকাতরা নয়। সে স্পষ্টই দেখতে পায়, মানিক মিয়া এভিনিউ ধরে সে হেঁটে যাচ্ছে। ঝাঁ ঝাঁ রোদ। চৈত্র মাস। ফার্মগেট থেকে সে হাঁটা শুরু করেছে। সে যাচ্ছে লালমাটিয়া। এত গরম যে তার ক্ষয়ে যাওয়া সোলের পাম্পসুর অনেকটাই ডুবে যাচ্ছে গনগনে পিচের ভেতরে। বেশ গরমও লাগে তার। ফোস্কা পড়ে যাবে নাকি? সে ভাবে। পিচের ভেতরে বুক সমান ডুবে যাওয়ার পরে তার অবশ্য কিছুটা ভয় করতে থাকে। চারপাশে লোকজন নেই। জনাকীর্ণ এই ব্যস্ত রাস্তার লোকজন আর সব যানবাহন কেন আর কীভাবে উধাও হয়ে গেছে, সেই বিষয়টা আনিসকে মোটেই ভাবায় না। তার কারণ অবশ্য আলাদা। মানিক মিয়া এভিনিউতে সে যেখানটায় গনগনে পিচের ভেতরে ডুবে আছে, তার ডান দিকে থাকার কথা সংসদ ভবন। কিন্তু ডান দিকে সে দেখতে পাচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী। তিনটি কিশোর বুক পানিতে নেমে একজন অন্যদের দিকে পানি ছিটাচ্ছে। এমন সময় ঝিরঝির করে বৃষ্টিও নামে। বৃষ্টি নামে, নাকি কিশোরদের ছেটানো পানি তার গায়ে এসে লাগে, সেটি আনিসের কাছে স্পষ্ট নয়। কার্তিক মাসের বৃষ্টিতে তার একটু শীত লাগে। শীতের ভাবটা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠলে সে অবশ্য মাথার কাছে রাখা পাতলা কাঁথাটি টেনে গায়ের ওপর জড়িয়ে দেয়। তার বেশ ঘুমও পায়। দাদির ঘরের বারান্দায় কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে সে ঘুমানোর চেষ্টা করে। টিনের চালের ওপর ঝমঝম করে শিল পড়তে থাকে। পায়ের দিকটার জানালা হাট করে খোলা। বৃষ্টির আঁচ আসছে। বাতাসের ঝাপটায় জানালার একটা পাল্লা ঠকঠক করে শব্দ হচ্ছে। সে কি উঠে জানালাটা বন্ধ করে দেবে? তার ইচ্ছেও হয়, আবার আলসেমিও লাগে।
সে কি শীতলক্ষ্যায় নেমেছে? কখন নেমেছে, সেটা অবশ্য তার মনে পড়ে না। তিনটি কিশোরের ভেতরে যে কালো আর ঢ্যাঙা গড়নের, সে তাকে পা ধরে টানছে। তার চোখের সামনে দুলতে থাকা কালো রঙ ক্রমশ ফিকে হতে হতে কালচে, ধূসর শেষ দিকে ফর্সা হতে থাকে। কিশোরটির মুখ ক্রমশ তার চেনাচেনা লাগতে থাকে; এক সময় সে পুরোপুরি চিনেও ফেলে। ছেলেটি সুজন, মেসে তার রুমে থাকে। এখনও সিট পায়নি বলে তার বেডেই ডাবলিং করছে।
আনিস ভাই, আনিস ভাই, উঠেন।
আনিসুর রহমান বিছানার উপর উঠে বসেছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তাকে বেশ নার্ভাস লাগে। লুঙ্গি হাঁটুর অনেকটা ওপরে উঠে গিয়েছিলো। সামনে বেশ ঝুঁকে পড়ে সে লুঙ্গি ঠিক করে।
আনিস ভাই, আপনার অফিস থেকে একজন লোক এসেছে। আপনার মোবাইল নাকি বন্ধ পাচ্ছে। তাই সে মেসেই চলে এসেছে।
কী বলিস? আনিস পুরোপুরি জেগে উঠেছে। তার চোখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ছায়া ফেলছে।
হ্যাঁ, মিজান নাকি কী যেন নাম।
কোথায় সে?
রাসেল ভাইয়ের রুমে টিভি দেখছে। বিপিএল। এখানে ডেকে আনবো? সুজন বলে। নাকি আপনি ওখানে যাবেন? তাকে চা নাস্তা দেওয়া হয়েছে।
আমি হাত-মুখটা ধুয়ে পোশাক পরে নিই। তারপর তুই তাকে এখানে নিয়ে আয়। এই ধর পাঁচ মিনিট।
ডিজিএম স্যার আপনেরে খুঁজতেছে। ফোনের পর ফোন দিছে। আর আপনের মোবাইল তো অফ। স্যার আমারে কইলেন, মিজান, তুই আনিস সাহেবরে এহনি খুঁইজা নিয়া আয়। অফিস থিকা আপনের যে ঠিকানা দিছে, ওইখানে গেলাম। মেসের ম্যানেজার কইলো, আপনে গত মাসে মেস বদলাইছেন। তারপর ড্রাইভার কুদ্দুসের কাছে আপনের এই মেসের ঠিকানা পাইলাম। মোবাইলে ছিলো না টেকা। লোড করলাম পঞ্চাশ। রিকশা ভাড়া গেছে আরও আশি টেকা। মিজান আরও কী কী যেন বলে। বলতেই থাকে।
ডিজিএম স্যার আমাকে খুঁজতেছেন ক্যান? উনি তো আমারে কোনো দিন ফোন দেন নাই। আজ এমন কী হইল যে আমারে খুঁজতেছেন?
সেইটা আমি ক্যামনে জানমো? আমি হইলাম পিওন। আমারে কি তারা ডাইকা কইবে ভিতরের গুমর কতা? আপনেই কন ভাইজান, আমারে জিগাইয়া হেরা কি কোনো কাজ করবে? গরিব মাইষেরে কেউ পাও দিয়াও পুছে না। কপাল, সব হইল কপাল।
স্যার কি তোমারে কিছু কইছেন নি? আনিস আমতা আমতা করে। না, মানে, অফিসে কোনো কথাবার্তা শুনছো নি?
বড়োলোকের মুহের কতা দিয়া কি তাগো অন্তরের দিশা পাওয়া যায়? ট্যারা মাইষের মতো তাগো নজর দুই দিকে।
মুহে কয় একটা, ইঙ্গিত থাকে অন্য দিকে।
স্যারের মুখটা কেমন দেখলা? হাসিখুশি নাকি গম্ভীর?
হেইডা ঠাওর করতে পারি নাই। ফোনে কার সাথে যেন উঁচা গলায় কতা কইতেছিলেন। আমি হের রুমে ঢুকছিলাম চায়ের কাপ নিয়া যাইতে। উনি আমার দিকে এমুন কইরা চাইলেন যে, পুরাই ডরাইছি। আন্ধার রাইতে হাঁটাপথে একলা মানুষ পাইলে চাইর পাঁচটা শিয়াল যেমুন জ্বলজ্বল কইরা তাকায়, আমার দিকে হেই রকম কইরা তাকাইছিলেন। আমি ভয় পাইছি, ভাইজান। মিজান তার ঘামে ভেজা খয়েরি টি-শার্টের গলার দিকটা ফাঁক করে ধরে বুকে থুতু ছেটায়। তারপরে বলে, আপনেরে ঠিক আড়াইটায় তেনার খাস চেম্বারে দেখা করতে কইছেন।
কেন? এখনই চলো যাই। আমি তো রেডি।
স্যার আপনেরে ঠিক আড়াইটায় দেখা করতে কইছেন।
ক্যান? আনিসের চোখে-মুখে উদ্বেগ।
সেইটা কইতে পারলে তো আমি এমডি হইতাম, পিওন হইতাম না। মিজান ফ্যাচফ্যাচ করে হাসে। ভাইজান, আমি গেলাম। আপনে সুমায় মতো যাইয়েন। সে একটুখানি থামে। পরে সে যেন বন্ধ ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবেই বলে, এই দুপুর বেলা হাঁইটা মতিঝিল রওনা দিলে কাওরান বাজারে যাওয়ার আগেই আমি মইরা যামো। আমার ডাইন পায়ে হইছে বাতের ব্যথা। এদিকে পকেটে নাই টেকা। …আইচ্ছা, ভাইজান, আমি গেলাম। কী কন? যাই? … আবারও একটু থামে মিজান। তারপর সে বলে, আমি তাইলে যাই। ঠিক আড়াইটায় অফিসে থাইকেন। টেনশন কইরেন না, ভাইজান। আল্লা আল্লা করেন। ভাইজান, আমি তাহলে আসি? যা রইদ উঠছে আইজ … এ রকম আরও কী কী বলতে বলতে মিজান এক সময় চলে যায়। তার মুখে হতাশা, বিরক্তি আর ক্লান্তি খেলা করছিলো।
ঘড়িতে বারোটা বাজে। একদম কাঁটায় কাঁটায় বারোটা বাজে। এখনও আড়াই ঘণ্টা সময় বাকি। এই সময়টা সে কী করবে? সে কি ডিজিএম স্যারকে ফোন দেবে? বন্ধ করে রাখা মোবাইল ফোনটি আরও একটু আগে সে অন করেছে। সে কি ফোন দেবে? স্পষ্টতই সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। ফোন সে দিতেই পারে। সে তো আর ফোন বন্ধ করেনি, ফোনে চার্জ ছিলো না বলে একা একাই সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ফোন বন্ধ করে রাখার অভ্যাস তো তার কোনো দিনই নেই। চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার জন্য কখন যে মোবাইল অফ হয়ে গিয়েছিলো, সেটা সে টের পায়নি। না, না, আসলে তার ফোন তো হারিয়ে গিয়েছিলো। আজ সকাল সাড়ে নয়টার সময় সে কাঁচা বাজারে গিয়েছিলো, ওই সময় পকেট থেকে মোবাইলটা কেউ নিয়ে যায়। সেই সাথে পকেটে রাখা তার সতেরোশো টাকাও নিয়ে গেছে। এগারোটার দিকে সে মোতালেব প্লাজা থেকে সেট কিনেছে, ফার্মগেট থেকে গ্রামীণফোন সেন্টারে গিয়ে সিম তুলেছে। ন্যাশনাল আইডি কার্ড খুঁজে পাচ্ছিলো না বলেই তো তার দেরি হলো। সে কীভাবে সেট কিনলো আজ? আজ মঙ্গলবার, মোতালেব প্লাজা তো মঙ্গলবার বন্ধ থাকে। তার এলাকার সব দোকানপাটেরও সাপ্তাহিক বন্ধ আজ। সেট কীভাবে সে কিনবে? আসলে সেট সে কিনেনি। এই সেট তার খালাতো ভাইয়ের। সেকেন্ডহ্যান্ড সেট কম দামে কিনেছে গতকাল সন্ধ্যায়; বলা যায় পানির দামেই। দুটো সেট এক রকম হলো কীভাবে? এটি তো তারই সেট। না, এটি তার সেট নয়। আসলে হইছে কী, বাবলু আর সে তো এক ধরনের সেটই দুজন কিনেছিলো বসুন্ধরা সিটি থেকে। কেনার শখ ছিলো স্যামসাং গ্যালাক্সি টু; বাজেটে হলো না বলেই তো কিনলো কমদামি সিম্ফোনি। বাবলু তো গতকাল রাতের লঞ্চে দেশের বাড়িতে গেছে। না, বাবলু নয়, অবিকল তার সেটের মতো দেখতে সেকেন্ডহ্যান্ড এই সেটটি সে গতকাল সন্ধ্যায় পেয়ে যায় ভাগ্যবশতই। কৃষি মার্কেটের সাইডে অটবির সে গলিটায় আলো-আঁধারি সব সময়ই থাকে, ওইখানে দাঁড়িয়েছিল রোগাপটকা বিক্রেতা। সে বলেছিল, তার মায়ের নাকি কী অসুখ, তাই সে তার মোবাইলটা বেচতে চায়। আনিস তাকে দেখেই বুুঝেছিল ব্যাটা হিরোইনচি। সে যে পাকা চোর, সেটা তো তার চোখেমুখেই খোদাই করা ছিলো। তবে আনিস যেটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেনি এই কারণে যে, দুই হাজার টাকায় একটা এন্ড্রয়েড সেট পেয়ে যাচ্ছে, যেটা দেখতে কিনা হুবহু তার সেটের মতোই। এমনও হতে পারে, সেটটা আসলে তারই। হতে পারে কী, এটা তো তারই সেট। স্ক্রিনের আড়াআড়ি দাগটা তো দেখাই যাচ্ছে। তবে চোরটাকে হাতের কাছে পেয়েও তাকে পাকড়াও যে করেনি, তার কারণ তার প্যান্টের পকেট থেকে চোরটা যখন মোবাইলটা হাতিয়ে নিচ্ছিলো, তখন তো আর সে খপ করে তার হাত চেপে ধরতে পারেনি। এখন আর বলে কী হবে? তাছাড়া সিক্স প্যাক করা সুঠামদেহী সুবেশী বড়োলোকের বখে যাওয়া ছেলের সাথে সে কী পেরে উঠতো নাকি? যে পেশি ছেলেটার! আর চিতাবাঘের মতো চাহনি। মোবাইলটা যে ছেলেটার নয়, এ ব্যাপারে আনিস নিশ্চিত। ছেলেটি যে আইফোন ব্যবহার করে, সেটা তো বোঝাই যায়। লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সামনে সে যখন সিম্ফোনি সেটটা বেচতে চাইলো, তখন আনিস বুঝে নিয়েছিলো, এটা তাদের নিচতলার ভাড়াটিয়ার বাসায় গ্রাম থেকে বেড়াতে আসা দুবলাপাতলা এক কিশোরের বড়ো শখের সেট। তেত্রিশশো টাকা দিয়ে সেটটি সে কিনেছে রাত পৌনে এগারোটার দিকে। তেত্রিশশো টাকা সে গুণে দিয়েছে। তিনটা হাজারি নোট, তিনটা একশো টাকার। টাকাগুলো দিতে তার কষ্টই হয়।
বারোটা একুশ বাজে। তার কি পেটে ব্যথা করছে? ব্যথাটা কোন দিকে? ডানে, না বামে? কাল রাতে কমিউনিটি সেন্টারে আক্কাসের সাথে খেতে যাওয়া তার ঠিক হয়নি। মাঝেমাঝেই ‘আজ ফুপাতো বোনের বাসায় দাওয়াত আছে’ বলে মেসে রাতের মিল সে অফ করে দেয়। ‘চল, আইজ ভালো-মন্দ খাইয়া আসি’ বলে আনিসকে প্রায়ই আক্কাস ডাকাডাকি করে। ডিমের তরকারি খেয়ে খেয়ে মুখে যখন অরুচি ধরে যায়, তখনই তো আনিস আক্কাসের সাথে কমিউনিটি সেন্টারে খেতে বসে যায়। বরপক্ষ বা কনেপক্ষ কোনো পক্ষকে না চিনে বেগানা কুকুর-বেড়ালের মতো বউভাতের ভোজসভায় শরিক হওয়াটা যে অনুচিত, সেটা কি সে জানে না? অবশ্যই জানে। তবে সে যে মাঝেমাঝেই আক্কাসের সাথে কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে সোজা খাবার টেবিলে বসে যায়, তার জন্য সে তো আর দায়ী নয়। দায়ী যদি কাউকে করতেই হয়, তাহলে তার খিদেটাই দায়ী। ‘দুপুরে অফিস থেকে খাবার দেওয়া হয়’ ঘোষণা দিয়ে সে তো রোজই একটা সিঙ্গারা আর একটা ডারবি খেয়ে কাটিয়ে দেয়। তারপর লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে মেসে ফিরে যখন সে জানতে পারে যে আজ খালা আসেনি, তখন আবুল হোটেলে পোয়া মাছ দিয়ে তার আর ভাত গিলতে মন চায় না। রাস্তার ও পাড়ের হোয়াইট হল পার্টি সেন্টারের ঝিলিক বাতিগুলো তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে আর বলে, ‘আয়, রোস্ট খাইয়া যা, খাশির রেজালার আইজ যা টেস্ট হইছে না!’ গুরুদেব আক্কাস অবশ্য তাকে বেশ কিছু টিপস দিয়ে দিয়েছে: ভালো পোশাক পরে যাবি। গম্ভীরভাবে থাকবি। এমন ভাব করবি, তুই হইতেছোস খন্দকার সাহেবের মেজ মেয়ের ছেলে। খন্দকার সাহেব কে, সেটা অবশ্য আনিস জানে না। জানে না তাতে সমস্যাও নেই। সব কিছু সবাইকে জানতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই, তাই না?
ঘড়িতে একটা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিট। সময়টা সে কীভাবে দেখে সেটা অবশ্য সে জানে না। তার পকেটে মোবাইল নেই। মোবাইল তো তার পরশুদিন ছিনতাই হয়ে গেছে। কাওরান বাজারে দুপুর বেলা ছিলো খুব জ্যাম। সে বসেছিলো বাসের পেছন দিকে জানালার পাশের সিটে। তার যে খালা ক্যান্সারের রোগী, তার সাথে কথা বলছিলো। কথা শুরু করেছে কী করেনি, আর অমনি বাঁশগাছের মতো চিকণ আর লম্বা একটা ফর্সা ছেলে ছোঁ মেরে তার মোবাইলটা নিয়ে দৌড় দিলো। তারপর আন্ডারপাসের ভেতরে তাকে ঢুকেও যেতে দেখে। তার বাসটাও হঠাৎ সাঁই সাঁই করে চলতে শুরু করলো। তাই মোবাইলের আশা আনিসকে ছেড়ে দিতেই হয়। আগামী মাসের বেতন পেয়ে সবার আগে সে মোবাইল কিনবে।
ভাই, কত বাজে?
চায়ের দোকানে চায়ে টোস্ট ভিজিয়ে খেতে থাকা লোকটি এবার না ক্ষেপে পারে না। এই মিয়া, আপনের কী হইছে। মিনিটে দশবার কইরা জিগাইতেছেন কয়ডা বাজে। দিনে-দুপুরে গাঞ্জা খাইছেননি? ট্রাক ড্রাইভারের হেলপার টাইপের এক চ্যাংড়া পোলা এবার মুখ খোলে। আপনের ধান্ধা কী? সেই কখন থিকা দেখতেছি বেঞ্চের কোণায় ঝিম ধইরা বইসা আছেন। আপনে করেন কী? নাম কী? বাড়ি কই? আনিস হয়তো বলে যে সে সামনের অফিসেই অফিস সহকারী পদে চাকরি করে। ওই যে বিআরটিসি ডাবলডেকারটি দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক বাম পাশের ছয় তলা বিল্ডিংটার দোতলায় তাদের অফিস। ওই তো সাইন বোর্ডও দেখা যাচ্ছে। অথবা সে হয়তো কিছুই বলে না কিন্তু তার মনে হয় সে বলেছে। চারপাশের আরও কিছু মানুষ তাকে কী কী যেন বলছে। কথাগুলো তার কানে পুরোপুরি পৌঁছে না। অথবা তার মনে হয়, সে রাতের অন্ধকারে বাঁশবাগানে পেশাব করতে বসেছে। মরা বাঁশ পাতার উপরে পেশাবের ছরছর শব্দ হচ্ছে। চার পাশে অজস্র ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে, সেই সাথে ডোবার ব্যাঙগুলোও। এত হর্নের আওয়াজের ভেতর সে কথাগুলো শুনতে পায়নি। অথবা সবই সে শুনতে পেয়েছে কিন্তু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। অথবা সে মূলত ভাবছে আদাবর থেকে মতিঝিল তার অফিসের সামনে সে কখন এসেছে, কীভাবে এসেছে। তার কিছু কিছু মনে পড়ে, সবটা পড়ে না। তার মনে পড়ে, মিজান চলে গেলো। তার পরনে ছিলো খয়েরি রঙের ঘামে ভেজা টি-শার্ট। এরপর বার তিনেক সে বাথরুমে গেছে, এটাও মনে আছে। তার পাতলা পায়খানার ব্যারাম নাই। শীতকালে নতুন পাটালি গুড়ের পায়েশ খেলে তার পেট নামতো। বাথরুমের সিরিয়াল পেতে পেতে তার একমাত্র আন্ডারওয়্যারটা নষ্ট হয়ে গেলো। সে কী কল পাড়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলো? নাকি ব্যাপারটা স্বপ্নে ঘটেছে? স্পষ্ট করে তার সেটা মনে পড়ছে না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, সে যেন গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলো। মাথার পানি ঢালতে ঢালতে তার মা বলছিলেন, ‘আইও বিও পাশ দিয়া তুই কী চাকরি করোস বাজান? তোর গলার আড্ডিডা তো খালিই উঁচা হইতেছে। আনিস ফুরফুরে হাসি দিয়ে বলেছিলো, মা এইডা তুমি বুঝবা না, এইডারে কয় বিউটি বোন- যত বাইরায়, ততই সৌন্দর্য। মুডাকাডা শইলের দিন শ্যাষ, এহন হইল সিলিমের যুগ। এহন এইডারই চল। তুমি পুরান কালের মানুষ। এইডা তুমি বুঝবা না। তার মা তাকে যেন জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। মায়ের এই অহেতুক কান্নার কোনো মানেই সে খুঁজে পায় না। বেতন পেয়েই সাড়ে চার হাজার টাকা তো সে বিকাশে পাঠিয়ে দেয়। বাকি আড়াই হাজার টাকায় সে তো বেশ আছে। চালের দাম অবশ্য আশি টাকা কেজি, তাতে কী? তাদের মেসের মালিকের মামাতো ভাই না ফুপাতো ভাই যেন ওয়ার্ড কমিশনারের কেমন আত্মীয়। তাই দশ টাকা সের দরে চাল তারা পায়। সেই চাল আবার পোকায় খাওয়া মোটা চাল নয়, একেবারে ফ্রেশ বাসমতী চাল। সেই চাল দিয়ে ভাত রান্না করলে পোলাও পোলাও ঘ্রাণ আসে। ভাজি-ভুজি, ভর্তার একটা আইটেম, ঘন ডাল আর পেটচুক্তি ভাত তো থাকেই, তার সাথে মাছ অথবা মাংসের একটা আইটেম রোজই থাকে। দুপুরে ইলিশ মাছ তো রাতে মুরগির মাংস। কোনো কোনো দিন অবশ্য রাতের খাবারের পর এক গ্লাস গরম দুধও থাকে। বিশ্বাস না হলে তার মা যেন এখনই সুজনকে ফোন করে। আল্লার কসম। অফিসটা তার বাসার পাশেই; আর তার তো পান-বিড়ি-সিগারেটের অভ্যাস নেই। সুতরাং, বলা যায়, মাসে মাসে প্রচুর টাকা সে জমাচ্ছে। আগামী বৈশাখে সে তার বাবার কবরটা বাঁধাই করবে। কবরের চার পাশটা সে টাইলস করে দেবে। টাইলসগুলো কিন্তু ইটের মতো ছোটো ছোটো নয় বরং পাটার চেয়েও বড়ো বড়ো- এই কথাগুলো সে তার মাকে বুঝিয়ে বলে। হাত-পা নেড়ে: এক্কেবারে চাঁদনি রাইতের মতো ফকফক্কা তার জমিন, আর তার ভিতরে ভিতরে জলছাপের মতো কাশফুলের নকশা। মা তো তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে; তবু তার মা মিহি সুরে কাঁদে। আনিসের খুব রাগ হয়; হওয়ারই কথা।
গল্পটি লেখকের প্রকাশিতব্য ‘চারটি বাহুর ত্রিভুজ’ গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া।
পড়িলাম। আছন্ন হইলাম। পুনরায় পড়িলাম। পড়িতে পড়িতে পড়িলাম। ঘোরাপাকে পড়িলাম।
মোটামুটি ভালো লাগলেও পাশাপাশি একটু বোরিংও লাগছিল।