রোনাল্ড রিগ্যান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ তম প্রেসিডেন্ট। যিনি ১৯৮১-১৯৮৯ পর্যন্ত আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তারও আগে ছিলেন একজন হলিউড অভিনেতা। এই যুগের অনেকেই হয়তো তাকে চিনবে না। তিনি যখন তার যশ এবং খ্যাতির শীর্ষে তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহুদূরে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপাড়ে পর্তুগালের মাদেইরায় জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে শিশু। যার নাম রাখা হয় প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের নামানুসারেই। আজ যার খ্যাতি রিগ্যান সাহেবের চেয়েও বেশি।
১৯৮৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি মারিয়া দোলোরেস দস সান্তোস আভেইরো এবং জোসে দিনিস আভেইরোর ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় একটি জেদি ছেলে। বাবা-মা তার নাম দেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরো। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। রোনালদো নামটি প্রেসিডেন্ট রিগ্যান এর নামানুসারেই রাখা। তার মা এবং বাবা যদিও প্রথমে চাননি সন্তানটি আদৌ পৃথিবীর আলো দেখুক। কারণ বাবা জোসে দিনিস আভেইরো ছিলেন পেশায় একজন মালী এবং মা মারিয়া দস সান্তোস আভেইরো ছিলেন একজন সামান্য রাঁধুনি। ১টি ছেলে এবং ২টি মেয়ে নিয়ে তাদের সংসারে অভাব অনটন বাসা বেধে আছে এমনিতেই। এর মাঝে আরো একটি সন্তান চাননি এই দম্পতি। কিন্তু বলা হয় জন্ম এবং মৃত্যু নাকি উপরওয়ালার হাতে। রোনালদো পৃথিবীর আলো দেখেছেন ঠিকই এবং নিজের দ্যুতিতে গোটা বিশ্বকেও করেছেন আলোকিত।
ছোটবেলা থেকেই জেদি ছিলেন রোনালদো। পড়াশুনা থেকে যতটা দূরে থাকতেন তিনি ঠিক ততটাই বন্ধুত্ব ছিল তার ফুটবলের সাথে। বাবা মার সপ্ন ছিল ছোট রোনালদো পড়াশুনা করে একদিন ভাল চাকরি করবে এবং তাদের পুরো পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠেনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই রোনালদোকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হলো। তার অপরাধ ছিল সে তার শিক্ষককে লক্ষ্য করে চেয়ার ছুড়ে মেরেছিল যে কিনা তাকে অপমান করে কিছু কথা বলেছিল। তার বাবা মা যদিও এতে পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পরেননি। কারণ তারা জানতো রোনালদোর এখনো জীবনে কিছু করার সুযোগ আছে এবং সেটা ফুটবল নিয়ে।
রোনালদো ফুটবলের সাথে যুক্ত হন তার বাবার মাধ্যমে। রোনালদোর বাবা একটি স্থানীয় অপেশাদার ক্লাবের সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। ক্লাবটির নাম অ্যান্ডোরিনহা। রোনালদো ১৯৯২ সালে সেই ক্লাবের সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৯৫ পর্যন্ত সেই ক্লাবে খেলেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত রোনালদো খেলেন আরেকটি লোকাল ক্লাব ন্যাসিওনাল এর হয়ে। এই সময়টায় রোনালদো তার খেলা দিয়ে সকলের নজর কাড়তে শুরু করেছিলেন। অবশেষে ১৯৯৭ সালে ১২ বছর বয়সে রোনালদো স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ৩ দিনের ট্রায়ালে যান। এবং তার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে লিসবনের ক্লাবটি তাকে সাইন করিয়ে নেয় মাত্র ১৫০০ ইউরোর বিনিময়ে। রোনালদো স্পোর্টিং ক্লাবের অন্যান্য তরুণদের সাথে যোগ দেন এবং তাদের সাথে খেলতে থাকেন। সবকিছুই ভাল যাচ্ছিল। রোনালদোর বয়স যখন ১৪ তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় সে এবার সেমি প্রফেশনাল লেভেলে খেলার জন্য প্রস্তুত। সে তার মাকে এই কথা জানায় এবং তার মায়ের কাছে থেকে অনুমতিও পায় পুরোপুরি ভাবে ফুটবলে মননিবেশ করার ব্যাপারে। কিন্তু ১ বছর পর রোনালদোর বয়স যখন ১৫ তখন আঘাত হানে দুর্ভাগ্য। রোনালদোর হার্টে এক জটিল অসুখ ধরা পরে যার নাম রেসিং হার্ট ডিজিস বা মেডিকেলের ভাষায় Tachycardia (টেকিকার্ডিয়া)। কারো হৃদস্পন্দনের হার যখন সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি হয় তখন তার অবস্থাকে বলা হয় টেকিকার্ডিয়া। রোনালদোর ক্যারিয়ার শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো এই রোগের জন্য কিন্তু, কথায় আছে ঈশ্বরও তাকে সাহায্য করে যে নিজের উপর ভরসা রাখে। হার মানতে নারাজ রোনালদোর হার্টের অপারেশন করা হয়। পরবর্তীতে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দলের সাথে পুনরায় অনুশীলনে যোগ দেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই রোনালদো সুযোগ পান স্পোর্টিং এর ইয়ুথ টিমে। তিনি স্পোর্টিং ক্লাবটির ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় যিনি একই মৌসুমে ক্লাবের অনূর্ধ্ব ১৬, ১৭, ১৮, বি টিম এবং ক্লাবটির প্রথম দলে খেলার সুযোগ পান। একবছর পরে ২০০২ সালের ৭ই অক্টোবর রোনালদো প্রিমেরা লীগাতে তার প্রথম ম্যাচ খেলার সুযোগ পান এবং সেই ম্যাচে তিনি ২টি গোল করেন।
রোনালদো স্যার এ্যালেক্স ফার্গ্যুসন এর নজরে আসেন ২০০৩ এর আগস্ট মাসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে খেলা তার একটি ম্যাচের মাধ্যমে। স্পোর্টিং সিপি বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড মধ্যকার সেই ম্যাচে রোনালদো অসাধারণ পারফর্মেন্স এর মাধ্যমে সবার নজর কাড়েন। স্পোর্টিং সেই ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে। রোনালদোর পারফর্মেন্স সেই ম্যাচে এতই মনোমুগ্ধকর ছিল যে খোদ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর খেলোয়াড়রাই তাদের কোচ স্যার ফার্গ্যুসনকে অনুরোধ করেন যেন তিনি রোনালদোকে ক্লাবের জন্য সাইন করিয়ে নেন। স্যার ফার্গ্যুসনও রোনালদোর প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন। তাই তিনি কালক্ষেপণ না করে রোনালদোকে ১২ দশমিক ২৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সাইন করিয়ে নেন। রোনালদো হয়ে যান ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামী কিশোর এবং ক্লাবটির ইতিহাসের প্রথম পর্তুগিজ খেলোয়াড়।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদো যেমন খুজে পেয়েছিল একটি বড় মঞ্চ ঠিক তেমনি খুজে পেয়েছিল বাবার মতো কাউকে। তিনি ছিলেন স্যার এ্যালেক্স ফার্গ্যুসন। প্রতিটি কোচই তার খেলোয়াড়দের পছন্দ করে কিন্তু রোনালদো এবং স্যার ফার্গ্যুসন এর মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল খেলোয়াড় এবং কোচের সম্পর্কের চেয়েও বেশি কিছু। রোনালদোর বাবা ছিলেন একজন মদ্যপায়ী। মদ্যপানাসক্ত বাবার কাছ থেকে হয়তো রোনালদো একজন বাবার পূর্ণ ভালবাসাটুকু পায়নি। রোনালদোর বয়স যখন মাত্র ২০ তখন রোনালদো বাবা মারা যান লিভারের অসুখের জন্য। বাবা হারানো রোনালদো তার বাবার জায়গায় স্যার ফার্গ্যুসনকেই বসিয়েছিলেন এবং স্যার ফার্গ্যুসনও রোনালদোকে সন্তানের মতই স্নেহ করতেন। স্যার ফার্গ্যুসন শুধু রোনালদোকে ফুটবলের জ্ঞানই দেননি তিনি রোনালদোকে জীবনের নানা সমস্যার মোকাবেলা কিভাবে করতে হয় তাও শিখিয়েছেন। তার কোন ভুল হলে সেগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন। একজন মানুষ যখন অনেক ছোট বয়সেই অনেক নাম ডাক করে ফেলে তখন সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রোনালদোকে সেই কঠিন সময়ে পথ দেখিয়েছেন স্যার ফার্গ্যুসন। এমনকি দলেও রোনালদোর প্রতি সবসময় দেখিয়েছেন অটল বিশ্বাস। রোনালদো ক্লাবে আসার পরে তাকে দিয়েছেন দলের ৭ নম্বর জার্সিটি। যা তার আগে পরিধান করেছেন ডেভিড বেকহাম, ব্রায়ান রবসন এবং জর্জ বেস্ট এর মতন তারকারা। রোনালদোকে কেন্দ্র করে দলও সাজিয়েছেন স্যার ফার্গ্যুসন। সবসময় যেমন স্নেহ দিয়েছেন তেমন মাঝে মাঝে করেছেন শাসন। একবার স্যার ফার্গ্যুসন রোনালদোকে তার ভুলের জন্য বলেছিলেন, “তুমি নিজেকে কি মনে করো? সবসময় একা একাই খেলার চেষ্টা করে যাও? এমন করলে তুমি কোন দিনও একজন ভাল খেলোয়াড় হতে পারবে না”। রোনালদো স্যার ফার্গ্যুসনের এই কথায় কান্নায় ভেঙে পড়েন।
❤️❤️❤️ pic.twitter.com/Njzma7SeyY
— Cristiano Ronaldo (@Cristiano) January 31, 2018
আজ রোনালদোর বয়স ৩৩ এবং রোনালদো এখনো বলেন, “আমার জন্য সে (স্যার ফার্গ্যুসন) আমার বাবার মতন”। এই উক্তি দ্বারাই তাদের সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ পায়।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদো ছিলেন একজন কারিকুরির দানব। চোখ ধাঁধানো পায়ের কারুকাজ দিয়ে তখন সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে বেশি পছন্দ করতেন এই উইঙ্গার। তাছাড়া ফ্রি-কিক থেকে গোল করার প্রবণতাও তখন তার মধ্যে ছিল বেশি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর হয়ে জিতেছিলেন অসংখ্য ট্রফি।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর হয়ে জয় করা তার শিরোপাগুলো হলো:
◊ প্রিমিয়ার লীগ – ২০০৬-০৭, ২০০৭-০৮, ২০০৮-০৯
◊ ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ – ২০০৭-০৮
◊ ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ – ২০০৮
◊ এফএ কাপ – ২০০৩-০৪
◊ ফুটবল লীগ কাপ – ২০০৫-০৬, ২০০৮-০৯
◊ এফএ কমিউনিটি শিল্ড – ২০০৭
২০০৯-১০ সিজনকে সামনে রেখে রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ইতোমধ্যেই রোনালদো জিতে নিয়েছিলেন বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের খেতাব। পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়ের ট্রান্সফার হতে যাচ্ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সেরা ক্লাবে। রেকর্ডতো সৃষ্টি হবারই ছিল। রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন রেকর্ড ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৯৪ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। রিয়াল মাদ্রিদের হোম গ্রাউন্ড সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রায় ৮০ হাজার ভক্তের সমাগত ঘটেছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে স্বাগত জানানোর জন্য। যেটা ছিল আরেকটি বিশ্বরেকর্ড। ২৫ বছর আগে নাপোলিতে ম্যারাডোনাকে স্বাগত জানাতে একত্রিত হয়েছিলেন ৭৫ হাজার মানুষ। এই রেকর্ডটি ভেঙে এবার নতুন করে রেকর্ড গড়েন রোনালদো এবং মাদ্রিদ সমর্থকরা।
রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার সময় স্যার এ্যালেক্স ফার্গ্যুসন বলেন, “রোনালদোর জন্য আমার কাছে শুধু প্রশংসাই পাবেন। সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। গোল মুখে তার অবদান অবিশ্বাস্য। তার পরিসংখ্যানগুলো অসাধারণ। গোলমুখে তার শট গুলো, তার ফ্রী-কিক, পেনাল্টি বক্সে তার আগ্রাসী খেলার ধরণ স্তম্ভিত করে দেয়ার মতন।”

রিয়াল মাদ্রিদে যখন রোনালদোর আগমন ঘটে তখন মাদ্রিদ ইতিহাসে তাদের অন্যতম কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অনেকেই বলে থাকেন রিয়াল মাদ্রিদের রোনালদো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। কথাটা সত্য। রিয়াল মাদ্রিদে আসার পরে ধীরে ধীরে নিজের খেলার ধরন পাল্টে ফেলেন রোনালদো। স্কিলফুল উইংগার থেকে রোনালদো পরিণত হন একজন গোল স্কোরিং দানবে। তবে তার এই বিবর্তন তার পক্ষেই কাজ করেছে এখনো পর্যন্ত। রোনালদো মাদ্রিদেও বহু সাফল্য পেয়েছেন। তবে সময় লেগেছে। ইউনাইটেড এর রোনালদোর চেয়ে মাদ্রিদের রোনালদো ব্যক্তিগত অর্জনে অনেক বেশি সফল। দলগত ভাবেও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রোনালদোর চেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছেন। রিয়ালের হয়ে ঐতিহাসিক লা-দেসিমা, লা উন-দেসিমা, এবং লা দুয়ো-দেসিমা জয়ের প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার দলগত অর্জনগুলো হচ্ছে:
♦ স্প্যানিশ লা-লীগা – ২০১১-১২ ২০১৬-১৭
♦ ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ – ২০১৩-১৪, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭
♦ ইউয়েফা সুপার কাপ – ২০১৪, ২০১৭
♦ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ – ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭
♦ স্প্যানিশ সুপারকাপ – ২০১২, ২০১৭
♦ কোপা দেল রে – ২০১০-১১, ২০১৩-১৪
এতগুলো শিরোপা জয়ের পেছনে যদি কেউ মুখ্য ভূমিকা পালন করে তবে তাকে নির্দ্বিধায় একজন জীবন্ত কিংবদন্তী বলা চলে। কিন্তু রোনালদোকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে অন্যতম করেছে তার ক্লাব ক্যারিয়ারে সফলতার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও সাফল্য অর্জন। পর্তুগালের হয়ে তার ইউরো জয় তাকে মুক্তি দিয়েছে ক্লাব লিজেন্ড নামক অপবাদের হাত থেকে।
পর্তুগাল। ফুটবল পরাশক্তির কোন দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়নি কোন কালেই। ইউসেবিও এবং লুইস ফিগোদের মত তারকারা কালেভদ্রে হয়তো এসেছেন পর্তুগালে কিন্তু জিতাতে পারেননি দলকে কিছু। আন্তর্জাতিক মঞ্চে হয়তো পর্তুগালের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছিল ২০০৪ সালে। সেবার ইউরো অনুষ্ঠিত হয়েছিল পর্তুগালের মাটিতেই। লুইস ফিগো এবং রোনালদো দুজনই তখন এক্টিভ খেলোয়াড় ছিলেন। ৩১ বছর বয়সী ফিগো তার সোনালী দিনের শেষ পর্যায় ছিলেন। আর ১৯ বছর বয়সি মাত্র নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। পর্তুগাল টুর্নামেন্টে ভাল খেলে নিজেদের জায়গা করে নেয় ফাইনালে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল গ্রীস।
২০০৪ সালের জুলাইয়ের ৪ তারিখে লিসবনে ৬৩ হাজার দর্শকের সামনে মুখোমুখি হয় পর্তুগাল এবং গ্রীস। পুরোটা ম্যাচ জুড়ে গ্রীস যেন পাত্তাই পাচ্ছিল না পর্তুগালের সামনে। পুরো ম্যাচ জুড়ে পর্তুগাল যেখানে প্রতিপক্ষের গোলমুখে শট নিয়েছিল ১৭টি, যার ৫টি অন টার্গেট। সেখানে গ্রীস পর্তুগালের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে মোট শটই নিয়েছে ৪টি, যার মাত্র ১টি অন টার্গেট। কিন্তু ৫৭ তম মিনিটে এঞ্জেলো ক্যারিসটেস এর করা সেই গোল আর শোধ করতে পারেনি পর্তুগাল। ফলে তাদের একটি জাতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন সেবারও অধরাই থেকে যায়। ইতিহাসের ১ম স্বাগতিক দল হিসেবে ইউরো ফাইনাল হেরে যায় পর্তুগাল।
ইউয়েফা ইউরো ২০১৬। এবারের ইউরোর আয়োজক দেশ ছিল ফ্রান্স। রোনালদোর বয়স তখন ৩১। ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম গুলোর একটি পার করেছেন মাদ্রিদে সদ্য। পুরো মৌসুম জুড়ে খেলে যাওয়া রোনালদো ঊরুর ইঞ্জুরিতে ভুগছিলেন। ডাক্তারেরা তাকে সাবধানও করে দিয়েছিলো এই ইঞ্জুরি নিয়ে ইউরো টুর্নামেন্টে অংশ নিলে তার ক্যারিয়ারও শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দেশের জন্য শিরোপা জিততে মরিয়া কোন কিছুতেই কর্ণপাত না করে অংশ নেন ইউরোতে।
রোনালদোর ২০১৬ ইউরো মিশন শেষ হয়ে যেতে পারতো গ্রুপ পর্বেই। গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচেই ড্র করে পর্তুগাল। ফলে ৩য় স্থানে থেকেই নক-আউট স্টেজে প্রবেশ করে তারা। নক-আউট স্টেজে তারা যথাক্রমে ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড এবং ওয়েলসকে পরাজিত করে ফাইনালে জায়গা করে নেয়। যা নিজের মধ্যেই একটি চমক ছিল। কারণ কেউ চিন্তাও করেনি গ্রুপ স্টেজে একটি ম্যাচও জিততে না পারা পর্তুগাল ফাইনাল খেলতে পারবে। ফাইনালের পথে রোনালদো দলের জন্য করেছিলেন ৩টি গোল এবং ৩টি এসিস্ট। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল দুর্দান্ত ফর্মে থাকা স্বাগতিক ফ্রান্স।
#NovaFotoDoPerfil pic.twitter.com/XrUiPnpEqk
— Cristiano Ronaldo (@Cristiano) February 4, 2018
১০ জুলাই, ২০১৬। প্যারিসের এস্তাদে দি ফ্রান্সে সমাবেত হয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার দর্শক। ম্যাচে হট ফেভারিট ফ্রান্স। পুরো টুর্নামেন্ট অসাধারণ খেলেছে তারা। তার উপর এবারের টুর্নামেন্টটিও অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাদের ঘরের মাটিতেই। কিন্তু বিপরীত দলে যখন রোনালদো নামক খেলোয়াড় আছেন তখন কোন কিছুতেই যেন মনকে শান্তনা দেয়া যায় না। খেলা শুরু হলো। ফ্রান্স শুরু থেকে পর্তুগালের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। ফ্রান্সের সাপোর্টাররা ছিল আত্মবিশ্বাসী। ওদিকে পর্তুগালের প্রতিটি সমর্থকের চোখ রোনালদোর দিকে। থাকবেই না বা কেন? তার একক নৈপুণ্যেইতো পর্তুগাল এখন ফাইনাল খেলছে। কিন্তু রোনালদো ম্যাচে বেশি কিছু করতে পারলেন না। কারণ ম্যাচের ৮ম মিনিটেই দিমিত্রি পায়েট এর করা এক নির্মম ট্যাকেল এর শিকার হন রোনালদো। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পরেন তিনি। টিভি রিপ্লেতে দেখা যাচ্ছিল দিমিত্রি পায়েটের করা সেই ট্যাকেল এ হাটু বেঁকে গেছিলো রোনালদোর। তবুও তিনি মেডিকেল স্টাফদের বললেন তিনি খেলা চালিয়ে যেতে চান। হয়তো সাহস পাচ্ছিলেন না এটা বলার যে “আমি খেলতে পারবো না”। কিভাবে বলতেন? হতে পারে এটাই তার দেশের জন্য কিছু জিতে দেয়ার শেষ সুযোগ। হাটুতে ব্যাথা নিয়েই খেলতে থাকেন রোনালদো। ম্যাচের ১৭ তম মিনিটে রোনালদো আবার মাঠে শুয়ে পরেন। ব্যাথা সহ্য করতে পারছিলেন না তিনি। আবার মেডিকেল স্টাফরা রোনালদোকে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। তাকে এই পা নিয়ে আর না খেলার পরামর্শ দেয়। কিন্তু রোনালো রাজি হননি। তিনি এবারো খেলা চালিয়ে যাবেন বলে তার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ম্যাচ আবারো শুরু হয়। রোনালদো আবার মাঠে আসেন ২০তম মিনিটে। ম্যাচের ২৪ তম মিনিটে আবার মাঠে বসে পরেন রোনালদো, হাত থেকে খুলে নেন ক্যাপ্টেন এর আর্ম-ব্যান্ড। ছোট কোন শিশুর মতন অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়েন। যেন কেউ তার কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল তার স্বপ্ন। এবার আর নিজের পায়ে হেটে মাঠের বাইরে যাবার শক্তি ছিল না হয়তো তার। মাঠে স্ট্রেচার আসলো। স্ট্রেচারে করে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেন কোন এক যোদ্ধা যুদ্ধে ঘায়েল হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। স্ট্রেচারে শুয়ে স্বপ্নহারা মানুষের মত করুণ ভাবে কাঁদছেন তিনি। তখন তার সাথে কাঁদছিল লাখো পর্তুগাল ভক্ত এবং বিশ্বব্যাপি কোটি কোটি রোনালদো ভক্ত। সবাই এক মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেল ম্যাচ এখনো শেষ হয়নি। পুরো এস্তাদে ডি ফ্রান্স তাকে বিদায় জানালো করতালির মাধ্যমে। ম্যাচের ২৫তম মিনিটে রোনালদোর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মাঠে নামলেন কারেসমা। পরের ৬৫ মিনিটে ফ্রান্স আক্রমণাত্মক খেলেছে এবং পর্তুগাল খেলেছে তুলনামূলক রক্ষণশীল খেলা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোন দলই গোল করতে না পারায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ে পায়ে ভারি বাঁধন নিয়ে বেরিয়ে আসেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এ যেন রোনালদোর আরেক রূপ! সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন এখন কোচের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেও সহকারী কোচের ভুমিকা পালন করছে! খেলোয়াড়দের ভুলে চেঁচাচ্ছে, তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। কখনো হার না মানা রোনালদোর এটাইতো বৈশিষ্ট্য। অতিরিক্ত সময়ে পর্তুগাল প্রচুর আক্রমণাত্মক খেলতে শুরু করে। সৃষ্টি করে বেশ কিছু গোলের সুযোগ। অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। ম্যাচের ১০৯ তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামা এডের দূরপাল্লার এক অবিশ্বাস্য শটে পর্তুগালকে এনে দেন সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। বুনো উল্লাসে ফেটে পরে পর্তুগালের খেলোয়াড়রা এবং গ্যালারিতে থাকা পর্তুগাল ভক্তরা। রোনালদোর চোখে আবারও অশ্রু দেখা গেল। কিন্তু এই অশ্রু আনন্দের। এই অশ্রু বিজয়ের আগামবার্তার। অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-০ গোলে শেষ হলে পর্তুগাল জিতে নেয় তাদের ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। পূর্ণতা পায় রোনালদোসহ পর্তুগালের সেই দলের সকল খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার। অপর দিকে ইতিহাসে পর্তুগালের পর ২য় দল হিসেবে নিজেদের ঘরের মাটিতে ইউরো ফাইনাল হেরে যায় ফ্রান্স।
দলগত ভাবে রোনালদো যেমন সফল তেমনি সফল সে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক দিয়ে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুসজ্জিত ব্যক্তিগত ট্রফি কেবিনেটটি এখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। তার জয় করা অসখ্য ব্যক্তিগত পুরষ্কার এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে:
★ ব্যালন ডি’অর – ২০০৮, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭
★ ফিফা “দ্যা বেস্ট” এওয়ার্ড – ২০১৬, ২০১৭
★ ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় – ২০০৮
★ ইউয়েফা বর্ষসেরা ইউরোপিয়ান খেলোয়াড় – ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭
★ ফিফা পুশকাস এওয়ার্ড – ২০০৯
★ ইউয়েফা বর্ষসেরা ক্লাব ফুটবলার – ২০০৭-০৮
★ ওয়ার্ল্ড সকার প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার – ২০০৮, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭
★ ফিফাপ্রো বর্ষসেরা খেলোয়াড় – ২০০৮
উপরে বর্ণিত এওয়ার্ড গুলো সহ বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত এওয়ার্ড জয়ী খেলোয়াড় তিনি। রোনালদোর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বোধহয় উপরের এওয়ার্ড লিস্টেই লুকিয়ে আছে। উপরের এওয়ার্ড লিস্ট তার সাফল্যের পাশাপাশি সংগ্রামের কথাও বলে। এবং সেটা হলো পরপর ৪ বার তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেসিকে ব্যালন ডি’অর জিততে দেখেও হার না মানা। লড়াই করেছেন, ফিরে এসেছেন, হয়েছেন সফল, সাথে এনে দিয়েছেন সাফল্য মাদ্রিদকে। একযুগ পর মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতানো সহ অনেক ফিরে আসার সাক্ষী রোনালদো। সাক্ষী ব্যালন ডি’অর রেসে ৪-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পরে ৫-৫ এ সমতা আনার। সংগ্রাম করে ফিরে আসার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত বোধহয় রোনালদো নিজেই।
মাঠে রোনালদোর পারফর্মেন্স দ্বারা তিনি দলগত এবং ব্যক্তিগত শিরোপা জয়ের পাশাপাশি জিতে নিয়েছেন পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি ফুটবল প্রেমিকের মন। ফুটবলকে ভালবাসে এমনই কয়েকজন রোনালদোর ব্যাপারে কিছু বিশেষ উক্তিও দিয়েছেন।
তাকে নিয়ে করা কিছু বিশেষ মানুষের বিশেষ কয়েকটি উক্তি:
“খুব কম খেলোয়াড়ই এখনো পর্যন্ত এসেছে যাদের নতুন জর্জ বেস্ট বলা হয়েছে। কিন্তু (রোনালদোকে নতুন জর্জ বেস্ট বলায়) প্রথম বার মনে হলো কেউ যেন আমার সুনাম করেছে।
— জর্জ বেস্ট | সর্বকালের সেরাদের একজন
সেরা খেলোয়াড়? কোন সন্দেহ ছাড়াই তা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।”
— পেলে | ফুটবল সম্রাট।
তার জুতোয় যাদু আছে। সে খুবই দ্রুত এবং শক্তিশালী। সে (রোনালদো) বিশ্বাস করে যে সে বল নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারবে। তার এই আত্মবিশ্বাসই তাকে বানায় স্পেশাল।
— ইউসেবিও | সর্বকালের সেরাদের একজন।
“ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই সেরা। সম্ভবত সে সর্বকালের সেরা। আমি ম্যারাদোনাকে কয়েকবার খেলতে দেখেছি। পেলের খেলা কখনো দেখিনি। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিস্ময়কর। সে জিদানের মত। ফুটবলে আরেকটি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কখনো আসবে না।”
— হোসে মোরিনহো | দ্যা স্পেশাল ওয়ান।
একজন খেলোয়াড় হিসেবে রোনালদো যা খুশি তাই করতে পারে। সে বল নিয়ে মাঝে মাঝে এমন কিছু করে যা দেখে আমার হাত মাথায় চলে যায় এবং আমি ভাবতে থাকি সে এটা কিভাবে করলো!
— লুইজ ফিগো | পর্তুগীজ কিংবদন্তি।
রোনালদো বলপায়ে এমন কিছু জিনিস করে যা আমি কখনো কোন খেলোয়াড়কে করতে দেখিনি। পরিস্থিতি নিজের হাতে নিতে হলে অবশ্যই আপনাকে একজন মহান খেলোয়াড় হতে হবে এবং রোনালদো এটা অনেকবার করে দেখিয়েছে।
— স্যার ববি চার্লটন | সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন।
আমি ক্লাবে আমার ২০ বছরে অনেক অসাধারণ খেলোয়াড় দেখেছি। কিন্তু রোনালদো? সে আমার দেখা সেরার কাতারে।
— স্যার এলেক্স ফার্গ্যুসন | সর্বকালের সেরা কোচদের একজন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জর্জ বেস্ট এবং ডেনিস ল এর চেয়েও ভাল খেলোয়াড়। যারা নিজেরাই ছিলেন ব্রিলিয়ান্ট এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম।
— জোহান ক্রুইফ | সর্বকালের সেরাদের একজন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো একজন রুঢ় প্রকৃতির খেলোয়াড়। যদি সে আর্জেন্টাইন হতো!
— ডিয়েগো ম্যারাডোনা | ফুটবল ইশ্বর।
ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং রোনালদো ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়। এত মানুষের ভালবাসা যার সাথে আছে সে সাধারণ কেউ হতে পারে না। সে অবশ্যই অসসধারণ কেউ। অসাধারণ রোনালদো এমনি করে অসাধারণ ভাবে খেলে যাক আরো বহুদিন এটাই সবার চাওয়া। এটাই ফুটবলের জন্য ভাল এবং দিনশেষে আমরা সবাই ফুটবল ভক্ত।