জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, কবিতা ও জীবন এক জিনিসেরই দুইরকম উৎসারণ। জীবনের আরেক প্রতিধ্বনি হচ্ছে কবিতা। অনেকেই বলেন, ভাবের উদয় হলে কবিতা আসে। অথবা বাল্মীকির উদাহরণ দিয়ে বলা যায় যন্ত্রণা, দুঃখ থেকে কবিতার জন্ম। যেখানে কিছু অপূর্ণতা রয়ে যায়, সেখানে সৃজিত কল্পনা দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায় কবিতা। ঠিক এ রকমটাই, কবি মোশতাক আহমদ তার ‘পঁচিশ বছর বয়স’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় নিজেকে একজন দুঃখবাদী কবি হিসেবে যখন হাজির করেন তখন অবাক হবার কিছু নেই।
রাশিয়ান এক কবি যখন বলেছেন, পুরোপুরি সুখী মানুষ কবিতা লিখতে পারে না। তখন সত্যিকার অর্থে আমাদের ধরে নিতে হয়, কবিতা হল জীবনের না পাওয়া প্রতিবিম্ব হিসেবে। কিন্তু কবি শুধু দুঃখের কথা বলতেই লিখেন না। জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছেন, ‘কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ কবি মোশতাক আহমদ যখন লিখেন, তখন তার বয়স কুড়ি পেরিয়ে একুশ বছর। সেই সময়ে জনপ্রিয় ও বেঁচে থাকা কবিরা ছিলেন বেশ প্রখ্যাত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, বিনয় মজুমদার, শামসুর রহমান, পিছনে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এদের প্রভাব। তবুও কালের প্রভাব কাটিয়ে কবি মোশতাক আহমদ-এর কবিতা অন্য এক নির্জন সুরে বাধা পড়ে। আর কবি অভিমানের সুরে গেয়ে যান ব্যথার গান।
‘আমার গোলার্ধ থেকে সরে গিয়ে রোদ
কোথায় গিয়ে কাকে মিশাও মেশাও উষ্ণতম দরদ’
মোশতাক আহমদ-এর প্রথম বইয়ের নাম ‘সড়ক নম্বর দুঃখ, বাড়ি নম্বর কষ্ট।’ পুরো কাব্যগ্রন্থে ব্যক্তিজীবনের ছাপ রয়েছে। রয়েছে ভালোবাসার কথা। আর না-পাওয়ার কথা। দুঃখ তো আছেই। আছে চরমতম অভিমান। তখন তিনি বলেন,
‘আমার আকাশে আজ সারাদিন
দুঃখের ক্যাম্পিং দিকে দিকে রাবীন্দ্রিক মেঘের
তাবুতে বিরহের ঘনজল’
কবি কীট্স যেমন বলেছেন, ‘Pain is knowledge।’ এই দুঃখ আনে উপলব্ধিতে নতুন বোধ, কবিতায় বাজে নতুন বীণা।
‘চড়ুইকে নিবেদিত পঙ্তিমালা’ কবিতায় কবি আমাদের কিছু মেসেজ দেন,
‘মৌলিক আনন্দের ভ্রূণ আত্মসমর্পণে’
আবার,
‘কাউকে যখন খুব ভালোবাসা যায়,
মানুষ পারে না আর তাকে ভুলে যেতে
যদিও বা প্রত্যাখানের অতল জলে তুমুল ডুবায়’
স্মৃতি আগুন’।
কবি কবিতাকে স্পর্শকাতর, অমীমাংসিত রমণী বলেছেন। যে ঋজু বাক্যের শাড়ি পড়তে অপছন্দ করে। এই অমীমাংসিত রমণীর সাথে নিজের ব্যবধান কমিয়ে আনতে কবি ব্যবহার করে করে, ইমেজ, রূপক, উপমা।
কবি মোশতাক আহমদ তার বাকি চারটি গ্রন্থে এই কথাটা সত্য, খুব বেশি করে সত্য ‘ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি’ এবং ‘বুকপকেটে পাথরকুচি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য।
‘পঁচিশ বছর বয়স’ কাব্যগ্রন্থে খুব চমৎকার একটি কবিতা, ‘চণ্ডিদাসের প্রণয়।’ চণ্ডিদাসের প্রেম বিরহ, কবির মানসে আঘাতের দাগ রেখেছে। কবির কাছে এইসব আবিষ্কার মূখ্য হয়েছে পরবর্তী বেশ কিছু কবিতায়,
‘ছিপ হাতে পাগল প্রণয়ী নদী হয়ে যায়।’
ইতিহাসে দাগ রেখেছে বিশেষত দুঃখ পেয়েছেন, এ রকম অনেকেরেই নাম কবিতায় ছিল। শুধু নাম না কবিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। যেমন, লক্ষ্মীট্যারার প্রতি অন্ধ হোমার, ইদিপাস ও রত্নেশ্বর, ইন্দ্রসভায় বেহুলা, বিনয় মজুমদারের বাড়ি।
ইতিহাস চেতনা ছিল কবির মর্মে, নিজের দেশ নিয়ে তার ছিল অহমিকা, তাই ইতিহাস থেকেও কবিতার উপাদান করেছেন সংগ্রহ,
‘অন্ধ মোগল সলিতা আরাকান রোডে
সুফির গজল রইল ডুবে নিঠুর নাফ জলে’
আবার,
তারপর ইদিপাস, মানে আমাদের রত্নেশ্বর সদাগর, কবির কবিতা দুঃখকে চাষ করেই লিখা শুরু, কিন্তু ধীরে ধীরে ঘটেছে এর উত্তরণ, এই ব্রহ্মাণ্ডের রূপের কাছেই সবার পরাজয়, আমাদের দুঃখকে দেয় পূর্ণতা। যেমন কবি মোশতাক আহমদ আকুতি জানিয়েছেন, তার এক কবিতায়
‘চান্দের গাড়ি, ও চান্দের গাড়ি!
আমাকে কোথায় পৌছে দেবে এই মাঝ রাতে
আকণ্ঠ জোছনার পর।
হিমছিড়ি বালিয়াড়ি ফেনার সাগর
অলীকের দেশে লীন।’
কবিতার আলোচনা আর কাব্যগ্রন্থের আলোচনা দুইটা এক না, প্রতিটা কবিতাই আলাদা কিছুর বাহক, কিন্তু কাব্যগ্রন্থ বিশেষ সময়ের বাহক। প্রতিটা কবিতা আলোচনা করলেই বের হয় বিস্ময়, কাব্যগ্রন্থ কবি জীবনের কালের সাক্ষী। একজন আলোচক শুধু সময়ের বিশেষ ইঙ্গিত এর আলোচনা করেন, কিন্তু কবিতার সৃষ্টি পাঠকের জন্য। পাঠকের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে কবিতা অনেক বৈচিত্রতা নিয়ে। কবি মোশতাক আহমদ-এর কবিতায় পেয়েছি তার নিজের ভাষা। অবশেষে, তার সুক্ষ রসবোধ এর পরিচয় পাঠকের কাছে অজানা যেন না রয়, তাই তার কবিতা প্যারাডাইস লস্ট এর কিছু লাইন
‘ইডেনের আধ খাওয়া আপেল
কার ভাগে গেল অবশেষে
কার পিছু নিল আকাঙ্খার সাপ।’