বৃষ্টিসিক্ত ঘাসভূমি
রাতের আওয়াজ
ফেলে আসে বৃষ্টি ধোয়া রাত
ট্রেনের ছাদ বেয়ে উঁকি দেয় ঊষা
প্রসারিত গোলাপি মেঘমালার ছোঁয়ায়
মুহূর্তে জেগে ওঠে ঘুমন্ত যাত্রীরা
চেয়ে দেখো! আহা চেয়ে দেখো !
বৃষ্টিসিক্ত ঘাসভূমি
কী হৃদয়কাড়া দৃশ্য…
ভোরের সূর্য শিশিরের ফাঁক গলে বেয়ে উঠে গেছে উপরে
বিবর্ণ তারারা
মুখ গোজে শিশিরের লেকে
দিগন্ত বিস্তৃত রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ
সীমানা পার হয় পৃথিবীর
কী সুন্দর আজকের সুনীল আকাশ, ফসলের মাঠ
কে বললে এর রূপ সীমিত !
হে ঘাসভূমি! হে বৃষ্টিসিক্ত ঘাসভূমি
তোমার এ সৌন্দর্য দেখার জন্য চাই দৃষ্টির গভীরতা
কেনোনা তুমি নিয়ে এসেছো সৌন্দর্যের রাজপুত্র, মায়াবী রাজকন্যা
এসব দেখে দেখে বিভূষিত হয়ে যায় পাঠকের মেজাজ
এই তৃণভূমিতে তাবুগুলো ফুলের মতো ফুটে আছে
ভেড়াগুলো ঢেউ খেলানো রাজহাঁস
চাবুকের আঘাতে ঘোড়াগুলো ছুটছে স্রোতের মতো
নিচে তাকিয়ে দেখো
বৃষ্টিধোয়া ঘাসগুলো যেন আরো সতেজ সজীব
সূর্যের হাজার রশ্মি এসে পড়েছে
অযুত অযুত ফুলের মধ্যে
কী বৈচিত্রময় এই দৃশ্য!
যেন গ্রেট ওয়ালের বুক জুড়ে রক্তিম কারুকাজ
ঘাসের উপর ছড়িয়ে আছে জীবনের প্রভা
ট্রেন দ্রুত চলে যায় ঘাসভূমিকে পিছনে ফেলে
ট্রেনের ভেপু হাজার শব্দে জানায় বিদায় সম্ভাষণ
আহা ঘাসভূমি
কিভাবে আমি নিয়ে যাই তোমার দৃষ্টিকাড়া সৌন্দর্য
বেইজিংএ আমার যে আত্মীয় ও বন্ধুরা আছে- তাদের জন্য
হে ট্রেন! তুমি একটু থামো দয়া করে
আমাকে তুলে দাও ঘাসের কটি গুচ্ছ
কী সুন্দর মেঘ
আমাকে নিয়ে যেতে দাও একটি সবুজ পাতার ঘামে।
আঙুর বাগানে
আঙুর বাগানে যখন শরৎ এসেছিলো
উজ্জ্বল পাথরের মতো থোকাগুলো ঝুলেছিলো নাশপাতির সাথে
পর্বতের পাড় ঘেষে যেন নাশপাতির প্যাগোডা
খাঁজে খাঁজে সাজানো ফলের প্যাভিলিয়ন
মৃদু তালে হেঁটে গেলে
মাতাল হয়ে যাবে গোলাপি, বেগুনি আঙুরের রূপে
সাবধান!
এই রূপসী আঙুরের স্তনের বোঁটার ঘর্ষনে
তোমার পোশাক হয়ে যাবে বর্ণিল
কোথায় রয়েছে এক্কাগাড়ি ও ঘোড়াগুলো
আঙুর চাষিরা সম্ভাষণ জানাবে বাম্পার ফলনে
বনের মনের আনন্দসঙ্গীত কোথায় গেলো?
একটি প্রেমসঙ্গীত ওয়েসিসের পর্দা সরিয়ে তুলে দিলো সুরের ঝংকার
আঙুর বাগান, আহা আঙুর বাগান
পাহাড়ের কোমড় ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেছে তোমার লতা
আঙুর বাগান, আহা আঙুর বাগান
তোমার স্বাদে ছড়িয়ে গেলো আত্মার আনন্দ
বাতাসে সবুজ তরঙ্গের দোলা সুগন্ধি পৌঁছে দেয় দূর-দূরান্তে
আমি উপভোগ করি তোমার সৌন্দর্যের প্রতিটি ভঙ্গি
দ্রাক্ষালতায় নেচে ওঠে মন কোমল অনুভবে
বুনোবাতাস ঘিরে রেখেছে হৃদয়ের চৌকাঠ
আমাকে জানায় ভালোবাসার অনুনয়,
‘প্রিয়তম, আর কটা দিন থেকে যাও না এখানে…’
তারা দুজন প্রেমে পড়েছিলো
তারা দুজন প্রেমে ডুবেছিলো
একজন ছিলো যুেেদ্ধর সংবাদবাহক
অন্যজন আর্মি ডাক্তার
মেয়েটি কী দিয়েছিলো তার দ্বিতীয় জীবনে
ছেলেটির কী বিনিময় ছিলো মেয়েটির প্রতি
যুদ্ধের ডায়রি খাতায়?
আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাই ছিলো ছেলেটির নিবেদন
মিষ্টি হাসিটিই ছিলো মেয়েটির প্রতিদান
‘এই তো বিজয়ের আর কটা দিন বাকি… একটু সবুর করো’
যৌথ সম্ভাষণ ছিলো দুজনের।
বিয়ের বাজনা বাজেনি কারো জীবনে
যুদ্ধের খবর আনতে গিয়ে ছেলেটি হয়েছে সমাহিত
আহত সৈনিকের উদ্ধারে মেয়েটি হয়েছে মৃত
দুজনের কেউ আর নেই এখানে
জনমানবহীন সেই পর্বতের পাদদেশে
রক্তবর্ণ আজেলিয়া চিকচিক করছে মেয়েটির গোলাপি গালের মতো
পান্নারঙ চিনারবৃক্ষটি পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছেলেটির মতো ঋজু ভঙ্গিতে।
তারা এখনো জীবিত
যৌবনের প্রেমের মতোই
বাকি জীবনও থাকবে এভাবেই
ছেলেটির চব্বিশ, মেয়েটির তেইশ
টগবগে প্রেমিক প্রেমিকা
তাদের বয়স আর বাড়বে না কখনো।
যুদ্ধের মাঝখানে
কামানের শব্দ হয়েছে বিগত
বিক্ষিপ্ত শোনা যায় বন্দুকের আওয়াজ
একটি ক্লান্ত বিষানের সুর ক্ষীণতর শোনা যায় দূর থেকে
তারা ফিরে আসবে না কখনো, দায়িত্বের বোঝা আর নিবে না কাঁধে
গান পাউডারের ধোয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে
নিরবতায় ঢাকা পড়েছে যুদ্ধক্ষেত্র
অসুস্থ সৈনিকের ড্রেসিংএ ব্যস্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা
স্ট্রেচার টিম এখানে-ওখানে করছে ছুটোছুটি
ঘুমাক্রান্ত সৈনিকের শোনা যায় হাই তোলার শব্দ
ঘূর্ণিঝরের শব্দ তুলছে ঘুমন্ত যোদ্ধার দল
একটি মধুর স্বপ্ন বুঝি দেখছে ওরা
‘তোমরা এখনো বেঁচে আছো’
দুষ্টু তারুণ্য ঠাট্টা করছে তাদের সাথে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সবকিছু একই গতিতে চলে না কখনো
গোলার শব্দ আগুনের লেলিহান শিখা নেই এখন আর
ধোয়ার কুণ্ডুলি নেই আকাশে
জোড়ায় জোড়ায় রঙিন প্রজাপতি উড়ছে
রাইফেলের নলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে
ক্লান্ত ঘোড়াগুলো ঘাসের মথিত ডগায়
স্পর্শ করে ক্ষুধার্ত মুখ…
দূরের রেল স্টেশন
মরুভূমির ওপারে দৃষ্টিরা সেটে থাকে
লী-এর সুবিশাল প্রান্তরে
লোকালয় খুঁজে ফিরি
শনে ছাওয়া কয়টি কুঁড়েঘর
ধোয়া ওড়ে ডেরাঘর থেকে
কিংবা প্রদীপের শিখা
একটি ছোট্ট সরাইখানা
বৃহৎ হোটেল এই লোকালয়ে
দুটি সরু রেল লাইন চলে গেছে
বৃহৎ জংশন এখানে।
কে বলে নেই কোনো বিশেষত্ব
এই সাধারণ রেল জংশনে।
ঝুলে আছে লাল ব্যানার
কী সুন্দর অভিহিতি
‘অগ্রগামী সৈনিকের স্টেশন’
মনে হবে বহুদূর রেল জংশন
এখানে বাঁধা আছে নাড়ির বন্ধন।
[জ্যাঙ জিমিন]
(জন্ম ১৯২৬) বর্তমানে চীনা কবিতায় একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নাম। তাঁর জন্ম এমন একটি পাহাড়ি গ্রামে যা বেইজিং শহরের নিকটস্থ উপশহরগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন। গ্রামটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে।তাদের কোন জমি জিরাত ছিল না। বাবার আয়ে কোন মতে সংসার চলতো। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক ও একজন লোককবি। পড়াশোনার তৃষ্ণাটা পান মূলত: বাবার কাছ থেকেই। তিনি তাঁর শিক্ষা ও কবিতার গুরু। বাবা ছিলেন একাধারে কবি, গায়ক ও চিত্রশিল্পী। জিয়াং জেমিনের কবিতার হাতে খড়ি মূলত: বাবার কাছ থেকে। বাবা কিনে বা বন্ধুদের কাছ থেকে যে সব পত্র-পত্রিকা ধার করে আনতেন জেমিন তা এক নি:শ্বাসে পাঠ করে ফেলতেন। যে কোন কবিতা দু’একবার পড়া হয়ে গেলে তা জিয়াং জেমিনের মুখস্থ হয়ে যেত। যে কোন ছাপানো কাগজ বা ঠোঙা পেলেও তিনি তন্ন তন্ন করে খুঁজতেন তাতে কোন কবিতা আছে কি না। তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতা বেশি পছন্দ করতেন। তবে মুক্ত ছন্দের কবিতাগুলোর ভাষা তার কাছে আটপৌড়ে মনে হতো যার কারণে সেগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল বেশি। পর্বতের পাদদেশ, তার চূড়া, পাহাড়ি গভীর খাদ আর তার ঢাল, ঘন বন আর বাহারি বুনো ফুল এতই মনোমুগ্ধকর ছিলো যা জিয়াং জেমিনকে কবি হতে উদ্ধুদ্ধ করেছে বেশি। এই মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও তার সংস্কৃতিমনা পরিবার তাকে কবিতার প্রতি ভালবাসার সিংহদ্বার খুলে দেয়।
জ্যাঙ জিমিন মূলত: রোমান্টিক কবি। তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প বয়ন অসাধারণ। আটপৌঢ়ে ভাষাকে তিনি কবিতায় নিয়ে আসেন খুবই নিপুণভাবে। যা হয়ে হয়ে ওঠে অসাধারণ ও জনপ্রিয়। একজন সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু তাঁর। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ছুটেছেন চীনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সেই সাথে তুলে এনেছেন সাহিত্যের উপাদান, ঢেলে দিয়েছেন তার নির্যাস- কবিতায়, ছোটগল্পে। তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি লিখেছি প্রাণবন্ত ভাষায়, প্রাকৃতিক ফর্মে, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে এবং ঐতিহ্যকে স্মরণে রেখে।’
১৯৩৭ সালে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিকামী কম্যুনিষ্ট দলে বাবা ও বড় ভাই যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে জিয়াং জেমিন বাড়ি ত্যাগ করেন দলে যোগ দিতে। ১৯৪০ সালে তিনি আর্মির তালিকা ভূক্ত হন। সৈনিক থাকাকালে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখিও চালিয়ে যান সমানতালে। ১৯৪২ সালে তিনি কবিতা ও ছোট গল্প লিখতে থাকেন। সেই সাথে প্রবন্ধও । ১৯৪৬ সালে তার লেখা প্রাদেশিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। ক্লাসিক ও আধুনিক কবিতা, লোক সংগীত ও গীতি কবিতা সমান গতিতে প্রকাশ পেতে থাকে।
১৯৬১ ও ৬২ সালে প্রকাশিত হয় `Sketches on a Visit to West I Ode to the Red Flag’ কাব্যগ্রন্থ দুটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হল- Wang the Pours out His Grievances, The Story of a Hired Hand, The Village Style, Sketches on a Visit to the West , Ode to the Red Flag, The Grass in the South, I tell you, Motherland, Mountain In the Border Region. কবিতা নিয়ে তার ভাবনা- আমি লোকসঙ্গীত পড়েছি এবং তা হৃদয়ঙ্গম করেছি। তার নির্যাস গ্রহণ করেছি। তাদের বিচিত্র ভাব-ভাষা আমি আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়েছি। তদুপরি আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম লোকসংগীতের স্টাইলে লিখতে হবে। তবে সেগুলোর মতো অত সীমিত নয়। চলিতরীতিতে স্পষ্ট করে তুলতে চাইলাম যা সবাইকে পরিতৃপ্ত করবে আর অপ্রয়োজনীয় প্রচলিত রীতিকে বাদ দিলাম কবিতার স্বার্থেই। যদি আমি কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি সংরক্ষণ করি কিংবা আমার মনের মধ্যে পরিবর্তনের কোনো তাড়না অনুভব করি তাহলে আমাকে অবশ্যই একটা জাতীয় ও জনপ্রিয় স্টাইলে লিখতে হবে। আমাকে এমন কবিতা লিখতে হবে যা নির্মল ও বিশুদ্ধ। পাঠক পাবে তার কাঙ্খিত স্বাদ, তাতে থাকবে আমার জাতির কথা, জনগণের কথা।
১৯৫৬ সালে সামরিক কাজ থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ও ম্যাগাজিনে কাজ করেন। এর পর তিনি যুক্ত হন China Federation of Literary and Art Circles এর সাথে। মো ইয়ান-এর নোবেল প্রাপ্তি চীনা সাহিত্য সম্পর্কে আমাদেরকে নতুন করে আগ্রহী করে তোলে। কবিতাগুলো Chinese Literature, Winter ১৯৮৪ সংখ্যা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।