আফ্রিকা মহাদেশ, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শোষিত ভূখণ্ড। ইতিহাস এতই গভীর জখম দিয়েছে ধরণীর এই অংশে যে সেই জখমের ক্ষত এখনো শুকোয়নি। এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য জমাট বেধে আছে এই অঞ্চলে।
আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি লাইবেরিয়া। ১৯৬৬ সালের ১লা অক্টোবর লাইবেরিয়ার মনরোভিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সেদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের একজন জর্জ উইয়াহ। তার বাবা ছিলেন পেশায় একজন মেকানিক। লাইবেরিয়ার আর দশটা পরিবারের মতন তার পরিবারও ছিলো অভাব অনটনে জর্জরিত। উইয়াহ মুসলিম কংগ্রেস বিদ্যালয় থেকে তার প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি উইলস হেয়ারস্টন উচ্চ বিদ্যালয়ে। কিন্তু উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুতে পারেননি তিনি।
ফুটবল খেলা শুরু করেন ১৫ বছর বয়সে ইয়াং সেভিয়র্সের তরুণ দলের হয়ে। পরে তিনি আরো কিছু স্থানীয় ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। উল্লেখ্য, মাইটি ব্যারল এবং ইনভিন্সিবল ইলেভেন এর হয়ে তিনি ৩৩টি গোলও করেছিলেন। লাইবেরিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রতিভা দেখিয়ে একজন ক্যামেরুনীয় কোচ ক্লদে লে রয় এর নজর কাড়েন তিনি। যিনি উইয়াহকে ক্যামেরুনের শীর্ষ পর্যায়ের স্থানীয় ক্লাবগুলোর একটি ইয়াওয়ুন্ড সাইড এফসির হয়ে সাইন করে নেন। তার প্রতিভা দেখে কোচ ক্লদে এতই বিস্মিত ছিলেন যে তিনি তৎকালীন এ এস মোনাকোর কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের সাথে এই বিস্ময় বালকের ব্যাপারে যোগাযোগ করেন। ওয়েঙ্গার নিজ চোখে উইয়াহর প্রতিভা দেখার জন্য আফ্রিকায় উড়ে যান। ওয়েঙ্গার উইয়াহর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাকে নিজ ক্লাবের জন্য সাইন করিয়ে নেন।
ক্লাব ক্যারিয়ার : ১৯৮৮ সালে উইয়াহ আর্সেন ওয়েঙ্গারের হাত ধরে ইউরোপে আসেন। তৎকালীন মোনাকো কোচ ওয়েঙ্গার উইয়াহকে সাইন করে নেন মাত্র ১২ হাজর পাউন্ডের বিনিময়ে। ক্লাব ক্যারিয়ারে এরপরে তিনি একে একে মোনাকো, পিএসজি, এসি মিলান, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, মার্সেই এবং আল জাজিরার হয়ে খেলেছেন।
ক্লাব ক্যারিয়ারে জর্জ উইয়াহর উল্লেখযোগ্য সাফল্য গুলো হলো:
• মাইটি ব্যারল
লাইবেরিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (১৯৮৫-৮৬)
লাইবেরিয়ান কাপ (১৯৮৫-৮৬)
• ইনভিন্সিবল ইলেভেন
লাইবেরিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (১৯৮৬-৮৭)
• এএস মোনাকো
কুপ ডি ফ্রান্স (১৯৯১)
• প্যারিস সেইন্ট জার্মেই
লীগ ওয়ান (১৯৯৩-৯৪)
কুপ ডি ফ্রান্স (১৯৯২-৯৩, ১৯৯৪-৯৫)
কুপ ডি লা লীগ (১৯৯৫)
• এসি মিলান
সিরি আ (১৯৯৫-৯৬, ১৯৯৮-৯৯)
• চেলসি
এফএ কাপ (১৯৯৯-২০০০)
ইংল্যান্ডে নিজের ক্যারিয়ার শেষ করে উইয়াহ আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন মার্সেই ক্লাবের হয়ে খেলতে। যেখানে তিনি ২০০১ সাল পর্যন্ত ছিলেন। তারপর তিনি ইউনাইটেড আরব এমিরেটস অ্যারাবিয়ান গাল্ফ লিগে খেলেন আল জাজিরা ক্লাবের হয়ে। যেখানে তিনি ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ২০০৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে এই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আফ্রিকান খেলোয়াড় ফুটবল থেকে নিজের অবসর ঘোষণা দেন।
উইয়াহ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল
ক্লাব লেভেলে উইয়াহ সফলতার শৃঙ্গে বিচরণ করলেও তিনি জাতীয় দলে ততটা সফলতার মুখ দেখেননি। উইয়াহ তার জাতীয় দলের হয়ে ২০ বছরে মোট ৬০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং এই ৬০টি ম্যাচে তিনি ২২টি গোল করেছেন। জাতীয় দলকে আলম্ব দেয়ার জন্য সকল চেষ্টাই করেছেন উইয়াহ। জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পরে পালন করেছিলেন জাতীয় দলের কোচের ভূমিকা। এমনকি একটি সময়ে জাতীয় দলকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টার পরেও তিনি লাইবেরিয়াকে একটি বিশ্বকাপেও অংশ নিতে দেখতে পারেন নি। যদিও সে লাইবেরিয়ার হয়ে আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসে দুই বার (১৯৯৬ ও ২০০২) অংশ নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু দুই বারই লাইবেরিয়া গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
এলফ্রেডো ডি স্টেফানো এবং জর্জ বেস্টদের সাথে উইয়াহকেও গণনা করা হয় ফুটবলের সেই সকল মহান খেলোয়াড়দের মধ্যে যারা কখনো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়নি।
ব্যক্তিগত অর্জন
জর্জ ওসমান উইয়াহ নিজের প্রথম গুরুত্ববহ ব্যক্তিগত খেতাব অর্জন করেন ১৯৮৯ সালে। মনাকোর হয়ে খেলতে থাকা উইয়াহ সেবার জিতে নেন বর্ষসেরা আফ্রিকান খেলোয়াড়ের খেতাব। এরপর ১৯৯৪ সালে পিএসজির হয়ে খেলাকালীন উইয়াহ আবারো এই খেতাব অর্জন করে নেন। কিন্তু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বৃহৎ ব্যক্তিগত অর্জনগুলো ধরা দেয় ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৫ সালে পিএসজি এবং এসি মিলানের হয়ে ভাল পারফর্ম করায় সেই বছরে ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার, ফ্রান্স ফুটবল ব্যালন ডি অর, এবং বর্ষসেরা আফ্রিকান খেলোয়াড় এর খেতাব জিতে নেন জর্জ উইয়াহ। তিনিই সর্বপ্রথম এবং একমাত্র আফ্রিকার অধিবাসী যে এই খেতাব গুলো একই বছরে জিততে পেরেছে। ১৯৯৬ সালে তাকে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ফুটবল হিস্টোরি এন্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (IFFHS) কর্তৃক শত বর্ষের সেরা আফ্রিকান ফুটবলার এর খেতাবে ভূষিত করা হয়।

উইয়াহ এবং বর্ণবাদ
ইউরোপের ফুটবলে বর্ণবাদী আচরণ এর বহু নিদর্শন রয়েছে। অতীতে এই লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে বহুবার, এখনো তা ঘটছে কদাপি। জর্জ উইয়াহও নিজের ক্যারিয়ারে বর্ণবাদীতার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েক বার। আবেগের বশে নিজের নিয়ন্ত্রনও হারিয়েছেন। ঘটনাটি ১৯৯৬ সালের ২০ই নভেম্বরের।

পর্তুগিজ ডিফেন্ডার কস্তার নাক ভেঙ্গে দিয়েছেন জর্জ উইয়াহ। উইয়াহর মতে কস্তা তাকে বার বার বর্ণবাদী বিদ্রূপ করেই যাচ্ছিল। তাই তিনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং নাক ভেঙ্গে দেন কস্তার। যার শাস্তি হিসেবে উইয়াহকে ৬ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে কস্তাকে কোন প্রকার শাস্তির অধীনে আনা যায়নি। এই ঘটনার পরেও সেই বছর ফিফা ফেয়ার প্লে পুরষ্কার পান উইয়াহ।

উইয়াহ তার প্রতি হওয়া বর্ণবাদী আচরণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তুলে ধরেণ আর্সেন ওয়েঙ্গারের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, “সে (ওয়েঙ্গার) আমার কাছে আমার বাবার মতন। আমাকেও সে তার নিজের সন্তানের মতই দেখতো। যখন বর্ণবাদী আচরণ তুঙ্গে ছিল তখন তিনিই আমার প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছেন।”
খেলার মাঠ থেকে রাজনীতির ময়দানে যাত্রা
লাইবেরিয়ার ২য় গৃহযুদ্ধ ২০০৫ সালে শেষ হলে জর্জ উইয়াহ লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। সাথে এটিও ঘোষণা দেন তিনি সামনে অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জর্জ উইয়াহ লাইবেরিয়ার জনগণের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। সেবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে উইয়াহর প্রতিপক্ষ দল উইয়াহকে ধরাশায়ী করতে অবলম্বন করেন গতানুগতিক পদ্ধতি। তারা প্রশ্ন তুলে জর্জ উইয়ার নানান যোগ্যতা নিয়ে। জর্জ উইয়াহর গতানুগতিক শিক্ষা যেখনে ছিল খুবই কম অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ এলেন জনসন সারলিফ ছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই উইয়াহর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আবার জর্জ উইয়াহর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল সারলিফের তুলনায় খুবই কম। সারলিফ ১৯৭০ এর দশকে টলবার্ট এডমিনিস্ট্রেশনে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অপর প্রান্তে উইয়াহর বলার মতন তেমন কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উইয়াহর ডাকনাম পড়ে গিয়েছিলো, “Babe in the woods”। যদিও প্রতিপক্ষরা এখানেই থেমে থাকেনি। এরপর প্রশ্ন তোলা হয় উইয়াহর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা নিয়ে। অভিযোগ তোলা হয়েছিল উইয়াহ তার ফুটবল ক্যারিয়ারে পিএসজিতে খেলার সময় ফ্রান্সের নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরে এই অভিযোগ তুলে নেয়া হয় এবং উইয়াহ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার জন্য সবুজ সংকেত পান।

উইয়াহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন, কিন্তু সারলিফের কাছে পরাজিত হন তিনি। সারলিফ যেখানে পেয়েছিল ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট সেখানে জর্জ উইয়াহ পেয়েছিলেন ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। উইয়াহ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু দ্যা আফ্রিকান ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে একটি স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং পক্ষপাতশূন্য নির্বাচনের স্বীকৃতি দেয়। যারা উইয়াহর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল নির্বাচনের সময় তাদের কড়া সমালোচনা করেন উইয়াহ। তিনি বলেন, “এত এত পড়াশুনা এবং বিপুল পরিমাণ অভিজ্ঞতা নিয়ে যারা শত শত বছর ধরে এই দেশটাকে শাসন করছে তারা আজ পর্যন্ত এই দেশের জন্য কিছুই করতে পারেনি।” উইয়াহ নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তিনি মায়ামির ডেভ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বাণিজ্য অনুষদে উচ্চতর ডিগ্রী লাভের জন্য।
উইয়াহ ২০০৯ সালে তার পড়াশুনো শেষ করে আবারো লাইবেরিয়ায় ফিরে আসেন এবং এসেই তিনি আবারো রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০১৪ সালে তিনি সিনেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন মনস্টেরাডো কাউন্টি থেকে। যেখানে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন প্রেসিডেন্ট সারলিফের ছেলে রবার্ট সারলিফ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। রবার্ট সারলিফ যেন পাত্তাই পায়নি জর্জ উইয়াহর কাছে। ৭৮% ভোট পেয়ে বিজয় লাভ করেন উইয়াহ।
২০১৬ সালে উইয়াহ জানান দেন তিনি ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিবেন। ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন জোসেফ বোয়াকাই। চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে উইয়াহ ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে জোসেফ বোয়াকাইকে পরাজিত করে অবশেষে লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি জর্জ উইয়াহ লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। গত ৭৪ বছরে এটাই ছিল লাইবেরিয়ার প্রথম পূর্ণ গণতান্ত্রিক ক্ষমতার হস্তান্তর। রাষ্ট্রপতি উইয়াহ বলেন দুর্নীতি দমন, অর্থনীতির পুনর্গঠন, নিরক্ষরতা তাড়ানো, এবং লাইবেরিয়ার সাধারণ মানুষদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়নই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।