Jobanএলন মাস্কের স্বপ্নজয়ের উপাখ্যান

এলন মাস্কের স্বপ্নজয়ের উপাখ্যান

“বড় হয়ে কি করবি বাবা?” পিতার এমন প্রশ্নের জবাবে এলন মাস্ক হয়তো বলেছিলেন, “মঙ্গলে যাব! মঙ্গলে গিয়ে থাকবো।” আর এই জবাব শুনে সেদিন তাঁর পিতাও হয়তো (বিষম খেয়ে) বলেছিলেন, “আরে বাবা থাম। চাঁদে যাব বললেও ঠিক ছিল; তাই বলে একেবারে মঙ্গল! কি সব আজগুবি, আকাশ-কুসুম কল্পনা, বাদ দাও এসব।”

আকাশ-কুসুম কল্পনাই বলতে হবে। পৃথিবীটাকে হয়তো নষ্ট করে ফেলছি প্রতিদিন; তাই বলে মঙ্গলে গিয়ে বসবাস? আজগুবি নয় তো কি? আকাশ-কুসুম ছাড়া আরকি? অবশ্যই আজগুবি ও আকাশ-কুসুম; কেবল যদি আপনি এখনো আশির দশকে বসবাস করেন তবেই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের এই শেষ বেলায় এসে মঙ্গলে যাওয়ার কল্পনাটা আর আজগুবি বলা যাচ্ছে না যে! আর এই আকাশ-কুসুম কল্পনাকে বাস্তবে পরিণত করার পেছনে যে মানুষটার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হচ্ছেন মাস্ক।

তো কে এই এলন মাস্ক? কি তার কাহিনী? কেন তাকে দ্যা গ্রেটেস্ট মাইন্ড এলাইভ বলা হয়? এইসব কিছুর উত্তর আমরা জানব আজ। এর আগে চলুন কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জেনে আসি।

প্রথমে বলি ‘স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস করপোরেশন’ এর কথা। সংক্ষেপে প্রতিষ্ঠানটি ‘স্পেস এক্স’ (SpaceX) নামে পরিচিত। আমেরিকার একটি ব্যক্তিগত নভোযান এবং নভোযানের যন্ত্রাংশ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। এদের অন্যতম এবং প্রধান অর্জন হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম লিকুইড প্রপেল্যান্ট রকেটকে কক্ষপথে পৌঁছানো।

এরপরে আসা যাক টেসলা ইনকরপোরেশন্স এ। ‘টেসলা’ (Tesla) একটি আমেরিকান অটমোটিভ প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। কারণ, পৃথিবীতে গ্যাস এবং তেল এর পরিমাণ সীমিত এবং জ্বালানি হিসেবে এই দু’টির তুলনায় বিদ্যুৎ অসীম তাই তেল, গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে বিদ্যুতের দ্বারস্থ হয়েছে কোম্পানিটি।

সবশেষে আসি সোলার সিটির কথায়। এটি টেসলা ইনকরপোরেশন্সেরই একটি অলাভজনক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যারা সোলার এনার্জিকে বিদ্যুতে রুপান্তর করার কাজে নিয়োজিত।

উল্লেখিত এই তিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বলার কারণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। এই তিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথেই এলন মাস্কের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এলন মাস্ক একাধারে স্পেসএক্স (SpaceX) এর সিইও এবং লিড ডিজাইনার, টেসলা ইনকরপোরেটেড (Tesla Inc.) এর সিইও এবং প্রোডাক্ট আর্কিটেক্ট আর সেই সাথে সোলার সিটি’র (Solar City) চেয়ারম্যান। হ্যাঁ, এলন মাস্ক এমন তিনটি কোম্পানি পরিচালনা করেন যারা কিনা বর্তমানকে ত্বরান্বিত করে ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার চেষ্টায় নিরলস খেটে যাচ্ছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন মঙ্গলে উপনিবেশ স্থাপন করার; চেষ্টা করেন অনবায়নযোগ্য জালানির বিকল্প খোজার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদনের স্থায়ী সমাধানের। তার সমসাময়িক ঝানু ব্যবসায়ীরা যখন সোশ্যালমিডিয়া আর গ্লোবালমার্কেটের ফটকাবাজিতে মত্ত, তখন এলন মাস্ক আরো ৫০ বছর পরের সমস্যা সমাধানে ঘুম হারাম করেন।

 

যেভাবে শুরু

বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার এবং মা মডেল। ১৯৭১ সালে সাউথ আফ্রিকায় জন্ম নেয়া এলনের ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল কম্পিউটার প্রোগ্র্যামিংয়ে। প্রোগ্র্যামিং শেখার জন্য টিউটরের সাহচর্যে আসলে দেখা যায় এলন তার টিউটরের চেয়ে প্রোগ্র্যামিংয়ে মাহের। তখনই আইবিএম (IBM) থেকে প্রোগ্র্যামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এর ওপর একটা টেস্ট নেয়া হয় এবং এলন সেই টেস্টে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে আইবিএম থেকে বিবৃতি দেয়া হয়, এলন এই বিশ্বের গুটি কয়েক ব্যক্তির মধ্যে একজন যারা সহজাতভাবেই প্রোগ্রামার। এবং আইবিএম’র এই বিবৃতির সত্যতার প্রমাণ দেন মাত্র বারো বছর বয়সেই যখন তিনি সম্পূর্ণ নিজের কোডিংয়ে তৈরি করেন ‘ব্লাস্টার’ নামক একটি গেম। পরে অবশ্য সেটা বিক্রি করে দেন পাঁচশ ডলারে। সতের বছর বয়সে এলন তার জন্মস্থান দক্ষিণ-আফ্রিকা ছেড়ে চলে আসেন কানাডায়। উদ্দেশ্য ছিল কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা। কিন্ত দুই বছরের ব্যবধানে আবার চলে আসেন আমেরিকায়। এখানে এসে অর্জন করেন দু’টি ডিগ্রি; পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এবং কলেজ অফ আর্টস এন্ড সায়েন্স থেকে অর্থনীতিতে।

এই সময়ের একটা মজার গল্প আছে এলনের। পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে তিনি তার দৈনিক খরচের জন্য রাখতেন মাত্র এক ডলার। এবং তার বাধাধরা খাবার ছিল নুডলস এবং রেড ক্যাপ্সিকাম। পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য তিনি তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির সাথে জোট বেধে নিজেদের বাসা নাইটক্লাব হিসেবে ভাড়া দিতেন। সপ্তাহ শেষে গড়ে ৫০০ জন মানুষ তাঁদের নাইট ক্লাবের পার্টি উপভোগ করত এবং এর জন্যে মাথাপিছু এন্ট্রি ফি ছিল পাঁচ ডলার। তার বন্ধুর কাজ ছিল পার্টি জমিয়ে তোলা এবং এলনের কাজ ছিল পার্টি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা।

 

স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ

পদার্থবিদ্যা এবং অর্থনীতির পাঠ চুকিয়ে এলন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ফলিত পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করতে। কিন্তু কোর্স শুরু হওয়ার দু’দিনের মাথায় তা ড্রপ করেন। পিএইচডির পরিবর্তে বড় ভাইকে সাথে নিয়ে শুরু করেন তার প্রথম ব্যবসা উদ্যোগ। বাবার কাছ থেকে ২৮ হাজার ডলার ধার করে এক সফটওয়ার প্রতিষ্ঠান চালু করেন দুই ভাই যেটার নাম ছিল জিপ২ (Zip2)। এটা ছিল আসলে পত্রিকা প্রকাশকদের জন্য। তাদের সুবিধার্থে শহরের মানচিত্র হিসেবে কাজ করত এই জিপ২। উল্লেখ্য, এটা গুগল ম্যাপেরও আগের সময়ের কথা। কিন্ত বেশিদিন জড়িত ছিলেন না জিপ২ এর সাথে। চালু করার কয়েক বছরের মাথায় এটি বিক্রি করে দেন মাস্ক ভ্রাতৃদ্বয়। এলনের ভাগে জোটে ২২ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থের প্রায় সম্পূর্ণটাই এলন তাঁর পরবর্তী উদ্যোগের মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেন।

 

তার হাত ধরেই পেপ্যাল

এলন মাস্ক সব সময়ই ব্যাংকের টাকা লেনদেনের ব্যবস্থাকে জটিল মনে করতেন। এছাড়া তার মনে হয়েছিল যে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের প্রক্রিয়াটা অনেক ধীর গতির। তাই এই কাজকে সহজ করতে তিনি একটি অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালু করেন যেটা ব্যবহার করে ইমেইলের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা যাবে। প্রাথমিকভাবে ওয়েবসাইটের নাম দেয়া হয় x.com;  এবং এটাই পরবর্তীতে পৃথিবীর জনপ্রিয় অর্থ লেনদেনের মাধ্যম পেপ্যাল (PayPal) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ২০০২ সালে ইকমার্স জায়ান্ট ইবে (eBay) দেড় বিলিয়ন ডলারে পেপ্যাল কিনে নেয়। এই বিক্রির টাকা থেকে এলন মাস্ক অর্জন করেন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার।

 

স্বপ্ন পূরণ

অবশেষে এলন তার আরাধ্য সাধনায় মনোনিবেশের সুযোগ পান। ২০০২ সালে জন্ম নেয় স্পেসএক্স (SpaceX)। এলন হাতে নেন তার স্বপ্নের প্রজেক্ট; উড়োজাহাজ যেমন ওড়ার পর আবার অবতরণ করে, তেমনি মহাকাশযানকেও তিনি জমিনে অবতরণ করাবেন। কিন্ত কেন? কারণ, তাহলে একই মহাকাশযান একাধিক যাত্রার জন্য ব্যবহারোপযোগী হবে। কিন্তু বলা যত সহজ, করাটা কি তত সহজ? প্রথম দুই প্রচেষ্টাই বিফল যায় তার। এদিকে প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সঙ্গীন। তবুও স্বপ্নবাজ এলন মাস্ক নাছোড়বান্দার মত লেগে রইলেন। মহাকাশযান উড়িয়ে এনে আবার অবতরণ তিনি করাবেনই। কিন্ত তৃতীয় প্রচেষ্টাও বিফলে গেল। এবার থামার পালা, কারণ প্রতিষ্ঠান যে প্রায় দেউলিয়া হল বলে! হিসাব-নিকাশ নিয়ে বসলেন এলন। দেখলেন, আরমাত্র একটি রকেট নিক্ষেপ করা সম্ভব স্পেসএক্স এর পক্ষে। কিন্তু তার পরপরই কোম্পানি দেউলিয়া ঘোষণা করতে হতে পারে।

কথায় আছে, পরাজয়ে ডরে না বীর। দেউলিয়া হবে তাই হোক, কিন্তু তার যে রকেট নিক্ষেপ করে আবার অবতরণ করানো চাই-ই চাই। ব্যাপক গবেষণার পর এক শনিবার ইলনের চতুর্থ মহাকাশযান আকাশে উড়ল, এলনকে এক পলকের স্বস্তি দিয়ে তা আবার নিখুঁতভাবে অবতরণও করল। জয়-পরাজয়ের এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিবৃতি তৈরি করলেন এলন। তার স্বপ্ন সফল কিন্ত এবার যে প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষণা করার পালা। কিন্তু কি মনে করে যেন আরো এক কর্মদিবসের জন্য তুলে রাখলেন দেউলিয়া ঘোষণার বিবৃতিটা। একেই বলে ভাগ্য; একদিনের কালক্ষেপণেই বদলে গেল স্পেসএক্স এর ভবিষ্যৎ। মঙ্গলবার অফিসে এসে মেইল খুলেই দেখলেন এক অসাধারণ চমক অপেক্ষা করছে তার জন্যে। মহাকাশযান বিষয়ক এই যুগান্তকারী সাফল্যের জন্য নাসা (NASA) স্পেসএক্সের সাথে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করতে চাইছে। নাসা’র কাছে যে একাধিকবার ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান নেই!

 

যাত্রা শুরু টেসলার

কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিরাপদ। কিন্তু এলন কি এতই থেমে থাকার পাত্র? মোটেও না। এক ইন্টারভিউতে এলন মাস্ক বলেন, কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার ইচ্ছা ছিল এমন কিছু ক্ষেত্রে কাজ করার যা কিনা মানুষের জীবনযাত্রাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে। তার অনেকগুলো পছন্দের মধ্যে অন্যতম ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এবার তবে আসা যাক টেসলা’র গল্পে। টেসলা’র সহপ্রতিষ্ঠাতা হলেও এলন কোম্পানির সাথে সরাসরি সংযুক্ত হন ২০০৪ সালে; চেয়ারম্যান হিসেবে। এখন তার উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে যাবতীয় তেল এবং গ্যাসকে ইতিহাস বানিয়ে বিদ্যুৎকে বহুল ব্যবহৃত জ্বালানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এই উদ্দ্যেশ্যকে এলন তিনটি যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন–

 গ্যাস ও তেলের পরিমাণ দুনিয়ায় নির্দিষ্ট ও সীমিত। ভবিষ্যতে একসময় মানবজাতিকে বিকল্প জ্বালানির পথ খুঁজতেই হবে।

 তেলের তুলনায় বিদুতের কার্যক্ষমতা ৪০ শতাংশ বেশি। একটা গাড়িতে তেল এবং গ্যাস ব্যবহার করা হলে গাড়ির কার্যক্ষমতা থাকে ২০ শতাংশ যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কার্যক্ষমতা বেড়ে ৬০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়।

 এলনের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, তেলের তুলনায় বিদ্যুৎ পরিবেশ বান্ধব।

এলনের মতে তেল এবং গ্যাসকে গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা মানে আমাদের পরিবেশ নিয়ে ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলা। এবং এটা মানতে রাজি না এলন মাস্ক। তাই তিনি শুরু করলেন বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি তৈরির কাজ। বিশাল কর্মযজ্ঞের পর ২০০৮ সালে টেসলা ইনকরপোরেটেড তাদের প্রথম গাড়ি বাজারজাত করে। পৃথিবীর ৩১টি দেশে Tesla Roadstar নামে এই মডেলের প্রায় ২৫ হাজার গাড়ি বিক্রয় হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও বেশ কিছু মডেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে টেসলা মডেল এস সেডান (Model S Sedan) এবং মডেল এক্স (Model X)।

টেসলা’র মডেল থ্রি গাড়ির হস্তান্তর অনুষ্ঠানের ভিডিও

এলন মাস্কের জীবন এবং তার কাজকে একটি লেখায় আটকানো অসম্ভব। তার ‘হাইপারলুপ’, ‘স্যাটেলাইট ইন্টারনেট’ এবং ‘দ্য বোরিং কোম্পানি’সহ এরকম আরো কিছু উদ্যোগ রয়েছে। সেগুলো নিয়েও আলাপ হবে হয়ত কোন এক সময়।