ফুটবল মানেই চরম প্রতিদ্বন্দিতার খেলা, এগারো এগারো বাইশে চলে গোল বলটিকে নিজেদের দখলে রাখার লড়াই। কিন্তু এই চরম প্রতিযোগিতার মাঝেও খেলোয়াড়রা মানবিকতাবোধের অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপনা করে থাকেন। এমনই বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা আজ দেখবো।
চড় খেয়েও বলস্টেসকে রক্ষায় কার্লোস পুয়োল
২০০৫ সালে বার্সেলোনা ও মেলরকা মধ্যকার খেলায় কার্লোস পুয়োল এগিয়ে এসেছিলেন মেলরকার ডিফেন্ডার সার্জিও বলস্টেসের রাগ ঠান্ডা করতে কিন্তু বলস্টেস কষে চড় কষে দেন পুয়োলের গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় পুয়োল হতচকিত হয়ে যান। আর এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে দৌড়ে আসেন পুয়োলের সতীর্থ রোনালদিনহো। কিন্তু কার্লোস পুয়োল কঠিন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তিনি দৌড়ে নিবৃত্ত করেন রোনালদিনহোকে। ফুটবল ইতিহাস সাক্ষী হল এক অনন্য ঘটনার। স্পেন দলের রুপকথার নায়কদের মধ্যে পুয়েলের নাম প্রথম সারিতে। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে তিনি ২০০০ অলিম্পিক, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০০২, ২০০৬ এবং ২০১০ এ অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি ইউয়েফা ইউরো ২০০৪ ও ২০০৮ এ অংশ নেন। স্পেনের হয়ে খেলেছেন ২০০৯ কনফেডারেশন কাপ। ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে জিতেছেন ছয়টি লা লিগা, দুটি কোপা দেল রে, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও দুটি ক্লাব বিশ্বকাপ শিরোপা।
উইগহর্স্টের ইচ্ছাকৃত পেনাল্টি মিস
২০১৩ সালে ইরান ও ডেনমার্কের মধ্যকার খেলায় গ্যালারীতে বাঁশি বাজানোয় খেলায় ইরানের একজন খেলোয়াড় বিরতির সময় হয়েছে মনে করে ভুল করেন। তিনি পেনাল্টি এরিয়ার মাঝেই হাত দিয়ে বল ধরে ফেলেন। যার ফলে রেফারি এটিকে পেনাল্টি হিসাবে ঘোষণা করেন।
এইসময় ডেনমার্কের খেলোয়াড় মর্টেন উইগহর্স্ট পেনাল্টি শটের আগে কোচ মর্টেন ওলসেনের নিকট দৌড়ে যান। কোচ ইচ্ছাকৃত পেনাল্টি মিস করার পরামর্শ দেন। উইগহর্স্ট ফিরে এসে গোল থেকে দুরে শট করে ইচ্ছাকৃত মিস করেন পেনাল্টি। এসময় সবাই হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাতে থাকে। সে ম্যাচে ডেনমার্ক ইরানের কাছে ১-০ গোলে হেরে গেলেও জিতে যায় নৈতিকতা। এজন্য উইগহর্স্ট পান অলিম্পিক কমিটির ফেয়ার প্লে পুরস্কার।
প্রতিপক্ষের গোলকিপার আহত তাই গোলের চিন্তা বাদ ডি ক্যানিওর
২০০০ সালে ওয়েস্টহাম ও এভারটনের মধ্যকার খেলায় চমৎকার একটি পাস এল ওয়েস্টহামের খেলোয়াড় পাওলো ডি ক্যানিওর কাছে। গোলবার খালি। খেলার ৯০ তম মিনিট চলছে তখন ১-১ গোলে সমতায় দু’দল। তারপরেও গোল দেওয়ার চেষ্টা না করে ক্রিকেটের মত বলটিকে ক্যাচ ধরলেন তিনি। কারণ এভারটনের গোলকিপার পল গেরাড একটু আগেই এগিয়ে গিয়ে ওয়েস্টহামের একজন খেলোয়াড়ের সাথে ধাক্কা লেগে ইনজুরড হয়ে মাঠে পড়েছিলেন। ডি ক্যানিও বল ধরে গোলকিপার জেরাডের সেবা নিতে বলেন। সৃষ্টি হয় এক অনন্য দৃশ্যের।
ডি ক্যানিও যদিও ছিলেন বদমেজাজি খেলোয়াড়। তিনি রেফারিকে আঘাত করে বহিস্কারও হয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনায় ফেয়ার প্লে পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি।
দর্শকের মুখে বলের আঘাত লাগায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিনয়
২০১১ সালে রিয়াল ও গেটাফের মধ্যকার খেলায় মাঠের সীমানার কাছে বল বাইরে পাঠাতে গিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর করা শটে বল গিয়ে লাগে একজন দর্শকের মুখে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি ভাঙা নাক নিয়ে স্টেডিয়ামেই বসে ছিলেন। রোনালদো সে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করলেও সে ঘটনার কথা ভোলেননি। ম্যাচ শেষে তিনি দর্শকসারিতে গিয়ে তার সাথে কথা বলেন এবং তাকে দেওয়ার জন্য তার নিজের জার্সি খুলেন। পরে ক্লাব কর্মকর্তাদের একজন তার হাতে নতুন জার্সি তুলে দিলে তিনি তা আহত দর্শকে উপহার দেন।
এছাড়াও ২০০১ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয় বায়ার্ন মিউনিখ এবং ভ্যালেন্সিয়া। দুই দলের খেলা ১২০ মিনিট পর্যন্ত ১-১ এ ড্র হওয়ায় মিমাংসার জন্যে খেলা গড়ায় পেনাল্টিতে। পেনাল্টিতেও দুই দল সমান সমান ছিল। শেষ এবং নির্ধারক পেনাল্টিটি অলিভার কান সেভ করেন। তখন দেখা যায় অদ্ভুত কান্ড। অলিভার কান উদযাপন না করে দৌড়ে যায় ভ্যালেন্সিয়া গোলকিপার সান্তিয়াগো কানিযারেস এর কাছে। সাইডলাইনে কাঁদতে থাকা সান্তিয়াগোকে সান্তনা দিতে থাকে কান। এই নজির দেখিয়ে সেবার ফেয়ার প্লে এওয়ার্ড পেয়ে যায় অলিভারকান।