Jobanআত্মহত্যা ও বাংলাদেশে আত্মহত্যা

আত্মহত্যা ও বাংলাদেশে আত্মহত্যা

আত্মহত্যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোটেও নতুন নয়। খবরের কাগজে আমরা প্রতিনিয়তই আত্মহত্যার খবর পড়ি। গত এক সপ্তাহের কথা হিসেব করলেও দেখা যাবে তিনটি আত্মহত্যার খবর প্রথম শ্রেণির পত্রিকাগুলোতে দেখা গেছে।

আত্মহত্যা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি, নিজেকে নিজেই বিসর্জন দেওয়া। সামাজিক প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যাকে কখনোই ভালো চোখে দেখা হয়না। কারণ, এটি ধর্মীয় ও মানবিক দিক থেকে একটি বড় অপরাধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, “প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যায় নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। অর্থাৎ, প্রতি ৪০ সেকেণ্ডে ১ জন আত্মহত্যায় নিজের জীবন বিসর্জন দেয়।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায় যে, “১৫-২৯ বছর বয়স্কদের মাঝে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।” আত্মহত্যার প্রবণতা বাংলাদেশেও ভয়ংকরভাবে বেড়ে গিয়েছে। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন বলছে যে, বাংলাদেশে ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৩৮৯ জন আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৮৫৭ জন গলায় রশি দিয়ে আত্মহুতি দেন। বাকি ৪১ হাজার ৫৩২ জন বিষপানে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেন।” পরিসংখ্যান দেখা যায়, বাংলাদেশে আত্মহত্যায় মারা যাওয়াদের অধিকাংশই নারী।

বাংলাদেশে প্রতিবছর এসএসসি, এইচএসসি’সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে অনেকেই নিজেকে শেষ করে দেয়। এই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোসাইন, তানভীর রহমান ও মুশফিক মাহবুবের আত্মহত্যার ঘটনা সারা বাংলাদেশে তোলপাড় তৈরি করে। আমাদের অগোচরে এমন অনেকেই আছেন যারা আত্মহত্যা করে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়। আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে হতাশা ও মানসিক অসুস্থতা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এই তথ্য ২০১৬ সালের। বাংলাদেশে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে আড়াইশর একটু বেশি।” এত বেশি সংখ্যক মানসিক রোগীর জন্য এত কম সংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকার কারণে আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মনোরোগের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকে।

তাছাড়া প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সমস্যা, যৌন নির্যাতন, বেকারত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, তীব্রভাবে তিরস্কারের শিকার হওয়া, প্রত্যাশা মতো ফল না পাওয়া ইত্যাদি। আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি সবসময় নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা বলে বেড়ায়। তারা মানুষকে বলে বেড়ায় যে, আমি মারা গেলে কেউ আমাকে মনে রাখবে না এবং কান্নাও করবে না। বরং সবাই আমার পরপারে চলে যাওয়াতে খুশি হবে ইত্যাদি

আত্মহত্যার মতো এই জঘন্য কাজ ঠেকাতে ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। সমাজ যদি পর্যাপ্ত সমর্থন দেয় এবং মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক মজবুত করে তাহলে আত্মহত্যার হার কমানো যাবে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে যদি পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশিরা মিলে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এই মন্দ কাজ থেকে সরে আসতে যথাযথ পরামর্শ ও প্রেরণা যোগায় এবং ভালো মনো-চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় তাহলে সমাজ থেকে আত্মহত্যা কর্পূরের মতো উবে যাবে। এভাবেই আত্মহত্যার প্রতিরোধ করে আমরা একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা এবং আত্মহত্যামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।