সেই রাতে মা দোকানে গিয়ে ফিরে এল না। আর কখনো এল না। কী হয়েছিল তার? আমি জানি না। আমার বাবাও একদিন চলে গিয়েছিল, তারপর আর কখনো ফেরেনি; বাবা যুদ্ধে লড়াই করছিল। লড়ছিলাম আমরাও। কিন্তু আমরা তো বাচ্চাকাচ্চা, দাদা-দাদির মতো আমাদের কাছেও কোনো বন্দুক ছিল না। দেশে সরকার যে দস্যুদের ডেকে এনেছিল, আমার বাবা তাদের সাথে যুদ্ধ করছিল। দস্যুরা জায়গাটার আনাচে কানাচে চষে বেড়াচ্ছিল আর আমরা তখন কুকুরের তাড়া খাওয়া মুরগির মতো তাদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত। কোথায় যাওয়া যায় বুঝতে পারছিলাম না। দোকানে গেলে রান্নার তেল পেতে পারে শুনে মা দোকানে গেল। আমরাও খুশি হয়েছিলাম কারণ অনেকদিন খাবারে তেলের স্বাদ পাইনি; তেল হয়ত সে ঠিকই পেয়েছিল। তারপর অন্ধকারে কেউ তাকে ধরাশায়ী করে সেটা কেড়ে নিয়ে গেছে। নিশ্চয় সেই দস্যুদের সাথে তার দেখা হয়ে গিয়েছিল। তারা যদি তোমাকে দেখে তো সোজাসুজি মেরে ফেলবে। গ্রামে তারা দুবার এসেছিল আর আমরা দৌড়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়েছি। তারপর চলে গেলে ফিরে এসে দেখি আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে উধাও; কিন্তু তিন বারের বার যখন তারা আবার এল তখন নেয়ার মতো আর ছিল না কিছুই- না তেল, না খাবার। তাই তারা আমাদের ঘরের বেড়াগুলো জ্বালিয়ে দিল। ছাদগুলো ভেতরের দিকে ধসে পড়ল। মা কোথাও কিছু টিনের টুকরো কুড়িয়ে পেয়েছিল; সেগুলো উপরে একদিকে ছাদের মতো করে ছড়িয়ে রেখেছিলাম আমরা। সেখানে বসেই মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যে রাতে মা আর ফিরে এল না।
দস্যুদের অত্যাচারে বাইরে যেতে এমনকি কাজকর্ম করতেও আমরা ভয় পেতাম। আসলে ছাদ ছাড়া বাসার ভেতরটা দেখতে এমন লাগছিল যে বাইরে থেকে হয়ত মনে হচ্ছিল বাসায় কেউ নেই। সারা গ্রামে সব শেষ হয়ে গেছে। মানুষের চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যেত শুধু। মা না বলা পর্যন্ত কিছু করতে অথবা ছুটোছুটি করতেও আমরা ভয় পেতাম। ভাইবোনদের মধ্যে আমি মেঝ মেয়ে, ছোট ভাইটা আমার ঘাড় ধরে পেটের উপরে ঝুলে থাকে; পা দিয়ে আমার কোমরে এমনভাবে আটকে থাকে যেন বাচ্চা বানর তার মাকে জড়িয়ে ঝুলছে। পোড়া বাসার একটা ভাঙ্গা কাঠের খুঁটি হাতে বড় ভাই সারারাত বসে ছিল। দস্যুরা এলে নিজেকে বাঁচাবে বলে।
মা আর কখনো আসেনি। দাদি আমাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারত না। একজন মহিলা আমার ছোট ভাইকে কিছুটা বুকের দুধ খেতে দিয়েছিল। অবশ্য বাসায় সে আমাদের মতোই পরিজ খেত। দাদি আমাদের নিয়ে বুনো শাকের খোঁজে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রামের লোকেরা আগেভাগে নিয়ে যাওয়াতে সেখানে একটা পাতাও আর বাকি ছিল না
আমরা সারাদিন সেখানেই ছিলাম। মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বলতে পারব না সেদিন কী বার ছিল; ততদিনে গ্রামের স্কুল, চার্চ সব বন্ধ হয়ে গেছে, তাই কেউ জানত না সেটা রবিবার নাকি সোমবার।
সূর্য ডোবার ঠিক আগে দাদি আর দাদা এল। গ্রামের কেউ তাদের খবর দিয়েছিল যে মা ফেরেনি আর আমরা বাচ্চারা বাড়িতে একদম একা। আমি দাদার আগে দাদি বলি। কারণ দাদি বেশ বড়সড় আর শক্তসমর্থ, এখনো বুড়ো হয়নি। আর দাদা ছোটখাটো মানুষ। ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে কোনখানে যে দাঁড়িয়ে আছে তুমি দেখতেও পাবে না। কী বলছ না শুনেই সে হাসবে। আর তার চুল দেখলে মনে হবে যেন সবসময় সাবানের ফেনা লেগে আছে। ছোটভাই, বড়ভাই, দাদা আর আমাকে নিয়ে দাদি তার বাসার দিকে রওনা দিল। রাস্তায় ভয় পেয়েছিলাম; দস্যুদের সামনে পড়ে যাই নাকি! (শুধু আমার ছোট ভাই ভয় পায়নি, দাদির পিঠে ঘুমাচ্ছিল) তারপর দাদির বাসায় অনেকদিন অপেক্ষা করেছিলাম আমরা। একমাস হবে হয়ত। আমাদের তখন খুব ক্ষিদে পেত। মা আর কখনো আসেনি। দাদি আমাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারত না। একজন মহিলা আমার ছোট ভাইকে কিছুটা বুকের দুধ খেতে দিয়েছিল। অবশ্য বাসায় সে আমাদের মতোই পরিজ খেত। দাদি আমাদের নিয়ে বুনো শাকের খোঁজে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রামের লোকেরা আগেভাগে নিয়ে যাওয়াতে সেখানে একটা পাতাও আর বাকি ছিল না।
সামান্য দূরত্বে দাদা অল্প বয়সের ছেলেদের পিছু পিছু হেঁটে মাকে খুঁজতে গিয়েছিল কয়েকবার। কিন্তু পায়নি। দাদি একদিন অন্য মহিলাদের সাথে মিলে সুর করে বিধাতাকে ডাকতে লাগল। আমিও তাদের সাথে সুর মেলালাম। সামান্য খাবার যোগাড় করা গেল। কিছু শিম। কিন্তু দুদিন পরে তা-ও ফুরিয়ে গেল। দাদার একসময় তিনটা ভেড়া, একটা গরু আর সবজি বাগান ছিল। দস্যুরা ভেড়াগুলো আর গরুটা নিয়ে গেছে। তাদেরও হয়ত ক্ষিদে পেয়েছিল। তারপর যখন চাষাবাদের সময় এল, দাদার কাছে তখন বোনার মতো একটা বীজও ছিল না।
তাই সবাই মিলে নয়, দাদি একাই সিদ্ধান্তটা নিল যে আমরা অন্য কোথাও চলে যাব। দাদা শরীর এদিকওদিক দুলিয়ে একটু-আধটু আপত্তি করেছিল বটে। দাদি দেখেও না দেখার ভান করে থাকল। আমরা বাচ্চারা তো মহাখুশি! যেখানে মা নেই, খাবারও নেই- এমন জায়গা ছেড়ে চলে গেলেই আমরা বাঁচি। আসলে আমরা এমন কোথাও চলে যেতে চাইতাম যেখানে দস্যুরা নেই অথচ খাবার আছে। ভাবতে ভালোই লাগত যে এরকম জায়গা নিশ্চয়ই কোথাও আছে, দূরে।
দাদি চার্চে পরে যাওয়ার কাপড়টা দিয়ে, তার বদলে একজনের কাছে কিছু ভূট্টা পেল। ভূট্টাগুলো সিদ্ধ করে ছালায় বেঁধে নিল। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। দাদি ভেবেছিল রাস্তায় কোথাও নদী থেকে পানি নিয়ে নেবে কিন্তু সামনে কোন নদী না থাকায় তীব্র্র পিপাসায় আমাদের আবার ঘুরে আসতে হলো। অবশ্য একেবারে দাদিবাড়ি পর্যন্ত ফিরে না এসে আমরা একটা গ্রামে এলাম যেখানে পানির পাম্প ছিল। সামান্য কাপড়চোপড় আর ভূট্টাভরা বাক্সটা খুলে দাদি সেখান থেকে তার জুতাজোড়া বিক্রি করে পানি নেয়ার জন্য বড় একটা প্লাস্টিকের বোতল কিনল। আমি বললাম, দাদি, তোমার কাপড়ও নেই, আবার জুতাও দিয়ে দিলে, চার্চে যাবে কী করে? সে আমাকে বুঝিয়ে বলল, অনেক দূর যেতে হবে আর এত জিনিস কি সাথে বয়ে নেয়া যায়! সেই গ্রামেও দেখলাম মানুষেরা পালিয়ে যাচ্ছে। মনে হলো, কোথায় যাওয়া যায় তা আমাদের চেয়ে ওরা ভালো জানে। তাই তাদের সাথে আমরাও যোগ দিলাম। আমাদের ক্রুগার পার্কের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ক্রুগার পার্কের ব্যাপারে আমরা জানতাম। সেটা একটা পশুরাজ্য- যেখানে হাতি, সিংহ, শিয়াল, হায়েনা, গন্ডার আর কুমিরে ভরা। যুদ্ধের আগে আমাদের নিজেদের দেশেও কিছু প্রাণী ছিল (দাদা বলে, আমরা বাচ্চারা তখনো জন্মাইনি) কিন্তু দস্যুরা হাতিগুলো মেরে দাঁতগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। তারপর সৈন্যদের সাথে মিলে খরগোশগুলো খেয়ে সাবাড় করেছে। আমাদের গ্রামের নদীতে একবার একজন লোকের দুটো পা কুমিরে খেয়ে ফেলেছিল। এছাড়া আমাদের দেশ সবসময় এমনিতে মানুষের দেশই ছিল, পশুদের নয়। ক্রুগার পাকের্র ব্যাপারে জানতাম কারণ আমাদের গ্রামের কিছু মানুষ সেখানে থাকত। সাদা মানুষেরা যেখানে বেড়াতে বা পশু দেখতে আসত সেখানে কাজ করার জন্য গ্রামের কয়েকজন ঘর ছেড়েছিল।
সামান্য কাপড়চোপড় আর ভূট্টাভরা বাক্সটা খুলে দাদি সেখান থেকে তার জুতাজোড়া বিক্রি করে পানি নেয়ার জন্য বড় একটা প্লাস্টিকের বোতল কিনল। আমি বললাম, দাদি, তোমার কাপড়ও নেই, আবার জুতাও দিয়ে দিলে, চার্চে যাবে কী করে? সে আমাকে বুঝিয়ে বলল, অনেক দূর যেতে হবে আর এত জিনিস কি সাথে বয়ে নেয়া যায়! সেই গ্রামেও দেখলাম মানুষেরা পালিয়ে যাচ্ছে
আমরা আবার রওনা দিলাম। মহিলারা ক্লান্ত হয়ে গেল। আমার মতো কিছু বাচ্চা ছিল যারা আরো ছোটদের পিঠে নিয়ে এগোচ্ছিল। একজন লোক আমাদেরকে ক্রুগার পার্কের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা কি চলে এসেছি? আমরা কি চলে এসেছি? আমি বারবার দাদির কাছে জানতে চাচ্ছিলাম। দাদি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, এখনো আসিনি। বরং তার মতে আমাদেরকে পাঁচিল থেকে দূরে একটু বেশি ঘুরে যেতে হবে। শহরে আলো পৌঁছানোর জন্য বৈদ্যুতিক খুঁটির উপরে যে তারগুলো গিয়েছে সেগুলো থেকে বাঁচার জন্য। তার কথা শুনে মনে হলো পাঁচিল ছোঁয়ামাত্রই চামড়া ঝলসে আমরা মরে যেতে পারি। পাঁচিলের গায়ে ছবি টাঙানো আছে। মিশন হাসপাতাল পুড়িয়ে ফেলার আগে সেখানে একটা লোহার বাক্সের উপরে চোখ, চুল আর চামড়াবিহীন মাথার এই ছবিটা দেখেছিলাম।
আমি আবার জানতে চাইলে তারা বলল, ক্রুগার পার্কের উপর দিয়ে আরও এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। কিন্তু যে ঝোপঝাড়গুলোর ভেতর দিয়ে দিনভর হাঁটছিলাম, দেখে মনে হচ্ছিল সব একইরকম। বানর, পাখি আর কচ্ছপ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী চোখে পড়েনি। কচ্ছপ হলে অবশ্য আমাদের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। আমার বড় ভাই আর অন্যান্য ছেলেরা মিলে সেটাকে ধরে পথ দেখিয়ে চলা লোকটির কাছে এনেছে কেটে রান্না করবে বলে। লোকটি কচ্ছপটাকে ছেড়ে দিয়েছিল কারণ তার মতে আগুন জ্বালানো ঠিক হবে না। যেহেতু পার্কের ভেতরে ছিলাম, আগুন জ্বাললে ধোঁয়ার কারণে আমরা ধরা পড়ে যেতাম। পুলিশ আর নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের দেখলে আবার যেখান থেকে এসেছিলাম আবার সেখানে পাঠিয়ে দিত। লোকটি বলেছিল রাস্তা এড়িয়ে, সাদা মানুষদের ক্যাম্প এড়িয়ে আমাদেরকে পশুপাখির মাঝে পশুপাখির মতো করে এগিয়ে যেতে হবে। হঠাৎ যখন ডাল ভাঙ্গার আর ঘাস মাড়ানোর শব্দ আমার কানে এল, জানি আমিই প্রথম শব্দটা শুনলাম, লোকটির কথামতো পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী আমাদেরকে পেয়ে গেছে ভেবে প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিলাম। দেখা গেল সেটা একটা হাতি। তারপর আরো একটা হাতি, আরো অনেক হাতি! গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে যেদিকেই তাকাও শুধু গাঢ় রঙের স্তূপ, নড়তে দেখা যাবে। শুঁড় পেঁচিয়ে তারা মোপেন গাছের পাতাগুলো মুখে পুরছিল। বাচ্চা হাতিগুলো মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে ছিল। একটু বড় হাতিরা আমার বড় ভাই আর তার বন্ধুদের মতো কুস্তি লড়ছিল। হাতের বদলে ব্যবহার করছিল শুঁড়। আমার এত মজা লাগছিল যে ভয় পেতেই ভুলে গেলাম। লোকটি বলল হাতিগুলো যতক্ষণ পার হবে ততক্ষণ আমাদের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। হাতিগুলো ধীরেসুস্থে চলছিল কারণ শরীর এত ভারী যে তাদের পক্ষে কাউকে দেখে চট্ করে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
খরগোশগুলো আমাদের দেখে ছুটে পালিয়ে গেল। তাদের লাফ দেখে মনে হচ্ছিল উড়ছে। আমাদের গ্রামের একটা ছেলে খনি থেকে আনা সাইকেল নিয়ে যেভাবে এঁকেবেঁকে চলত, বন্য শুকোরেরা শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি সামনে থেকে সরে সেরকম আঁকাবাঁকা লাইন করে মরার মতো পড়ে রইল। আমরা প্রাণীগুলোর পিছু নিলাম তারা কোথায় পানি খায় দেখার জন্য। তাদের খাওয়ার পরে গর্তে জমে থাকা পানি আমরা খেতে আরম্ভ করলাম। পিপাসায় এত কাতর ছিলাম, পানির খোঁজ পাওয়ার আগপর্যন্ত বুঝতেই পারিনি। আমাদের সামনে প্রাণীগুলো সারাদিন ধরে শুধু খেয়েই চলছিল। তাদের দিকে তাকালে দেখতে পেতে যে তারা ঘাস, গাছ অথবা গাছের শিকড় কিছু না-কিছু খাচ্ছেই। অথচ সেখানে আমাদের খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। সামান্য সিদ্ধ ভূট্টা শেষ হয়ে গিয়েছিল। নদীর উপর লতায় জন্মানো কতকগুলো শুকনো, পিপড়েধরা ফিগ ছিল আমাদের একমাত্র খাদ্য যা আসলে বেবুনরা খায়। সুতরাং ওই জঙ্গলে পশুপাখির মতো হতে চাওয়া খুব কষ্টকর ছিল বটে।
হঠাৎ যখন ডাল ভাঙ্গার আর ঘাস মাড়ানোর শব্দ আমার কানে এল, জানি আমিই প্রথম শব্দটা শুনলাম, লোকটির কথামতো পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী আমাদেরকে পেয়ে গেছে ভেবে প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিলাম। দেখা গেল সেটা একটা হাতি। তারপর আরো একটা হাতি, আরো অনেক হাতি! গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে যেদিকেই তাকাও শুধু গাঢ় রঙের স্তূপ, নড়তে দেখা যাবে। শুঁড় পেঁচিয়ে তারা মোপেন গাছের পাতাগুলো মুখে পুরছিল। বাচ্চা হাতিগুলো মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে ছিল। একটু বড় হাতিরা আমার বড় ভাই আর তার বন্ধুদের মতো কুস্তি লড়ছিল। হাতের বদলে ব্যবহার করছিল শুঁড়। আমার এত মজা লাগছিল যে ভয় পেতেই ভুলে গেলাম
দিনের বেলায় তীব্র গরমে সিংহগুলোকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখতাম। তাদের গায়ের রঙ ঘাসের রঙের হওয়াতে আমরা প্রথমে তাদের দেখতে পাইনি। কিন্তু লোকটি বুঝতে পেরে আমাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। আমারও সিংহগুলোর মতো করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। ছোট ভাইটা দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমার কাছে খুব ভারী লাগত। ওকে পিঠে উঠিয়ে দেয়ার জন্য দাদি যখন আমাকে খুঁজত, আমি লুকিয়ে থাকতাম। আমার বড়ভাই তেমন কথাবার্তা বলত না; কোথাও জিরিয়ে নিতে বসলে পরে তাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠাতে হতো। সে যেন দাদার মতো হয়ে গেছে, কিছুই শুনতে পায় না। একবার দেখি দাদির মুখের উপরে কতকগুলো মাছি হেঁটে বেড়াচ্ছে অথচ সে তাড়িয়ে দিচ্ছে না; আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পাম গাছের একটা পাতা নিয়ে মাছিগুলোকে ধাওয়া করলাম।
রাতেও দিনের মতো করে আমরা হাঁটতাম। সাদা মানুষদের ক্যাম্পের রান্নার আগুন দেখা যেত। ধোঁয়া আর মাংসের গন্ধ নাকে লাগত। হায়েনাগুলোকে দেখতাম গন্ধ পেয়ে ঝোঁপের মধ্যে উধাও হয়ে যেত। লজ্জায় তাদের পিঠ ঢালু হয়ে গেছে। তবে তারা কেউ যদি মাথাটা একবার ঘোরাত তো দেখত, তাদের বড়, চকচকে বাদামি চোখগুলো দেখতে ঠিক আমাদের চোখের মতো; অন্ধকারে যখন আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাই। ক্যাম্পে কাজের লোকগুলোর থাকার জায়গা থেকে আমাদের ভাষায় কথাবার্তা ভেসে আসছিল। দলের একজন মহিলা তখন সাহায্যের জন্য তাদের কাছে যেতে চাইল। অনবরত চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে সে বোঝাতে চাচ্ছিল যে তারা উচ্ছিষ্ট থেকেও তো আমাদেরকে কিছু দিতে পারে। শেষে দাদিকে মহিলার মুখ চেপে ধরতে হলো। যে লোকটি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে বারবার ক্রুগার পার্কে গ্রামের পরিচিত লোকদের থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। আমাদেরকে সাহায্য করলে নাকি কাজ থেকে তাদের ছাঁটাই করে দেবে। সুতরাং তারা যদি আমাদেরকে দেখেও ফেলে তো, হয় না দেখার ভান করবে নয়তো ভাব দেখাবে যে কেবল কিছু পশুপাখি দেখেছে।
রাতে সামান্য ঘুমিয়ে নেয়ার জন্য কখনও আমরা একটু থামতাম। গাদাগাদি করে ঘুমাতাম। যেহেতু প্রতিটি মুহূর্তে আমরা শুধু হাঁটছি আর হাঁটছিই, তাই ঠিক কবে তা বলতে পারব না, তবে কোনো একটা রাতে মনে হলো সিংহগুলো একেবারে পাশেই। শব্দটা দূর থেকে শোনা গর্জনের মতো নয়। বরং যেন খুব কাছেই, হাঁপানোর শব্দের মতো, দৌড়ালে আমরা যেমন করি। তারা কিন্তু মোটেই দৌড়াচ্ছে না, কাছেই কোথাও বসে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে আমরা আরো কাছাকাছি চলে এলাম; একজনের উপরে আরেকজন। হুড়োহুড়িতে কেউ ধারের দিকে চলে গেলে ক্রমাগত মাঝখানে চলে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। ভয়ের চোটে ঘাম ছুটে যাওয়া এক মহিলার দুর্গন্ধময় শরীরের চাপে আমি পিষে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তবু তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে পেরে ভরসা পাচ্ছিলাম। বিধাতার কাছে মিনতি করছিলাম যে সিংহরা যদি নেবেই তো ধারের দিক থেকে কাউকে টেনে নিয়ে চলে যাক। সামনের যে গাছটা থেকে লাফিয়ে এলে একটা সিংহ ঠিক মাঝখানে আমাকে পাবে, সেই দৃশ্যটা যেন দেখতে না হয় তাই আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। লোকটি ভয় পাওয়ার বদলে একটা মরা ডাল নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সব গাছে আঘাত করতে লাগল। সে আমাদের সবসময় শব্দ করতে মানা করত। কিন্তু তখন নিজেই চিৎকার চেঁচামেচি করে হট্টগোল শুরু করে দিল। সে সিংহদের উদ্দেশ্যে এমন শোরগোল করছিল, ঠিক যেভাবে আমাদের গ্রামে মাতাল একটা লোক উদ্দেশ্যবিহীনভাবে চেঁচায়। একটু পরে লোকটির চিৎকারের উত্তরে দূর থেকে ভেসে আসা সিংহদের গর্জন শুনতে পেলাম।
সিংহগুলোর মতো করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। ছোট ভাইটা দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমার কাছে খুব ভারী লাগত। ওকে পিঠে উঠিয়ে দেয়ার জন্য দাদি যখন আমাকে খুঁজত, আমি লুকিয়ে থাকতাম। আমার বড়ভাই তেমন কথাবার্তা বলত না; কোথাও জিরিয়ে নিতে বসলে পরে তাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠাতে হতো। সে যেন দাদার মতো হয়ে গেছে
আমরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পাথরের উপরে পা দিয়ে নদী পার হওয়ার সময়ে আমার বড়ভাই আর লোকটি মিলে দাদাকে তুলে এক পাথর থেকে অন্য পাথরে রাখছিল। দাদি এমনিতে শক্তসমর্থ কিন্তু তার দুই পা থেকে রক্ত ঝরছিল। একমাত্র আমার ছোট ভাইটিকে ছাড়া মাথার ওপরের বাক্সগুলো বা অন্য কিছুই আর আমরা বইতে পারছিলাম না। তাই সব জিনিস একটা ঝোঁপের নিচে ফেলে রওনা দিলাম। দাদি বলছিল, আমরা নিজেরা কোনরকমে পৌঁছতে পারলেই হয়! একসময় ক্ষিধের জ্বালায় অচেনা কিছু জংলি ফল খেয়ে ফেলাতে আমাদের পেট খারাপ হয়ে গেল। পেটে যখন ব্যথা শুরু হলো তখন আমরা লম্বা লম্বা ঘাস ঘেরা একটা জায়গায় ছিলাম। ঘাসগুলো প্রায় হাতির সমান উঁচু। দাদা তো আর আমার ছোট ভাইয়ের মতো যেখানেসেখানে বসে পড়তে পারে না, তাই তাকে বারবার ঘাসের আড়ালে যেতে হচ্ছিল। আমাদের দ্রুত ছোটা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। লোকটি বারবার তাগাদা দিচ্ছিল, তবু তাকে দাদার জন্য একটু অপেক্ষা করতে বলছিলাম।
দাদা যেন আমাদের সাথে তাল মেলাতে পারে তাই সবাই বসে ছিলাম। কিন্তু দাদা পারেনি। মধ্যদুপুরে পোকামাকড়ের টানা ডাকে ঘাসের ভেতরে তার নড়াচড়ার কোনো শব্দ আমাদের কানে আসেনি। ঘাসগুলো অনেক লম্বা আর দাদা এত ছোট যে তাকে দেখা যায়নি। কিন্তু ঢোলা প্যান্ট আর ছেঁড়া শার্ট পরনে কোথাও সে ছিল নিশ্চয়ই। শার্টটা সুতো না থাকায় দাদি আর সেলাই করে দিতে পারেনি। দাদা এত দুর্বল আর ধীরেপায়ে হাঁটে যে তার পক্ষে বেশিদূরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। ছড়িয়ে গেলাম দলে দলে ভাগ হয়ে যেন নিজেরাও আবার ঘাসের মধ্যে হারিয়ে না যাই। ঘাসগুলো আমাদের নাকে-চোখে ঢুকে যাচ্ছিল। নীচুস্বরে দাদাকে ডাকছিলাম কিন্তু পোকামাকড়ের একটানা শব্দের ফাঁকে সে ডাক তার কানে পৌঁছানোর তেমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। অনেক খুঁজেও শেষপর্যন্ত তাকে পাওয়া গেল না। লম্বা লম্বা ঘাসের উপরে সারারাত আমরা পড়ে থাকলাম। ঘুমের মধ্যে মনে হলো, খরগোশের লুকিয়ে রাখা বাচ্চার মতো কোনরকম কোথাও একটু জায়গা করে নিয়ে গুটিশুটি মেরে দাদা হয়ত শুয়ে আছে।
জেগে ওঠার পরেও দাদাকে কোথাও দেখলাম না। তাই আবার খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। ততক্ষণে ঘাসের মধ্যে বারবার যাতায়াতের কারণে কতকগুলো রাস্তাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাকে খুঁজে না পেলেও অন্তত তার জন্য আমাদেরকে খুঁজে পাওয়া তো কঠিন ছিল না। সমস্ত দিন আমরা অপেক্ষায় বসে থাকলাম। চারদিক চুপচাপ। বন্য প্রাণীগুলোর মতো গাছের ছায়ায় শুয়ে থাকলেও সূর্যের প্রখরতা থেকে বাঁচা যেত না। চিত হয়ে শুয়ে আকাশে ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকা কুৎসিত, বাঁকা ঠোট আর পালকবিহীন গলাওলা পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আগেও বেশ কয়েকবার মরা প্রাণীর হাড়হাড্ডি চাবাতে দেখেছি ওদের। অবশ্য সেখানে তাদের খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। অনেক উপরে বৃত্তাকারে উড়তে উড়তে তারা নিচে নেমে আসে তারপর আবার উপরে উঠে যায়। দেখলাম তাদের গলাগুলো ঘুরিয়ে এদিকওদিক ঠোকর দেয়ার ভঙ্গি করছে। আবার গোলগোল করে উড়ছে। দদিও আমার ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে পাখিগুলোর দিকে বরাবর তাকিয়ে ছিল।
দুপুরের পরে, লোকটি দাদিকে বলল, এবার আমাদের যাওয়া উচিত। বলল যে তাদের বাচ্চাগুলো যদি এরপরও না খেয়ে থাকে তো মারা যাবে।
উত্তরে দাদি কিছুই বলেনি।
লোকটি দাদিকে আশ্বাস দিল, যাওয়ার আগে আমি তোমাদের খাওয়ার পানি এনে দেব।
দাদি একে একে বড় ভাই, নিজের কোলে ছোট্ট ভাইটি আর আমার দিকে তাকাল। আমরা দেখলাম একের পর এক সবাই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না যে চারপাশের ঘাসগুলো মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল যেখানে একটু আগে তারা বসে ছিল। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে ক্রুগার পার্কে আমরা একদম একা হয়ে যাব আর পুলিশ অথবা বন্য প্রাণীরা সহজেই আমাদের পেয়ে যাবে। আমার নাক-চোখের পানি হাতের উপরে বেয়ে পড়ছিল কিন্তু দাদি লক্ষই করল না। গ্রামের বাড়িতে চ্যালাকাঠ মাটি থেকে তোলার জন্য দাদি যেমন পা ফাঁক করে দাঁড়াত সেভাবে উঠে দাঁড়াল। আমার ছোট ভাইটিকে নিজের কাপড় দিয়ে পিঠে বেঁধে নিল, জামার উপরের দিকটা ছিঁড়ে যাওয়াতে তার বড় স্তনদুটো দেখা যাচ্ছিল। যদিও সেগুলোতে ছোট ভাইয়ের জন্য কিছুই ছিল না। দাদি শুধু বলল, চল।
তারপর সেই লম্বা ঘাসওলা জায়গাটা ফেলে আমরা চললাম। অনেক পেছনে ফেলে চলে এলাম। যে লোকটি আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল, তার এবং অন্য সবার সাথে এক হয়ে আমরা আবার যেতে আরম্ভ করলাম। আবারো হাঁটতে লাগলাম।
চার্চ কিংবা স্কুলের চেয়েও বড় একটা তাবু মাটির সাথে টেনে বাঁধা ছিল। যার জন্য এত দূরে এসেছি তা ঠিক এমন হবে, আগে বুঝতে পারিনি। অবশ্য এরকম একটা জিনিস আমি দেখেছিলাম যখন সৈন্যদের কাছে বাবা কোথায় আছে জানতে মা আমাকে নিয়ে শহরে গিয়েছিল। সেই তাবুর ভেতরে মানুষ বসে প্রার্থনার গান গাচ্ছিল। এটা যদিও একই রকম নীল-সাদায় বানানো কিন্তু প্রার্থনা বা গান গাওয়ার জায়গা নয়। এখানে আমাদের দেশ থেকে ভেসে আসা মানুষদের সাথে আমরা থাকি। ক্লিনিকের সিস্টার বলে, ছোট বাচ্চারা ছাড়াই নাকি আমরা দু’শ মানুষ। আবার ক্রুগার পার্ক থেকে আসার পথে জন্মানো শিশুরাও তো আছে!
কড়া রোদের মধ্যেও তাবুর ভেতরে বেশ অন্ধকার। মনে হয় পুরো গ্রামটাই ঠেলেঠুলে এখানে ঢুকে গেছে। প্রতিটি পরিবার বাড়ির বদলে চট অথবা বাক্সের মোটা কাগজ দিয়ে ঘেরা নিজেদের ছোট জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। আমরা যেখানে যা পেতাম তা দিয়েই অন্যদেরকে নিজেদের সীমানা বুঝিয়ে দিতাম যে এর ভেতরে কেউ আসতে পারবে না; যদিও দরজা, জানালা বা দেয়াল বলতে কিছুই ছিল না। তাই বাচ্চারা ছাড়া অন্য যে কেউ উঠে দাঁড়ালেই সবার বাড়ির ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পেত। কেউ কেউ আবার মাটির ঢেলা দিয়ে রঙ বানিয়ে চটের উপরে নকশাও করেছিল।
যাই হোক, অনেক উপরে আর দূরে হলেও, তাবুর ছাদটাই ছিল আমাদের সত্যিকারের ছাদ। ছাদটা ছিল আকাশের মতো। মনে হতো সেটা একটা পাহাড় আর পাহাড়ের ভিতরে থাকি আমরা। ফাটা ফাটা জায়গাগুলোতে ধুলোর স্তর ভারি হয়ে এমনভাবে নিচের দিকে নেমে এসেছে যেন মনে হয় সেগুলো বেয়ে উঠে যাওয়া যাবে। তাবুর ছাদটা মাথার উপরে বৃষ্টি ঠেকায়। কিন্তু পাশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে। সীমানাগুলোর মাঝখানে, যেখানে শুধু একজন মানুষ চলাচল করতে পারে, সেখানে আমার ছোট ভাইয়ের মতো বাচ্চারা বসে কাদা দিয়ে খেলে। হাঁটতে হলে তোমাকে তাদের মাড়িয়েই যেতে হবে। আমার ছোট ভাই একেবারে খেলে না। প্র্রতি সোমবারে ক্লিনিকে যখন ডাক্তার আসে দাদি তাকে তার কাছে নিয়ে যায়। সিস্টার বলেছে লম্বা সময় ধরে যথেষ্ট খাবার না পাওয়ার কারণে তার মাথার ভিতরে কোনো ক্ষতি হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধ চলছিল। আর বাবা সেখানে আমাদের সাথে ছিল না। তারপর আবার ক্রুগার পার্কেও সে খাবার পায়নি। সে শুধু সারাদিন দাদির গায়ের উপরে অথবা শরীরের যে কোনো জায়গায় হেলান দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় কিছু জানতে চায় কিন্তু দেখলেই বুঝবে যে সে তা বলতে পারছে না। অবশ্য কখনো কাতুকুতি দিলে সে হয়ত একটু হাসতেও পারে। ক্লিনিক থেকে একরকম গুঁড়ো খাবার দেয়, পানির সঙ্গে মিশিয়ে তাকে পরিজ বানিয়ে দেয়ার জন্য। আর এভাবে ধীরে ধীরে হয়ত একদিন সে ঠিক হয়ে যাবে।
যেদিন আমরা এখানে এসে উঠেছিলাম, আমার আর আমার বড় ভাইয়ের অবস্থাও একইরকম ছিল। তেমন কিছু ভালো করে মনে পড়ে না আমাদের। ক্রুগার পার্ক হয়ে দূর থেকে আসা সবাইকে প্রথমে যেখানে এসে জানাতে হয়, তাবুর আশেপাশে থাকা গ্রামের লোকেরা আমাদেরকে ধরাধরি করে সেই ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা ঘাসের উপরে বসে অপেক্ষা করছিলাম। কী করতে হবে ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না। উঁচু হিলের জুতা পরা, অদ্ভুত মসৃণ চুলওলা সুন্দরী এক সিস্টার আমাদেরকে কিছু প্যাকেট করা পাউডার খেতে দিল। পাউডারগুলো পানির সাথে মিশিয়ে ধীরে ধীরে খেতে বলল। আমরা দাঁত দিয়ে প্যাকেট ছিঁড়ে চেটে চেটেই খেতে লাগলাম। পাউডার আমার মুখে আঠার মতো লেগে গেলে ঠোঁট আর আঙুল থেকে চুষে খাচ্ছিলাম। আমাদের সাথে হেঁটে আসা বেশ কিছু বাচ্চা বমি করতে আরম্ভ করল। আমার অবশ্য শুধু হেচকির জন্য কষ্ট হচ্ছিল আর পেটের ভেতরের সবকিছু যেন সাপের মতো পেঁচিয়ে উপরে-নিচে ওঠানামা করছিল। অন্য একজন সিস্টার বারান্দায় লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে বলল কিন্তু আমরা উঠতেই পারলাম না। আমরা পুরো জায়গাটাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, একজন আর একজনের গায়ে হেলান দিয়ে কোনরকমে বসে ছিলাম। সিস্টার প্রত্যেকের একটা করে হাত ধরে তাতে সুঁচ ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। আরও কিছু সুঁচ দিয়ে রক্ত নিয়ে ছোট্ট টিউবে ভরছিল। আমাদের সুস্থ করার জন্যই হয়ত এসব করছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কেন, যতবার চোখ বুজে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে তখনো হাঁটছি আর হাঁটছিই, ঘাসগুলো খুব লম্বা আর সামনে অনেক হাতি। বুঝতেই পারছিলাম না যে সেসব অনেক দূরে ছেড়ে এসেছি।
তাবুর ভেতরে মানুষ বসে প্রার্থনার গান গাচ্ছিল। এটা যদিও একই রকম নীল-সাদায় বানানো কিন্তু প্রার্থনা বা গান গাওয়ার জায়গা নয়। এখানে আমাদের দেশ থেকে ভেসে আসা মানুষদের সাথে আমরা থাকি। ক্লিনিকের সিস্টার বলে, ছোট বাচ্চারা ছাড়াই নাকি আমরা দু’শ মানুষ। আবার ক্রুগার পার্ক থেকে আসার পথে জন্মানো শিশুরাও তো আছে! কড়া রোদের মধ্যেও তাবুর ভেতরে বেশ অন্ধকার। মনে হয় পুরো গ্রামটাই ঠেলেঠুলে এখানে ঢুকে গেছে। প্রতিটি পরিবার বাড়ির বদলে চট অথবা বাক্সের মোটা কাগজ দিয়ে ঘেরা নিজেদের ছোট জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। আমরা যেখানে যা পেতাম তা দিয়েই অন্যদেরকে নিজেদের সীমানা বুঝিয়ে দিতাম যে এর ভেতরে কেউ আসতে পারবে না; যদিও দরজা, জানালা বা দেয়াল বলতে কিছুই ছিল না। তাই বাচ্চারা ছাড়া অন্য যে কেউ উঠে দাঁড়ালেই সবার বাড়ির ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পেত। কেউ কেউ আবার মাটির ঢেলা দিয়ে রঙ বানিয়ে চটের উপরে নকশাও করেছিল
দাদি কিন্তু তখনো মোটামুটি শক্তভাবেই দাঁড়াতে পারছিল। লিখতে-পড়তে পারত বলে সে-ই আমাদের হয়ে সাইন করে দিল। দাদি আমাদেরকে তাবুর এক ধারে নিয়ে রাখল। যদিও সেদিক দিয়ে বৃষ্টি আসতে পারে কিন্তু ঝুলানো ঢাকনাগুলো উঠিয়ে রাখলে বেশ রোদ আসে আবার তাবুর ভিতরের গুমোট গন্ধটাও বেরিয়ে যায়। দাদির পরিচিত এক মহিলা তাকে পাটি বানানোর মতো ভালো জাতের ঘাসের জায়গাটা দেখিয়ে দিলে দাদি আমাদের শোয়ার জন্য বেশ কয়েকটা বানিয়ে ফেলল। মাসে একবার খাবারের ট্রাক ক্লিনিকে আসে। সাইন করে দাদি যে কার্ডগুলো নিয়েছিল তার একটা দেখালে আমরা চটের বস্তায় ভরা ভূট্টার তৈরি কিছু খাবার পাই। ছোট ঠেলাগাড়িতে বস্তাগুলো তাবুতে আনা হয়। আমাদেরটা দাদির বদলে আমার বড় ভাই ঠেলে আনে আবার খালি ঠেলাগাড়িগুলো ক্লিনিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে অন্যান্য ছেলেদের সাথে দ্রুত ঠেলার প্রতিযোগিতা চলে। কখনো কপালে থাকলে, গ্রামে যে লোকটা বিয়ারের যোগান দেয়, সে হয়ত ভাইকে কিছু টাকা দিয়ে বলে সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিতে। অবশ্য অন্য কোনো দিকে না গিয়ে ঠেলাগাড়িগুলো সরাসরি সিস্টারদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা। টাকা পেলে ভাই একটা ঠান্ডা ড্রিংক কিনে খায় আর আমার কাছে হাতেনাতে ধরা পড়লে আমাকেও ভাগ দেয়। প্রতিমাসের কোনো একদিন ক্লিনিকের উঠোনে চার্চের লোকেরা পুরোনো কাপড় স্ত‚প করে রেখে যায়। দাদির কাছে আরেকটা কার্ড আছে যেটা দেখালে আমরা সেখান থেকে কাপড় পছন্দ করে নিতে পারি। এখন আমার দুটো জামা, দুটো প্যান্ট আর একটা লম্বা হাতাওলা উলের জামা আছে। তাই এখন আমি স্কুলে যেতে পারি।
গ্রামের স্কুলে আমাদেরকে নিয়ে নিল। অবাক হয়ে দেখি তারা আমাদেরই ভাষায় কথা বলে। দাদি বলল কেন তারা এখানে আমাদেরকে থাকতে দিল; কারণ অনেক আগে, বাবা যখন ছোট ছিল, আমাদের গ্রাম থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত একই শাসকের অধীনে একটাই দেশ ছিল। তাদের আর আমাদের মাঝখানে ক্রুগার পার্ক ছিল না আর ছিল না কোনো সীমানা বা প্রাচীর- যা মানুষকে কষ্ট দেয়।
তাবুতে দিনের পর দিন থাকতে থাকতে আমার এগারো বছর বয়স হয়ে গেল। আমার ছোট ভাইয়ের বয়স প্রায় তিন যদিও তার মাথাটাই শুধু বড় কিন্তু শরীরটা এত ছোট যে তাকে ঠিক তিন বছরের বাচ্চার মতো দেখায় না। তাবুর কিছু মানুষ আশেপাশের পড়ে থাকা জমিতে কিছু শিম, ভূট্টা আর বাঁধাকপি লাগিয়েছে। বয়ষ্করা বসে বসে লতাপাতা দিয়ে নিজেদের বাগানের চারদিকে দেয়ার জন্য বেড়া বানায়। কারো অবশ্য শহরে গিয়ে কাজ করার নিয়ম নেই কিন্তু মহিলারা কেউ কেউ গ্রামেই কাজ পেয়ে গেছে তাই নিজেদের জন্য এটাসেটা কিনতে পারে। সেই গ্রামে আমাদের ওখানকার মতো কাদামাটি দিয়ে নয়, ইট আর সিমেন্ট দিয়ে সুন্দর বাড়ি বানানো হয়। দাদি যেহেতু এখনো শক্ত-সমর্থই আছে তাই সেরকম একটা জায়গায় কাজ পেয়ে গেল। সে মাথায় করে কখনো ইট আবার কখনও বাক্সভরা পাথর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এখন তার কাছে চিনি-চা-দুধ-সাবান কেনার পয়সা থাকে। চায়ের দোকান থেকে একটা ক্যালেন্ডার পেয়ে দাদি তাবুর ঝোলানো ছাদে লাগিয়ে রেখেছে। স্কুলে আমি বেশ চালাক-চতুর। দাদি দোকানের বাইরে থেকে মানুষের ছুঁড়ে ফেলা বিজ্ঞাপনের কাগজ কুড়িয়ে এনে আমার বইগুলোতে মলাট লাগিয়ে দেয়। মোমবাতির দাম বেশি আর রাত হলে আমাদেরকে তাবুর ভিতরে সেই ক্রুগার পার্কের মতো ঠাসাঠাসি করে শুতে হয় তাই সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই দাদি আমাকে আর বড় ভাইকে দিয়ে বাড়ির কাজগুলো করিয়ে নেয়। চার্চে যাওয়ার জন্য দাদি নিজের জুতা এখনও কিনতে পারেনি কিন্তু আমার আর বড় ভাইয়ের স্কুলের কালো জুতা ঠিকই কিনে দিয়েছে। আবার তা মুছে পরিষ্কার করে রাখতেও ভোলে না। প্র্রতিদিন যখন তাবুর ভিতরে সকাল হয়, শিশুরা কাঁদতে থাকে, বড়রা একজন আর একজনকে বাইরের গোছলখানার দিকে ঠেলতে থাকে আর বাচ্চারা কেউ কেউ কাল রাতে যে বাটি থেকে আমরা পরিজ নিয়ে খেয়েছি সেটার শুকিয়ে যাওয়া গুড়ো খুঁটিয়ে খেতে থাকে, ঠিক তখন আমি আর আমার বড় ভাই স্কুলের জুতা গুছিয়ে নেই। দাদি পাটির ওপরে আমাদেরকে একসাথে পা সোজা করে বসতে বলে যেন সে ভালোভাবে দেখতে পায় যে আমরা ঠিকমতো জুতা পরেছি কি না। তাবুর অন্য কোনো বাচ্চার স্কুলের জুতা নেই। তাদের সাথে তুলনা করে নিজেদের তিনজনের দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা যেন আবার সত্যি সত্যি নিজেদের বাসায় আছি, একটুও দূরে আসিনি আর মাঝখানে কোনো যুদ্ধ ছিল না।
কয়েকজন সাদা মানুষ একটা সিনেমা বানাবে বলে তাবুতে থাকা লোকদের ছবি তুলতে এল। যদিও সিনেমার কথা আগে শুনেছি কিন্তু কখনো দেখিনি। একজন সাদা মহিলা ঠেলেঠুলে আমাদের জায়গায় ঢুকে গিয়ে দাদিকে এটাসেটা প্রশ্ন করা শুরু করল। সাদা মহিলাটির ভাষা বোঝে এমন একজন আমাদের ভাষায় দাদিকে প্রশ্নগুলো বুঝিয়ে বলতে লাগল।কতদিন ধরে আপনারা এভাবে আছেন?
দাদি জানতে চাইল, ‘এখানে’ বলতে সে কি ‘তাবুতে’ বোঝাচ্ছে? দুই বছর এক মাস।
ভবিষ্যতের জন্য আপনি কী আশা করেন?
কিছু না। আমি এখানেই বেশ আছি।
কিন্তু আপনার বাচ্চাদের জন্যও কি কিছু চান না?
আমি তাদের পড়ালেখা শেখাতে চাই যেন তারা বড় হয়ে ভালো কাজ পায় আর রোজগার করতে পারে।
আপনি কি কখনো আপনার নিজের দেশ মোজাম্বিকে ফিরে যেতে চান?
আমি ফিরে যাব না।
কিন্তু যুদ্ধ থেমে গেলে তো এখানে আপনাদের আর থাকতে দেয়া হবে না, তখনও কি আপনারা ফিরে যাবেন না?
আমার মনে হয়না দাদি আর কথা বাড়াতে চায়। সে আর সাদা মহিলার কথার উত্তর দেবে বলেও মনে হয় না। সাদা মহিলাটি আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
দাদি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে উদাস চোখে বলতে লাগল, আমাদের কোনো বাড়ি নেই। কিছু নেই।
দাদি এটা কেন বলল? কেনো? আমি তো ফিরে যাব। আমি আবার সেই ক্রুগার পার্ক পেরিয়ে চলে যেতে চাই। মা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে, যুদ্ধের পরে দস্যুরাও হয়ত আর ওখানে থাকবে না। আর দাদাকে যেখানে একলা ফেলে এসেছি, সেখান থেকে কোনোভাবে আস্তে আস্তে ক্রুগার পার্কের ভেতর দিয়ে এতদিনে নিশ্চয় সে বাড়িতে পৌঁছে গেছে। তারা নিশ্চয় বাসায় আছে আর তাদের কথা তো আমার মনে পড়তেই থাকবে!
নাদিন গোর্ডিমার: সাউথ আফ্রিকায় জোহেন্সবার্গের কাছে স্প্রিংস নামে একটি ছোট শহরে জন্মেছিলেন নাদিন গোর্ডিমার। একেবারে তরুণ বয়স থেকেই সাউথ আফ্রিকার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণায় তিনি নিয়োজিত। ছোটবেলায় ক্যাথলিক কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। ‘দ্যা কোয়েস্ট ফর সিন গোল্ড’ নামে একটি বইয়ের মাধ্যমে ১৯৩৭ সালে মাত্র পনের বছর বয়সে প্রথম শিশুসাহিত্যের জগতে পা রাখেন। এরপর শিশুদের জন্য আরও রচনা করে যান। পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে সাউথ আফ্রিকার বিভিন্ন ম্যাগাজিনে গল্প লিখতে আরম্ভ করেন। ১৯৪৯ সালে ‘ফেস টু ফেস’ নামে তার প্রথম ছোটগল্পের সংকলন বের হয়। ১৯৫১ সালে দ্যা নিউ ইয়র্কারে তার গল্প প্রথম প্রকাশিত হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। তারপর থেকেই ক্রমাগত ছোটগল্পের আসরে নাদিন গোর্ডিমার একটি বিশেষ নাম। ছোটগল্পের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ছোটগল্প এই যুগের সাহিত্যের প্রতিফলন।
১৯৫৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা লাইং ডেইজ’ প্রকাশিত হয়। নীতিবর্জিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ফলাফল হিসেবে আসা মানুষের অস্থির সামাজিক জীবনের মর্মান্তিক বর্ণনাই তার লেখার প্রধান উপাদান। তার লেখায় জাতিগত বৈষম্যের নির্ভুল চিত্র ফুটে ওঠে বারবার। কাহিনীগুলোতে ভালোবাসা, ক্ষমতা আর সম্পর্ককে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। গোর্ডিমার কথা বলেন সাধারণ মানুষের কন্ঠে। তাদের চাওয়া-পাওয়া যেন বিমূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে তার কলমের ছোঁয়ায়। সমাজের অবহেলিত মানুষের বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্যই যেন তিনি ক্রমাগত লিখে যান আরও অনেক গল্প আর উপন্যাস। ১৯৭৪ সালে ‘দ্যা কনজারভেশনিস্ট’ নামে উপন্যাস লিখে বুকার প্রাইজ পান। নাদিন গোর্ডিমার ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজসহ আরও নানারকম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। ‘গেট এ লাইফ’(২০০৫) তার নবীনতম উপন্যাস। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, এইডস্ সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। জাতিগত এবং নীতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার লড়াই অব্যহত রয়েছে।