‘প্রশ্নফাঁস’ এখন একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা যাচ্ছে না কোনােভাবেই। শুধু তাই নয়, মাঝে মধ্যে মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়র খবর শোনা যায়। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবর পত্রিকায় আসে। কর্তৃপক্ষ সব সময় ওই সব খবর স্বীকার করতে চায় না। শিক্ষা বিষয়ক কর্তাব্যক্তি তো বটেই মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও তার ভাষণে প্রশ্নফাঁসকে যুগের পরিক্রমায় একটি ধারাবাহিক ব্যাপার বলেছেন। এটি সত্যিই জাতির জন্য হতাশার। যে যত কথাই বলুন, সব ছাপিয়ে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া মহাদুর্যোগ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে জাতির সামনে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রশ্নফাঁস রোধে নতুন নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের পরও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করিয়েও ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরীক্ষার দিন সকালে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মিডিয়ার হাতে চলে আসছে। পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নফাঁসের দায় শেষ পর্যন্ত কতিপয় ‘অসাধু শিক্ষক’-এর ওপর দেয়া হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে অভিযোগটি যথার্থ বলে মনে করছেন অনেকেই। পরীক্ষার দিন সকালে ফাঁস হওয়র কারণ বুঝতে অধিকতর অনুসন্ধান জরুরি। ডিজিটালাইজেশনের আগে দুর্বৃত্ত চক্র প্রশ্নফাঁস করে কয়েকদিন আগে থেকে বিভিন্ন স্থানে হাতে হাতে সরবরাহ করতো। কর্তৃপক্ষ সেটি জেনে গেলে প্রশ্নের সেট পাল্টে অন্য সেটে পরীক্ষা নিতো। ফলে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন অকার্যকর হয়ে যেতো। তবে সবক্ষেত্রে প্রশ্ন ‘আউট’ হওয়ার খবরটি ‘লিক আউট’ হতো না। তখন আর কোনাে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল না। এখন ডিজিটালাইজেশনের পরে দুর্বৃত্ত চক্র ও অসাধু পরীক্ষার্থী বা অভিভাবকের মধ্যে আগেই সরবরাহ লাইন স্থাপিত হয়ে থাকে। দুর্বৃত্তরা প্রশ্ন আগেই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু প্রকাশ করে না। পরীক্ষার দিন সকালে সমাধানসহ প্রশ্ন সরবরাহ করা হয় ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্সে। তা পাবলিকলি হয় না। ফলে ওই দিনের পরীক্ষা বাতিল করার আর কোনাে সুযোগ থাকে না। এখনকার ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নের প্যাকেট খোলার সময় প্রশ্নফাঁস হয়- এ ধারণাটি যে এখন যথার্থ নয় এর অনেক যুক্তি দেয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন, ফেসবুকসহ সব যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব। লক্ষণীয় যে, এখন শুধু এমসিকিউ অংশই ফাঁস হচ্ছে, সৃজনশীল অংশের কথা শোনা যাচ্ছে না। তবে শোনা যাচ্ছে না বলে ফাঁস হচ্ছে না এমন ভাবারও কারণ নেই। এগুলো বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
ফাঁস রোধ করা যাবে না- এমন হতে পারে না। কিন্তু এই স্বল্প পরিসরে তা সম্ভব নয়। তাই সংক্ষেপে স্বল্প মেয়াদি কিছু বিষয়ে আলোকপাত করছি।
প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা পর্যন্ত কাজটি অনেক ধাপে সম্পন্ন হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে হিসাব করলে ওই ধাপ সংখ্যা ৪০টি হবে বলে টিআইবি গবেষণায় জানিয়েছে। এর মধ্যে ৬টি ধাপ অধিক গুরুত্বপূর্ণ- প্রাথমিক প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, পরিশোধন, ছাপানো, ট্রেজারিতে সংরক্ষণ, কেন্দ্রে প্যাকেট খোলা ও পরীক্ষা কক্ষে বিতরণ। এর মধ্যে এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে হস্তান্তর ও সংরক্ষণও রয়েছে। এর যে কোনাে জায়গা থেকে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। তবে ছাপানো প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় অনুমান করা যায়, স্থানান্তরসহ শেষ ৪ ধাপের মধ্যে অপরাধটি সংঘটিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে কেন্দ্রে প্রশ্নের প্যাকেট খোলা ও কক্ষে বিতরণের ধাপকে। এটি খুব সহজেই নিশ্চিতভাবে এড়ানো যায়।
কয়েকটি প্রস্তাবনা
এক. প্রতিটি কেন্দ্রের পরীক্ষা কক্ষে বাধ্যতামূলকভাবে ২০-এর গুণিতক হিসাবে আসন বিন্যাস করতে হবে।
দুই. প্রতিটি প্যাকেটে ২০টি করে প্রশ্ন থাকবে।
তিন. প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিলগালা করা প্রশ্নের প্যাকেট পরীক্ষা শুরুর ৫ মিনিট আগে কেন্দ্র সচিব বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে জেলা-উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসানের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে পরীক্ষা কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা কক্ষে প্রেরণ করতে হবে। যথাযথভাবে কক্ষে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে উল্লিখিত দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্ধারিত বিতরণ প্রতিবেদন ফরমে স্বাক্ষর করবেন।
চার. পরীক্ষা কেন্দ্রের অভ্যন্তরে সব সড়ক ও ভবনের বারান্দা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে।
পাঁচ. পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ কেন্দ্রে প্রবেশ বা অবস্থান করতে পারবেন না- তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রশাসন নিশ্চিত করবে।
সবচেয়ে নাজুক ধাপটি হলো প্রশ্নপত্র ছাপানোর প্রক্রিয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, ‘ছাপানোর সময় আগে ২৮ জন প্রশ্ন দেখতে পারতেন। এখন ওই সংখ্যা ১৮ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে।’ এতে ঝুঁকি কমলেও একবারে ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। কারণ ১৮ জন তো দেখছেন। এখানে প্রশ্ন কম্পোজ করা, প্রুফ দেখা, ট্রেসিং প্লেট তৈরি, ছাপানো, প্যাকেট করার পর্যায়গুলাে ঝুঁকিপূর্ণ। ছাপানো প্রশ্ন ফাঁস হয় শেষ দুই ধাপের মধ্যে।
বিবেচ্য বিষয়সমূহ
এক. প্রশ্ন প্রণয়নের জন্য বোর্ডগুলোয় নির্ধারিত কক্ষে নির্ধারিত কয়েকটি কম্পিউটার থাকবে যা পাসওয়ার্ড প্রটেকটেড। কম্পিউটারের লগ ইন থেকে শুরু করে লগ আউট করা পর্যন্ত সব অপারেশন অটোমেটিক জেনারেট হয়ে সংশোধনযোগ্য নয় এমন একটি ফাইলে রিপোর্ট আকারে সংরক্ষিত থাকবে। কম্পিউটারে একটি ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া প্রিন্টার, স্ক্যানার, ফ্লাশ ড্রাইভসহ অন্য কোনাে ডিভাইস যুক্ত করার পোর্ট থাকবে না।
দুই. শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন কাজে একটি নির্ধারিত ইমেইল অ্যাকাউন্ট থাকবে যার পাসওয়ার্ড কেবল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানবেন।
তিন. প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড প্রতিটি বিষয়ের জন্য কম্পিউটারে কম্পোজ করতে পারেন এবং নিজস্ব কম্পিউটার আছে- এমন ১০ প্রশ্ন প্রণেতা শিক্ষকের কাছ থেকে ১০টি কম্পোজ করা প্রশ্ন নির্ধারিত মেইলে সংগ্রহ করবেন। প্রশ্নগুলাে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষয়ভিত্তিক ফোল্ডারে এনক্রিপ্টেড আকারে সংরক্ষিত হবে।
চার. একটি বোর্ডের প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র পরিশোধক হবেন দু’জন। তারা নির্ধারিত কম্পিউটারে বসে প্রশ্ন পরিশোধন করবেন। পরিশোধনের দিন পরিশোধকদের মোবাইল ফোনে ডিএনক্রিপশন-এর পাসওয়ার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবেন।
পাঁচ. দশ সেট প্রশ্ন থেকে দুই সেট প্রশ্ন তৈরি করবেন। দশ সেটের সব সেট থেকেই প্রশ্ন গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কোনাে সেট থেকেই ১৫ শতাংশের বেশি প্রশ্ন গ্রহণ করা যাবে না। প্রশ্ন মডারেশন সম্পন্ন হলে দুই সেট প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষয়ভিত্তিক নতুন ফোল্ডারে ট্যাগসহ এনক্রিপ্টেড আকারে জমা হবে।
ছয়. পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মেইলের মাধ্যমে ছাপাখানা (বিজি প্রেস বা বিশেষায়িত কোনাে প্রেস)-এর নির্ধারিত মেইলে প্রেরণ করবেন যা ছাপাখানার নির্ধারিত কম্পিউটারে প্রতিটি বিষয়ের নির্ধারিত ফোল্ডারে এনক্রিপটেড আকারে জমা হবে। প্রতিটি বিষয়ের ১৬ সেট প্রশ্ন হবে।
সাত. ১৬ সেট প্রশ্ন থেকে স্বয়ংক্রিয় লটারির মাধ্যমে দুই সেট প্রশ্ন নির্বাচিত হবে চূড়ান্তভাবে ছাপার জন্য। ট্রেসিং প্লেট তৈরির সময় প্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রশ্নপত্র ডিএনক্রিপ্টেড হবে। এরপর ছাপার কাজ হবে। ছাপার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২০টি প্রশ্নের একটি প্যাকেট তৈরি হবে এবং প্যাকেটের ওপর লেবেল লাগানো হবে। একই সঙ্গে সয়ংক্রিয়ভাবে আধুনিক নিরাপত্তা সিল লাগানো হবে। ছাপাখানার কার্যক্রম সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে। প্যাকিং করা প্রশ্নে কেন্দ্রের চাহিদা অনুসারে কেন্দ্রভিত্তিক বড় প্যাকেট হবে আধুনিক নিরাপত্তা সিলসহ। সেখান থেকে প্রচলিত ব্যবস্থায় জেলা-উপজেলা ট্রেজারিতে পাঠানো হবে।
উপরের কোনাে ধাপই বাস্তবায়নের জন্য জটিল নয়। এ বছরের এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষাতেই প্রথম সুপারিশের সম্পূর্ণ ও দ্বিতীয় সুপারিশের অধিকাংশ প্রয়োগ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত প্রযুক্তিবিদের সহায়তা গ্রহণ করতে হবে।
এটি গেল প্রশ্ন তৈরি, ছাপানো ও বিতরণ প্রক্রিয়া। এরপর সামগ্রিকভাবে কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। এমসিকিউ পরীক্ষায় শুধু বৃত্ত ভরাটের বিষয় থাকায় সহজে উত্তর সরবরাহ করা যায়। আবার শিক্ষার্থীরাও অনুমানে বৃত্ত ভরাট করার সুযোগ পায়। এর বদলে ওই অংশের প্রশ্ন কাঠামো একই রেখে একই প্রশ্নপত্রে ১ বা ২ নম্বরের অনেক প্রশ্ন দেয়া যার উত্তর সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক ও খাতায় ২-৩ লাইনে উত্তর লিখতে হবে।
এখানে শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন ও বিতরণ ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হলো যা এখনই করা জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদে অনেক বিষয় আছে যা এখনই আলোচনা শুরু করা দরকার। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে আরো পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কোনােভাবেই প্রশ্ন ফাঁস হতে পারবে না। তবে এর আগে ওইসব অপরাধের জন্য দোষীদের ধরে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
প্রশ্নফাঁস জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাটিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। জনগণ, বিশেষ করে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। নিজেদের সন্তানকে ফাঁস প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে বাধা দিতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া শুধু শিক্ষা ও পুলিশিংয়ে এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের তরফে যারা এই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। সবাই যখন বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন তখন ঢালাওভাবে অস্বীকারের সংস্কৃতি কোনাে সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে না। এই ক্ষতি স্বীকার করে নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ওই মহামারি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে।